অরণ্যে রোদন- বইমেলার আকাশে অনেক তারা by আনিসুল হক

Friday, February 7, 2014

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের আকাশে একটা বাঁকা চাঁদ। আস্তে আস্তে বড় হচ্ছে। আজ ষষ্ঠী। কমলার কোয়ার মতো আকার নিয়েছে চাঁদটা।
বাংলা একাডেমির বর্ধমান হাউসের খিলানগুলোর পাশে বটগাছের পাতার ফাঁক দিয়ে এই চাঁদ প্রতি ফেব্রুয়ারিতেই উঁকি দেয়। বড় হয়, ছোট হয়। একাডেমি চত্বরে বড় আমগাছটার মুকুল ঝরে পড়ে থাকে মাটিতে, গন্ধে ম-ম করে। এ ফেব্রুয়ারিতে একাডেমির মূল চত্বরে মাত্র একবার গিয়েছি, একটা বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করতে। অন্য সন্ধ্যাগুলো সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ভেতরেই ঢুঁ মারি। উদ্যানের ভেতরেই তো আমার প্রিয় প্রকাশনা সংস্থাগুলো—প্রথমা, সময়, অনন্যা, কাকলি, অন্যপ্রকাশ, ইউপিএল, সাহিত্যপ্রকাশ, অনুপম, মাওলা ব্রাদার্স, জ্ঞানকোষ, পার্ল, তাম্রলিপি, জাগৃতি, শ্রাবণ, সন্দেশ, পাঠকসমাবেশ ইত্যাদি। কত প্রকাশক, কজনের নাম বলব!

আমার চোখের সামনেই মেলা বড় হলো। সেই যে আশির দশকের শুরুতে বুয়েটে পড়ব বলে ঢাকায় এসেছিলাম। বন্ধুদের নিয়ে যেতাম বাংলা একাডেমির বইমেলায়। পুকুরের পাড়ে একটা স্টলে লেখা: এখানে নির্মলেন্দু গুণকে পাওয়া যায়। তখনই আরেক রসিক কবির ফোঁড়ন, নির্মলেন্দু গুণের ডজন কত?
মনে হচ্ছে সেদিনের ঘটনা। আমার প্রথম কবিতার বই খোলা চিঠি সুন্দরের কাছে বেরিয়েছে, ১৯৮৯ সাল, একটা মাদুরে বইগুলো বিছিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লাম একাডেমি চত্বরে। তখন আমার ওজন ছিল ৫০ কেজি, এখন ওজন ৮০। তখন বয়স ছিল ২৪, এখন ৪৯। প্রথম বই যে বয়সে বেরিয়েছিল, ২৪-এ, তার চেয়ে বেশি বছর তারপর আমি পার করে দিলাম, ২৫ বছর পরে এখন আমার বয়স ৪৯।
কিন্তু নিজেকে এখনো সেই হালকা-পাতলা জিনসের নীল রঙের শার্ট পরা এলোমেলো চুলে বড় দাঁতের কিশোরটিই মনে হয়। মনে হচ্ছে, ওই তো দাঁড়িয়ে আছেন আহসান হাবীব, উন্মাদ সম্পাদক, তাঁর কাছে নিয়ে গেলেন বুয়েটের স্থাপত্য বিভাগের মাহফুজ ভাই, বললেন, ‘এর বই রাখো তোমার স্টলে।’ হাবীব ভাই এককথায় রাজি হয়ে গেলেন। আমার বই বইমেলার একটা স্টলে শোভা পাচ্ছে।
বইমেলার ভেতরেই তখন বসত চায়ের দোকান। অনেকগুলো। হুমায়ূন আহমেদ, শামসুর রাহমান, মহাদেব সাহা—সবাই সেই চায়ের দোকানে বসে আড্ডা দিতেন। মহাদেবদার পাশের চেয়ারে বসেছিলাম। শামসুর রাহমান আর হুমায়ূন আহমেদও একই টেবিলে বসে পড়ায় টেবিলের মর্যাদা হঠাৎ গেল বেড়ে। আমি কী করব, বুঝে উঠতে পারছি না। এমন সময় কবি ফেরদৌস নাহার পাশ দিয়ে যেতে যেতে বলে উঠলেন, ‘মিটুন তো দেখি একেবারে বড়দের দলে যোগ দিয়ে বসেছ।’ লজ্জায়, সংকোচে কী করব বুঝে উঠতে পারছিলাম না। এসব স্টলে অনেক রাত পর্যন্ত আড্ডা দিতেন রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ। বইমেলা থেকে বের হয়েই একবার রাতের ট্রেনে তাঁর সঙ্গে ময়মনসিংহে গিয়েছিলাম কবিতা পড়তে।
ভোরের কাগজ বের হলো ফেব্রুয়ারি মাসে। স্টল নেওয়া হলো বইমেলায়। তখন ভোরের কাগজ-এর শেষ পাতায় লিখতে শুরু করলাম বইমেলা প্রতিদিন। এখন সেটাই রেওয়াজ হয়ে গেছে, সব পত্রিকাতেই রোজ বইমেলার খবর ছাপা হয়। ভোরের কাগজ-এ আমিই লিখেছি কয়েক বছর।
আখতারুজ্জামান ইলিয়াস আসতেন। আমি তো ছোট্ট একটা মানুষ, গিয়ে স্যারের আঙুল ধরে ফেললাম। বললাম, ‘স্যার, কেমন লাগছে মেলা? কী কী বই বেরোল।’ হাসলেন। আমাকে সঙ্গে নিয়ে পুরো মেলা হাঁটলেন। কিন্তু প্রশ্নের উত্তর দিলেনই না। সাক্ষাৎকার নেওয়া হলো না। হাসান আজিজুল হক স্যার এলে তো আমি পোষা বিড়ালের মতো চঞ্চল হয়ে উঠতাম। তখন আমারও দু-একটা বই বেরিয়ে গেছে, কিশোর পাঠকেরা স্যারের সামনেই হয়তো আমার কাছে অটোগ্রাফ চাইছে, আমি লজ্জায় মাটির সঙ্গে মিশে যাচ্ছি, রশীদ হায়দার তাই দেখে বললেন, ‘হাসানকে
পেয়ে আনিস যে একেবারে পাগল হয়ে গেলে!’ আরও লজ্জা! আমি কি রশীদ ভাইকেও কম পছন্দ করি নাকি।
আশির দশকে মেলায় হাঁটতেন হেলাল হাফিজ। আমি তাঁর সঙ্গে হাঁটতাম। একদিন অনেকক্ষণ হাঁটার পরে রসিকতা করে বললাম, ‘নাহ্, আর বড় কবিদের সঙ্গে হাঁটব না।’ হেলাল ভাই হেসে বললেন, ‘এভাবে বলতে হয় না আনিস।’ সেই হেলাল ভাই এবার বাংলা একাডেমি পুরস্কার পেয়েছেন। অভিনন্দন, হেলাল ভাই।
দাদাভাইয়ের কথাও খুব মনে পড়ে। রংপুরে থাকতে কচি-কাঁচার মেলা করতাম বলে ঢাকায় এসে তিনিই হয়ে উঠেছিলেন আশ্রয়। প্রথম দিকে কচি-কাঁচার আসরে ছড়া-কবিতা ছাপা হতো, পরের দিকে তাঁর সম্পাদিত ইত্তেফাক-এর বিশেষ সংখ্যাগুলোয় ছাপিয়ে দিতে লাগলেন কবিতা। একদিন তিনি হাঁটছেন বর্ধমান হাউসের ঝুলবারান্দার সামনে দিয়ে, সঙ্গে লুৎফর রহমান রিটন আর আমীরুল ইসলাম, আমি ছুটে গেলাম, ‘দাদাভাই, জানেন, আমার বই অমুক আর অমুক লেখকের মতোই বিক্রি হয়।’ দাদাভাইয়ের মুখের কথা একটু আটকে যেত, বললেন, ‘সেটা তো ভালো খবর হলো না!’ খুব হতোদ্যম হয়েছিলাম।
হুমায়ুন আজাদের উপস্থিতি ছিল সবচেয়ে নিয়মিত। বসতেন আগামীর স্টলে। বেলা তিনটা থেকে রাত নয়টা পর্যন্ত স্বাক্ষর দিতেন বইয়ে। কথা বলতেন পাঠকদের সঙ্গে। প্রথমবার যখন তাঁর নারী বইমেলায় এল, নদী থেকে বেরিয়েছিল, প্রথম দিন মলাট ছাড়াই, তাই বিক্রি হয়ে যেতে লাগল। আমি বললাম, ‘স্যার, নারী তো কভার ছাড়াই বিক্রি হয়ে যাচ্ছে।’ তিনি বললেন, ‘নারী তো কভার ছাড়াই ভালো।’ এটা লিখে দিয়েছিলাম বলে তিনি ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘বেশি স্মার্ট হোয়ো না।’ কিন্তু এত ভালোবাসতেন আমাকে যে পরের দিনই সব ভুলে গিয়ে ডেকে নিলেন কাছে।
মুহম্মদ জাফর ইকবালের সঙ্গেও আমার প্রথম পরিচয় বইমেলাতেই। আহসান হাবীব ভাই-ই পরিচয় করিয়ে দিলেন। জাফর স্যার যুক্তরাষ্ট্র থেকে এসেছেন, নতুন লেখকদের সঙ্গে পরিচিত হতে চান, আহসান হাবীব ভাই আমাকে তাঁর স্টলের সামনে দাঁড় করিয়ে রেখে জাফর ইকবাল স্যারকে ডেকে আনলেন, ‘এই যে আনিসুল হক, নতুনদের মধ্যে যারা...’
সেই যে মুহম্মদ জাফর ইকবাল স্যারের সঙ্গে খাতির হলো, সেটা আজ অবধি অটুট আছে।
হুমায়ূন আহমেদ জনপ্রিয় হয়ে গেলে আর বইমেলায় স্বাভাবিকভাবে আসতে পারতেন না। আসতেন রাত সাড়ে আটটার দিকে। এসে যে স্টলে বসতেন, সেই স্টলে এমন ভিড় হতো যে স্টল ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হতো। অমনি ভিড় ঠেলে স্যারের কাছে গিয়ে বাচ্চাদের একটা বই কিনে বললাম, স্যার, আমার মেয়ে পদ্যর জন্য অটোগ্রাফ দেন। স্যার লিখলেন, ‘পদ্য, তুমি কেমন আছ?’ একটা লাইন হঠাৎ লিখে ফেলেই তিনি আমাকে বুঝিয়ে দিলেন, কেন একজন মানুষ সবার থেকে আলাদা।
মাহমুদুল হককে আমি কখনো বইমেলায় দেখিনি। কিন্তু তাঁর বই কবে আসবে, সাহিত্যপ্রকাশে গিয়ে খুব খোঁজ নিতাম, আরেকজনকে খোঁজ নিতে দেখতাম, আমাদের লেখক বন্ধু ইমতিয়ার শামীমকে। তাঁকে দেখলাম বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণেই, খাটিয়ার মধ্যে শোয়ানো।
সমুদ্র গুপ্ত খুব মজার মানুষ ছিলেন। বড় বড় চুল, সাদা, বড় বড় গোঁফ, বইমেলায় হেঁটে বেড়াচ্ছেন! একাকী রৌদ্রর দিকে নামে তাঁর কবিতার বই বেরোল, তাতে কবিতা ছিল, ধুলো নিয়ে, সেটা উদ্ধৃত করে বললাম, মেলায় ভীষণ ধুলো...তিনি পরের দিন বললেন, ‘প্রচারটা কায়দা করে ভালোই দিয়েছিস রে!’
প্রণব ভট্ট ছিলেন এক মজার চরিত্র। কার বই বেশি বিক্রি হচ্ছে, এটা খোঁজ নিয়ে বেড়াতেন বিভিন্ন স্টলে। হুমায়ূন স্যার তাঁকে বই উৎসর্গ করে লিখেছিলেন, ‘তাঁর পুরোটা শরীরজুড়ে কলিজা।’ সত্যি, তিনি আমার বইয়ের বিজ্ঞাপন বিভিন্ন পত্রিকায় তাঁর খরচে প্রকাশ করে দিতেন।
শহীদুল জহিরকে আমি কোনো দিনও বইমেলায় দেখিনি, কিন্তু যেবার সেরাতে পূর্ণিমা ছিল বেরোল, সেবার হইচই পড়ে গিয়েছিল। খন্দকার আশরাফ হোসেন কিন্তু ছিলেন বইমেলার নিয়মিত চরিত্র, বই বেরোত, লিটল ম্যাগাজিন বেরোত, টিচার ইন ল কথাটা তিনিই আমাকে শিখিয়েছিলেন আর ফাঁদ বইটা হাতে নিয়েই বলেছিলেন কাফকায়েস্ক।
এবার বইমেলায় আমরা তো খুব অনুভব করব মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানেরও অভাব। সেই কবে বাংলা একাডেমি স্টল থেকে কিনেছিলাম তাঁর গঙ্গাঋদ্ধি থেকে বাংলাদেশ। তাঁর বইটা, আমরা কি যাব না তাদের কাছে যারা শুধু বাংলায় কথা বলে, খুব নাড়া দিচ্ছে। আমরা সবকিছুতে ইংরেজিতে ফিরে যাচ্ছি। বিয়ের আমন্ত্রণপত্র থেকে শুরু করে দোকানের নামফলক। কিন্তু খুব বিস্মিত হয়েছি, প্রশাসনের প্রশিক্ষণেও ইংরেজিরই চল দেখে।
এখনো বইমেলায় মাঝেমধ্যেই আসেন সৈয়দ শামসুল হক ও আনোয়ারা সৈয়দ হক। পাশে গিয়ে দাঁড়াই। ছবি তুলি। কী যে ভালো লাগে। আনিসুজ্জামান স্যারকে আসতে হয়, চেয়ারম্যান হিসেবে, আবার অনুরোধের ঢেঁকি গিলতে, বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করতে। কাইয়ুম চৌধুরী, রফিকুন নবী, হাশেম খান এলেই বুঝতে হবে, সেরা স্টলের পুরস্কারের বিচার চলছে। মুনতাসীর মামুন স্যারের সঙ্গ খুব মজার, আগে সময় প্রকাশনীতে কিছুক্ষণ সময় কাটানোর পরে একটা ঢাউস বই বিক্রি হলেই ফরিদ আহমেদকে বলতেন, ‘ফরিদ, এবার মনে হয় এক কাপ চা খাওয়ার দাম উঠেছে।’ আমরা দুজনই ফরিদ আহমেদের কিপ্টেমি নিয়ে খুবই রসিকতা করি, ফরিদ ভাই সহ্য করেন। আসাদুজ্জামান নূর অনেক আগে থেকেই বইমেলায় নিয়মিত আসেন এবং বই কেনেন। আবুল মাল আবদুল মুহিতও আসতেন কেডস পরে, বৈকালিক হাঁটার কাজটাও সারতেন, বইও কিনতেন। মন্ত্রী হওয়ার পরে তো তাঁদের পেছনে ভিড় লেগে থাকবে। যেমন নিরিবিলি হাঁটতে দেখা যাবে রামেন্দু মজুমদারকে। এক আধবার আসবেন আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। কিছুক্ষণ বসবেন। তারপর চলে যাবেন।
মুহম্মদ জাফর ইকবাল এলে তো পেছনে তাঁকে মৌচাকের মতো ঘিরে ধরবে কিশোর-তরুণেরা। ইমদাদুল হক মিলন সম্পাদক হয়ে যাওয়ার পর কম সময় পান, তবু বলি, মিলন ভাই, বইমেলায় সময় দিন, আসুন। যেমন সেলিনা হোসেন, সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, মঈনুল আহসান সাবের, নাসরীন জাহান, তবক দেওয়া পান মুখে আসাদ চৌধুরীকে না দেখলে মনে হবে বইমেলা অসম্পূর্ণই রয়ে গেল।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানেই বইমেলা হোক। সব স্টল সামনেরবার শুধু সোহরাওয়ার্দী উদ্যানেই থাকুক। এমনকি উদ্যানের উন্মুক্ত মঞ্চ ও গ্যালারিটাও নিয়ে নেওয়া হোক মেলার ভেতরে, সেখানে অনুষ্ঠান হোক। বড় লেখক ও আলোচকেরা একাডেমি প্রাঙ্গণে সেমিনার করে ওই পাশে যদি পদধূলি না দেন, তাহলে কেমন করে হবে?
বইমেলায় যাই। সন্ধ্যার আকাশে চাঁদ ওঠে। একদিন যে লেখকেরা-কবিরা এই মেলায় নিয়মিত আসতেন, আজ আর আসেন না, তাঁদের কথা মনে পড়ে। কিন্তু আকাশভরা অনন্ত নক্ষত্রবীথি দেখলে মনে হয়, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ দাশ থেকে শুরু করে শামসুর রাহমান—প্রত্যেকেই তো আছেন মেলায়। বই থাকা মানেই তো লেখকদের উপস্থিতি।

