বিলুপ্তপ্রায় গ্রামীণ ঐহিত্য ঢেঁকি ।। জহির রহমান

Saturday, July 16, 2011



বর্তমান যান্ত্রিক যুগ। আধুনিকতার যুগ। কর্মব্যস্ত মানুষের ব্যস্ততা যেমন বেড়েছে তেমনি যে কোন কাজ স্বল্প সময়ে স্বল্প শ্রমে দ্রুত সম্পন্ন করতে পারলেই মানুষ হাফ ছেড়ে বাঁচে। আধুনিক ও নতুন নতুন প্রযুক্তির কল্যাণে মানুষ অতীতের ঐতিহ্যবাহী অনেক অনেক জিনিসপত্রের ব্যবহার বা কর্মকান্ড যা তাদের জীবনাচারের সাথে ছিল অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত তা পরিত্যাগ করেছে কিংবা পরিত্যাগ করতে বাধ্য হচ্ছে।

এজন্য কাউকে দোষারোপ করে লাভ নেই বরং যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে এবং সময় বাঁচাতে অতীতের অনেক কিছুই পরিত্যাগ করতে হয় এবং নিত্য নতুন অনেক কিছু সে জায়গা পুরণ করে নেয়ায় অতীত হয়ে যায় ইতিহাসের অংশ। কিন্তু আমাদের অতীত ঐতিহ্য ভুলে গেলে চলবেনা। জানা এবং পরবর্তী প্রজন্মকেও জানানো প্রয়োজন। অতীতকে জেনেই ভবিষ্যত কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করলে সুফল লাভ হয় সহজ। আমাদের অতীত ইতিহাস ঐতিহ্য সমাজ সংস্কৃতি ইত্যাদি যাতে ভুলে না যাই সচেতন মহলের সেদিকে নজর দেয়া অবশ্যই প্রয়োজন। চিরায়ত বাংলার হারিয়ে যাওয়া সেই ইতিহাস ঐতিহ্যেরই একটি অংশ হচ্ছে আমাদের অতীতের বহুল ব্যবহৃত নিত্যপ্রয়োজনীয় সমাজ সংস্কৃতির অংশ হল ঢেঁকি’র ব্যবহার।

আগেকার যুগে প্রায় প্রত্যেকটি বাড়িতেই ধান বানার জন্য ঢেঁকি থাকত। বর্তমানে নিতান্ত অজো পাড়াগাঁয়ের কোথাও কোথাও হয়ত ঢেঁকি থাকতেও পারে তবে, এসবের ব্যবহার প্রায় নেই বললেই চলে। ঢেঁকিছাটা চাউলের কদর এখনও কমেনি কারণ এ চাউলের ভাতের মজাই আলাদা। ঢেঁকিছাটা চাউলের উপরের আবরণ থাকে যাতে প্রচুর পরিমান ভিটামিন রয়েছে। ঢেঁকিছাটা চাউল পাওয়া যায় তবে এর দামও অন্যান্য চালের চেয়ে তুলনামুলকভাবে বেশি।

ঢেঁকি শিল্প গ্রাম বাংলার প্রাচীন গ্রামীন ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপুর্ণ অংশ। একসময় গ্রাম- গঞ্জসহ সর্বত্র ধান ভাঙ্গা, চাউল তৈরি, গুড়ি, চিড়া তৈরি, মশলাপাতি ভাঙ্গানো সহ বিভিন্ন কাজের জন্য ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হত চিরচেনা ঐতিহ্যবাহী ঢেঁকি। তখন এটা গ্রামীণ জীবন ও সংস্কৃতির সাথে জড়িত ছিল ওতপ্রোতভাবে। অনেকে কুটির শিল্প তথা পেশা হিসেবেও ঢেঁকিতে ধান বানতেন। ঢেঁকি চালাতে সাধারণত দুজন লোকের প্রয়োজন হয়। সাধারণত মহিলারাই চালাতেন তাদের সাধের ঢেঁকি। এক প্রান্তে উঠে সর্বশক্তি প্রয়োগ করে পা দিয়ে চাপ দিতে হয় আবার ছাড়তে হয়। অপরজন নির্দিষ্ট গর্তে যেখানে মলার আঘাতে চাউল থেকে ধান বের হয় সেখানে সতর্কতার সাথে ধান দিতে হয় আবার প্রতি আঘাতের পর পর ধান নড়াচড়া করে উল্টে পাল্টে দিতে হয় যাতে সবগুলোতে আঘাত লাগে। শেষ হলে বা গর্ত পরিপূর্ণ হয়ে গেলে এগুলো তুলে আবার নতুন ধান দিতে হয়। মহিলারা ধান বানার ফাঁকে ফাঁকে আঞ্চলিক গীত পরিবেশন করতেন মনের আনন্দে একক বা যৌথ কন্ঠে।

