সরকার আদিবাসীদের অধিকারের কথা স্বীকার করে নাঃ সন্তু লারমা

Wednesday, August 10, 2011

দিবাসী ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক দুটি অনুষ্ঠানে গতকাল বুধবার বক্তারা ‘আদিবাসী’ কথাটির বিষয়ে সরকারের সাম্প্রতিক অবস্থানের তীব্র সমালোচনা করেছেন। এত দিন সমস্যা না থাকলেও এখন এ নিয়ে নেতিবাচক কথা বলায় প্রশ্ন তোলেন তাঁরা। কয়েকজন বক্তা আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতির জন্য আন্দোলনের পক্ষেও মত দেন। ‘আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর ভূমি ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় ভূমি কমিশনের গুরুত্ব ও কার্যকারিতা’ শীর্ষক এক সেমিনারে সভাপতি ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় ওরফে সন্তু লারমা। তিনি এতে অভিযোগ করে বলেন, এই সরকার গণতন্ত্র আর সুশাসনের কথা বললেও তারা আদিবাসীদের গণতান্ত্রিক ও সাংস্কৃতিক অধিকারের কথা স্বীকার করে না। সন্তু লারমা পার্বত্য চুক্তির সাংবিধানিক স্বীকৃতি এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি কমিশনকে কার্যকর করারও দাবি জানিয়েছেন।
আগারগাঁওয়ের এলজিইডি ভবনে এই সেমিনারের আয়োজন করে অ্যাসোসিয়েশন অব ল্যান্ড রিফর্মস ডেভেলপমেন্ট (এএলআরডি) ও বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম। বাঙালি-আদিবাসী বিতর্কের প্রসঙ্গ তুলে আদিবাসী ফোরামের সভাপতি সন্তু লারমা বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী নিজেই বলেছেন, আমরা নাকি বিদেশি আর বাঙালিরা আদিবাসী। সংবিধান সংশোধন করে বলা হয়েছে, আদিবাসীরাও বাঙালি। আমি যদি বলি, তিনি (শেখ হাসিনা) জাতি হিসেবে চাকমা, তাতে তিনি কি রাজি হবেন? আসলে পার্বত্য চট্টগ্রামে ইসলাম কায়েম করার জন্যই এসব করা হচ্ছে।’
মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান বলেন, ‘জিয়ার আমলে যে বিষবৃক্ষ রোপণ করা হয়েছিল, এই সরকার সেই বৃক্ষকে এখনো কেন জিইয়ে রাখছে! ...কাগুজে মালিকানা দিয়ে আদিবাসীদের জমি আত্মসাৎ করা হচ্ছে। তামাক চাষের জন্য বহুজাতিক কোম্পানির কাছে জমি লিজ দেওয়া হচ্ছে। এতে জটিলতা বাড়ছে। দ্রুত পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি না করলে এই সমস্যা আরও প্রকট হবে।’
‘আদিবাসী’ প্রত্যয়টির প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করেন মানবাধিকার নেত্রী খুশী কবির। তিনি এর পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে বলেন, ‘১৯৯৭ সালে পার্বত্য চুক্তিতে আদিবাসী শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারেও তা ব্যবহার করা হয়েছে। আমরা তো তাদের ভোট দিয়েছি ইশতেহার দেখে। এখন এমন কী হলো যে “আদিবাসী” শব্দটি ব্যবহার করা যাবে না? আসলে প্রাকৃতিক সম্পদের নিয়ন্ত্রণ রাখার জন্যই সরকার এখন আদিবাসী বলতে নারাজ।’
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) চেয়ারম্যান সুলতানা কামাল বলেন, ‘আদিবাসীদের পায়ের তলা থেকে মাটি সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা আর আমলারা পাহাড় কিনে নিচ্ছেন। ছেলেমেয়ের বিয়েতে তাঁরা পাহাড় উপহার দেন। এসব বন্ধ করতে হবে।’
সামাজিক বনায়ন নীতিমালার মাধ্যমে আদিবাসীদের ভূমির অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তথ্য কমিশনের সদস্য সাদেকা হালিম। তিনি আরও বলেন, ভূমি কমিশনের কাজ ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি করা, ভূমি জরিপ নয়।
সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর সমালোচনা করে কলামিস্ট সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, ‘বাংলাদেশে বহু জাতির বাস। অথচ আমাদের সংবিধানে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের জনগণ জাতি হিসেবে বাঙালি বলে পরিচিত হবে। এতে উগ্র বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রকাশ পেয়েছে।’