আনিসুল হক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।

গদ্যকার্টুন- গম্ভীর ও অপ্রাপ্তবয়স্ক পাঠকের জন্য নয় by আনিসুল হক

Friday, January 31, 2014

কিছু কিছু মানুষ আছেন, সব সময় সিরিয়াস। তাঁরা হাস্যরস নিতে পারেন না। হাস্যকৌতুককে তাঁরা অগ্রহণীয় বলে মনে করেন।
এ ধরনের এক মানুষের কথা পড়েছিলাম একটা রুশ কৌতুক ম্যাগাজিনে।
অফিসের বস তিনি। তাঁর অফিসের একজন কর্মচারী বলল, ‘এই, আমি একটা কৌতুক বলব।’
সবাই বলল, ‘বলো বলো।’
কর্মচারীটি কৌতুক বলতে শুরু করল: ‘এক লোক একটা পার্টিতে ঢুকেছে। তার দু পায়ে বেড়ি করে ব্যান্ডেজ বাঁধা। সে ঠিকমতো হাঁটতেও পারছে না। সবাই বলল, তোমার পায়ে কী হয়েছে? লোকটা বলল, আমার পায়ে নয়, মাথায় হয়েছিল। আমার মাথা ফেটে গিয়েছিল। মাথা ফেটে গেছে? তাহলে তুমি পায়ে ব্যান্ডেজ বেঁধেছ কেন? আরে, আমি পায়ে ব্যান্ডেজ বেঁধেছি নাকি? ডাক্তারের কাছে গেছি। ডাক্তার আমার মাথায় ব্যান্ডেজ বেঁধে দিয়েছেন। এত ঢিলা করে ব্যান্ডেজটা বেঁধে দিয়েছেন যে গড়াতে গড়াতে পায়ে এসে পড়েছে।’
এই কৌতুক শুনে অফিসের সবাই হেসে উঠল। শুধু বস হাসতে পারলেন না। তাঁর মনে হতে লাগল, এটা কি সম্ভব?
মাথায় ব্যান্ডেজ বাঁধা হলে সেটা কি পা পর্যন্ত নেমে যেতে পারে?
রাতের বেলায় তাঁর ঘুম ভেঙে গেল। তিনি তাঁর বউকে ঘুম থেকে জাগালেন। বললেন, ‘আচ্ছা বলো তো, একটা লোকের মাথা ফেটে গেছে বলে ডাক্তার তার মাথায় ব্যান্ডেজ বেঁধে দিয়েছেন। সেই ব্যান্ডেজটা কি পা পর্যন্ত নেমে যেতে পারে?’
রুশ কৌতুক ম্যাগাজিনটিতে বলা হয়েছে, এই বস আর কেউ নন, তিনি নিজেই একটা কৌতুক ম্যাগাজিনের সম্পাদক।

কৌতুককে কৌতুক হিসেবে নিতে পারতে হবে। কৌতুকে যুক্তি খোঁজা উচিত নয়।
ধরা যাক এই কৌতুকটা: সিংহের বিয়ে হবে, ভেড়া খুব লাফাচ্ছে। সিংহের বিয়ে, দাওয়াতে যেতে হবে। একজন বলল, ‘সিংহের বিয়ে তো তুই ভেড়া লাফাচ্ছিস কেন?’ ভেড়া বলল, ‘আরে, বিয়ের আগে আমিও তো সিংহ ছিলাম, বিয়ের পরে না ভেড়া হয়ে গেছি!’
এই কৌতুক শুনে যদি কেউ বলে, যাহ্, একটা সিংহ কীভাবে ভেড়া হয়ে যাবে? এটা সম্ভবই না, তাহলে কিন্তু চলবে না।

