বাজেটের পর বাজার

Monday, June 13, 2011

দ্রব্যমূল্য নিয়ে প্রতিদিনই সংবাদমাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের খবর প্রকাশিত হয়। সর্বশেষ খবরটি হচ্ছে 'বাজেট ঘোষণার পর আরেক দফা বেড়েছে জিনিসপত্রের দাম।' ভুক্তভোগীদের কাছে এ খবর সঙ্গত কারণেই অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এমনিতেই উচ্চ দ্রব্যমূল্যের যাঁতাকলে পড়ে লোকজনের ভোগানত্মি বেড়েছে তার ওপর বিভিন্ন ছল ছুঁতোয় যদি জিনিসপত্রের দাম বাড়তেই থাকে তাহলে তারা যাবে কোথায়? বাজেট এলেই একটি প্রবণতা দেখা যায় কোন কোন ব্যবসায়ীর মধ্যে।

বাজেটের আগে ও পরে দুই দফায় জিনিসপত্রের দাম বাড়িয়ে দেয় তারা। বাজেটে দাম কমুক বা বাড়ুক সেদিকে কোন ভ্রূৰেপ নেই। সবচেয়ে দুঃখজনক হচ্ছে বাজেটে দাম বাড়েনি এমন পণ্যের দামও বাড়িয়ে দেয় ব্যবসায়ীরা এবং তা বাজেটের উছিলায়। বাজেটে কোন জিনিসের দাম বাড়লে তাৎৰণিকভাবে তা বাড়িয়ে দেয়া হয় কিন্তু কমলে সেটি কার্যকর হয় অত্যন্ত ধীর গতিতে।
ঘোষিত বাজেটে ভোজ্যতেলের দামের ওপর কোন কর বাড়ানো না হলেও বাজেট ঘোষণার পর পরই দুই থেকে পাঁচ টাকা লিটারপ্রতি দাম বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। ইতোমধ্যেই বাজারে ভোজ্যতেলের সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে সিন্ডিকেট চক্র। ফলে দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এমনিতেই এ বছর দফায় দফায় ভোজ্যতেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। এমনকি মাত্র এক সপ্তাহ আগেও কোম্পানিগুলো সব ধরনের সয়াবিন তেলের দাম বাড়িয়েছে। কিন্তু এক সপ্তাহ না যেতেই বাজেট ঘোষণার পর আবারও তেলের দাম বাড়ানো হয়। এক লিটারের সয়াবিনের বোতল ১১৬ টাকার স্থলে ১২০ টাকা এবং দুই লিটার ২৩৪ টাকার স্থলে ২৪০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। কোম্পানি ভেদে দামের তারতম্য রয়েছে। সে ৰেত্রে দাম আরও বাড়িয়ে দেয়া হয়।
এক পরিসংখ্যানে দেখা যায় ২০১০ জুলাই থেকে ২০১১-এর ২৫ মে পর্যন্ত পরিশোধিত ও অপরিশোধিত ভোজ্যতেল আমদানি হয়েছে ১০ লাখ ৫২ হাজার ৫১৮ মেট্রিক টন। যা চাহিদার তুলনায় যথেষ্ট। অথচ ব্যবসায়ীরা বলছেন সরবরাহ কমে যাওয়ার কথা।
ব্যবসায়ীরা যখন এই ধরনের দাবি তুলছেন তখন আনত্মর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমে আসছে। কিন্তু স্থানীয় বাজারে উল্টো তেলের দাম বাড়ছে। দেখা যায়, আন্তর্জাতিক বাজারে কোন জিনিসের দাম বাড়লে সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় বাজারেও তা বাড়িয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু দাম কমলে তার প্রভাব পড়তে অনেক সময় লাগে।
ব্যবসায়ীদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দ্রব্যমূল্য সহনীয় পর্যায়ে রাখান আহ্বান জানিয়েছেন। ব্যবসায়ীরাও প্রধানমন্ত্রীকে এ ব্যাপারে আশ্বস্ত করেছেন। বিশেষ করে আসন্ন রমজানে যাতে দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল থাকে সেটি নিশ্চিত করার কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। ব্যবসায়ীরা এ ব্যাপারে আশ্বাস দিয়েছেন ঠিকই কিন্তু বাজারে তো এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। তাহলে বাজেট ঘোষণার পরপরই জিনিসপত্রের দাম বাড়ল কেন? আনত্মর্জাতিক বাজারে যেখানে ভোজ্যতেলের দাম কমছে সেখানে স্থানীয় বাজারে ব্যবসায়ীরা দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন। এটা তো সদিচ্ছার লৰণ নয়। এখন থেকেই দ্রব্যমূল্যের পাগলা ঘোড়াকে টেনে ধরতে না পারলে রমজানে কি তাকে বাগে আনা যাবে?
মানুষজন বিশ্বাস করতে চায় দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল রাখার ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীকে দেয়া ব্যবসায়ীদের আশ্বাস কেবল কথার কথা নয়, এজন্য বাজারে এর প্রতিফলন দেখতে চান ভুক্তভোগীরা।

বাজেট ভাবনা by এম আর খায়রুল উমাম

একটা দেশের বার্ষিক আয়-ব্যয়ের সম্ভাব্য হিসাব জাতীয় বাজেট। জাতীয় উন্নয়নকে সামনে রেখে সরকার তার লক্ষ্য-উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য বাজেটে বিভিন্ন খাতে অর্থ বরাদ্দ করে এবং সে মতো সারাবছর ব্যয় করে। উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে আমাদের অর্থের সীমাবদ্ধতা আছে। প্রাধিকার নিরূপণ করেই ব্যয়ের খাত নির্ধারণ করা হয়ে থাকে। অতীতে জনগণের অজান্তেই বাজেট প্রক্রিয়াকে রাখা হতো, জন অংশগ্রহণের কোন সুযোগ ছিল না।