সন্তু লারমার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং ও পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের প্রচার সম্পাদক মঙ্গল কুমার চাকমা।
‘সরকারের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ’: ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে নির্বাচিত আদিবাসীদের এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি নিয়ে সরকারের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ। সাংবিধানিক স্বীকৃতি আদায়ে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন ছাড়া উপায় নেই।
ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে দুই শতাধিক আদিবাসী নির্বাচিত হয়েছেন। মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন ও জাতীয় আদিবাসী পরিষদ তাঁদের এই সংবর্ধনা দেয়। এতে সভাপতিত্ব করেন মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম।
শিশু একাডেমী প্রাঙ্গণে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি সাংসদ হাসানুল হক ইনু বলেন, ‘সরকার আদিবাসীদের স্বীকৃতি দেয়নি। উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তাসহ বিভিন্ন নাম দিয়েছে। সরকার যে নামেই ডাকুক, আমি আদিবাসীই বলব। আপনারাও নিজেরা নিজেদের আদিবাসীই বলুন। মূর্খদের সঙ্গে তর্ক করে লাভ নেই। লড়াই করার জন্য ঐক্যবদ্ধ হোন।’
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান বলেন, ‘আদিবাসীদের সাংবিধানিক প্রশ্নে সরকার কিছু কিছু প্রশ্নবিদ্ধ পদক্ষেপ নিচ্ছে। কেন এ ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছে, তা আমরা বুঝতে চাই। কেননা, আমরা বিশ্বাস করতে চাই, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জনগণের বন্ধু। প্রধানমন্ত্রীকে যারা ভুল পথে পরিচালিত করার চেষ্টা চালাচ্ছে, কমিশন তাদের পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক আবুল বারকাত বলেন, ‘আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে আদিবাসী শব্দ আছে। আর এখন আদিবাসী মানুষকে বাঙালি বানিয়ে জাতিসত্তাকে অস্বীকার করছে সরকার। এতে করে লড়াইয়ের বাইরে আর পথ দেখি না।’
জাতীয় আদিবাসী পরিষদের সভাপতি অনিল মারান্ডি বলেন, ‘সরকার আমাকে কী নামে ডাকবে, তা নিয়ে অহেতুক বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। আমাকে বাঙালি বানিয়ে আমার সাঁওতাল পরিচয় মুছে দিতে চাচ্ছে। আমি নিজের পরিচয়ে পরিচিত হতে চাই।’
অনুষ্ঠানে সমতল ও পার্বত্য অঞ্চলের ইউপি চেয়ারম্যান ও সদস্য হিসেবে ১৫১ জন আদিবাসী জনপ্রতিনিধিকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের পার্বতীপুর ইউনিয়নের সংরক্ষিত আসনের সদস্য বিচিত্রা তিরকি বলেন, ‘আমরা এত দিন কথা বলার সুযোগ পাইনি। পরিষদের বিভিন্ন ভাতা ও কর্মসূচি থেকে আমরা বাদ পড়তাম। এবার কথা বলতে পারব।’ অন্য জনপ্রতিনিধিদের উদ্দেশে বিচিত্রা তিরকি বলেন, ‘কার্ড বিতরণে আপনারা টাকা নেবেন না। ঘরে ঘরে গিয়ে মানুষের সমস্যার সমাধান করবেন। নেটওয়ার্কের যুগ, একজন আরেকজনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখবেন।’
অনুষ্ঠানে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা জনপ্রতিনিধি নৃপেন্দ্রনাথ মাহাতো, সুনীল কান্তি দেওয়ান, অমলাচিং মারমা প্রমুখ বক্তব্য দেন। জনপ্রতিনিধিরা বেহাত হয়ে যাওয়া ভূমি উদ্ধার, সাংবিধানিক স্বীকৃতি আদায় ও আদিবাসী নারী নির্যাতন প্রতিরোধে ভূমিকা রাখার অঙ্গীকার করেন।
দ্য হাঙ্গার প্রজেক্টের দেশীয় পরিচালক বদিউল আলম মজুমদার, জাতীয় আদিবাসী পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রবীন্দ্রনাথ সরেন ও পরিষদের সদস্য বিমলচন্দ্র রাজোয়ারও অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন।

মণিপুরি তাঁত শিল্প কি হারিয়েই যাবে?