কিন্তু অনেক পাঠকই আছেন খুব সিরিয়াস। মিলান কুন্ডেরার একটা উপন্যাস আছে—ফেয়ারওয়েল পার্টি। ওই উপন্যাসে মিলান কুন্ডেরা একজন ডাক্তারের চরিত্র সৃষ্টি করেছেন। তাঁর নাম ডাক্তার স্ক্রেটা। ডাক্তার স্ক্রেটা বন্ধ্যা নারীদের চিকিৎসা করেন। তিনি নিজের স্পার্ম বন্ধ্যা নারীদের ইনজেক্ট করে দেন। তাদের অনেকেই সন্তান লাভ করে। উপন্যাসের একটা জায়গায় বর্ণনা আছে, ডাক্তার স্ক্রেটা পথ দিয়ে যাচ্ছেন, বাচ্চারা মাঠে খেলছে, তিনি তাকিয়ে দেখছেন, কয়টা বাচ্চা দেখতে তাঁর মতো হয়েছে।
মিলান কুন্ডেরা বলছেন, তিনি এই চরিত্র ও ঘটনা লিখেছেন একেবারেই হালকা চালে। কৌতুক করার জন্য। কিন্তু ব্যাপারটা কৌতুক রইল না। একদিন মেডিসিনের এক অধ্যাপক তাঁর কাছে এসে হাজির। অধ্যাপক বললেন, ‘আমি আপনার লেখার খুব সিরিয়াস পাঠক। আপনার প্রতিটা লাইন আমার মুখস্থ। আমি একটা সেমিনারের আয়োজন করছি। এটার বিষয় হলো “বন্ধ্যত্ব ও স্পার্ম ডোনেশন”। আপনার উপন্যাস ফেয়ারওয়েল পার্টিতে এই ব্যাপারটা আছে। এটা অত্যন্ত সিরিয়াস একটা বিষয়। এভাবে একটা কঠিন সমস্যার সমাধান হতে পারে। আপনি অবশ্যই আমার সেমিনারে আসবেন। আপনি বক্তব্য দেবেন।’
কুন্ডেরা বললেন, ‘আমার উপন্যাসকে সিরিয়াসলি নেওয়ার কিছু নেই। আমি এটা নিতান্তই কৌতুক করার জন্য লিখেছি।’
অধ্যাপক পরম বিস্ময়ে কুন্ডেরার মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আপনার উপন্যাসকে আমরা সিরিয়াসলি নেব না? আপনি নিজে লেখক হয়ে এ কথা বলতে পারলেন? আপনার লেখাকে আমরা সিরিয়াসলি নেব না?’
কুন্ডেরা বললেন, ‘ভাই, লেখকদের সব কথা সিরিয়াসলি নেবেন না। আরেকটা কথা, ফিকশন লেখকেরা কিন্তু খুব বানিয়ে গল্প করে। গল্প লেখকদের জন্য উপদেশ প্রচলিত আছে, ডোন্ট রুইন ইয়োর স্টোরিজ উইথ ফ্যাক্টস। সত্য ঘটনা বলে তোমার গল্প নষ্ট কোরো না।’
ফেসবুকে একটা চমৎকার কৌতুক পেয়েছি। এটা যে কৌতুক, তা আগেই বলে রাখলাম। একজন কৃষি বিশেষজ্ঞ উপস্থাপক টেলিভিশনের ক্যামেরায় একজন ছাগলচাষির সাক্ষাৎকার নিচ্ছেন।
উপস্থাপক: আপনি আপনার ছাগলকে কী খাওয়ান?
ছাগলচাষি: কোনটারে? কালোটা না সাদাটা?
উপস্থাপক: কালোটারে...
ছাগলচাষি: ঘাস।
উপস্থাপক: আর সাদাটারে?
ছাগলচাষি: ওইটারেও ঘাস খাওয়াই।
উপস্থাপক: ও আচ্ছা। আপনে ওইগুলানরে রাতে কই রাখেন?
ছাগলচাষি: কোনটারে? কালোটা না সাদাটা?
উপস্থাপক: কালোটারে?
ছাগলচাষি: ওইটারে বাইরের ঘরে বাইন্দা রাখি।
উপস্থাপক: আর সাদাটারে?
ছাগলচাষি: ওইটারেও বাইরের ঘরে বাইন্দা রাখি।
উপস্থাপক: আপনি ওগুলানরে কী দিয়া গোসল করান?
ছাগলচাষি: কোনটারে? কালোটা না সাদাটা?
উপস্থাপক: কালোটারে?
ছাগলচাষি: পানি দিয়া গোসল করাই।
উপস্থাপক: আর সাদাটারে?
ছাগলচাষি: ওইটারেও পানি দিয়া গোসল করাই।
উপস্থাপক: সবকিছু দুইটার বেলায় একই রকম করলে তুই বারবার কালোটারে সাদাটারে জিগাস কেন?
ছাগলচাষি: কারণ, কালো ছাগলটা আমার।
উপস্থাপক: আর সাদা ছাগলটা?
ছাগলচাষি: ওইটাও আমার।
আমার গল্প শেষ। এই গল্প পড়ে আমি হা হা করে হেসেছি। কিন্তু একজন-দুজনকে বলতে গেছি। শুনে তাঁরা হাসলেন না। জানি না, কেন হাসলেন না। হয়তো আমি কৌতুক বলতে পারি না বা সবাই হিউমার নিতে জানে না।
এখন কি ভয়ে ভয়ে একটা কথা বলতে পারি? আসলে এ দল, বি দল দুইটা একই রকম। দুইটাই আমাদেরই দেশের দল। তবু দুইটার কথা আলাদা আলাদাভাবেই বলতে হয়। এক নিঃশ্বাসে আমরা বলতে পারি না।
এর অনেক কারণ আছে। একটা নিশ্চয়ই যুদ্ধাপরাধী ও সাম্প্রদায়িক শক্তির সঙ্গে গাটছড়া বাঁধা।
এই প্রশ্নটার একটা সমাধান যদি হয়ে যায়, তাহলে কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতির ৮০ শতাংশ সমস্যার সমাধান হয়।
আমি যদি এ রকম হালকা গল্প দিয়ে লেখা শেষ করি, আপনারা বলবেন, হালকা লেখক। শুক্রবারটাই মাটি। এবার একটা সিরিয়াস গল্প। গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের লেখা গল্প আমি ছোট করে বলি:
একজন ডিগ্রিহীন ডেনটিস্ট সকালবেলা তাঁর চেম্বার খুলে যন্ত্রপাতি পরিষ্কার করছেন। এ সময় ফোন বাজল, ডেনটিস্টের ছেলে ফোন ধরল। তারপর এসে ডেনটিস্টকে বলল, ‘বাবা, মেয়র ফোন করেছেন, তিনি জানতে চান তুমি কি চেম্বারে আছ?’
ডেনটিস্ট বললেন, ‘নাই। বলে দাও, নাই।’
ছেলেটা গেল এবং ফিরে এসে বলল, ‘মেয়র জিগ্যেস করছেন, তিনি কি এখন আসতে পারেন?’
‘বলে দাও, আমি নাই।’
‘তিনি তোমার সব কথা ফোনে শুনতে পাচ্ছেন।’
‘গিয়ে বলো, দেখা হবে না।’
একটু পরে ছেলে এসে বলল, ‘বাবা, উনি বলেছেন, তুমি যদি তাঁকে না দেখ, তিনি তোমাকে গুলি করে মারবেন।’
এবার ডেনটিস্ট তাঁর ছেলেকে বললেন, ‘তাঁকে আসতে বলো।’
মেয়র এলেন। ডেনটিস্টের চেয়ারে চিৎ হয়ে শুলেন। হা করলেন। ডেনটিস্ট দেখলেন, একটা আক্কেল দাঁতের অবস্থা খারাপ। বললেন, ‘দাঁতটা তুলে ফেলতে হবে।’
মেয়র বললেন, ‘তুলে ফেলুন।’
ডেনটিস্ট বললেন, ‘কিন্তু কোনো অ্যানেসথেসিয়া ব্যবহার করা যাবে না।’
‘কেন?’
‘কারণ, ওখানে পুঁজ হয়ে গেছে। রাজি?’
‘হ্যাঁ। তুলে ফেলুন।’
এবার ডেনটিস্ট মেয়রের পা বাঁধলেন। হাত বাঁধলেন। বললেন, ‘হা করুন।’ সাঁড়াশিটা হাতে নিয়ে বললেন, ‘আপনি আমাদের কুড়িজনকে হত্যা করেছেন গুলি করে। এবার তার মূল্য আপনাকে দিতে হবে।’ তিনি দাঁতটা টেনে তুলে ফেললেন।
মেয়রের চোখে পানি চলে এসেছে। ডেনটিস্ট তাঁকে একটা পরিষ্কার কাপড় দিয়ে বললেন, ‘চোখের পানি মুছে ফেলুন।’
যাওয়ার সময় মেয়র বললেন, ‘বিলটা পাঠিয়ে দেবেন।’
‘বিল কার নামে পাঠাব? আপনার ব্যক্তিগত নামে, না সিটি করপোরেশনের নামে?’
মেয়র বললেন, ‘দুইটা তো একই।’

আনিসুল হক: সাংবাদিক ও সাহিত্যিক।

অরণ্যে রোদন- ভাই, শান্তিতে থাকতে দিন by আনিসুল হক

Sunday, January 26, 2014

গণতন্ত্রে তাঁরাই দেশ শাসন করবেন, যাঁরা জনগণের প্রতিনিধি। জনমতের প্রকৃত প্রতিফলন ঘটে, এমন একটা নির্বাচনের মাধ্যমে এই প্রতিনিধিরা ক্ষমতায় আসবেন। তাঁরা সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিকের সমর্থনধন্য হবেন।
কাজেই একটা সুন্দর, অর্থবহ, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন গণতন্ত্রের একেবারে প্রাথমিক ও মৌলিক একটা শর্ত। তবে, এটা অন্যতম শর্ত। গণতন্ত্রের আরও কতগুলো শর্ত আছে, লক্ষণ আছে।