সরকার বাজেট ঘোষণা করলে সারাদেশে সরকারি দল তাকে গণমুখী বলে এবং বিরোধী দল গণবিরোধী বলে মিছিল করেই দায়িত্ব শেষ করত। কিন্তু বর্তমানে অনেকেই বাজেট বিষয়ে আগ্রহী হয়ে উঠছে। দেশের সব শ্রেণীর নাগরিকের জন্য অত্যন্ত জরুরি এই বাজেটের প্রতি আগ্রহ খুব গুরুত্বপূর্ণ। সরকার ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে জনঅংশগ্রহণের পরিবেশ সৃষ্টিতে এগিয়ে এসেছে। এখন বাজেট প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় সরকার যেমন বিভিন্ন শ্রেণীপেশার সঙ্গে মতামতের সুযোগ সৃষ্টি করেছে আবার বিপরীতে সাধারণ মানুষও এগিয়ে এসেছে বাজেট তারা কেমন দেখতে চায়, তা জানাতে। এতে বাজেটের ব্যর্থতার অংশ কমে যাবে এবং সাফল্যের অংশ বৃদ্ধি পাবে, তা জোর দিয়ে বলা যায়। এখন সরকারের দায়িত্ব জনগণের মতামতের মূল্যায়ন করা।
'মানুষ কোনদিন কোন যথার্থ হিতকে ভিক্ষারূপে গ্রহণ করিবে না, ঋণরূপেও না, কেবল প্রাপ্য বলিয়াই গ্রহণ করিতে পারিবে।' রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রাপ্য কথাটার মধ্যে অধিকারের বিষয়টা পরিষ্কার। জাতীয় বাজেট প্রণয়নে 'অধিকার' কথা তুললে অনেকেই আঞ্চলিকতা দোষে দুষ্ট করতে পারে। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য পিছু ছাড়ে না, তাই অধিকারের প্রশ্ন তুলতে হয়। বর্তমান সরকার জেলাভিত্তিক বাজেট প্রণয়নের ঘোষণা দিয়েছিল। কিন্তু এখন মনে হয় সরকার তার ঘোষণা থেকে সরে এসেছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই জেলাভিত্তিক বাজেট প্রণয়ন সম্ভব নয়। কারণ আমাদের নীতিনির্ধারকরা তাদের বাড়িটাই বাংলাদেশ মনে করে। যার যতটুকু ক্ষমতা আছে তিনি তার বাংলাদেশের জন্য সবটাই নিবেদন করে থাকেন। এমন নীতি হওয়ার ফলে জাতীয় বাজেটে সুষম বণ্টন লক্ষ করা যায় না। যশোরে কোন মন্ত্রী নেই, কুষ্টিয়ায় কোন মন্ত্রী নেই, সাতক্ষীরায় একজন মন্ত্রী ও খুলনায় একজন প্রতিমন্ত্রী আছে। সারা খুলনা বিভাগের ভাগে মাত্র দেড়জন (মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী)। এই দেড়জন খুলনা বিভাগের উন্নয়নের জন্য কতটা ভূমিকা রাখতে পারবেন। ৬০ মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর দেশে খুলনা বিভাগ অবহেলিত থেকে যাবে। ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় যশোরসহ খুলনা বিভাগ বঞ্চিত থেকে যাচ্ছে বছরের পর বছর। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস লাইন প্রকল্প বন্ধ করে বরাদ্দকৃত অর্থ সিলেটের প্রকল্পে নিয়ে নিতে কোন সমস্যা হয় না। মাঝে আমরা কয়েকটা জেলার মানুষ মাসে ২৪ ঘণ্টা দু'বার্নারের চুলো জ্বালিয়ে ৩৫০ টাকার রান্না করার সুযোগ থেকে এখনো বঞ্চিত আছি। মাসে দু-আড়াই হাজার টাকার গ্যাস পুড়িয়ে রান্না করতে হচ্ছে। তারপর আজ মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার ঘোষণা হলে কাল পাশের জেলার ক্ষমতাধর তা নিজের বাংলাদেশে নিয়ে যাওয়ার জন্য টানাটানি শুরু করে দেন। এমন ঘটনা নিত্যনৈমিত্তিক। তাই আঞ্চলিকতার দোষ মাথায় নিয়ে প্রাপ্যটি বুঝে পেতে চাই। নেতার গুণে নয়, সুনির্দিষ্ট নীতির ভিত্তিতে প্রাপ্য নির্ধারণ করা প্রয়োজন। সেটা দারিদ্র্য বিবেচনায় হতে পারে, আর্থ-সামাজিক অবস্থা বিবেচনায় হতে পারে, জনসংখ্যা বিবেচনায় হতে পারে, তবে কোন অবস্থায় ব্যক্তি প্রাধান্য পেতে পারে না।
বাংলাদেশে ১ লাখ ৪৪ হাজার বর্গকিলোমিটারে ১৬ কোটি লোকের বাস। এখন দেশে মৃত্যুহার প্রতি হাজারে সাড়ে ৯ জন এবং জন্মহার প্রতি হাজারে ২৫ জন। মৃত্যুহারের তুলনায় জন্মহার বেশি হওয়ায় জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেতেই থাকবে। জনসংখ্যার চাপে দেশ এখনই ন্যুব্জ। তার ওপর বর্তমান জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি শিশু ও কিশোর। বৃদ্ধ ও যুব মানুষের তুলনায় শিশু কিশোরের সংখ্যা বেশি হলে আগামীতে জনসংখ্যার চাপ আরও বাড়বে। এ অবস্থায় জনসংখ্যাকে জনশক্তিতে রূপান্তর করে বিদেশে রপ্তানি করে রক্ষা পাওয়া যাবে না। স্বাধীনতার ৪০ বছরে জনসংখ্যা দ্বিগুণ হয়েছে। ১৬ কোটি লোকের মাত্র ১ কোটি মানুষ বিদেশে শ্রম বিক্রি করার সুযোগ পেয়েছে। বাকিদের দেশেই বেঁচে থাকার সংগ্রাম করতে হচ্ছে। সরকার যত ভালো জনশক্তি তৈরি করুক না কেন একটা নির্দিষ্ট অঙ্কের বাইরে তা রপ্তানি করতে পারবে না। তাই জনশক্তি রপ্তানির ভরসায় জনসংখ্যাকে নিয়ন্ত্রণহীন করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। সরকার জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের কার্যক্রমে ভাটা দেয়ার সাধারণ মানুষের দারিদ্র্য বেড়ে চলেছে। স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে পারছে না। বস্তির সংখ্যা বেড়ে চলেছে। কৃষিজমি কমে যাচ্ছে। খাদ্য নিরাপত্তা রক্ষা করা যাচ্ছে না। মৌলিক অধিকার সোনার হরিণ হয়ে পড়েছে। কর্মসংস্থান না হওয়ায় বেকার সমস্যা বাড়ছে। এমন হাজার সমস্যার মধ্যে দেশের সব পরিকল্পনা ভুল হয়ে যাচ্ছে। তাই দেশকে রক্ষা করতে হলে, মানুষকে রক্ষা করতে হলে জন্মনিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি জোরদার করতে হবে। সরকারের সামনে এক নম্বর চ্যালেঞ্জ জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ। এই কার্যক্রমের শতভাগ সাফল্যের জন্য বাজেট বরাদ্দ থাকা জরুরি।
সমাজ এখন ধনবৈষম্যের নিরিখে পুরোপুরি বিভক্ত। ধনীর অর্থে যে দারিদ্র্য সৃষ্টির প্রধানতম হাতিয়ার তা ধনবাজরা বুঝতে চায় না। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায়, 'আমাদের ভদ্র সমাজ আরামে আছে, কেননা আমাদের লোক সাধারণ নিজেকে বোঝে নাই। এই জন্যই জমিদার তাহাদিগকে মারিতেছে, মহাজন তাহাদিগকে ধরিতেছে, মনিব তাহাদিগকে গালি দিতেছে, পুলিশ তাহাদিগকে শুষিতেছে, গুরু ঠাকুর তাহাদের গাঁট কাটিতেছে, আর তাহারা কেবল সেই অদৃষ্টের নামে নালিশ করিতেছে যাহার নামে সমন জারি করিবার জো নাই। আমরা বড়জোর ধর্মের দোহাই দিয়া জমিদারকে বলি তোমার কর্তব্য করো, মহাজনকে বলি তোমার সুদ কমাও, পুলিশকে বলি তুমি অন্যায় করিয়ো না_ এমন করিয়া নিতান্ত দুর্বলভাবে কতদিন কতদিক ঠেকাইব। চালুনিতে করিয়া জল আনাইব আর বাহককে বলিব যতটা পারো তোমার হাত দিয়া ছিদ্র সামলাও_ সে হয় না; তাহাতে কোন এক সময়ে এক মুহূর্তের কাজ চলে কিন্তু চিরকালের এ ব্যবস্থা নয়। সমাজে দয়ার চেয়ে দায়ের জোর বেশি।'