আমাদের দেশে সত্তরের দশকে সর্বপ্রথম রাইসমিল বা যান্ত্রিক ধান থেকে চাল বের করার কল বা মেশিন এর প্রচলন শুরু হয়। তখন থেকেই ঢেঁকির প্রয়োজনীয়তা ক্রমান্বয়ে হ্রাস পেতে থাকে। একসময় সারাদেশে বার মাসে তের পার্বণ পালিত হত। গ্রামে গঞ্জে একটার পর একটা উৎসব লেগেই থাকত। হেমন্ত উৎসব, পৌষ পার্বণ, বসন্ত উৎসব, নববর্ষ, বিবাহ উৎসব, কনের বাড়ীতে আম কাঠঁল প্রদানের সময় হাতের তৈরী রুটি পিঠা তৈরির উৎসব, হিন্দুদের পূজা, মেলাসহ হরেক রকমের অনুষ্ঠানের আয়োজন হত বা এখনও হচ্ছে। এসব উৎসবে পিঠা পায়েস সন্দেস ইত্যাদি তৈরির ধুম পড়ে যেত। আর এসব তৈরীর মূল উপকরণ হচ্ছে চালের গুড়ি। চালের গুড়ি তৈরীর জন্য অতীতে ঢেঁকির আশ্রয় নেয়া হত। ঈদ বা উৎসবের সময় ঘনীভুত হয়ে এলে প্রত্যেক বাড়ীতেই ঢেঁকির ছন্দময় শব্দ শুনেই আন্দাজ করা যেত ঈদ বা উৎসব এসেছে। গ্রাম বাংলার শৌখিন মহিলারা চালের গুড়ি দিয়ে চুই পিঠা, চিতল পিঠা, রুটি পিঠা, তালের পিঠা, সমছা সহ তৈরী করতেন হরেক রকমের পিঠা। কিন্তু বর্তমান আধুনিক এ যান্ত্রিক যুগে বিভিন্ন অনুষ্ঠান উৎসবে আর অতীতের মতো জৌলুস নেই। উৎসবগুলো আজকাল প্রথা বা রেওয়াজ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

একটা সময় ছিল বড় গৃহস্থ বা কৃষকের ঘরে অবসর সময়ে বা রাতের অধিকাংশ সময়ই ঢেঁকিতে ধান বানার কাজ করতে হতো। ধান বানতে বানতে অনেক মহিলার হাতে ফসকা পড়ে যেত। গরিব মহিলারা বা গৃহ পরিচারিকারা এক আধসের চাল বা ধান পারিশ্রমিকের মাধ্যমে কেহবা শুধু পেটপুরে খাবার বিনিময়ে ধনিদের ঘরে চাল ভাঙার কাজে নিয়োজিত থাকতো। যে গৃহস্থ যতো বেশি ধান বা চাউল উৎপাদন করে বিক্রয় করতে পারতেন তিনিই এলাকায় ততো বড়ো ধনী হিসেবেই খ্যাতি অর্জন করতেন। তাই বড়ো বড়ো গৃহস্থের বাড়ীতে ঢেঁকিতে ধান বানার আওয়াজ তথা ঢেকুর ঢেকুর শব্দ শুনা যেত হরদম।

কালের বিবর্তনে হারিয়ে যেতে বসেছে ঢেঁকির ছন্দময় শব্দ। এখন শুধু চাল নয় মশলাপাতিও মেশিনের মাধ্যমে ভাঙ্গানো হয়। পাটা পুতাইলের ঘষায় যে মরিছ পিষা হতো তাও এখন বিলুপ্ত প্রায়। মহিলাদের আরামের পরিধি বেড়েছে। বেড়েছে আধুনিকতা ও আধুনিক যান্ত্রিক জীবন যাপন। গ্রামের দু-এক বাড়ীতে ঁেঢকির অস্তিত্ব থাকলেও এর ব্যবহার নেই বললেই চলে। আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম হয়তো যাদুঘরে গিয়ে জানতে হবে ঢেঁকি কী জিনিস এবং এর মাধ্যমে কোন ধরনের কাজ করা হতো।

গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য : হারিয়ে যাচ্ছে পালকি ।। জহির রহমান

Saturday, April 30, 2011

চিরায়ত গ্রামবাংলার ঐতিহ্যের ধারক পালকি আর চোখে পড়ছে না। পালকিও কোন কোন খানদানি বাড়িতে অচল হয়ে পড়ে আছে। কিংবা মিউজিয়াম পিস হয়ে কালের স্থানু সাক্ষী হয়ে আছে জাদুঘরে। বেহারাদের সুর করে সেই কিনু গোয়ালার গলি ঘুরে মাঠ প্রান্তর পেরিয়ে গন্তব্যের কাছে দূর থেকে সেই ছয় বেহারাদের আর দেখা যাচ্ছে না। তাদের ছন্দিত লয়ে হাঁটার সাথে সাথে এ গাঁও থেকে ওগাঁয়ে নাইয়র, বিয়ের কনে-বর কিংবা মান্যগণ্য ব্যক্তিদের নিয়ে যাওয়ার এ চক্রবিহীন যান সম্ভবত তার অন্তিম প্রহর গুনছে।