আবার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের সমর্থিতরাই কেবল দেশ চালাবে, গণতন্ত্রে তা সব সময় না-ও হতে পারে। দুটো উদাহরণ দিই। যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় বুশ যখন দ্বিতীয়বার প্রেসিডেন্ট হন, বাস্তবে তিনি তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে বেশি ভোট পেয়েছিলেন কি না, এটা নিয়ে বিতর্ক আছে। কিন্তু যেহেতু আদালত তাঁকে নির্বাচিত ঘোষণা করেছেন, তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ডেমোক্র্যাটরা এবং তাঁদের দেশের সব মানুষ এটা মেনে নিয়েছিলেন। শুধু তাঁদের দেশের মানুষ মেনে নিয়েছিলেন, তা-ই বা বলি কেন, সারা পৃথিবীর মানুষ হাসিমুখে কিংবা বেজারমুখে মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিলেন। আর ভারতে তো হরহামেশাই কম ভোট পাওয়া দল বেশি ভোট পাওয়া দলের সমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় বসছে। সেটা পরোক্ষভাবে জনগণের সমর্থন নিয়েই ক্ষমতায় বসা। যাঁদের জনগণ ভোট দিয়েছেন, তাঁরা আবার সরকার গঠনের জন্য আমাদের সমর্থন দিয়েছেন, কাজেই আমরাই জনপ্রতিনিধি।
এই নিয়ে নৈতিক বিতর্ক তোলা যায়, জনগণ কেন তোমাদেরই সরাসরি ভোটে জেতাল না, কাজেই তোমরা সেই রকম সরাসরি প্রতিনিধি কি? কিন্তু সেই প্রশ্ন কেউ তোলে না। কারণ, আবারও বলি, নির্বাচন গণতন্ত্রের অন্যতম প্রধান ও মৌলিক শর্ত বটে, কিন্তু গণতন্ত্রের আরও অনেক অপরিহার্য উপাদান আছে, যেগুলো না থাকলে নির্বাচিত সরকার থাকলেও আসলে গণতন্ত্র থাকে না।
সেসব উপাদানের এক নম্বর হলো আইনের শাসন। তা ছাড়া আছে সরকারের জবাবদিহি, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, দক্ষতা ও কার্যকারিতা। আরেকটা হলো, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা। একটা দেশে সব মানুষই সমান। রাজার ছেলেরও এক ভোট, রাস্তার ধারে পড়ে থাকা খঞ্জ ভিখারিরও এক ভোট। রাজার ছেলের যতটুকু মর্যাদা, রাখাল বালকেরও ততটুকু মর্যাদা। সেটা কে বিধান করবে? প্রতিনিয়তই তো আমরা দেখি, রাষ্ট্র, ক্ষমতাবানেরা কীভাবে ব্যক্তি মানুষের অধিকার খর্ব করে থাকে। তাহলে এই বিপুল বিশাল ক্ষমতাসম্পন্ন রাষ্ট্র বা ক্ষমতাদর্পী শাসকদের হাত থেকে একজন ব্যক্তি মানুষ কীভাবে তার অধিকার রক্ষা করে চলবে? কে তাকে রক্ষা করবে? আইনের শাসন, স্বাধীন ও দক্ষ বিচার বিভাগ এবং স্বাধীন সংবাদমাধ্যম। কাজেই আমরা যদি গণতন্ত্র নিশ্চিত করতে চাই, তাহলে ভোটের সঙ্গে সঙ্গে অবশ্যই আমাদের বলতে হবে আইনের শাসনের কথা, মানবাধিকারের কথা, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার কথা, বলতে হবে জবাবদিহির কথা।
এই সরকার যে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেছে, সেটা বিতর্কিত। কিন্তু বাস্তবে এটাই এখন আমাদের সরকার। বিএনপিকেও এখন বলতে হচ্ছে এই সরকারের সঙ্গেই আলোচনায় বসার কথা।
আমেরিকানরা নির্বাচনের পরে প্রথম যে বিবৃতি দিয়েছিল, তাতেও আছে সরকারের সঙ্গেই আলোচনায় বসার সুপারিশ। অর্থাৎ এখন এই সরকারই সরকার, এই সরকার নিয়েই আমাদের চলতে হবে। সেটা কত দিন, তা উভয় পক্ষ মিলেমিশে ঠিক করুক। কিন্তু সরকার কী? সরকার তো আমাদের ম্যানেজার। একটা ফ্ল্যাট ভবনে একটা সমিতি থাকে। এক বছর বা দুই বছরের জন্য তারা নির্বাচিত হয়। কেউ সভাপতি, কেউ সাধারণ সম্পাদক, কেউ বা কোষাধ্যক্ষ। আমরা তাঁদের চাঁদা দিই। তার বিনিময়ে তাঁরা কোনো মাসোহারা নেন না, তাঁরা আমাদের বিদ্যুৎ বা পানির দেখভাল করেন, আমাদের নিরাপত্তা দেন, রক্ষণাবেক্ষণ করেন, মাঝেমধ্যে আমাদের বিনোদনেরও ব্যবস্থা করেন। মেয়াদ শেষে নতুন কর্মকর্তা নির্বাচিতও হন। তাঁরা আবার কর্মচারী নিয়োগ দেন, সুপারভাইজার, দ্বাররক্ষী। এখন এই সমিতির কর্মকর্তারা যদি এই দারোয়ান বা হিসাবরক্ষক নিয়োগের সময় ঘুষ খান, কিংবা নিজের ঘরে বেশি বিদ্যুৎ নিয়ে অন্যদের কম দেন, তাহলে কি হবে? এটা কখনো হয় না।
সরকারের কাজ আমাদের নিরাপত্তা দেওয়া, অবকাঠামোসুবিধা দেওয়া, আমাদের অর্থনীতি চালানো। তারা দেশের মালিক নয়। তারা দেশের সেবক। এই কথাটা সরকারি লোকজন ভুলে যান। কথায় আছে, ক্ষমতা মানুষকে নীতিভ্রষ্ট করে; চূড়ান্ত ক্ষমতা নীতিভ্রষ্ট করে চূড়ান্তভাবে। সারা পৃথিবীতে চিরটাকাল দুর্নীতি ছিল। কোথাও খুব কম, কোথাও খুব বেশি। আমাদের দেশে মোগল আমলে দুর্নীতি হয়েছে, ইংরেজ আমলে হয়েছে, পাকিস্তানি আমলে হয়েছে, স্বাধীন বাংলাদেশে তো দুর্নীতির সাগরে আমরা ভাসছি। কিন্তু এটার তো লাগাম টানতে হবে। কে টানবে? রাষ্ট্র যখন মানবাধিকার লঙ্ঘন করে, কে তাকে বাধা দেবে? বিচার বিভাগকে দিতে হবে, নাগরিকদের উচ্চকণ্ঠ হতে হবে, সংবাদমাধ্যমকে সজাগ ও সোচ্চার থাকতে হবে। এই সরকারকে তা-ই বলব, যেহেতু আপনারা একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে এসেছেন, আপনাদের উচিত খুব বেশি করে ভালো ভালো কাজ করা। দেশের মানুষের উপকার হয়, এই রকম কাজ করতে থাকুন, যেন আপনার মেয়াদটার কথা স্বস্তির সঙ্গে স্মরণ করতে পারে।
সেখানেই আসবে মানবাধিকার রক্ষার কথা। সত্য বটে, গত এক বছরে সারা দেশে প্রতিক্রিয়াশীল চক্র, জামায়াত-শিবির বা এই ধরনের শক্তি যেভাবে হামলা করেছে, যেভাবে বাড়িঘর পুড়িয়েছে, যেভাবে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর, ব্যববসায়িক স্থাপনা, উপাসনালয়ে আক্রমণ করেছে, যেভাবে আওয়ামী লীগারদের হত্যা করেছে, তার প্রতিবিধানে শক্ত হওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই। কিন্তু এই শক্ত হওয়াটাও যেন হয় আইনানুগ। মানবাধিকারের সব বিধান ও রীতি মান্য করে। দরকার হলে দ্রুত বিচার আদালত করুন, দরকার হলে স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল করুন। তবু স্বচ্ছ বিচারের মাধ্যমে শাস্তি নিশ্চিত করুন। কোনো অপরাধী যেন ছাড়া না পায়, তেমনি বিনা বিচারে কাউকে যেন শাস্তি দেওয়া না হয়।
সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে। নইলে ভবিষ্যতে ইতিহাস ক্ষমা করবে না। আমরা জানি, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার নামে কীভাবে দাঙ্গায় উৎসাহিত করা হয়েছে, কীভাবে ব্যক্তি অধিকার ক্ষুণ্ন করা হয়েছে। এসব সংবাদমাধ্যমের পক্ষে কথা বলার মুখ তারা নিজেরাই রাখেনি। তবু যা করা হয়, তা যেন করা হয় আইনের মাধ্যমে। এবং আইনটি যেন কালো আইন না হয়। এই সরকার যেহেতু একপক্ষীয় নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত, কাজেই সরকারকেই এসব দিক সবচেয়ে বেশি সতর্কতার সঙ্গে রক্ষা করতে হবে। সাধারণত মানুষের প্রবণতা থাকে, যে নৈতিক দিক থেকে দুর্বল অবস্থানে থাকে, সে তত বলপ্রয়োগের চেষ্টা করে। এ বিষয়ে সরকারের নীতিনির্ধারক মহলকে অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে সবচেয়ে বেশি।
আর দেশে ও বিদেশে একটা ব্যাপক জনমত তৈরি হয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর মতো মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তি, যুদ্ধাপরাধীদের নিয়ে গঠিত দল, যারা গণ-আন্দোলনের নামে নৃশংসতার প্রমাণ একাত্তরে রেখেছে, এখনো রেখে চলেছে, তাদের বর্জন করার। এখন বিএনপি নেতারা তো টেলিভিশনগুলোর টক শোয় এবং সভা-সেমিনারে প্রকাশ্যে বলছেন, সরকার নিষিদ্ধ করে দিক জামায়াতে ইসলামীকে। এই সুযোগ রাজনৈতিক নেতাদের গ্রহণ করতে হবে। বিএনপিকে বুঝতে হবে, জামায়াতের ভোট কখনো সাত থেকে আট শতাংশের বেশি ছিল না, সর্বশেষ জরিপে তা নেমে এসেছিল তিন শতাংশের নিচে। কিন্তু বিএনপি বা আওয়ামী লীগ যখন নির্বাচনে জয়লাভ করে, একাই জয়লাভ করার মতো জনপ্রিয়তা অর্জন করে বলেই করে।
এই কলামে বহুবার বলা হয়েছে, বিএনপির উচিত সংবিধানের অধীনেই নির্বাচনে যাওয়া। বলা হয়েছিল, আওয়ামী লীগ চায় না বিএনপি নির্বাচনে আসুক, সে কারণেই তো বিএনপির নির্বাচন করা উচিত। আজ প্রমাণিত হয়েছে, শুধু আওয়ামী লীগ চায়নি বিএনপির নির্বাচনে অংশগ্রহণ, কথা শুধু এতটুকুনই সত্য নয়, সত্য এই যে বিএনপিও চায়নি নির্বাচনে অংশ নিতে। তারা ভেবেছিল, তারা সরকারকে টেনেহিঁচড়ে নামিয়ে তারপর নির্বাচনে যাবে। কিন্তু গণ-আন্দোলনের বদলে আমরা দেখেছি পেট্রলবোমা। আগুনে পুড়ে যাওয়া মানুষ, গরু ও সবজির ট্রাক। দেখেছি হাজার হাজার গাছ কেটে ফেলা। দেরিতে হলেও বিএনপির নেতারা বুঝেছেন, সন্ত্রাস করে আন্দোলনে জেতা যায় না।
এটা আরও আগে বুঝলে তাঁরাও ভালো করতেন, দেশের ও মানুষের এত ক্ষতিও হতো না। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের অগ্নিঝরা ভাষণে একবারও আক্রমণ করার কথা বলেননি, সবচেয়ে কঠিন কথাটা ছিল, আমরা ভাতে মারব, পানিতে মারব। কিন্তু দম ফেলার আগেই তিনি বলেছেন, তোমরা আমার ভাই, তোমরা ব্যারাকে ফিরে যাও, কেউ তোমাদের কিছু বলবে না। আর বলেছেন, এই বাংলার হিন্দু, মুসলিম, বাঙালি, অবাঙালি সবাইকে রক্ষা করার দায়িত্ব আমাদের, আমাদের যেন বদনাম না হয়।
কথা শেষ করি। সরকারকে বলতে চাই, অপরাধীদের কঠোর হাতে দমন করুন, কিন্তু মানবাধিকার রক্ষা করে চলুন, বিচার বিভাগ ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত রাখুন, ভালো ভালো কাজ করে দেশের মানুষের চিত্ত জয়ের চেষ্টা করুন। বিএনপিকে বলব, যুদ্ধাপরাধী স্বাধীনতাবিরোধীদের বর্জন করুন। অহিংস আন্দোলন করুন। আন্দোলনে জনগণের অংশগ্রহণ বৃদ্ধির চেষ্টা করুন। আমরা সামনের দিনগুলোয় শান্তি চাই। এখন যেখানেই যাই, সবাই বলে, ভাই, আমাদের শান্তিতে থাকতে দিন, কাজ করতে দিন, ছেলেমেয়েদের স্কুলে যেতে দিন, চলাফেরা করতে দিন। জনগণের এই চাওয়াটা যেন আমাদের নেতাদের কানে পৌঁছায়।
আনিসুল হক: সাংবাদিক ও সাহিত্যিক।