সমাজের দায় নিশ্চিত করতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন প্রাথমিক শিক্ষা। দেশের মানুষের জন্য প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করা গেলে একটা যোগাযোগের মাধ্যমে গড়ে উঠবে। যা তাকে দেশকে জানতে আগ্রহী করে তুলবে। মানুষ দেশকে জানলেই অন্তরে শক্তি সৃষ্টি হবে। দেশকে ভালোবাসতে শিখবে। একজন সাধারণ মানুষ অন্যের কথা শুনবে এবং অন্যকে নিজের কথা বলে নিজেদের অধিকারের গ-ির বিস্তার ঘটাবে। স্বাধীনতার ৪০ বছরে আমাদের প্রাথমিক শিক্ষার প্রয়োজনীয় প্রসার ঘটেনি। তাই মানসম্পন্ন প্রাথমিক শিক্ষার প্রসার ঘটিয়ে সাধারণ মানুষের কাছে পেঁৗছানোর উদ্যোগ গ্রহণ প্রয়োজন। সাধারণ মানুষকে অধিকারসচেতন করতে পারলেই উন্নয়নকে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব।
বর্তমান সমাজে শিক্ষা এখন অধিকার নয়, বাণিজ্যিক পণ্য। নানা ধরনের শিক্ষাব্যবস্থার কারণে বাংলাদেশ কয়েক ভাগে ভাগ হয়ে গেছে। গুণগত মানের নৈতিক ও আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর প্রাথমিক একধারার শিক্ষা নিশ্চিত করেই দেশের ইতিবাচক পরিবর্তনের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। দেশের পিছিয়ে পড়া মানুষগুলোকে প্রীতির বন্ধনে বাঁধতে জাতীয় বাজেটে শিক্ষাব্যবস্থার প্রথম সোপান প্রাথমিক শিক্ষা গুরুত্ব পাবে। আগামীর জন্য জাতির উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে ক্রাশ প্রোগ্রামের মাধ্যমে সবাইকে লিখতে-পড়তে পারার মতো প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে বাজেট বরাদ্দ রাখার আবেদন জানাই। সঙ্গে সঙ্গে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার জন্য বিভিন্ন শ্রেণীপেশার বৃত্তিমুখী শিক্ষার বিস্তার ঘটানোর উদ্যোগ প্রয়োজন।
বাংলাদেশের সংবিধানের ১৮(১) অনুচ্ছেদে জনস্বাস্থ্যের উন্নতিসাধনকে সরকারের দায়িত্ব হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। স্বাধীনতার ৪০ বছরে আমাদের স্বাস্থ্যসেবা প্রদানে একজন ডাক্তারের বিপরীতে দশমিক ৫৪ জন নার্স এবং দশমিক ২৭ জন স্বাস্থ্য সহকারীর ব্যবস্থা করতে সক্ষম হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, মানসম্মত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে একজন ডাক্তারের বিপরীতে ৩ জন নার্স ও ৫ জন স্বাস্থ্য সহকারীর একটি দলের প্রয়োজন পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে দেশের সার্বিক চিকিৎসার কথা না বলে প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা কি সম্ভব? স্বাস্থ্যসেবার অব্যবস্থার কারণে সাধারণ রোগের চিকিৎসায় প্রতিবছর ব্যাপকসংখ্যক লোকজন বিদেশে পাড়ি দিচ্ছে এবং এতে বছরে প্রায় ১০০ কোটি টাকা বিদেশে চলে যাচ্ছে। অপরিকল্পিত স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার কারণে দেশের অধিকাংশ মানুষই এখনো নূ্যনতম স্বাস্থ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত। দেশে এখন প্রায় ৮৫ শতাংশ মায়েরা সন্তান প্রসবকালে হাসপাতালে আসে না, ৭০ শতাংশ গর্ভবতী মেয়েরা রক্তশূন্যতায় ভুগছে, ৬০ শতাংশ শিশু জন্মকালে কম ওজন নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। দেশের আগামী প্রজন্মের চিত্র যদি এমন করুণ হয় তবে উন্নয়নের চিত্রটা কী হতে পারে তা বিবেচনার দাবি রাখে। সরকার স্বাস্থ্যনীতির খসড়া তৈরি করলেও গড়িমসির কারণে আজও চূড়ান্ত করতে পারেনি।
তাই জনগণের মতামতের ভিত্তিতে খসড়াকৃত স্বাস্থ্যনীতি অবিলম্বে চূড়ান্ত করে সে ভিত্তিতে স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। দেশের সাধারণ মানুষের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে জাতীয় বাজেটে বরাদ্দ রাখতে হবে। এই বাজেটে প্রয়োজনীয় নার্স ও স্বাস্থ্য সহকারীর সংখ্যা বাড়ানোর ব্যাপক কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে।
মানুষের উদ্দেশ্যহীন যাত্রা কোনদিন লক্ষ্যে পেঁৗছতে সাহায্য করে না। দেশও তাই। লক্ষ্য নির্ধারণ করে এগিয়ে চললে সাফল্য একদিন আসবে। বাংলাদেশের লক্ষ্যহীন যাত্রা তাকে রসাতলের দিকে নিয়ে চলেছে। আমরা আশু সমস্যার আশু সমাধানের পথে চলতে গিয়ে দীর্ঘমেয়াদি কোন ভাবনা আমাদের মধ্যে নেই। সরকার পাঁচসালা বা দশসালা পরিকল্পনা করে এগিয়ে চলার কথা ভুলেই গেছে। বর্তমান সরকার জনগণের সামনে ভিশন-২০২১ রেখেছে। এই ভিশন অর্জনের কোন সুষ্ঠু পরিকল্পনা জনগণ পেয়েছে বলে মনে হয় না। তাই লক্ষ্য অর্জনে জনগণের যে পরিমাণ সম্পৃক্ততার প্রয়োজন তা লক্ষ করা যাচ্ছে না। জনগণের হার্দিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা না গেলে কি লক্ষ্যে পেঁৗছানো সম্ভব হবে? তার ওপর এই ভিশন একটা দলের। এটাকে দেশের বা জনগণের ভিশনে রূপান্তর করা যায়নি। ফলে সরকার পরিবর্তন হলে এই ভিশনের অবস্থা কী হবে, তা আমাদের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলেই অনুমান করতে পারি।
তাই সব জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেই দেশের লক্ষ্য নির্ধারণ করার উদ্যোগ প্রয়োজন। তারপর লক্ষ্যকে সামনে রেখে সরকার এগিয়ে চলবে। এমন মহা পরিকল্পনা ছাড়া উন্নয়নকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়া সম্ভব নয়। আবার সরকার পাঁচসালা বা দশসালা পরিকল্পনা করেই তাদের উদ্দেশ্যহীন যাত্রাকে সঠিক পথে নিয়ে আসা জরুরি। এতে পথের ভিন্নতা থাকতে পারে, কিন্তু লক্ষ্যচ্যুতির কোন সুযোগ থাকবে না। সাধারণ মানুষ জানতে ও বুঝতে পারবে, আগামী ২০ বছর বা ৫০ বছর পর তাদের অবস্থান কোথায় থাকবে। বিশ্বে তাদের মূল্যায়ন কেমন হবে।
অতীতের ধারাবাহিকতায় আমরা দেখে থাকি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে এডিপি'র ৪০-৪৫ শতাংশ সর্বোচ্চ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়। বাকি অংশ মাত্র ৩ মাসে তড়িঘড়ি বাস্তবায়ন করা হয়ে থাকে। এ ভিন্ন এডিপি'র অর্থ ব্যয় করা সম্ভব হয় না। এর ফলে রাষ্ট্রীয় অর্থের ব্যাপক অংশ দুর্নীতির কবলে পড়ে। এডিপি দ্রুত বাস্তবায়নের নামে তড়িঘড়ি করে খরচ দেখিয়ে জাতির কি উপকার হয়? সংশ্লিষ্ট কিছু লোককে জনগণের অর্থের দেদার লুটের সুযোগ সৃষ্টি ছাড়া ভিন্ন কোন উপকার হয় বলে বিশ্বাস করা কঠিন। তাই ১. বাজেট প্রক্রিয়া ঢেলে সাজাতে হবে। ২. বাজেটে সব শ্রেণীর মানুষের অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করতে হবে। ৩. শিক্ষার মান উন্নয়নকল্পে প্রাথমিক শিক্ষাকে গুরুত্ব দিতে হবে। ৪. স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নত করে প্রাথমিক স্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে হবে। ৫. পিছিয়ে পড়া মানুষের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। সর্বোপরি জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম জোরদার করতে হবে।