Sunday, July 3, 2011

সিলেট বলতেই যে দুই-তিনটি বিষয় সবার আগে চোখের সামনে ভেসে ওঠে, তার অন্যতম মণিপুরি তাঁত শিল্প। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশে এর চাহিদা ও খ্যাতি ছড়িয়েছে অনেক আগেই। কিন্তু বিভিন্ন সমস্যায় জর্জরিত ঐতিহ্যবাহী মণিপুরি তাঁত শিল্প সময়ের ব্যবধানে আজ বিলুপ্তির পথে। প্রয়োজনীয় মূলধন, প্রশিক্ষণ আর সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা না থাকায় হারিয়ে যেতে বসেছে এই শিল্প। অথচ প্রতিকূলতা কাটাতে পারলে সিলেটের ঐতিহ্যবাহী মণিপুরি তাঁত শিল্প হতে পারত বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম মাধ্যম।
বৃহত্তর সিলেটের মৌলভীবাজার ও সিলেট জেলায় মূলত অধিকাংশ মণিপুরি বসবাস করে। সিলেট নগরীর মাছিমপুর, লালদীঘিরপাড়, লামাবাজার, জল্লারপাড়, রাজবাড়ি, মির্জাজাঙ্গাল, বাগবাড়ি, সাগরদীঘিরপাড়, সুবিদবাজার, মিরের ময়দান, আম্বরখানা, কুশিঘাট, গোয়াইপাড়া, খাদিমনগর, গঙ্গানগর এলাকায় মণিপুরি সম্প্রদায়ের বসবাস। মণিপুরি পরিবারের মহিলারা তাঁতে কাপড় বোনার ব্যাপারে স্বশিক্ষিত এবং তারাই মূলত এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত। তাদের নিপুণ হাতে তৈরি বৈচিত্র্যময় নকশাখচিত মনিপুরি বস্ত্র দেশের পাশাপাশি বিদেশেও সমাদৃত। পর্যটকরা সিলেটে এলে তাই খোঁজ করে মণিপুরি তাঁতবস্ত্রের। ২০০৪ সালে জার্মানি ও ইতালিতে এবং ২০০৭ সালে দুবাই আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় মনিপুরি তাঁতবস্ত্র ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছিল। এর আগে ১৯৭৮ সালে প্রথমবারের মতো ঢাকার বস্ত্র মেলায় মণিপুরি তাঁতের স্টল দেওয়া হয়েছিল। ওই মেলায় মণিপুরি তাঁতবস্ত্র সম্মানসূচক পুরস্কার অর্জন করে। প্রতিবছর ব্যক্তি উদ্যোগে প্রচুর মনিপুরি বস্ত্র বিদেশে গেলেও যথাযথ পদক্ষেপ না থাকায় এখনো সরাসরি বিদেশে বাজারজাত করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি এ পণ্যের।
সাধারণত মণিপুরী মহিলারা নিজেদের পরিবারের ব্যবহারের পোশাক কোমর তাঁতে নিজেরাই তৈরি করে। পাশাপাশি ঘরে উৎপাদিত বাড়তি কাপড়গুলো তারা বিক্রি করে। এই কাপড় নিয়ে নগরীর কিছু এলাকায় কেবল মণিপুরি বস্ত্রের দোকান গড়ে উঠেছে। লামাবাজার, জিন্দাবাজার, শাহজালাল (রহ.) দরগাগেট, সুবিদবাজার, খাদিমনগর এলাকায় বেশ কিছু মণিপুরি কাপড়ের দোকান রয়েছে। এসব দোকানে মণিপুরিদের তৈরি শাড়ি, চাদর, বিছানার চাদর, গামছা, মাফলার, ওড়না, থ্রিপিস, ব্যাগ, টেবিল ক্লথ পাওয়া যায়। এসব পণ্যের রয়েছে আলাদা বিশেষত্ব। এ কারণেই তা অনেকের পছন্দের জিনিস। মণিপুরি নারী সত্যবামা দেবী জানান, আগে কেবল বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও মেলায় মণিপুরি তঁাঁতবস্ত্রের স্টল দেখা যেত। এখন নগরীর অনেক এলাকায় মণিপুরি বস্ত্রের স্থায়ী দোকান গড়ে উঠেছে।
যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে মণিপুরি বস্ত্রের ফ্যাশনেও এসেছে পরিবর্তনের ছোঁয়া। তবে মনিপুরি তাঁত শিল্পের বিকাশ ও প্রসারের ক্ষেত্রে তার ছাপ পড়েনি। বরং নানা সংকটের কারণে নতুন প্রজন্ম এই শিল্পের প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছে, সরে যাচ্ছে এ পেশা থেকে। এই শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা জানায়, তাদের বংশ পরম্পরায় প্রাপ্ত তাঁত শিল্প আজ গভীর সংকটের মুখে। পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে তীব্র প্রতিযোগিতার বাজারে টিকে থাকতে এই শিল্পকে রীতিমতো হিমশিম খেতে হচ্ছে। তার ওপর এই শিল্পের কাঁচামালের মূল্য বৃদ্ধি ও দুষপ্রাপ্যতা, সেই সঙ্গে ভারতীয় পণ্যের আগ্রাসনে মণিপুরি তাঁত শিল্প পার করছে চরম সংকটকাল। তাতে মণিপুরিরা ক্রমেই আগ্রহ হারাচ্ছে তাঁতবস্ত্র উৎপাদনের ব্যাপারে।
কাঁচামালের মূল্য বৃদ্ধি ব্যবসায় বিরূপ প্রভাব ফেলছে জানিয়ে নগরীর লামাবাজারের সিলেট মণিপুরি শাড়ি ঘরের বিক্রয়কর্মী মঙ্গলা দেবী বলেন, 'সুতার দাম বেড়ে যাওয়ায় প্রতিটি বস্ত্রের ক্ষেত্রে মূল্য বৃদ্ধি করতে হয়েছে। এতে করে বেচাকেনা আগের চেয়ে অনেক কমে গেছে। এভাবে চললে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে যাবে।' সংশ্লিষ্টরা জানায়, তাঁতের একটি শাড়ি বুনতে প্রায় এক সপ্তাহ সময় লাগে। চাদর তৈরি করতে লাগে দুই থেকে চার দিন। কিন্তু তৈরিকৃত পণ্য বিক্রি করে সে তুলনায় পারিশ্রমিক পাওয়া যায় না। তাঁরা অভিযোগ করে বলেন, বাজারে অবাধে ভারতীয় শাড়ি ও চাদর আসায় এসব কাপড়ের সঙ্গে মণিপুরিদের হাতে তৈরি কাপড় প্রতিযোগিতায় মার খাচ্ছে। তাঁদের প্রশ্ন, সাত-আট দিনে একটি শাড়ি তৈরি করে পর্যাপ্ত দাম না পেলে কাপড় বুনে লাভ কি। তাই বর্তমানে যারা বিকল্প কাজ পাচ্ছে না, কেবল তারাই একেবারে বেকার থাকার চেয়ে ঘরে বসে কাপড় তৈরি করছে। একসময় মণিপুরি মহিলাদের প্রায় সবাই তাঁতে কাপড় বুনলেও এখন তাদের অনেকেই পা বাড়াচ্ছে বিকল্প পেশার দিকে। বর্তমানে বৃহত্তর সিলেটের মণিপুরি সম্প্রদায়ের অল্পসংখ্যক লোকই বাণিজ্যিকভাবে কাপড় তৈরির সঙ্গে জড়িত।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা না থাকায় অনেকে অর্থের সংস্থান করতে বিভিন্ন এনজিওর দ্বারস্থ হচ্ছে। কিন্তু চড়া সুদে ঋণ নিয়ে সুবিধা করতে পারছে না। তারা জানায়, কোমর তাঁত বসাতে বেশি পুঁজি লাগে না বলে এটি অনেক মণিপুরি পরিবারেই বসানো হয়। কিন্তু এতে বেড শিট, বেড কাভার, পিলোর মতো হাতেগোনা কয়েকটি পণ্য ছাড়া অন্য কোনো বস্ত্র বোনা যায় না। শাড়ি, থ্রিপিস, ওড়নার মতো পরিধেয় বস্ত্র তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় তাঁত বসানোর ব্যয় অনেক বেশি। একটি যন্ত্রচালিত ব্রড ব্র্যান্ডের তাঁতের সরঞ্জাম কিনতে ৫০ হাজার থেকে ৬০ হাজার টাকা লাগে। তাই যাদের পুঁজি কম, তারা বাধ্য হয়ে কোমর তাঁত ব্যবহার করে। পুঁজির অভাব ছাড়াও আরো কিছু কারণে মণিপুর িতাঁত শিল্পের প্রসার হচ্ছে না। এ শিল্পের সঙ্গে জড়িতরা জানায়, 'প্রয়োজনীয় কাঁচামাল সিলেটে পাওয়া যায় না। নরসিংদী ও ঢাকা থেকে কাঁচামাল সংগ্রহ করতে হয়।'
১৯৭৯ সালে সমাজকল্যাণ ও মহিলাবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে ১০টি তাঁত দিয়ে সিলেট নগরীর শিবগঞ্জে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে মণিপুরি তাঁতবস্ত্র উৎপাদন শুরু হয়েছিল। পরে সরকারি সাহায্য বন্ধ এবং প্রশিক্ষণ ও কাঁচামালের অভাব দেখা দেয়ায় চালু হওয়ার আট বছরের মাথায় তাঁতগুলো বন্ধ হয়ে যায়। ২০০৮ সালের আগস্টে বাংলাদেশ মণিপুরি আদিবাসী ফোরামের উদ্যোগে মহিলা তাঁতি সম্মেলনে মহিলা ও শিশুবিষয়ক, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা এবং সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী মণিপুরি তাঁত শিল্পের জন্য সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার আশ্বাস দেন। তবে পরে তা আর বাস্তবায়িত হয়নি। মণিপুরি তাঁত শিল্পের আধুনিকায়নে কোনো ধরনের উদ্যোগ না নেওয়ায় মান্ধাতার আমলের ধারায় এখনো চলছে এর বুনন ও উৎপাদন কাজ। পাশাপাশি সরকারিভাবে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ না থাকায় ক্রমেই হারিয়ে যেতে বসেছে মণিপুরি তাঁত শিল্প।
বাংলাদেশ মণিপুরি মহিলা সমিতির চেয়ারপারসন এস রিনা দেবী বলেন, 'ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে সবার আগে প্রয়োজন সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা। পাশাপাশি এই শিল্পে নিয়োজিতদের যথাযথ প্রশিক্ষণ এবং ঋণ সুবিধা দিলে এটি আরো বিকশিত হবে।' তিনি বলেন, 'আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে এ শিল্পকে গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব। এর ফলে দেশে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রাও আসবে।'

ঢাকার মগরা by আজিজুর রহমান

Thursday, February 10, 2011

কসময় ঢাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস করত এমন একটি জ্ঞাতিগোষ্ঠীর নাম হচ্ছে মগ। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তসংলগ্ন আরাকান রাজ্য থেকে কয়েক শতাব্দী আগে মগরা বাংলার রাজধানী ঢাকায় এসে বসবাস শুরু করে। ঐতিহাসিকদের মতে, অষ্টম শতক থেকেই মগরা বিচ্ছিন্নভাবে ব্যবসা-বাণিজ্যসহ নানা কারণে বাংলায় প্রবেশ করতে থাকে।