গদ্যকার্টুন- গাছেরটাও খান, তলারটাও কুড়োন... by আনিসুল হক

Friday, January 17, 2014

আপনার অসুখ করেনি। কিন্তু আপনাকে দেওয়া হলো অভিজাত চিকিৎসাসেবা। আপনি ভোটে দাঁড়াননি। কিন্তু আপনি হয়ে গেলেন নির্বাচিত সাংসদ। আপনি অসুস্থ, কিন্তু আপনি খেলতে গেছেন গলফ। আপনার বউয়ের সঙ্গে আপনার বিরোধ।
আপনি এখন বিরোধীদলীয় নেত্রীর সম্মানিত ও গর্বিত স্বামী। আপনার অবস্থান সরকারবিরোধী, কিন্তু আপনি হলেন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত। আপনি শপথ করেছিলেন, আপনি সুইসাইড করবেন, শেষে আপনি শপথ নিলেন সাংসদ হিসেবে। আপনি ছিলেন ক্ষমতাচ্যুত স্বৈরাচারী, এখন দুই গণতান্ত্রিক দলের সবচেয়ে কাম্য ধন।

আপনিটা কে?
আপনারা জানেন এই ধাঁধার উত্তর।
এটা ছড়িয়েছে ফেসবুকে। কেউ একজন রচনা করেছেন। আদিতে কে করেছেন জানি না, তাই কৃতজ্ঞতা স্বীকার করতে পারলাম না।
আচ্ছা, আপনি কে? এই নিয়ে একটা কৌতুক প্রচলিত আছে। বুশ-সংক্রান্ত কৌতুক। এটা আগে বলে নিই।
বুশ গেলেন ব্রিটেনে। তিনি রানিকে জিজ্ঞেস করলেন, আচ্ছা, ব্রিটেনে দেশ চালানো হয় কীভাবে?
রানি বললেন, বুদ্ধি দিয়ে।
কেমন?
আচ্ছা, এই যে টনি ব্লেয়ার। ওকে আমি জিজ্ঞেস করব একটা ধাঁধা। আচ্ছা টনি, বলো তো, একটা লোক, সে তোমার বাবার ছেলে, সে তোমার মায়ের ছেলে, তোমার আর কোনো ভাইবোন নেই। লোকটা?
টনি উত্তর দিল: আমি।
দেখলে, টনির কত বুদ্ধি? এভাবে টনি ব্লেয়ার বুদ্ধি দিয়ে দেশ চালায়।
বুশ আমেরিকায় ফিরে গেলেন। তাঁর মন্ত্রীদের ডেকে বললেন, বলো তো, একটা লোক, সে তোমার বাবার ছেলে, সে তোমার মায়ের ছেলে, তোমার আর কোনো ভাইবোন নেই, লোকটা কে?
পুরো মন্ত্রিসভা তখন নিশ্চুপ। কী কঠিন ধাঁধা রে বাবা!
তখন বুশ বললেন, পাওয়েল কই? পাওয়েল থাকলে নিশ্চয়ই এর উত্তর দিতে পারত। ডেকে আনা হলো পররাষ্ট্রমন্ত্রী কলিন পাওয়েলকে। তাঁকেও জিজ্ঞেস করা হলো একই প্রশ্ন: একটা লোক, সে তোমার বাবার ছেলে, সে তোমার মায়ের ছেলে, তোমার আর কোনো ভাইবোন নেই, লোকটা কে?
পাওয়েল বললেন, আমি।
বুশ বললেন, হয় নাই, গাধা! সঠিক উত্তর হবে, টনি ব্লেয়ার।
বুশের আরেকটা কৌতুক বলি।
বুশ গেছেন একটা স্কুল পরিদর্শন করতে।
একটা ছেলে বলল, আমার দুটো প্রশ্ন আছে। এক. আপনি কম ভোট পেয়েও কী করে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হলেন? দুই. ইরাকে কোনো ব্যাপক বিধ্বংসী অস্ত্র পাওয়া যায় নাই। এ সত্ত্বেও আপনি কেন ইরাকে হামলা করলেন? এতগুলো নারী-শিশুর মৃত্যুর কারণ হলেন?
ঢং করে ঘণ্টা বাজল। বুশ বললেন, এখন ১০ মিনিটের বিরতি। বিরতির পর আবার শুরু হবে।
এবার আরেকটা ছেলে দাঁড়াল।
সে বলল, আমার তিনটা প্রশ্ন আছে। এক. আপনি কম ভোট পেয়েও কী করে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হলেন? দুই. ইরাকে কোনো ব্যাপক বিধ্বংসী অস্ত্র পাওয়া যায় নাই। এ সত্ত্বেও আপনি কেন ইরাকে হামলা করলেন? এতগুলো নারী-শিশুর মৃত্যুর কারণ হলেন? তিন. বিরতির আগে দুটো প্রশ্ন করেছিল যে ছেলেটা, সে কোথায় গেল?
আমরাও কিন্তু একই প্রশ্ন করতে পারি।
একটা করতে পারি ম্যাডাম খালেদা জিয়াকে। আপনি যদি অবরোধ-হরতালের কর্মসূচি থেকে সরেই এলেন—সরে আসার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ—আর এখন সংলাপের কথা বলছেনই, সেই সরকারের সঙ্গে সংলাপ, যা আপনার ভাষায় অবৈধ, তাহলে কেন এই কাজ আগে করলেন না? প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যেদিন আপনার বেঁধে দেওয়া সময়ের আগেই আপনাকে কর্মসূচি স্থগিত করে সংলাপের জন্য আমন্ত্রণ জানালেন, সেদিন কেন আপনি হরতাল স্থগিত করে আলাপে গেলেন না? কী হতো গণভবনে গিয়ে এক কাপ চা খেলে? মধ্যখান থেকে এত যে মৃত্যু, এত যে অগ্নিদাহ, এগুলোর দায় কে নেবে?
আর শেখ হাসিনাকে প্রশ্ন করা যায়, আপনি ১৫৩টা আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়া সাংসদকে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত সাংসদ বলতে পারেন কি না?
আর এই কৌতুক-আলোচনার সূত্র ধরে ডা. দীপু মনি বলতে পারেন, ব্রিটেনের রানির ধাঁধার জবাবটা আমি দিতে পারব। আপনারা কেউ আমাকে জিজ্ঞেস করছেন না কেন? আমি তো পারতাম।
আমি কয়েকজন সাধারণ মানুষ, রিকশাওয়ালা, আমাদের আত্মীয়স্বজনকে জিজ্ঞেস করলাম, বর্তমান পরিস্থিতিতে মানুষ কী বলছে?
তাঁরা সবাই নানা বাক্যে যা বলেছেন, তা হলো, মানুষ বলছে, ক্ষমতায় কে এল, কে গেল, আমাদের কিছু যায়-আসে না। আমরা শান্তি চাই। আমরা জানতে চাই, আমাদের পথ চলাচলের জন্য বাধাহীন হবে তো? বাড়ি থেকে বেরোলে আমি অক্ষত দেহে ফিরে আসতে পারবে তো? আমার গায়ে কেউ পেট্রলবোমা ছুড়ে মারবে না তো? আমি আমার দোকানপাট খুলতে পারব তো? আমার বাস-ট্রাক-অটোরিকশা নিয়ে আমি
যে রাস্তায় বেরোব, তাতে কেউ আগুন দেবে না তো? আমি যে সবজি বা দুধ উৎপাদন করছি, তা বিক্রি হবে তো? আপনারা থাকেন আপনাদের পলিটিকস নিয়ে, আমাদের বাঁচতে দিন। আমাদের কাজকর্ম করতে দিন। আমাদের শিশুদের স্কুলে যেতে দিন।
আমাদের প্রবৃদ্ধি এ বছর কমে যাবে, বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস। আমাদের এখন দরকার কাজ করা। দেশের মানুষ নিজের উদ্যোগে নিজের সৃজনশীলতা দিয়ে কাজ করে যাবে, যাচ্ছে। কিন্তু তাদের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায় রাজনীতি।
গণতন্ত্র নামের বাইসাইকেলের দুটো চাকা।
একটা সরকারি দল, একটা বিরোধী দল।
আমাদের সরকারি চাকাটা আমরা দেখতে পাচ্ছি। তাতে অবশ্য জাতীয় পার্টি, জাসদ, ওয়ার্কার্স পার্টিরও স্পোক দেখা যাচ্ছে।
কিন্তু বিরোধী চাকা কোনটা? জাতীয় পার্টি?
জানি না। সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত এ ব্যাপারে ভালো বলতে পারবেন। গাছেরটাও খাবেন, তলারটাও কুড়াবেন...সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের বাচনভঙ্গিটা অননুকরণীয়। এটা কেউ নকল করতে পারবে বলে মনে হয় না। সে চেষ্টা না-হয় আমরা না-ই করলাম।
ওঁরা গাছেরটাও খান, তলারটাও কুড়োন, আমরা তো সেই খাবারের ভাগ চাইছি না। আমরা চাই, আমাদের মাথার ঘাম পায়ে ফেলা পরিশ্রমের ফলটা নিয়ে যেন দারাপুত্রপরিবার মিলে একটু শান্তিতে দিন গুজরান করতে পারি।
আনিসুল হক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।

অরণ্যে রোদন- কী ব্যবস্থা নিলেন? by আনিসুল হক

Friday, January 10, 2014

আমার এক বন্ধু আমাকে বার্তা পাঠিয়েছেন: ‘সারা দেশে যা হচ্ছে, তা দেখে আমি, আমার পরিবার, আমার সম্প্রদায়—আমরা কেউ এতটুকু আশ্চর্য নই। এটাই ইতিহাস, আমরা জানি এ রকম হয়, হয়েছে বহু।
আমরা জানি এ রকম হতোই। আমরা জানি এ রকম হতেই থাকবে। ৪৬, ৪৭, ৬৫, ৬৬, ৭১, ৭৫, ৯০, ৯১, ৯৬, ২০০১, ২০০৮, ২০১৪ বা গুজরাট, বাবরি মসজিদ, রাখাইন, যুদ্ধ, ভোট—সব সময়ই একই ভবিতব্য।