কর ও ভ্যাটের আওতা না বাড়ানোর প্রস্তাব বিএনপির

Wednesday, June 8, 2011

দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়েছে মন্তব্য করে খালেদা জিয়া বলেছেন, গত দুই দশকে কোনো অর্থবছরে সামষ্টিক অর্থনীতির সূচকগুলো এতটা বিপর্যয়ে আর পড়েনি। এর জন্য তিনি গত বছর বিএনপির প্রস্তাব না মানাকে দায়ী করেন। তিনি বলেন, বিরোধী দলের পক্ষ থেকে বাজেট প্রস্তাব দেওয়া হলেও সরকার একে গুরুত্ব দেয় না। খালেদা জিয়া আরো বলেছেন, অর্থনীতির এই নাজুক অবস্থার মূলে আরো আছে মূল্যস্ফীতি, সার, চালের মূল্যবৃদ্ধি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট, উন্নয়ন প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন না হওয়া, শেয়ারবাজারে বিপর্যয় ইত্যাদি বিষয়।

গতকাল বুধবার রাজধানীর রূপসী বাংলা হোটেলে (সাবেক শেরাটন) বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া তাঁর বাজেট প্রস্তাবে এসব কথা বলেন। ওই প্রস্তাবে তিনি বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যর্থতার অভিযোগ তুলে সরকারের কঠোর সমালোচনা করেন। সংসদে অর্থমন্ত্রীর বাজেট ঘোষণার এক দিন আগে এই প্রস্তাব তুলে ধরল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)।
গত বছর বাজেটের আগে এ ধরনের বাজেট প্রস্তাব দেওয়ার রীতি চালু করে বিএনপি। তবে গত বছর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল বাজেট ঘোষণার তিন দিন আগে। গতকাল প্রস্তাব ঘোষণার অনুষ্ঠানে বিএনপির শীর্ষ নেতারা ছাড়াও বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক, দাতা সংস্থার প্রতিনিধি ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
গত বছর পেশ করা তাদের বাজেট প্রস্তাব পুরনো হয়ে যায়নি উল্লেখ করে বিএনপি চেয়ারপারসন অনেক ক্ষেত্রে সেগুলোকেই আবার তুলে ধরেন। এর সঙ্গে যুক্ত করেন নতুন কিছু প্রস্তাব। এবারের প্রস্তাবে করমুক্ত আয় সীমা তিন লাখ টাকা করা, বিদেশগামীদের বিনা সুদে ঋণ দেওয়া, আইলাবিধ্বস্ত এলাকায় পুনর্বাসন বহুমুখী প্রকল্প গ্রহণে ১৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ, বস্ত্র খাতে নগদ সহায়তার হার বাড়ানো, তাঁতিদের ১৫ শতাংশ নগদ ভর্তুকি ও কৃষকদের জন্য সমবায় ব্যবস্থা গঠনে ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দের দাবি করা হয়।
এ ছাড়া সঞ্চয়পত্রের উৎসে কর কর্তন রহিত করে সুদের হার পুনর্নির্ধারণ, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে থোক হিসাবে ভ্যাট আদায়ের পরিমাণ শতকরা ২৫ ভাগ কমানো, ভ্যাটের আওতা আর সম্প্রসারণ না করা, ডাক্তারের ফি, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ফি, বাড়িভাড়া/স্থাপনা ও যাত্রীভাড়ার ওপর থেকে মূল্য সংযোজন কর প্রত্যাহার, প্রতি উপজেলায় প্রাথমিকভাবে ১০০ শয্যাবিশিষ্ট একটি করে বয়স্ক নিবাস নির্মাণ, সারা দেশের জন্য ডে-কেয়ার ব্যবস্থা গড়ে তোলাসহ বিভিন্ন প্রস্তাবের কথা বলা হয় বিএনপির বাজেট প্রস্তাবে।
অবকাঠামো উন্নয়নে বিএনপি বেশ কিছু প্রস্তাব দিয়েছে। এগুলো হলো রাজধানী ঢাকার সঙ্গে সব বিভাগীয় শহরের উচ্চগতির ট্রেন চালু করা, ঢাকা-চট্টগ্রামের মধ্যে ছয় লেন মহাসড়ক নির্মাণ, দ্বিতীয় পদ্মা সেতু নির্মাণ এবং রেল যোগাযোগসহ দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মাণ। বিএনপি রেল যোগাযোগসহ দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা তীব্রভাবে অনুভব করছে বলেও প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়।
খালেদা জিয়া শুরুতেই বলেন, 'আমাদের এ বাজেট প্রস্তাবনা উত্থাপনের পেছনে উদ্দেশ্য ছিল জাতির ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আমাদের ধ্যান-ধারণা তুলে ধরা। একটি দায়িত্বশীল রাজনৈতিক দল হিসেবে জাতির সামনে একটি দিকদর্শন তুলে ধরা আমরা দায়িত্ব মনে করি। সেই চিন্তা থেকেই আমরা গত বছর বাজেট প্রস্তাবনা উপস্থাপন করেছিলাম। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে সরকার আমাদের ধারণাগুলোকে কোনো গুরুত্বই দেয়নি। যার ফলে আজ সামষ্টিক অর্থনীতির সব সূচক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। এক কথায় দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়েছে।'
বিএনপির বাজেট প্রস্তাবে 'সংকট ঘনীভূত হচ্ছে' শীর্ষক একটি অনুচ্ছেদ রাখা হয়। সেখানে অর্থনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংকটের আশঙ্কা করা হয়। বলা হয়, চলতি অর্থবছরে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রের চিত্র নৈরাশ্যজনক। এটা কোনো আশার আলো দেখায় না। সরকারি মহল দাবি করছে, চলতি অর্থবছরে জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার হবে ৬.৭ শতাংশ। অথচ এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) প্রাক্কলন অনুযায়ী এই প্রবৃদ্ধির হার ৬.৩ শতাংশের বেশি নয়। দেশীয় একটি সংস্থা ও বিশ্বব্যাংকও প্রায় একই ধরনের প্রাক্কলন করেছে। জিডিপির প্রবৃদ্ধির হিসাব বারবার সংশোধন, তথ্যের অসামঞ্জস্য ও হিসাবপ্রক্রিয়ার ওপর নগ্ন হস্তক্ষেপের কারণে এর গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে বলে প্রস্তাবে দাবি করা হয়।
প্রস্তাবে বলা হয়, প্রবৃদ্ধির যে হার দাবি করা হচ্ছে, পরিস্থিতি অপরিবর্তিত থাকলে, দীর্ঘমেয়াদে এই প্রবৃদ্ধিও টেকসই হবে না। সাত শতাংশ প্রবৃদ্ধি তো দূরের কথা, সরকার যে প্রবৃদ্ধির হার দাবি করছে সেটাও পরিসংখ্যানে কারচুপির ফলে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর কর্মকর্তাদের প্রতি জনৈক মন্ত্রীর রক্তচক্ষু প্রদর্শন সর্বজনবিদিত।
পরিবহন ও জ্বালানি ব্যয় বেড়ে যাওয়াকে 'মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা' বলে অভিহিত করেন খালেদা জিয়া। জনগণের বিপুল অংশের নিট আয় আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে দাবি করে তিনি বলেন, রপ্তানি বৃদ্ধি পেয়েছে ৪১ শতাংশ, একই সঙ্গে আমদানি ব্যয় বেড়েছে ৫১ শতাংশ। বিদেশ থেকে প্রেরিত অর্থেও (রেমিট্যান্স) নামমাত্র প্রবৃদ্ধি হয়েছে। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ বৃদ্ধি পেয়েছে। চলতি হিসাবে জুনের শেষে ঘাটতি দেখা দেবে, লেনদেনের ভারসাম্যেও ঘাটতি দেখা দেবে।
খালেদা জিয়া বলেন, 'সরকার খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের দাবি করছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বিদেশ থেকে খাদ্য আমদানি করা হচ্ছে বিশালভাবে। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের প্রশ্নে সরকারের দুজন মন্ত্রীকে ভিন্নমত পোষণ করতে দেখা গেছে। তাহলে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন হলো কী করে?'
শেয়ারবাজারের বিপর্যয় থেকে ফায়দা লুটকারী গোষ্ঠীর পাচার ও আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে পাচারের কারণে ডলার সংকট তৈরি হয়েছে বলে উল্লেখ করেন বিএনপি চেয়ারপারসন। তিনি বলেন, সারা বিশ্বে যেখানে মার্কিন ডলারের মূল্যমান কমছে, সেখানে বাংলাদেশে টাকার বিপরীতে ডলারের মূল্যমান বাড়ছে।
খালেদা জিয়া বলেন, বর্তমান অর্থবছরে সামষ্টিক অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি সূচক নেতিবাচক হয়ে পড়েছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মূলত ভোগতাড়িত হওয়ায় ভঙ্গুরতায় ভুগছে। মূল্যস্তর, বিনিয়োগ, সঞ্চয়, বাজেট ঘাটতি, শিল্পোৎপাদন, বিদেশি মুদ্রার সঙ্গে টাকার বিনিময় হার, বিদেশি মুদ্রার মজুদ এবং কর্মসংস্থান সবই নেতিবাচক। বিগত দুই দশকের মধ্যে বাংলাদেশ এবারই সবচেয়ে সংকটজনক অবস্থায় পড়েছে।
বাজেটের আকার বাড়লেও সে হিসাবে উন্নয়ন ব্যয় বাড়ছে না উল্লেখ করে খালেদা জিয়া বলেন, বিএনপি সরকারের শেষ বাজেটের তুলনায় বর্তমান বাজেট ১২০ শতাংশ বেড়েছে। কিন্তু উন্নয়ন ব্যয় পাঁচ বছরে বেড়েছে মাত্র ৫০ শতাংশ। ফলে বাজেটে উন্নয়ন প্রাধান্য ধীরে ধীরে কমছে।
বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নে সরকার ব্যর্থ বলে উল্লেখ করেন খালেদা জিয়া। মূল্যস্ফীতির বিবেচনায় আগামী বাজেটের জন্য ঘোষিত ৪৬ হাজার কোটি টাকার এডিপি খুব বেশি নয় বলে উল্লেখ করেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী। তবে এর অর্থসংস্থান নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। তিনি আরো বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের ওপর ক্রমবর্ধমান ভর্তুকির চাপ বেড়ে গেলে রাষ্ট্র ভয়াবহ রাজস্ব আয়ের সংকটে পড়বে। ফলে দেশি-বিদেশি উৎস থেকে ঋণ নিয়ে ঘাটতি মোকাবিলা করতে হবে। এর ফলে মূল্যস্ফীতি আরো বাড়বে। বেসরকারি খাত ঋণ-দুর্ভিক্ষে নিক্ষিপ্ত হবে, সামগ্রিক উৎপাদন ব্যাহত হবে।
দারিদ্র্য বিমোচনের ক্ষেত্রে সরকার কৃত্রিম পরিসংখ্যান দিয়ে কারসাজি করছে বলে অভিযোগ করেন খালেদা জিয়া। তিনি বলেন, গত বছর সরকার বলেছিল দেশে দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা ৩৭.৫ শতাংশে নেমে এসেছিল। এক বছর পর সরকার বলছে, দারিদ্র্যের হার ৩১.৫ শতাংশে নেমে এসেছে। অথচ বিশ্বব্যাংকের এক সমীক্ষা বলছে, ২০১০ সালের জুলাই-ডিসেম্বর মেয়াদে নতুনভাবে ১.৫৯ শতাংশ লোক দারিদ্র্যসীমার নিচে প্রবেশ করেছে।
খাদ্যে মূল্যস্ফীতি আশঙ্কাজনক পর্যায়ে চলে গেছে উল্লেখ করে খাদে জিয়া বলেন, চলতি অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতির হার ৬ শতাংশে রেখে ধীরে ধীরে তা কমিয়ে আনার কথা বলেছিলেন অর্থমন্ত্রী। কিন্তু বর্তমান মূল্যস্ফীতির হার প্রতিশ্রুতির ধারেকাছেও নেই। সর্বশেষ এপ্রিলে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৮.৫৪ শতাংশ। গ্রামে মূল্যস্ফীতির চাপ আরো বেশি।
সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) মার্চের হিসাবে মোটা চালের দাম ৩২ শতাংশ, আটার দাম ৫০ শতাংশ, ভোজ্য তেলের দাম ৫০ শতাংশ বেড়েছে বলেও উল্লেখ করেন বিএনপি চেয়ারপারসন। তিনি বলেন, দরিদ্র মানুষের ৩৩ শতাংশ আয় দিয়ে চাল কিনতে হয়।
সারের দাম বাড়ানোর সমালোচনা করে খালেদা জিয়া বলেন, ইউরিয়ার দাম কেজিপ্রতি আট টাকা বাড়ানোর ফলে উৎপাদন খরচ বাড়বে ৪০ শতাংশ। এতে কৃষি উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
তরল জ্বালানিনির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে উচ্চমূল্যে বিদ্যুৎ কিনতে পিডিবির লোকসানের বোঝা দিন দিন বাড়ছে বলে উল্লেখ করা হয় বিএনপির প্রস্তাবে। সেখানে বলা হয়, বেশি দামে বিদ্যুৎ কেনার ফলে জাতীয় বাজেটে ভর্তুকির পরিমাণ বাড়ছে। বিদ্যুতের মূল্য বাড়িয়ে ভোক্তাদের ওপর ভর্তুকির দায়ও চাপানো হচ্ছে।
প্রস্তাবে আরো বলা হয়, কুইক রেন্টাল থেকে বিদ্যুৎ কিনতে ভর্তুকির পরিমাণ বেড়ে যাবে। অপরিকল্পিতভাবে তরল জ্বালানিনির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কেনায় তরল জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধির ফলে জাতীয় বাজেটে ভর্তুকির পরিমাণ আরো বেড়ে যাবে।
খালেদা জিয়া আরো বলেন, কোনো টেন্ডার ছাড়াই বিদ্যুৎ সেক্টরে কুইক রেন্টাল পাওয়ার কেন্দ্রের বেশির ভাগই দেওয়া হয়েছে সরকারদলীয় ব্যবসায়ীদের। এসব জায়েজ করার জন্য পাস করা হয়েছে ইনডেমনিটি অ্যাক্ট এবং সংশোধন করা হয়েছে পিপিআর অ্যাক্ট। টিসিবির ডিলারশিপ, খোলাবাজারে বিক্রি কর্মসূচির (ওএমএস) ডিলারশিপ ও সার বিতরণের জন্য ডিলার নিয়োগ দিয়ে দলীয় ব্যক্তিদের মধ্যে সুযোগ বিতরণ করা হয়েছে।
বাংলাদেশে ক্ষুদ্র পরিসরে হলেও একটি ব্যক্তি-উদ্যোক্তাগোষ্ঠী গড়ে উঠেছে বলে উল্লেখ করেন খালেদা জিয়া। তিনি বলেন, বিএনপির লক্ষ্য হলো, এদের কার্যকর নীতি-সহায়তা দিয়ে স্বাবলম্বী ও আত্মমর্যাদাবোধে বিশ্বাসী করে গড়ে তোলা।

বেগম খালেদা জিয়ার বিকল্প বাজেট প্রস্তাবনা

উপস্থিত সহকর্মী, সুধী, এক্সেলিন্সিস, সাংবাদিকবৃন্দ,
আস্‌সালামু আলাইকুম।
৭ জুন ২০১০ সালে চলতি অর্থবছরের বাজেট সম্পর্কে আমাদের কিছু চিন্তা-ভাবনা ও বাজেট প্রস্তাবনা আপনাদের সামনে উপস্থাপন করেছিলাম। আমাদের এই বাজেট প্রস্তাবনা উত্থাপনের পেছনে উদ্দেশ্য ছিল জাতির ভবিষ্যত সম্পর্কে আমাদের ধ্যান-ধারণা তুলে ধরা। একটি দায়িত্বশীল রাজনৈতিক দল হিসেবে জাতির সামনে একটি দিক-দর্শন তুলে ধরা আমরা দায়িত্ব মনে করি। সেই চিন্তা থেকেই আমরা গত বছর বাজেট প্রস্তাবনা উপস্থাপন করেছিলাম।

কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে সরকার আমাদের ধারণাগুলোকে কোনো গুরুত্বই দেয় নি। যার ফলে আজ সামষ্টিক অর্থনীতির সকল সূচক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। এক কথায় দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙ্গে পড়েছে। বিগত দুই দশকেও একই অর্থবছরে সামষ্টিক অর্থনীতির সূচকসমূহ এমন বিপর্যয়ে পড়েনি। যাইহোক, বিদায়ী অর্থছরের মতো আমরা এবারও একই আঙ্গিকে দেশের পরিবর্তিত পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে আগামী অর্থবছরের উপর বাজেট প্রস্তাবনা উত্থাপন করছি। কিন্তু পরিতাপের বিষয় আমরা এমন এক প্রেক্ষাপটে এই প্রস্তাবনা উত্থাপন করছি যখন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা আদালতের রায়ের অজুহাতে বাতিলের ঘোষণা দিয়ে সুষ্ঠু বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের পথ রূদ্ধ করে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে স্তব্ধ করে দেয়ার পাঁয়তারা চলছে। আমরা একদিকে যেমন রাজপথের সংগ্রামে রয়েছি, তেমনি তার পাশাপাশি আমাদের জাতি গঠনমুলক কর্মকাণ্ড সকল প্রতিকূলতার মধ্যেও অব্যাহত রাখতে চাই।


সুধী মন্ডলী,
আমরা বিশ্বাস করি, বাজেট হবে মানুষের জন্য, উন্নয়নের জন্য, উৎপাদনের জন্য। আর বাজেট বরাদ্দের নীতি হবে সামাজিক উৎপাদনশীলতার নিরিখে সীমিত সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা। বর্তমান বাস্তব অবস্থার নিরিখে বরাদ্দের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার নির্ণয়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত, শিক্ষা খাত, স্বাস্থ্যখাত এবং ভৌত-অবকাঠামো খাত বিশেষ গুরুত্বের দাবিদার।

বিদায়ী অর্থবছরের বাজেটের ওপর আমরা বেশ কিছু প্রস্তাবনা উপস্থাপন করেছিলাম। আমাদের দিক-দর্শন এবং প্রস্তাভাবনা এ বছরেও পুরোনো হয়ে যায় নি। এ কারণে বিদায়ী অর্থবছরের প্রস্তাবনাগুলোও সংক্ষিপ্তরূপে আপনাদের নজরে আনা হলো।

বিএনপির অর্থনৈতিক দর্শন
বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পরবর্তী প্রায় চল্লিশ বছরের মধ্যে আওয়ামী শাসনাধীন প্রথম সাড়ে তিন বছরকে বাংলাদেশের একজন অর্থনীতিবিদ আখ্যায়িত করেছিলেন “দি লস্ট মোমেন্টস” বা “হারানো মুহূর্ত” রূপে। সেই সময় বাংলাদেশ একটি “তলাবিহীন ঝুড়ি” বলেও পরিচিতি অর্জন করেছিল। সমাজতন্ত্রের নামে রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদের নীতি রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুন্ঠনের অবাধ সুযোগ করে দেয়। গড়ে উঠে একটি উৎপাদনবিমুখ লুটেরা শ্রেণী। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়া উন্নয়ন ও উৎপাদনের অর্থনীতি প্রবর্তন করে এই ধারা রোধ করার জন্য কঠোর পরিশ্রম করেন। কিন্তু জেনারেল এরশাদের আমলে স্বৈরশাসনের সমর্থনের ভিত তৈরি করার প্রয়াস একটি ঈৎড়হু ঈধঢ়রঃধষরংস এর জন্ম দেয়, যার নেতিবাচক প্রভাব আজও অব্যাহত। বর্তমান সরকারের শাসনামলে ক্ষমতাবানদের আত্মীয়-স্বজন এবং অনুগত ব্যক্তিদের মধ্যে খাজনা বিতরণের (উরংঃৎরনঁঃরড়হ ড়ভ জবহঃ) প্রবণতা দুঃখজনকভাবে প্রকট আকার ধারণ করেছে। এর ফলে অদক্ষ হাতে সমপদ কুক্ষিগত হচ্ছে। নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, আয় বণ্টন এবং কর্মসংস্থানের উপর।

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি ব্যক্তি উদ্যোগ এবং গণসৃজনশীলতা-নির্ভর অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় বিশ্বাস করে। ব্যক্তি উদ্যোগ ও গণসৃজনশীলতাকে গতিশীল করার জন্য বিএনপি রাষ্ট্রের সহায়ক ভূমিকায় বিশ্বাস করে। বিএনপি আরও বিশ্বাস করে যে, একটি সুঠাম এবং প্রতিযোগিতার শক্তিতে বলিয়ান ব্যক্তি-উদ্যোক্তা শ্রেণী ছাড়া একটি আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজ নির্মাণ সম্ভব নয়। সম্ভব নয় এর জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক দর্শনের বাস্তবায়ন।
বাংলাদেশে ক্ষুদ্র পরিসরে হলেও একটি ব্যক্তি-উদ্যোক্তাগোষ্ঠী গড়ে উঠেছে। এই গোষ্ঠীটির মধ্যে সবচাইতে সৃজনশীল ও প্রাণবন- গোষ্ঠীটি বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। মূলতঃ নিজস্ব সঞ্চয়ের উপর ভিত্তি করে এবং কোনো প্রকার ব্যাংক ঋণের প্রত্যাশা না করে এরা নতুন নতুন উদ্যোগ সৃষ্টি করছে। এদের মধ্যেই নিহিত আছে আগামী দিনের অর্থনীতির গতিশীল ও প্রাণবন- ধারা। নীচ থেকে গড়ে উঠা এই উদ্যোগ (ঊহঃবৎঢ়ৎরংব ভৎড়স নবষড়) ক্রমান্বয়ে শক্তি অর্জন করে জাতীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধারাকে বেগবান করবে। বিএনপির লক্ষ্য হলো, এদেরকে কার্যকর নীতি সহায়তা দিয়ে স্বাবলম্বী ও আত্ম-মর্যাদাবোধে বিশ্বাসী করে গড়ে তোলা। যথোপযুক্ত প্রণোদনার মাধ্যমে উৎপাদন ও উন্নয়নের পথে উত্তরণ ঘটাতে চায় বিএনপি। বিএনপি পরনির্ভরশীলতার অর্থনীতি থেকে দ্রুততম সময়ে বেরিয়ে আসতে চায়। উল্লেখ্য যে, ১৯৯১ সালে নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় আসার পর বিএনপি বার্ষিক উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থায়নে ৪৯ শতাংশ পর্যন- সংস্থান দেশীয় সম্পদের মাধ্যমে করতে সক্ষম হয়। পূর্ববর্তী স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের সময় জাতীয় উন্নয়নে দেশীয় সমপদ যোগানোর প্রয়াস শূণ্যের কোঠায় নেমে আসে। সেই সময় সরকারের প্রশাসনিক ব্যয় মেটানোর জন্য বৈদেশিক সম্পদের উপর নির্ভরশীলতার সৃষ্টি হয়। একটি স্বাধীন স্বার্বভৌম দেশের জন্য এর চাইতে লজ্জ্বাকর অবস্থা আর কি হতে পারে?

বিএনপি একটি কল্যাণমুখী দরিদ্রবান্ধব কর্মসংস্থান সৃজনকারী অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় বিশ্বাস করে। আয় বণ্টনে বৈষম্য হ্রাস করে দেশীয় বাজার সম্প্রসারণের নীতিতে বিশ্বাসী বিএনপি। বিএনপি কৃষি, শিল্প এবং সেবাখাতে সমৃদ্ধ জাতীয় অর্থনীতি গড়ে তুলতে চায়। এই লক্ষ্য দ্রুততম সময়ে পুরণের জন্য একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলতে চায় বিএনপি। বিএনপি তাই শিক্ষা, গবেষণা, কৃৎ-কৌশল, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি এবং গবেষণা ও উন্নয়নের প্রতি যথাসাধ্য রাষ্ট্রীয় সহযোগিতা প্রদানের নীতিতে বিশ্বাস করে। আমরা মনে করি, খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির অব্যাহত সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে খাদ্যে স্বয়ম্ভর হওয়ার কোনো বিকল্প জনবহুল বাংলাদেশের নেই।

বিএনপি বাজার প্রক্রিয়া ও রাষ্ট্রের ভূমিকার সর্বোত্তম সমন্বয়ে বিশ্বাসী। জাতীয় অর্থনীতিকে সর্বোত্তমভাবে সংগঠিত করতে ব্যক্তি মালিকানা, সমবায়ভিত্তিক মালিকানা এবং রাষ্ট্রীয় মালিকানার পারস্পরিক পরিপূরকতায় বিশ্বাসী বিএনপি। সামাজিকভাবে অনগ্রসরগোষ্ঠীসমূহকে রাষ্ট্রীয়ভাবে বিশেষ সহায়তা প্রদানের নীতিতে বিশ্বাসী বিএনপি। শিক্ষার বিস-ার, স্বাস্থ্যসেবা, আয়বর্ধন, সামাজিক বৈষম্য নিরসন প্রভৃতি নানামুখী কর্মসূচির বাস্তবায়ন করে সামাজিকভাবে অনগ্রসর গোষ্ঠীগুলোকে সমাজের মূলধারায় নিয়ে আসার নীতিতে বিশ্বাস করে বিএনপি। নারীর ক্ষমতায়ন ও অধিকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নারী পুরুষকে সমভাবে দেশ গড়ার সৈনিকে পরিণত করতে চায় বিএনপি।