ছন্দের জাদুকর সত্যেন্দ্র নাথ দত্তের ভাষায়, রবীন্দ্রনাথের কবিতায়, হেমন্তের গানে কিংবা ভূপেন হাজারিকার মাদল মাদক তানে চলা পালকি এখন ঐতিহ্যের খাতায় নাম লেখাচ্ছে। সেই ন্যাংটা পুঁটো ছেলেটা আর বলে না পালকি চলে, পালকি চলে ঃ আদুল গায়ে যাচ্ছে কারা — যাচ্ছে কারা হনহনিয়ে।
রবি ঠাকুরের ’বীরপুরুষ’ কবিতার খোকা তার মাকে পালকিতে নিয়ে যাওয়ার সময় লড়ে না ডাকাতের সাথে যখন ওরা আসে তেড়ে ‘হারে রে রে’ বলে। সেই ভীষণ যুদ্ধের বর্ণনাও দিতে পারে না মাকে। মাও বলতে পারেন না , ভাগ্যে খোকা ছিল তাঁর সাথে। দাদা তার সদ্য বিয়ে হওয়া দিদিটিকে আর বলে না, এ কটা দিন থাক না দিদি , কেঁদে কেটে কঁকিয়ে, দুদিন বাদে তো নিয়েই যাবে পালকি করে সাজিয়ে। ‘মৈমনসিং গীতিকার’ দেওয়ানা মদিনাও ছুটবে না পালকিতে আবের পাংখা নিয়ে আর।

পালকি বহরের আর সেই পরিচিত দৃশ্য এখন আর দেখা যায় না। আধুনিক যোগাযোগের গোগ্রাসে পালকি হারিয়ে যাচ্ছে বিস্মৃতির অতল তলে প্রাচীন বাংলার এ বাহনটি। আসলে পালকি নামটির উৎপত্তি ফারসি ও সংস্কৃত – উভয় ইন্দোভারতীয় ভাষা থেকে আর সেই সাথে ফরাসি থেকেও। সংস্কৃতে পলাঙ্কিকা। 


পল্লীকবি জসিমউদ্দীন তাঁর স্মৃতিকথায় এ গাঁও থেকে ওগাঁওয়ে যাওয়া বেহারাদের পালকি নিয়ে চলার যে বিবরণ দিয়েছেন তা আমাদের আবহমান বাংলার ঐতিহ্যের অংশ। বিলুপ্ত প্রায় এ পালকি এখন নানা জাদুঘরে শোভা পাচ্ছে।

এককালে নদীনালা কম এরকম কিছু জেলা যেমন যশোর, খুলনা, সাতক্ষীরা, নড়াইল, ঝিনাইদহ, মাগুরা, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, ফরিদপুর, মাদারিপুরসহ বিভিন্ন জেলায় ৫০’ -৬০’-এ দশকেও অনেক পালকি চোখে পড়তো। বিশেষ করে বিয়ে বাড়িতে নব বরবধূ আনা নেয়ায় পালকি ব্যবহার করা হতো। চক্রযানের বিপ্লবে পালকির জায়গা করে নেয় ছৈওয়াল নকশী গরু গাড়ি। আর আধুনিকোত্তর এই যুগে জায়াগা দখল করে নিয়েছে প্রাইভেটকার ও মাইক্রোবাস। হালে লাঙ্গল যেমন গ্রামেও অচল তেমনি ধনী-গরিব নির্বিশেষে সকলে নানা অনুষ্ঠানে ব্যবহার করছে কার আর মাইক্রোবাস। এ যানের রমরমা ব্যবসাও একই কারণে জমে উঠেছে। 

ছড়ায় বলা হয়েছে বউ সাজবে কালকি, চড়বে সোনার পালকি! না সোনার বরনীকন্যা এখন আর পালকির বদ্ধ পরিবেশে যাবে না, উঠবে আসল বা নকল ফুলে সাজানো ফুলেল এয়ারকন্ডিশন্ড কারে।

 
Support : Dhumketo ধূমকেতু | NewsCtg.Com | KUTUBDIA @ কুতুবদিয়া | eBlog
Copyright © 2013. Edu2News - All Rights Reserved
Template Created by Nejam Kutubi Published by Darianagar Publications
Proudly powered by Dhumketo ধূমকেতু