‘এই নিয়তি আমার দাদার, বাবার, মায়ের, এই নিয়তি আমার, এই নিয়তি আমার সন্তানেরও। হ্যাঁ, আমার সন্তানেরও, কারণ বদলায়নি কোনো কিছুই, তথাকথিত শিক্ষা, আধুনিকতা বরং সাম্প্রদায়িকতার সঙ্গে যোগ করেছে হিপোক্রিসির নতুন নতুন পথ। আমার বাবার আমলের ধর্মান্ধরা অ্যাট লিস্ট হিপোক্রিট ছিল না। আর হ্যাঁ, আরেকটা জিনিসও নতুন, ফেসবুকের আর্তনাদটুকু। যেমন এখন আমি করছি, যেমন অনেকেই করে; গা-জোয়ারি স্ট্যাটাস দিয়ে তৃপ্ত হচ্ছে।
‘এ ছাড়া, আগেও আমরা জ্বলেছি, পুড়েছি, মরেছি, হারিয়েছি অনেক। একদল মেরেছে তো আরেক দল এসে টেনে তুলেছে। একদল তাড়িয়ে দিয়েছে তো আরেক দল আমার ভিটের দরজা ধরে বলেছে, ফিরে এসো, আমি আছি পাশে। এখনো তা-ই হচ্ছে। তাই কোনো বিশেষ ধর্মের ওপর আমার, আমাদের কোনো ক্ষোভ বা অভিযোগ নেই। অভিযোগ যদি থেকে থাকে, তা আছে ধর্মকে ব্যবহার করা সমাজের ওপর, ক্ষোভ ধর্মাবলম্বীর সংখ্যা দিয়ে করা রাজনীতির ওপর। সেই ক্ষোভও প্রাগৈতিহাসিক। আমার পূর্বপুরুষের ছিল, আমার আছে এবং আবার বলছি, শুনতে খারাপ লাগবে, এই বাংলাদেশে থেকে আমার সন্তানকেও একই ক্ষোভ করতে হবে।
‘তাই বলছিলাম, ক্ষোভ নেই, নতুন করে কোনো অভিযোগ নেই, নতুন কোনো দুঃখ নেই—আছে সেই পুরোনো ক্ষত, সেই পুরোনো কান্না, সেই পুরোনো অভিমান-অপমানে মাথা নিচু করতে করতে মাটির সঙ্গে মিশে যাওয়ার যন্ত্রণা। কেউ বিশ্বাস করতে পারবে না—মালাউন বলে গাল শুনতে, ইন্ডিয়ার দালাল বলে মিথ্যে অভিযুক্ত হতে, সবকিছুতে মাঝপথে থেমে যেতে, যেকোনো ঘটনায় মালু স্লোগানের সঙ্গে আগুন আর খড়্গকে ধেয়ে আসতে দেখে কেমন লাগে, কী হয় বুকের ভেতরটায়।
‘আমরা যদি শুধু আওয়ামী লীগের সমর্থক হিসেবে মরতাম, যদি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে থাকার জন্য ঘর জ্বলত, যদি শুধু রাজাকারদের ঘৃণা করার জন্য সম্ভ্রম যেত, যদি শুধু বাংলাদেশকে বাংলাদেশ হিসেবেই দেখতে চাই বলে দেশ ছাড়তে হতো, তবে এতটুকুও কষ্ট হতো না, যতটা হয় শুধু হিন্দু পরিচয়ের জন্য এই শাস্তি পেতে হয় বলে।
‘হিন্দু পরিচয়ের জন্য মরে যাওয়াও যে কী অপমানের, হিন্দু পরিচয়ের জন্য জন্তুর মতো দেশ থেকে পালানো কতটা অপমানের, কতটা ঘেন্নার, তা কেবল যে সয়, যে বয়ে বেড়ায় সেই বোঝে। গুজরাটের আলী হায়দারের কী যন্ত্রণা তা সৌদি আরবের বাদশার চেয়ে নিযুত গুণ বেশি জানি আমি, ভ্যাটিকানের পোপের চেয়ে বেশি বুঝতে পারি মিসরের কপ্ট ক্রিশ্চানরা কী ক্ষত বয়ে বেড়ায়, ইসরায়েলিদের চেয়ে বেশি অনুভব করি অ্যান ফ্রাংকের মন। সংখ্যালঘু শব্দটার কারাগার থেকে মুক্তি পেতে আমাদের কতটা ইচ্ছে করে, একবার মানুষ হতে কী ভীষণ আকুতি, তা জানি কেবল আমি, তা জানে কেবল আলী হায়দার।’
এই বার্তা পড়ে স্তব্ধ হয়ে থাকতে হয়। চিরসুখী জন ভ্রমে কি কখন ব্যথিত বেদন বুঝিতে পারে? আমরা ভাব করতে পারি,
সমস্ত অনুভূতি দিয়ে বোঝার চেষ্টা করতে পারি একজন মানুষ যখন কোনো একটা পরিচয়ের জন্য সংখ্যালঘু হিসেবে গণ্য হয়, তখন তার কেমন লাগে। কিন্তু আমরা আসলে কি তা বুঝব? ওই পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে না গেলে কি আসলে তা বোঝা যাবে? কিন্তু কতগুলো বাস্তব পরিস্থিতিও তো অনুভব করার চেষ্টা করা যায়।
রাতের অন্ধকারে ঘুমিয়ে পড়া শিশুটি যখন চিৎকার-চেঁচামেচির মধ্যে জেগে ওঠে, দিশেহারা মা যখন হঠাৎ ঘুম থেকে জেগে ওঠা শিশুটিকে কোলে করে ছুটতে থাকেন ঘর ছেড়ে, এই পৌষের শীতে যখন তারা নদীতে লাফিয়ে পড়ে ওই পারে যেতে চায় শুধু একটুখানি নিরাপত্তার জন্য, পেছনে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে তাদের ঘরবাড়ি, আগুন জ্বলছে, আর্তনাদ, শোরগোল, তখন তার কেমন লাগে আসলে! ওই নদী থেকে ভেজা শরীরে উঠে ওপারের গাছতলায় সারা রাত কাটানোর দৈহিক কষ্টটুকু হয়তো খানিকটা অনুভব করা যাবে, কিন্তু তাদের মনে, আরও আরও অসংখ্য মানুষের মনে তা যে গভীর অনিশ্চয়তা, নিরাপত্তাহীনতা, শিকড়হীনতা, ছায়াহীনতা, অবলম্বনহীনতার বোধ তৈরি করে, তা আমরা আসলেই অনুভব করতে পারব না।

দুই
রাষ্ট্র, সরকার, সমাজ তাদের দায়িত্ব পালন করতে পারল না কেন? আমাদের হিন্দু বা বৌদ্ধ মানুষগুলোর তো উভয়সংকট। সরকারি দলের নেতা বলেছেন, তোমরা সবাই যাবে ভোটকেন্দ্রে। তাঁরা রওনা হয়েছেন। পথে নির্বাচন বর্জনকারী জোটের কর্মীরা শাসাচ্ছেন, ভোট দিতে গিয়ে দেখিস, ফেরার পরে বুঝবি! কোথাও কোথাও বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে তাদের ঘরবাড়ি দোকানপাট জ্বালিয়ে, ভেঙে, তছনছ করে, মারধর করে, লুটপাট করে।
কিন্তু প্রশাসন, নির্বাচন কমিশন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, নেতারা করলেনটা কী? যেখানে এই আক্রমণ হয়েছে, সেসব জায়গা তো সেই কবে থেকেই অশান্ত। সরকার কি জানে না, কোথায় কোথায় জামায়াতের তাণ্ডব হয়েছে, হয়, হতে পারে? ১৪৭টা আসনে নির্বাচন, ৩০০টাতেও নয়, সরকার, নির্বাচন কমিশন বা প্রশাসন কেন আগে থেকে সেসব কেন্দ্রে, সেসব এলাকায় অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করল না? সংস্থাগুলো রিপোর্ট করতে পারল না কেন যে দেড়-দুই শ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হামলা করতে পারল দুর্বৃত্তরা? স্কুল পোড়ানো কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি হতে পারে না। ওটা এক দিনই কেবল ভোটকেন্দ্র, ৩৬৫ গুণন ৫ দিনই স্কুল। যারা নিজেদের রাজনৈতিক দাবি আদায় করার জন্য স্কুল পোড়ায়, তাদের জন্য সামান্য করুণাও নয়, কোনো ছাড় নয়। কঠোর ব্যবস্থা নিন। প্রতিটি স্কুলে হামলার ঘটনায়, প্রতিটি নির্বাচনোত্তর সহিংসতা, সাম্প্রদায়িক হামলার দ্রুত তদন্ত করুন, প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করুন এবং যে যে দলেরই হোক না বা হোক না নির্দলীয়, কঠোর হাতে দমন করুন, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিন। নির্বাচনের আগেও যেসব ঘরবাড়ি, উপাসনালয়ে হামলার ঘটনা ঘটেছে, প্রতিটির তদন্ত করুন, কী শাস্তি হচ্ছে, তা দেশবাসীর সামনে তুলে ধরুন।

তিন
বিমা কর্মকর্তা শাহীনা আক্তার (৪৫)। অফিসের কাজে খুলনা থেকে এসেছিলেন ঢাকায়। বাড়ি খুলনা শহরের টুটপাড়া। স্বামী সাংবাদিক এফ জামান। ঢাকায় এসে আটকা পড়েন অবরোধের কারণে। শুক্রবারে বের হন, কোনো কর্মসূচি নেই, কোনো বিপদ হবে না ভেবে। খুলনার বাস ধরতে গুলিস্তান যেতে হবে। বাসে ওঠেন। পরীবাগে সেই বাস শিকার হয় পেট্রলবোমার। দগ্ধ বাসযাত্রীদের নেওয়া হয় ঢাকা মেডিকেলের বার্ন ইউনিটে। গত বুধবার ৮ জানুয়ারি ২০১৪ তিনি মারা যান। এমনিভাবে ঢাকা মেডিকেলের বার্ন ইউনিটে এসেছেন ১৪০ জন, গত অক্টোবর থেকে, প্রায় তিন মাসে, মারা গেছেন ২৩ জন। যাঁরা বেঁচে আছেন, তাঁদের জীবন দুর্বিষহ। পেট্রলবোমা ছুড়ে মানুষ মারা হচ্ছে সারা দেশে। পেট্রলবোমা মারা কি রাজনৈতিক কর্মসূচি? বিএনপির নেতারা বলছেন, তাঁদের কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ, অহিংস, তাঁরা এসব করেন না। তাঁরাও পেট্রলবোমা হামলাকারী, সাম্প্রদায়িক হামলাকারী প্রকৃত অপরাধীদের শাস্তি চান। আমরা সরকারের কাছে জোর দাবি জানাই, প্রতিটি পেট্রলবোমা নিক্ষেপের ঘটনার তদন্ত করুন, যাকেই দোষী পাওয়া যাবে, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিন এবং কোন ঘটনায় কী ব্যবস্থা নেওয়া হলো, তা মানুষকে জানতে দিন।