বিএনপি সবসময় নন-গভ:সংস্থাসমূহকে জাতীয় উন্নয়নমূলক কাজে সম্পৃক্ত হতে সুযোগ করে দিয়েছে এবং ভবিষ্যতেও এ ধারা অব্যাহত থাকবে।
বিএনপি চায় এমন একটি আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থা, যে ব্যবস্থা কোনো গোষ্ঠীকে এড়িয়ে যাবেনা, প্রতিটি মানুষ মানুষের মর্যাদা পাবে। প্রতিটি মানুষের স্বাধীনতা এবং বাছাই ও পছন্দের অধিকার (ঈযড়রপব)  নিশ্চিত হবে। সম্পূর্ণ অবসান ঘটবে ধর্মীয় ও জাতিগত ভেদ বৈষম্যের। বাংলাদেশের মাটিতে এবং এর উন্মুক্ত আকাশের নীচে প্রতিটি মানুষ হবে একে অপরের স্বজন। উন্নত জীবনবোধের নৈতিকতায় প্রত্যেক নাগরিক হবে মানুষের মতো মানুষ। সকল প্রকার বৈষম্য, শোষন বঞ্চণা এবং অবহেলার বিরুদ্ধেই বিএনপির রাষ্ট্রীয় নীতি পরিচালিত হবে।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সরকারের ব্যর্থতা
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এখন অত্যন্ত নাজুক। আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে জমি ইজারা নেওয়ার ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংক যে মন-ব্য করেছে তাতে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তারা বলেছে “বৈদেশিক মুদ্রার মজুত মূলতঃ কয়েকটি পণ্য রপ্তানি এবং প্রবাসী বাংলাদেশীদের পাঠানো আয়ের উপর নির্ভরশীল। এর মধ্যে রয়েছে খুবই স্বল্প পরিমানে বৈদেশিক সাহায্য ও ঋণ। সম্প্রতি রপ্তানি বাড়লেও এর চেয়ে বেশি বেড়েছে আমদানী (রপ্তানি বেড়েছে ৪১%, কিন্তু আমদানি বেড়েছে ৫১%)। প্রবাসী আয়ে নামমাত্র প্রবৃদ্ধি থাকলেও মূলধন হিসাবে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। বিদেশী বিনিয়োগ পরিস্থিতি দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। ফলে বৈদেশিক দায় পরিশোধে দেশে বিদেশী মুদ্রার মজুত (রিজার্ভ) চাপের মধ্যে ও তা নিম্মমুখী। এই পরিস্থিতিতে টাকার মূল্যমান ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে।

গত মার্চ ২০১১ পর্যন্ত (বাংলাদেশ ব্যাংক তথ্য) সামগ্রিক বৈদেশিক লেনদেনের ঘাটতি ৫২ কোটি ৯০ লাখ ডলার। চলতি হিসেবে ৬৮ কোটি ৯০ লাখ ডলার উদ্বৃত্ত থাকলেও তা চলতি জুন মাসের হিসাব সমন্বয়ের পর ঘাটতিতে পরিণত হবে। সূত্রমতে, বুধবার (১.৬.১১) দেশে বৈদেশিক মুদ্রার মজুদের পরিমান ছিল এক হাজার তেতাল্লিশ কোটি ১২ লাখ ৩০ হাজার মার্কিন ডলারের সমপরিমান বৈদেশিক মুদ্রা।
সারের দাম বৃদ্ধি
যেখানে উৎপাদনের উপকরণ সাশ্রয়ী মূল্যে সরবরাহ করে কৃষককে উৎপাদন বৃদ্ধি করার জন্য প্রণোদনা দেয়ার কথা, সেখানে ইউরিয়া সারের দাম কেজিপ্রতি ১২ টাকা থেকে ২০ টাকায় বৃদ্ধি করা হয়েছে, অর্থাৎ দাম বাড়ানো হয়েছে ৬৭ শতাংশ। এর ফলে গত বছরের তুলনায় একই পরিমান সার ব্যবহার করলে শুধু এই উপকরণের জন্য উৎপাদন খরচ বাড়বে প্রায় ৪০ শতাংশ। কেননা কৃষকরা ইউরিয়া ব্যাপক হারে ব্যবহার করে। এর ফলে কৃষি উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

একদিকে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি এবং অন্যদিকে উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য না পাওয়ারও ব্যাপক অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।

‘ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না কৃষক। লাভ ফড়িয়া মজুদদারদের’ - প্রথম আলো, ২রা জুন, ২০১১। খবরে প্রকাশ সরকারিভাবে বোরো ধান-চাল সংগ্রহ অভিযান শুরু না হওয়ায় ঠাকুরগাঁয়ের মজুদদারেরা ফড়িয়াদের মাধ্যমে কমদামে ধান কিনে পরবর্তী সময়ে সরকার ঘোষিত দরে বিক্রির আশায় গুদামজাত করছেন। মজুদদারেরা মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ফড়িয়াদের সঙ্গে আলোচনা করে ধানের দর নিয়ন্ত্রণ করছেন। এতে শ্রম ও পুঁজি খাটিয়ে কৃষকেরা ফসলের ন্যায্য দাম না পেলেও ফড়িয়া মজুদদাররা শস্য সংগ্রহ নিয়ে সরকারের সময় উপযোগী সিদ্ধান্তের অভাবে ফায়দা তুলে নিচ্ছে। সরকারই ফড়িয়া মজুদদারদের স্বার্থে কাজ করছে।
মূল্যস্ফীতির হার বৃদ্ধি
চলতি অর্থবছরে বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৬ শতাংশে স্থিতিশীল রেখে তা ক্রমান্বয়ে কমিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। সেই প্রতিশ্রুতির ধারে কাছে নেই মূল্যস্ফীতির বর্তমান হার। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যানুযায়ী সর্বশেষ এপ্রিল মাসে ভোক্তা মূল্যস্ফীতির হার ১০.৬৭, মার্চ ২০১১ এ হার ছিল ১০.৪৫ শতাংশ। অন্যদিকে চলমান গড় হিসাবে ২০১১ এর এপ্রিল মাসে মূল্যস্ফীতির হার ৮.৫৪ শতাংশ। দরিদ্র দেশগুলোর জনগণের আয়ের বড় অংশই ব্যয় হয় খাদ্য ক্রয়ে। ফলে বাংলাদেশের মত দেশগুলোতে খাদ্যপণ্যের দামের উপরই নির্ভর করে মূল্যস্ফীতির উঠানামা। খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার এখন আতঙ্কজনক পর্যায়ে চলে গেছে। গত এপ্রিলে (২০১১) খাদ্য মূল্যস্ফীতি হয়েছে ১৪.৩৬ শতাংশ। আগে মার্চে ছিল ১৩.৮৭ শতাংশ। অন্যদিকে খাদ্য বহির্ভূত মূল্যস্ফীতির হার ৩.৯৭ শতাংশ, যা মার্চে ছিল ৪.৩২ শতাংশ।

ব্যবধান বেড়েছে শহর আর গ্রামের মানুষের মধ্যেও। গ্রামে দারিদ্র্যের হার বেশি। মূল্যস্ফীতির চাপও বেশি। গত এপ্রিলে পল্লী অঞ্চলে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ১১.৪৯ শতাংশ। এর মধ্যে খাদ্যসূচকে ১৫.৩৮ শতাংশ ও খাদ্য বহির্ভূত সূচকে ৩.৯২ শতাংশ। অন্যদিকে এপ্রিলে শহর এলাকায় মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৮.৬২ শতাংশ। এ ক্ষেত্রে খাদ্যসূচকে ১২.০৪ শতাংশ এবং খাদ্য বহির্ভূত সূচকে ৪.১৮ শতাংশ। অর্থাৎ গরীব মানুষের উপর বাজেটের আগেই কর বসেছে ১০.৬৭ শতাংশ।
অথচ আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে প্রথম অগ্রাধিকার ছিল দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ। বলা হয়েছিল, “দ্রব্যমূল্যের দুঃসহ চাপ প্রশমনের লক্ষ্যে চাল, ডাল, তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম কমিয়ে জনগণের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে স্থিতিশীল রাখার ব্যবস্থা করতে হবে।”

অথচ টিসিবির মূল্য তালিকা (মার্চ ২০১১) অনুযায়ী বিগত বছরের একই সময়ের তুলনায় মোটা চালের দাম বেড়েছে ৩২ শতাংশ, আটার দাম বেড়েছে ৫০ শতাংশ এবং ভোজ্যতেলের দাম বেড়েছে ৫০ শতাংশ।

পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০০৫ সালের খানা আয় ও ব্যয় জরিপ অনুযায়ী দরিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী বেশির ভাগ মানুষের দৈনিক আয়ের ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ ব্যয় হয় খাদ্য ক্রয়ে। এর মধ্যে কেবল চালই কিনতে হয় ৩৩ শতাংশ আয় দিয়ে। সুতরাং চালের দাম বাড়লে জনগোষ্ঠী খাদ্য-নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে পড়ে যায়। দারিদ্র্য বাড়ে। উচ্চ-মূল্যস্ফীতি আয় বৈষম্য বৃদ্ধি করে। আন-র্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আই,এম,এফ) মনে করে মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশ ছাড়িয়ে যাওয়াই বিপদজনক। সন্দেহাতীতভাবে বাংলাদেশ সেই বিপদজনক পরিস্থিতিতে পড়েছে।

দ্রব্যমূল্যের প্রভাব নিয়ে পরিচালিত বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে ২০১০-১১ স্ট্যাডি থেকে ২০১০ এর জুলাই থেকে ২০১০ এর ডিসেম্বর পর্যন- খাদ্যমূল্যের বিশ্লেষণে জানা যায়, খাদ্য পণ্যের দাম বাড়ায় নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে ২ দশমিক ০৮ শতাংশ এবং কিছু মানুষ এ সীমা অতিক্রম করায় (০.৪৯%), সার্বিকভাবে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে ১ দশমিক ৫৯ শতাংশ মানুষ। এ পরিসংখ্যান ২০১০-১১ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসের। অবস্থার দ্রুত অবনতির পরিপ্রেক্ষিতে আরও ৩ শতাংশ মানুষ যে দারিদ্রসীমার নিচে নেমে গেছে তা সহজেই অনুমান করা যায়। উল্লেখ্য যে, ২০০০ সাল থেকে ২০০৫ সাল পর্যন- বিএনপির শাসনামলে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা ৪৯ শতাংশ থেকে ৪০ শতাংশে নেমে এসেছিল।