তবে ১৫ শতক থেকে বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকার হয়ে মগরা মাতৃভূমি ত্যাগ করে বাংলায় আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। ১৭ শতকের প্রথমদিকে রাজনৈতিক কারণে মগদের একটি দল তৎকালীন ঢাকার উত্তর এলাকার শেষপ্রান্তে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে। আরাকানের সর্বশ্রেষ্ঠ শাসক রাজা মলহনের মৃত্যুর পর তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র রাজা শ্রীসুধর্ম (১৬৩২-৩৮ খ্রিস্টাব্দ) সিংহাসনে আরোহণ করেন। নরপতি নামে রাজার এক আত্মীয়-মন্ত্রীর সঙ্গে রানী নাৎসিনমির ছিল গোপন প্রণয়। এরা ষড়যন্ত্র করে ১৬৩৮ খ্রিস্টাব্দে রাজা শ্রীসুধর্ম ও শিশুপুত্র মিনসানিকে হত্যা করে। রানী নাৎসিনমি তার প্রেমিক নরপতিকে রাজা বানিয়ে সিংহাসন দখল করে নেয়। সেই সঙ্গে সাবেক রাজার জ্ঞাতি ও সমর্থকদের নির্বিচারে হত্যার আদেশ জারি করে। ফলে প্রাণভয়ে রাজার হাজার হাজার অনুসারী চট্টগ্রামে এসে আশ্রয় নেন। এ হত্যাকাণ্ড ও সিংহাসন জবরদখলের সংবাদ পেয়ে চট্টগ্রাম অঞ্চলের সুবাদার রাজার ছোট ভাই মেঙ্গতরায় ধরমসা ভ্রাতৃহত্যার প্রতিশোধ নিতে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং সিংহাসন জবরদখলকারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। কিন্তু নৌবাহিনীর দুর্বলতার কারণে যুদ্ধ জয়ের আশা ছেড়ে দিয়ে বাংলায় চলে আসতে বাধ্য হন। সেই রাজনৈতিক গোলযোগের সময় বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব এলাকা এবং দক্ষিণ উপকূলীয় অঞ্চলে কমপক্ষে ৫৫ হাজার মগ বা আরাকানি আশ্রয় নেয়। মেঙ্গতরায় ধরমসা তাঁর পরিবার-পরিজন ও নেতৃস্থানীয় সমর্থকসহ প্রায় ১০-১২ হাজার অনুচর এবং ১৯টি হাতি নিয়ে ঢাকায় চলে আসেন। ঢাকায় এসে তিনি মোগল সুবাদার ইসলাম খান মাসহাদির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে আশ্রয় প্রার্থনা করেন এবং তাঁকে তিনটি হাতি উপঢৌকন দেন। সুবাদারও মেঙ্গতরায়কে পাঁচ হাজার টাকা উপহার দেন এবং মসনব ও জায়গির প্রদান করেন। মেঙ্গতরায় ধরমসা নিজ রাজ্যের সার্বভৌমত্ব মোগলদের হাতে অর্পণ করে নিজেকে সম্রাট শাহজাহানের করদরাজা হিসেবে ঘোষণা দেন। তিনি তাঁর সব সমর্থক নিয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। মেঙ্গতরায় ধরমসার নতুন নাম হয় মীর আবুল কাশেম আল হুসেনি আত-তাবাতাবাই আল-সামনি। সুবাদার তাঁদের বসবাসের ব্যবস্থা করে দেন তখনকার ঢাকা শহরের তিন মাইল উত্তরে এক জঙ্গলাকীর্ণ অঞ্চলে। যা পরবর্তী সময়ে মগবাজার নামে পরিচিতি লাভ করে।
 
Support : Dhumketo ধূমকেতু | NewsCtg.Com | KUTUBDIA @ কুতুবদিয়া | eBlog
Copyright © 2013. Edu2News - All Rights Reserved
Template Created by Nejam Kutubi Published by Darianagar Publications
Proudly powered by Dhumketo ধূমকেতু