চার
ভোট দেওয়ার অপরাধে ভোটারদের বাড়িঘরে হামলা, পেট্রলবোমা মেরে মানুষ পুড়িয়ে মারা—এজাতীয় ফৌজদারি অপরাধের সঙ্গে যুক্তদের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি ব্যবস্থা নেওয়ার জোর দাবি জানাই সরকারের প্রতি। আর বিরোধী নেতা-কর্মীদের প্রতি আকুল আবেদন, রাজনৈতিক প্রতিবাদ কর্মসূচিকে রাজনৈতিক কর্মসূচির মতোই রাখুন; জঙ্গি, সন্ত্রাসবাদী, ফৌজদারি অপরাধমূলক তৎপরতা কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি হতে পারে না।
আমি যখন স্কুল পোড়ানোর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ করে স্ট্যাটাস দিই, মন্তব্য আসে, স্কুলগুলোতে নির্বাচন হয় কেন? তার মানেটা হলো, স্কুল পোড়ানো, মানুষের ওপর হামলা করে মানুষ মারা অনেকেই না হলেও কেউ কেউ সমর্থন করেন। আমরা কবে থেকে এই রকম নিষ্ঠুর হলাম? রাজনীতি আমাদের বিবেকের ওপর এমনি কালো পর্দা টেনে দিয়েছে যে নির্বাচন প্রতিহত করার জন্য সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তাকে মেরে ফেলা কিংবা স্কুল পোড়ানোকেও আমরা সমর্থন করছি?
এই নির্বাচন প্রতিহত করারই বা কী ছিল। যে নির্বাচনে ১৫৩ জন ভোটের আগেই নির্বাচিত, সেই নির্বাচনের আবার গ্রহণযোগ্যতা কী? এটা প্রতিরোধ করার জন্য স্কুল জ্বালাতে হয়? প্রিসাইডিং কর্মকর্তা, আনসারদের খুন করার মতো ঘটনা ঘটাতে হয়? শান্তির জন্য সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে আমি জিরো টলারেন্সের পক্ষে। কঠোর হোন। দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিন। পাশাপাশি এও বলব, রাজনৈতিক সমস্যার পুলিশি সমাধান নেই। দেশে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব সরকারের। সরকারকেই রাজনৈতিক সমস্যার রাজনৈতিক সমাধান দিতে পারতে হবে। কাজেই সরকারকেই বিরোধী দলের সঙ্গে আলোচনা শুরু করতে হবে। একটা মতৈক্যে পৌঁছাতেই হবে। আর বিরোধী দলকেও নাশকতা, ধ্বংসাত্মক কর্মসূচি থেকে শতহাত দূরে থাকতে হবে। আর সমাজের মধ্যে যে ব্যাধি, যে বিভক্তি, হিংসাদ্বেষ, তা থেকে কোন শুশ্রূষায় সমাজকে সুস্থ করে তোলা যাবে, তা আমার জানা নেই।
আর কত শাহীনা আক্তারের লাশ দেখতে হবে আমাদের? আর কত শিশুর চোখ কিংবা আঙুল উড়ে যাবে ককটেলে? আর কত মানুষকে জীবন্ত দগ্ধ হতে হবে? পুলিশ আর কত গুলি চালাবে? কবে আমাদের নেতারা বলবেন, যথেষ্ট হয়েছে, এবার শান্তি চাই, এবার একটা সমঝোতায় পৌঁছানো দরকার।

আনিসুল হক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।

গদ্যকার্টুন- ভালা করি ঘর বানায়া কয় দিন? by আনিসুল হক

Friday, January 3, 2014

আচ্ছা, আপনাদেরও কি এই রকম হয়? ধরুন, একটা কাজ করতে হবে। ধরা যাক, আপনি কাউকে একট চিঠি লিখবেন, বা কোনো একটা বিল জমা দেবেন,
কোনো একটা কিছুর জন্য আবেদন করবেন। কাজটা করার জন্য আরও তিন মাস সময় হাতে আছে। আপনি প্রথমে ভাবলেন ঠিক আছে, দুই মাস সময় হাতে রেখেই কাজটা করে ফেলব। এক মাস যায়, দুই মাস যায়, তারপর যখন তিন মাস যায় যায়, তখন আপনার হুঁশ হয়, এবং একেবারে শেষের দিন গিয়ে কাজটা সারেন?
যদি আপনার এই রকম হয়ে থাকে, তাহলে বুঝবেন, আপনি আমারই দলে। এবং আমার ধারণা, বেশির ভাগ মানুষই আসলে কাজ ফেলে রাখে, এবং শেষ মুহূর্তের আগে কাজ শেষ করে না। আপনারা যাঁরা আমার মতোই শেষ দিনের আগে কাজ শেষ করেন না, তাঁদের জন্য নিউ ইয়ার রেজুলেশন, নতুন বছরের অঙ্গীকার:
নতুন বছরে আমি হব ভালো ছেলে
সময়ে সারব কাজ রাখব না ফেলে।
আপনার মূল্যবান সময় কি ফেসবুকে অপব্যয়িত হচ্ছে? তাহলে আসুন, নতুন বছরে এই প্রতিজ্ঞা করি:
নতুন বছরে আমি এই পণ করি
ফেসবুক না পড়ে যেন সত্যি বই পড়ি।
আমার ওজন বেড়ে যাচ্ছে। ভুঁড়ি সামলাতে পারছি না। জিমনেসিয়ামে যাবার জন্য বার্ষিক কার্ড করেছিলাম, টাকা ব্যয় হয়েছে, ক্যালরি খরচ হয় নাই। একটা মেশিন কিনেছি, ব্যায়ামের যন্ত্র, সেটা ঘরের একটা কোণে অযত্নে পড়ে আছে, প্রথম দুই-তিন দিনই যা শরীরচর্চা হয়েছে, তারপর বেমালুম ভুলে গেছি সেই যন্ত্রের কথা। আপনাদেরও কি এই রকম হয়?
তাহলে আসুন, প্রতিজ্ঞা করি:
নতুন বছরে আমি এই করি পণ
খাওয়া কম ব্যায়াম বেশি কমাব ওজন।
ইনশা আল্লাহ, আগামী নতুন বছর পর্যন্ত যদি বেঁচে থাকি, আগামী বছরেও এই প্রতিজ্ঞাগুলোই নতুনভাবে উচ্চারণ করতে পারব। মানুষ প্রতিজ্ঞা করে প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করার জন্যই।
এই জন্যই তো লোকে বলে, সিগারেট ছাড়া খুব সোজা। আমি আমার এই ক্ষুদ্র জীবনে বহুবার সিগারেট ছেড়েছি।
আমি অবশ্য ধূমপান করি না। এই প্রতিজ্ঞা তাই আমাকে করতে হয় না, এই প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করবারও দরকার পড়ে না।
***

এই পর্যন্ত পড়ার পর অনেকেই ক্ষিপ্ত হয়ে উঠবেন। দেশের পরিস্থিতি ভয়াবহ। একতরফা একটা নির্বাচন সামনে। বিরোধী জোট সেই নির্বাচন বর্জন করেছে। অর্ধেকের বেশি আসনে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতাই হয়নি। দেশে চলছে লাগাতার অবরোধ, লাগাতার হরতাল, লাগাতার বোমাবাজি, লাগাতার অগ্নিসংযোগ। দ্যাশ শ্যাষ। ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ, কৃষকদের কপাল পুড়ে ছাই, কলকারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। প্রবৃদ্ধি ৫-এর নিচে নেমে যেতে বাধ্য। নেতাদের আছে শুধু ক্ষমতাপ্রীতি। কেউ দেশের কথা ভাবছে না। এই অবস্থায় আপনি রসিকতা করেন। এই অবস্থায় তুমি মিয়া ক্যালরি, কোলেস্টেরল, ফেসবুক নিয়া ঘ্যানর ঘ্যানর করো।
তিন বছর ধরে একই কথা বলছি। বলছি যে, একতরফা নির্বাচন চাই না, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন চাই। বলছি, ভোটে জনমতের প্রকৃত প্রতিফলন চাই। কেউ আমার কথা শুনেছে?
গতকাল একজন সাবেক রাষ্ট্রদূত বললেন, বাংলাদেশে আছে আসল গণতন্ত্র। বকাওয়ালা বকে যাচ্ছে, লেখাওয়ালা লিখে যাচ্ছে, শোনাওয়ালা শুনে যাচ্ছে, করাওয়ালা নিজের মতো করে যাচ্ছে। এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি।
প্রথম আলো লিখেছে, হাল ছেড়ে দিয়েছে বিএনপি। আশ্চর্য একটা দল। জরিপ বলছে, তারা জনপ্রিয়। জরিপ বলছে, তাদের দাবি, তত্ত্বাবধায়ক সরকার বেশির ভাগ মানুষই চায়। তার পরেও তাদের আন্দোলনে লোক হয় না। দেড় কোটি মানুষের শহরে দেড় লাখ না হোক, ১৫ হাজার লোক পথে নামবে না? নামবে কেন, কোনো নেতা নেমেছেন? নামবেন কী করে, সব নেতা তো কারাগারে। কথা কি সত্য? টিভি টক শোতে তো এখনো বিএনপির নেতাদের দেখি। কারণ হলো, বিএনপি সর্বহারাদের দল নয়। তাঁদের শরীরে মেদ আছে। নড়তে-চড়তে কষ্ট হয়।
শক্তিশালী বিরোধী দল না থাকা কোনো গণতন্ত্রের জন্য বড় দুঃসংবাদ। আমরা এখন সেই দুঃসংবাদের মধ্যে আছি।
***

নতুন বছরে তাই আমরা কতগুলো রেজুলেশন নিতে পারি।
১. আগামী এক বছরে বাংলাদেশের সব জমি কিনে ফেলব।
২. আগামী এক বছরে বাংলাদেশের সব নদী ভরাট করে ফেলব।
৩. আগামী এক বছরে বাংলাদেশের সব গাছ কেটে ফেলব।
৪. আগামী এক বছরে প্রত্যেক সরকারি নেতার জন্য দুইটা করে টেলিভিশন চ্যানেল, পাঁচটা করে ব্যাংক, ছয়টা করে বিমা বরাদ্দ দেওয়ার ব্যবস্থা করব।
রসিকতা করছি। বুঝতেই পারছেন।
এবার একটা সিরিয়াস কথা। গত বছরের সবচেয়ে স্মরণীয় উক্তি হলো: ‘আমি প্রধানমন্ত্রিত্ব চাই না।’
***

না না, রাজনৈতিক আলোচনা বাদ। এখানে রাজনৈতিক আলোচনা নিষিদ্ধ। যে প্যাঁচ আপনি-আমি লাগাই নাই, যে সুতার কোনো অংশ, না ডগা, না মাঝখানেরটা, আপনার আমার ধরাছোঁয়ার মধ্যে নাই, সেই প্যাঁচ আমরা খুলব কীভাবে। যারা প্যাঁচ লাগিয়েছেন, কেবল তাঁরাই খুলতে পারবেন।
বরং আসুন, আমরা গান-বাজনা করি। হাসন রাজার গানটা গাই।
লোকে বলে বলে রে ঘরবাড়ি ভালা না আমার।
কী ঘর বানামু আমি শূন্যেরও মাঝার।
ভালা করি ঘর বানায়া কয় দিন রমু আর,
আয়না দিয়া চায়া দেখি পাকনা চুল আমার।

আনিসুল হক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।

গদ্যকার্টুন- শঙ্কা আসে ধেয়ে by আনিসুল হক

Friday, December 27, 2013

পাঠকদের কাছে ক্ষমা চাই। কারণ, এই কলামে লিখেছিলাম, নির্বাচন নিয়ে দেশে কোনো অচলাবস্থা দেখা দেবে না, দিলেও সেটা ভয়ংকর কিছু হবে না। বাংলাদেশের মানুষের আছে সৃজনশীলতা, তারা এমন একটা উপায় বের করে নেবে, যা থেকে একটা সুন্দর নির্বাচন সম্পন্ন করা যাবে। আমার সেই ভবিষ্যদ্বাণী চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে, আমার আশা হয়ে গেছে গুড়ে বালি।

আমরা পড়েছি ভয়াবহ সংকটে। এত মৃত্যু, এত ধ্বংস, এত আগুন! জীবন ও জীবিকার ওপরে এমন নিষ্ঠুর আঘাত। প্রত্যেক মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাপন ব্যাহত হচ্ছে। কৃষি, শিল্প, ব্যবসা, শিক্ষা, চাকরি—প্রতিটা ক্ষেত্র ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে; এবং সবচেয়ে বড় কথা, সংকট থেকে উত্তরণের কোনো সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছে না, বরং সামনে আরও হানাহানি, আরও আগুন, আরও প্রাণহানি, আরও সম্পদহানির আশঙ্কা ধেয়ে আসছে। এবং রাজনৈতিকভাবে দেশ একটা কানাগলিতে ঢুকে পড়তে যাচ্ছে, যেখান থেকে বেরোনোর উপায় আমাদের জানা নেই।