বৈদেশিক সাহায্য প্রবাহ
বর্তমান অর্থবছরে বাজেট ঘাটতি মেটানোর জন্য বিশ হাজার ৭৭৭ কোটি টাকা বৈদেশিক সাহায্য প্রাপ্তি আশা করা হয়েছিল। কিন্তু, অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে এই খাতে পাওয়া গেছে মাত্র ৪,৬২৭ কোটি টাকা। বিগত অর্থবছরে প্রাপ্ত সাহায্যের পরিমান ছিল ৯,১৪৪ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী বর্তমান আর্থিক বছরের প্রথম নয় মাসে বিদেশী ঋণ পাওয়া গেছে ১২৯ কোটি ৩৩ লাখ ডলার, কিন্তু বিগত অর্থবছরে একই সময়ে পাওয়া গিয়েছিল ১৭৭ কোটি ডলার যার মধ্যে ৫০ কোটি ডলার পরিশোধ করা হয়েছে। বর্তমান অর্থবছরে তুলনামূলকভাবে বেশ কম সাহায্য পাওয়া গেলেও পরিশোধ করতে হয়েছে বেশি। দুর্নীতি, মানবাধিকার, সুশাসন প্রভৃতি ইস্যুতে সরকারের সঙ্গে দাতাগোষ্ঠীর দূরত্ব বৃদ্ধি পাওয়ায় দাতাগোষ্ঠী পূর্বের ন্যায় অর্থ ছাড় করছে না। বৈদেশিক ঋণের প্রবাহের পরিমান কমেছে ৩৮%।
স্পেশাল ইকনমিক জোন
ভারতীয় বাণিজ্য সংস্থার পক্ষ থেকে সিলেটের ছাতকে শুধু মাত্র ভারতীয় বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি ‘স্পেশাল ইকনমিক জোন’ স্থাপনের প্রস্তাব করা হয়েছে। বর্তমান সরকার বিষয়টি বিবেচনা করে দেখছেন। এই স্পেশাল ইকনমিক জোনের জন্য ৪০০ একর ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি অধিগ্রহণ করতে হবে। যেসব ভারতীয় ব্যবসায়ীগোষ্ঠী এই স্পেশাল ইকনমিক জোনে বিনিয়োগের জন্য উৎসাহ দেখাচ্ছে তাদের মধ্যে রয়েছে টাটা, বিরলা, টিভিএস গোষ্ঠীসহ অন্যান্য বড় বড় ভারতীয় শিল্পগোষ্ঠী। এদের লক্ষ্য হল উত্তর পূর্ব ভারতের শিল্প পণ্যের চাহিদা পুরণ করা। বাংলাদেশের শিল্পপতিরা ধারণা করেছিলেন ট্রানজিট ব্যবস্থা চালু হলে তারাই সীমান-বর্তি অঞ্চলে কলকারখানা স্থাপন করে উত্তর-পূর্ব ভারতের বাজারে তাদের অবস্থান সুদৃঢ় করবে। ভারতীয় ব্যবসায়ী মহলের প্রস্তাব গ্রহণ করা হলে বাংলাদেশী শিল্পপতিদের আশাআকাঙ্খা ধূলিসাৎ হয়ে যাবে। আমার মনে করি এ ধরণের প্রস্তাব অনুমোদনের পূর্বে বাংলাদেশী শিল্পপতিদের স্বার্থ সরকারকে অবশ্যই বিশেষ বিবেচনায় নিতে হবে।
ভারতের সংগে ১ বিলিয়ন ডলারের কঠিন শর্তযুক্ত ঋণচুক্তি
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরের সময় ভারত থেকে ১ বিলিয়ন ডলারের ঋণ নেওয়ার একটি চুক্তি সম্পাদিত হয়। এই ঋণচুক্তির অধীনে যে সব প্রকল্প বাস-বায়িত হবে তার লক্ষ্য হল বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে ভারতের করিডোর সুবিধা ব্যবহার সহজতর করা। এই ঋণের জন্য ১.৭৫% হারে সুদ দিতে হবে। অথচ বিশ্ব ব্যাংক এ ধরণের ঋণ দেয় ০.৭৫% সুদে। ৫ বছরের গ্রেস পিরিয়ড সহ ১৫ বছরে এই ঋণ শোধ করতে হবে। বিশ্ব ব্যাংকের ক্ষেত্রে শর্তটি হলো ১০ বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ ৪০ বছরে পরিশোধ। কমিটমেন্ট ফি দিতে হবে ০.৫ শতাংশ হারে। এই শর্তটিও বিশ্ব ব্যাংকের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয় না। ভারতই প্রকল্পের পরামর্শক সেবা দেবে। ৮৫ শতাংশ উপকরণ ও যন্ত্রপাতি ভারত থেকেই কিনতে হবে, বাকী ১৫ শতাংশ উপকরণ অন্য সূত্র থেকে সংগ্রহ করা গেলেও ভারতের এক্সিম ব্যাংকই তা সংগ্রহ করবে। প্রকল্পে অংশগ্রহণকারী পার্টিগুলোর পাওনা ভারতের এক্সিম ব্যাংক সরাসরি পরিশোধ করবে। প্রকল্পের কোনো অর্থ বাংলাদেশের হাতে আসবে না। প্রকল্পের কন্ট্রাক্টরগণও হবেন ভারতীয়। জয়েন্ট ভেনচারের ক্ষেত্রে ৫১ শতাংশ মালিকানা থাকবে ভারতীয় কোম্পানীর। সকল পাওনা ডলারে পরিশোধ করতে হবে। বাংলাদেশ নিজ উদ্যোগে ভারতীয় অনুমোদন ছাড়া এই ঋণের অধিনে কোনো প্রকল্প গ্রহণ করতে পারবে না। এই ঋণ চুক্তি শতকরা ১০০ ভাগ বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থবিরোধী। কারণ কঠিন শর্তের ভারতীয় ঋণ বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে ভারতের করিডোর সুবিধা ব্যবহারের জন্যই ব্যয়িত হবে। ইতোমধ্যে সরকারের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ভারতের কাছ থেকে ট্রানজিট ব্যবহারের জন্য ফি দাবি করাকে ‘অসভ্যতা’ বলে মিডিয়ার কাছে উল্লেখ করেছেন। অথচ বর্তমান সরকারের সমর্থক অর্থনীতিবিদরা ইতিপূর্বে দাবি করেছিলেন ভারতকে ট্রানজিট দিলে বাংলাদেশ সিংগাপুর হয়ে যাবে। বাস-বে দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশ নানাভাবে ক্ষতিগ্রস- হয়ে আরো নিঃস্ব হয়ে পড়বে।
এ, ডি, পি বাস্তবায়ন
রাষ্ট্রীয় প্রশাসনে এখন চলছে নৈরাজ্যকর অবস্থা। মন্ত্রী পরিষদ ও উপদেষ্টা মন্ডলীর দ্বৈত শাসনের ফলে সিদ্ধান্তহীনতা, স্থবিরতা এবং সরকারের অভ্যন্তরে চিন্তার ঐক্যের অভাব প্রশাসনকে এমন স্তরে নিয়ে গেছে যে এর দ্বারা জনগণের কোন মঙ্গল আশা করা যায় না। জানা যায়, বর্তমান সরকারের কর্মকর্তারা ভয়ভীতি ও ত্রাসের মধ্যে থাকার ফলে এবং তাঁদের উপর অবাঞ্ছিত রাজনৈতিক খবরদারি ও হস্তক্ষেপের ফলে এ,ডি,পি বাস্তবায়নে আশানুরূপ উদ্যোগ গ্রহনে তাঁরা সাহস পাচ্ছে না। বর্তমানে এডিপি বাস্তবায়নে অদক্ষতা সরকারের ব্যর্থতারই একটি নজির।

পরবর্তী এডিপিতে প্রকল্পের সংখ্যা ১০৩৯ এর মধ্যে ৯৬২টি প্রকল্প বর্তমান অর্থবছর থেকে স্থানান্তরিত। ৭৭টি প্রকল্পের জন্য নতুন অর্থায়ন করা হয়েছে। এর মধ্যে ৮৩৪টি বিনিয়োগ প্রকল্প, ১৪৩টি কারিগরি সহায়তা প্রকল্প এবং ৬২টি জেডিসিএফ দ্বারা অর্থায়নকৃত।

চলতি অর্থবছরে প্রথম ১০ (দশ) মাস শেষে সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি মাত্র ৬০ শতাংশ বাস-বায়ন হয়েছে। ৮৭টি প্রকল্পে কোন অর্থই ব্যয় করা হয়নি। অর্থাৎ জুলাই থেকে এপ্রিল ২০১১ পযনর্- ২০ হাজার ৯০৯ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। এর অর্থ দাঁড়ায়, শেষ দুই মাসে ১৪ হাজার ২২১ কোটি টাকা খরচ করতে হবে। প্রতি বছরেই সরকার যে আকারের এ, ডি, পি, করে, তা বাস-বায়ন না করতে পেরে সংশোধন করা হয়। সংশোধিত এ,ডি, পিও শেষ পযনর্- বাস-বায়ন হয় না।

এ দিকে গত দুই অর্থবছর ধরে বাজেটে সরকারী বেসরকারী অংশীদারির (পিপিপি) আওতায় বিনিয়োগের ব্যাপক আশাবাদ প্রকাশ করা হলেও এখন পর্যন- কোন অগ্রগতি নেই। গত বছরে আড়াই হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ থাকলেও নীতিনির্ধারণী কাঠামো প্রণয়নে ব্যর্থতার কারণে একটি টাকাও খরচ করা সম্ভব হযনি। আগামী অর্থবছরেও শুনছি তিন হাজার কোটি টাকা এই খাতে বরাদ্দ দেয়া হবে। এমনকি পিপিপির দপ্তর গঠনের ঘোষনা দেওয়া হলেও তা’ও করতে পারেনি সরকার। জাতীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলোতে খরচ না করে অন্যান্য প্রকল্পে খরচ করার ফলে উন্নয়ন ব্যয়ের মান ব্যাহত হয়েছে। উল্লেখ্য যে, আমাদের সময়ে গৃহীত ঢাকা-চট্টগ্রাম হাই-ওয়ে চার লেন প্রকল্প, যাত্রাবাড়ী ফ্লাই-ওভার ও রেলওয়ের ডাবল লাইন প্রকল্পগুলো যথাসময়ে শুরু না করে বর্তমানে নতুন করে কার্যাদেশ দিয়ে এগুলোর ব্যয় বাড়ানো হয়েছে প্রায় কয়েকগুণ। উল্লেখ্য যে, আমাদের সময় প্রাইভেট ইনভেস্টমেন্ট কমিটির (চওঈঙগ) নীতি কাঠামোর আওতায় ১৬টি বিনিয়োগ প্রস-াব প্রক্রিয়াকরণ করে অনেক দূর এগিয়ে যাওয়া হয়েছিল, কিন্তু এগুলো বন্ধ করে দেওয়ার ফলে প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে কয়েকগুণ।


আমরা মনে করি, সরকারী কর্মকান্ডের উপর রাজনৈতিক হস-ক্ষেপ বন্ধ করে আস্থার মনোভাব ফিরিয়ে আনতে হবে। সময়মত অর্থছাড় করে প্রকল্পের বাস-বায়ন ত্বরান্বিত করতে হবে। বছর ব্যাপী সুষম হারে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যে বছরের প্রথম থেকেই রাজস্ব সংগ্রহের গতি বাড়াতে হবে। রাজস্ব প্রশাসনের ভিন্নতা বিবেচনায় রাজস্ব প্রশাসন পরিচলনায় নীতি পরিবর্তন ও সংস্কার করতে হবে।

উন্নয়ন প্রকল্পগুলো সময়ের মধ্যে সম্পন্ন না হওয়ায় একদিকে যেমন ব্যয়, অন্যদিকে মূল্যস্ফীতির চাপও বৃদ্ধি এই দ্বি-মুখী নেতিবাচক চাপ প্রতিহত করার লক্ষ্যে উন্নয়ন প্রশাসনকে তৎপর করে তোলা প্রয়োজন। রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রকল্পের বাহুল্য কাঙ্খিত উন্নয়ন অর্জনের পরিপন্থি।

আগামী অর্থবছরের জন্য ৪৬ হাজার কোটি টাকার নতুন এ,ডি,পি অনুমোদন করেছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ (এন,ই,সি)। এই অর্থ আপাতঃদৃষ্টিতে বিগত বছরের এডিপির তুলনায় বড় দেখালেও বর্তমান মূল্যস্ফীতির কথা বিবেচনা করলে এই অর্থ তেমন বেশি নয়। এর মধ্যে সরকার যোগান দেবে ২৭ হাজার ৩১৫ কোটি টাকা এবং বিদেশী সহায়তার প্রত্যাশা ১৮ হাজার ৬৮৫ কোটি টাকা। এই সরকারের আমলে চলতি অর্থ বছরের সময়মত বৈদেশিক সাহায্য না আসার ফলে এডিপি বাস্তবায়ন মন্থর হয়ে গেছে। ভবিষ্যতে কি হবে বলা যায় না। স্থানীয় মুদ্রায় অর্থ যোগান দিতে ব্যাংক ব্যবস্থার উপর অতি নির্ভরশীলতায় একদিকে বেসরকারী খাতে ঋণের সরবরাহ সংকুচিত হবে, অন্যদিকে বেসরকারী খাতে উৎপাদন ব্যাহত হবার ফলে মূল্যস্ফীতিকে উসকে দিতে পারে।
কী রকম বাংলাদেশ দেখতে চাই

সাধারণ মানুষের মধ্য থেকে উঠে আসা তরুণ গণযোদ্ধা ও সৈনিকেরা দলমত নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাঁধে কাধ মিলিয়ে যুদ্ধ করে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছিল। কিন্তু স্বাধীনতার পরপর তাদের স্বপ্ন ভেঙ্গে গিয়েছিল। অগণিত মানুষের রক্ত, অশ্রু, শ্রমের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশে রচিত হয়েছিল ইতিহাসের এক কালো অধ্যায়। গণতন্ত্রকে ধ্বংস করে একদলীয় বাকশালী স্বৈরশাসন জাতির কাঁধে চাপিয়ে দেয়া হয়েছিল। সেই স্বৈরব্যবস্থার ভস্মস্তূপ থেকে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এ দেশকে বহুদলীয় গণতন্ত্রে উত্তরণ করেছিলেন। তবে ১৯৮২ এবং ২০০৭ সালে এই গণতন্ত্র ব্যাহত করে স্বৈরশাসন প্রবর্তিত হয়েছিল। জনগণকে সঙ্গে নিয়ে আমাদেরকে সংগ্রামের পথে স্বৈরশাসনের অবসান ঘটাতে হয়েছে।

শহীদ জিয়ার লক্ষ্যই ছিল স্বাধীনতা সংগ্রামের মূল নির্যাস-সঞ্জাত। সেটা হচ্ছে গণতন্ত্র, স্বাধীনতা, মর্যাদা এবং উন্নয়ন ও উৎপাদনের পথে সমৃদ্ধি অর্জন।

আমাদের ভবিষ্যত স্বপ্ন ও লক্ষ্য হচ্ছে, পরিবর্তিত বিশ্ব ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং পরিবেশ বিপর্যয় মোকাবিলায় সক্ষম এমন একটি বাংলাদেশ, যেখানে ক্ষুধা, অপুষ্টি, অশিক্ষা, সামাজিক অবিচার, মানবাধিকার লঙঘন এবং শোষণ, বঞ্চনা ও কোনো ধরণের বৈষম্য থাকবে না। আমরা আগামী দশকের মধ্যে বাংলাদেশকে বিশ্ব সভায় সম্মান ও মর্যাদার আসনে আসীন দেখতে চাই। সেই লক্ষ্য ও স্বপ্ন বাস-বায়নকল্পেঃ

ক    বিশ্বাসযোগ্য এবং পক্ষপাতহীন নির্বাচন অনুষ্ঠানের নিশ্চয়তা
খ    কার্যকর এবং জবাবদিহিতামূলক সংসদের নিশ্চয়তা
গ    একটি স্বাধীন, দক্ষ, রাজনৈতিক হস-ক্ষেপ বিবর্জিত এবং দুর্নীতিমুক্ত বিচার ব্যবস্থা
ঘ    মানবাধিকার সংরক্ষণ এবং আইনের শাসনের নিশ্চয়তা
ঙ    দক্ষ, দুর্নীতিমুক্ত এবং দল-নিরপেক্ষ গণ এবং পুলিশ প্রশাসন গড়ে তোলা
প্রশাসনিক
আমরা একটি দক্ষ, গতিশীল, যুগ-উপযোগী ও গণমুখি প্রশাসন গড়ে তুলতে চাই।

সেই লক্ষ্যে
ক    স্বচ্ছ এবং জবাবদিহিতামূলক নীতিনির্ধারনী প্রক্রিয়া চালু করা
খ    স্বচ্ছ এবং দলীয় প্রভাবমুক্ত সরকারি ক্রয় ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা
গ    সকল পর্যায়ে ব-মড়াবৎহধহপব চালু।
ঘ    স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশনকে সম্পূর্ণভাবে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করা
অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা
আমরা এমন একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা ও নীতি কাঠামো গড়ে তুলতে চাই যার মাধ্যমে ২০২৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশ দ্রুত দারিদ্র্যমুক্ত একটি মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হবার পথে এগিয়ে যাবে।

সেই লক্ষ্যে
ক    কৃষির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, বাণিজ্যিকীকরণ এবং বহুমুখীকরণ
খ    শিল্পখাতে অধিকতর প্রবৃদ্ধি অর্জন
গ    সেবা খাতকে দরিদ্র মানুষের নিছক টিকে থাকার আশ্রয়স্থল থেকে সর্বাত্মক সমৃদ্ধির বাহনে রূপান্তরিত করা
ঘ    রপ্তানী খাতের বহুমুখীকরণ
ঙ    বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষের চাহিদার নিরিখে বিশ্বায়নের বাস-বতার সংগে সঙ্গতি রেখে দেশীয় বাজারমুখী শিল্পায়ন
বৈদেশিক শ্রমবাজার
আমরা এমন একটি মানব সম্পদ উন্নয়ন নীতি চাই যার মাধ্যমে সম্ভব হবে
ক    বিদেশে রপ্তানিযোগ্য শ্রমিকদের দক্ষ শ্রমিকরূপে গড়ে তোলা।
খ    বিদেশের শ্রমবাজারে দক্ষ নার্সদের বিরাট চাহিদার সুযোগ গ্রহণের জন্য দেশে প্রতিটি বিভাগীয় শহরে উচ্চ মানের নার্সিং ইনস্টিটিটিউট গড়ে তোলা।
ঘ    এক কথায় বিদেশে প্রেরণযোগ্য শ্রমশক্তির কারিগরি ও প্রযুক্তিগত মান উন্নয়ন।
স্বাস্থ্যবান জাতি
আমরা একটি স্বাস্থ্যবান জাতি গঠনকল্পে জনগণের স্বাস্থ্যসেবা ও সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে একটি বাস্তবসম্মত স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ নীতি প্রণয়ন করতে চাই।

যার লক্ষ্যে হবে
ক    আগামী দশকের মধ্যে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার আরো উল্লেখযোগ্য পর্যায়ে নামিয়ে আনার জন্য প্রণোদনা ও বস্তুগত সহায়তা প্রদান।
খ    গরিব ও বঞ্চিত শ্রেণীর মানুষদের অগ্রাধিকার দিয়ে নাগরিকদের জন্য নিবারণ ও নিরাময়মূলক স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ, আওতা ও পরিধি এবং মান উন্নত করা।
গ    শিশু ও মাতৃ মৃত্যুর হার আরও নামিয়ে আনতে এবং তাদেরকে অপুষ্টি থেকে বাঁচাতে শিশু ও মাতৃসেবার উন্নয়ন।

আপনাদের সবাইকে ধন্যবাদ।
 
Support : Dhumketo ধূমকেতু | NewsCtg.Com | KUTUBDIA @ কুতুবদিয়া | eBlog
Copyright © 2013. Edu2News - All Rights Reserved
Template Created by Nejam Kutubi Published by Darianagar Publications
Proudly powered by Dhumketo ধূমকেতু