সমস্যার মূলে অবশ্যই জেদ। এখন এ কথা সহজেই বলে ফেলা যায়, আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছিল, বিএনপিকে তারা নির্বাচনের বাইরে রাখবে। আমরা বলেছিলাম, আওয়ামী লীগ চায় না বিএনপি নির্বাচনে আসুক। আওয়ামী লীগের চাওয়া পূরণ করার দায়িত্ব তো বিএনপির নয়। তাই বিএনপির উচিত নির্বাচনে আসা। নির্বাচনের হাওয়া বইতে শুরু করলে একটা পক্ষে জোয়ার চলে আসবে, সেই জোয়ারে কারচুপির চক্রান্ত খড়কুটার মতো ভেসে যাবে। অরণ্যে রোদন করলে তা কে শুনবে বনের পশু-পাখি-বৃক্ষলতা ছাড়া। কেউ শোনেনি। এখন এ কথাও বলে ফেলা যায় যে বিএনপির নেতৃত্বও আসলে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর চান না, তাঁরা চান ১৯৯৬ ও ২০০৭ সালে তাঁদের যেভাবে অপমানজনকভাবে ক্ষমতা ছাড়তে হয়েছিল, সেই তেতো অভিজ্ঞতার স্বাদ শেখ হাসিনার সরকারকে পাইয়ে দেওয়া।

দুই পক্ষের মনের ভেতরে মীমাংসা না করার জেদ প্রবল, আপনি-আমি কথা বলে কী করতে পারব? আর উভয় পক্ষই শুধু নিজেরটাই বুঝছে, দেশের মানুষের জীবন, দেশের মানুষের নিরাপত্তা, দেশের ভবিষ্যতের কথা ঘুণাক্ষরেও কেউ ভাবছে কি? তার চেয়েও ভয়াবহ কথা হলো, উভয় পক্ষ আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করে যে তাদের ক্ষমতা গ্রহণ বা ক্ষমতা দখল করে রাখার মধ্যেই কেবল নিহিত রয়েছে দেশের মঙ্গল, এমনকি দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের রক্ষাকবচ। যদি উভয় পক্ষই এটা ভাবতে থাকে যে আমি ক্ষমতায় না থাকলে দেশ শেষ হয়ে যাবে, তখন আপনি কী করতে পারেন। আমরা শুধু উভয় পক্ষকে বলতে পারি, এই চিন্তার নাম ফ্যাসিবাদী চিন্তা।

আর আওয়ামী লীগ কেন অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনকে ভয় পেল? কার পরামর্শে? বছর দুই আগে যখন সংবিধান সংশোধন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রথা তুলে দেওয়া হয়, তখন তো শাসকদের জনপ্রিয়তায় এতটা ধস নামেনি। বরং সরকার জনপ্রিয়তা হারিয়েছে বলে বিভিন্ন জরিপে যা বলা হচ্ছে, তার একটা অন্যতম কারণ মানুষের এক দিনের রাজা হওয়ার সুযোগটা রদ করে দেওয়া। শেয়ার মার্কেট কেলেঙ্কারি, পদ্মা সেতু কেলেঙ্কারি, দল ও সংগঠনের নেতা-কর্মীদের বাড়াবাড়ি—এসব তো আছেই। আছে সাংসদ-মন্ত্রী-নেতাদের অনেকের সম্পদ ফুলে-ফেঁপে ওঠা। যেটা এখন নির্বাচনী হলফনামায় দিনের আলোর মতো পরিষ্কার। একজন নেতা জানান, তিনি প্রায় ১৫ কোটি টাকা আয় করেছেন মাছের চাষ করে। মানে বছরে তিন কোটি টাকা। প্রতি কেজি মাছে তাঁর ১০ টাকা লাভ হলে বছরে ৩০ লাখ কেজি মাছ তাঁকে উৎপাদন করতে হয়েছে। তার মানে প্রতিদিন দুই ট্রাক করে মাছ তাঁর খামার থেকে বাজারে এসেছে। তাই তো বলি, দেশে মাছের অভাব দূর হলো কীভাবে? সব ঢাকায় বসে থাকা মন্ত্রী-সাংসদেরা উৎপাদন করেছেন।

তবু আওয়ামী লীগ সরকার অনেক ভালো কাজও তো করেছিল। সেসবের কথা মানুষ যে বিবেচনা করবে, সেই অবকাশই তো তাকে দেওয়া হলো না। কল্পনা করুন, যদি উচ্চ আদালতের দেওয়া সুযোগ অনুসারে আরও দুই টার্ম তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রচলিত থাকত, তাহলে আজ বিএনপি আন্দোলন করত কী নিয়ে? আজ জামায়াতের আন্দোলন আর বিএনপির আন্দোলন একাকার হয়ে যেতে পারত না। এমনকি সরকার তো জাতীয় পার্টিকেও নির্বাচনে আনতে ব্যর্থ হয়েছে। শেখ হাসিনার একসময়ের মন্ত্রী আ স ম আবদুর রবও এখন বিএনপি জোটের আন্দোলনকে সমর্থন দিচ্ছেন। আওয়ামী লীগ তো ‘পলিটিকস’টাও ঠিকভাবে করতে পারছে না। এবং পর্যবেক্ষকদের কেউ কেউ মনে করেন, আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক চালেও ব্যর্থ হচ্ছে। কারণ, রাজনীতি রাজনীতিকদের হাতে নেই। অরাজনৈতিক গোষ্ঠী যখন রাজনীতি চালানোর চেষ্টা করে, তার ফল এ রকমই হয়ে থাকে।

১৮-দলীয় জোট খুবই কৌশলী একটা চাল দিয়েছে। দিনের পর দিন অবরোধে দেশের যখন নাভিশ্বাস উঠে গেছে, তখন তারা দিয়েছে ঢাকা চলো কর্মসূচি। এত দিন আমরা দেখলাম বিরোধী জোটের অবরোধ, এরপর দেখব, সরকারি অবরোধ। সরকার এবার ঢাকা আসার সব ধরনের পথ বন্ধ করে দেবে। আমাদের পরিত্রাণ নেই।

কী হবে ২৯ ডিসেম্বর? কী হবে এরপর? হানাহানি হতেই থাকবে। এই নির্বাচন তো আসলে ঠেকানোরও কিছু নেই, যে নির্বাচনে অর্ধেকের বেশি প্রার্থীর প্রতিদ্বন্দ্বী থাকেন না, তার তো কোনো মানেও নেই আসলে। সরকার ক্ষমতা ছাড়তে চাইবে না, ৫ জানুয়ারিটা পার হয়ে গেলে শপথ গ্রহণ করে নতুন সরকার চেপে বসতে চাইবে জুতমতো। আর বিরোধী জোটই বা তা মেনে নেবে কেন? তারাও খালেদা জিয়ার ভাষায় ‘প্রাণক্ষয়ী’ আন্দোলন চালিয়ে যাবে। সরকার দমন-নিপীড়ন বাড়িয়ে দিতে থাকবে। জুলুম বাড়বে, গণতান্ত্রিক অধিকারগুলো হরণ করা হতে থাকবে। উফ্, আমি কল্পনাও করতে পারছি না, সামনের দিনগুলোয় আমাদের জন্য কী অপেক্ষা করছে?

যে আওয়ামী লীগ ১৯৪৯ সাল থেকে গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করে আসছে, তারা কি ক্ষমতায় থাকার জন্য বলপ্রয়োগকেই একমাত্র উপায় হিসেবে গ্রহণ করে নিয়েছে?

বলা হয়ে থাকে, আওয়ামী লীগ সরকার সামনের দিনগুলোয় অনেক ভালো কাজ করবে, জনপ্রিয়তা ফিরে পাবে, তখন নির্বাচন দেবে। জনপ্রিয়তা ফিরে পাবে কী করে? আরও আরও মৎস্য চাষ করে? ভালো কাজ করলে যদি জনপ্রিয়তা পাওয়া যায়, তাহলে গত পাঁচ বছর তারা তা না করে একপক্ষীয় নির্বাচনের পরে করার কথা কেন ভাবল? আচ্ছা, আওয়ামী লীগ জনপ্রিয়তা ফিরে পেল, নির্বাচন দিলেই তারা জয়লাভ করবে, তখন নির্বাচনটা হবে কোন পদ্ধতিতে? আবারও সেই বিষচক্র। তত্ত্বাবধায়ক ছাড়া অন্য কিছু বিরোধীরা কেন মানবে? আর কোনো একটা পক্ষ কোনো একটা ছাড় যদি দেয়ই, তাহলে তা তারা এখন দিচ্ছে না কেন? আর কতজন মারা গেলে আমরা বলব, মানুষ মারা গেছে? আর কজন পুড়লে আমরা বলব, এটা বর্বরতা ছাড়া আর কিছু নয়?

একটা জাতির ইতিহাসকে এক দিন, দুই দিন, এক বছর, দুই বছরের পাল্লায় মাপতে হয় না। তাই আমি আবারও বলব, আজ থেকে ২০ বছর পরের বাংলাদেশটা নিশ্চয়ই একটা উন্নত-আলোকিত স্বদেশই হবে। কিন্তু নিকট ভবিষ্যতের কথা যদি আমাকে বলতে বলেন, আমি ভালো কিছু দেখছি না। ‘এখন প্রকৃত আশাবাদীর পক্ষে আর কিছুই করার নেই, কেবল হতাশ হওয়া ছাড়া।’

অরণ্যে রোদন হলেও আমাদের কথা আমাদের বলে যেতেই হবে। সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন চাই। নির্বাচনে জনমতের প্রকৃত প্রতিফলন চাই। এবং নির্বাচন করতে হলে বিবদমান জোটগুলোর মধ্যে একটা ন্যূনতম মতৈক্য চাই, সমঝোতা চাই, মীমাংসা চাই। বাংলাদেশে তা-ই হয়, যা বিএনপি আর আওয়ামী লীগ একযোগে চায়। দেশে শান্তি আসুক, এটা বিএনপি আর আওয়ামী লীগকে একযোগে চাইতে হবে। তা না হলে আমাদের কারোরই স্বাভাবিক মৃত্যুর কোনো গ্যারান্টি থাকবে না। আমরা কতটা বর্বর হয়েছি যে কেবল মানুষ হত্যা করছি, তা নয়, আমরা বৃক্ষ নিধন করে চলেছি; আমরা কেবল মানুষ পুড়িয়ে মারছি, তা নয়, আমরা এখন গরু পোড়াতে শুরু করেছি। আমরা কি মানুষ পদবাচ্য নই?

আনিসুল হক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।

 
Support : Dhumketo ধূমকেতু | NewsCtg.Com | KUTUBDIA @ কুতুবদিয়া | eBlog
Copyright © 2013. Edu2News - All Rights Reserved
Template Created by Nejam Kutubi Published by Darianagar Publications
Proudly powered by Dhumketo ধূমকেতু