বিলুপ্তপ্রায় গ্রামীণ ঐহিত্য ঢেঁকি ।। জহির রহমান

Saturday, July 16, 2011



বর্তমান যান্ত্রিক যুগ। আধুনিকতার যুগ। কর্মব্যস্ত মানুষের ব্যস্ততা যেমন বেড়েছে তেমনি যে কোন কাজ স্বল্প সময়ে স্বল্প শ্রমে দ্রুত সম্পন্ন করতে পারলেই মানুষ হাফ ছেড়ে বাঁচে। আধুনিক ও নতুন নতুন প্রযুক্তির কল্যাণে মানুষ অতীতের ঐতিহ্যবাহী অনেক অনেক জিনিসপত্রের ব্যবহার বা কর্মকান্ড যা তাদের জীবনাচারের সাথে ছিল অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত তা পরিত্যাগ করেছে কিংবা পরিত্যাগ করতে বাধ্য হচ্ছে।

এজন্য কাউকে দোষারোপ করে লাভ নেই বরং যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে এবং সময় বাঁচাতে অতীতের অনেক কিছুই পরিত্যাগ করতে হয় এবং নিত্য নতুন অনেক কিছু সে জায়গা পুরণ করে নেয়ায় অতীত হয়ে যায় ইতিহাসের অংশ। কিন্তু আমাদের অতীত ঐতিহ্য ভুলে গেলে চলবেনা। জানা এবং পরবর্তী প্রজন্মকেও জানানো প্রয়োজন। অতীতকে জেনেই ভবিষ্যত কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করলে সুফল লাভ হয় সহজ। আমাদের অতীত ইতিহাস ঐতিহ্য সমাজ সংস্কৃতি ইত্যাদি যাতে ভুলে না যাই সচেতন মহলের সেদিকে নজর দেয়া অবশ্যই প্রয়োজন। চিরায়ত বাংলার হারিয়ে যাওয়া সেই ইতিহাস ঐতিহ্যেরই একটি অংশ হচ্ছে আমাদের অতীতের বহুল ব্যবহৃত নিত্যপ্রয়োজনীয় সমাজ সংস্কৃতির অংশ হল ঢেঁকি’র ব্যবহার।

আগেকার যুগে প্রায় প্রত্যেকটি বাড়িতেই ধান বানার জন্য ঢেঁকি থাকত। বর্তমানে নিতান্ত অজো পাড়াগাঁয়ের কোথাও কোথাও হয়ত ঢেঁকি থাকতেও পারে তবে, এসবের ব্যবহার প্রায় নেই বললেই চলে। ঢেঁকিছাটা চাউলের কদর এখনও কমেনি কারণ এ চাউলের ভাতের মজাই আলাদা। ঢেঁকিছাটা চাউলের উপরের আবরণ থাকে যাতে প্রচুর পরিমান ভিটামিন রয়েছে। ঢেঁকিছাটা চাউল পাওয়া যায় তবে এর দামও অন্যান্য চালের চেয়ে তুলনামুলকভাবে বেশি।

ঢেঁকি শিল্প গ্রাম বাংলার প্রাচীন গ্রামীন ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপুর্ণ অংশ। একসময় গ্রাম- গঞ্জসহ সর্বত্র ধান ভাঙ্গা, চাউল তৈরি, গুড়ি, চিড়া তৈরি, মশলাপাতি ভাঙ্গানো সহ বিভিন্ন কাজের জন্য ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হত চিরচেনা ঐতিহ্যবাহী ঢেঁকি। তখন এটা গ্রামীণ জীবন ও সংস্কৃতির সাথে জড়িত ছিল ওতপ্রোতভাবে। অনেকে কুটির শিল্প তথা পেশা হিসেবেও ঢেঁকিতে ধান বানতেন। ঢেঁকি চালাতে সাধারণত দুজন লোকের প্রয়োজন হয়। সাধারণত মহিলারাই চালাতেন তাদের সাধের ঢেঁকি। এক প্রান্তে উঠে সর্বশক্তি প্রয়োগ করে পা দিয়ে চাপ দিতে হয় আবার ছাড়তে হয়। অপরজন নির্দিষ্ট গর্তে যেখানে মলার আঘাতে চাউল থেকে ধান বের হয় সেখানে সতর্কতার সাথে ধান দিতে হয় আবার প্রতি আঘাতের পর পর ধান নড়াচড়া করে উল্টে পাল্টে দিতে হয় যাতে সবগুলোতে আঘাত লাগে। শেষ হলে বা গর্ত পরিপূর্ণ হয়ে গেলে এগুলো তুলে আবার নতুন ধান দিতে হয়। মহিলারা ধান বানার ফাঁকে ফাঁকে আঞ্চলিক গীত পরিবেশন করতেন মনের আনন্দে একক বা যৌথ কন্ঠে।

আমাদের দেশে সত্তরের দশকে সর্বপ্রথম রাইসমিল বা যান্ত্রিক ধান থেকে চাল বের করার কল বা মেশিন এর প্রচলন শুরু হয়। তখন থেকেই ঢেঁকির প্রয়োজনীয়তা ক্রমান্বয়ে হ্রাস পেতে থাকে। একসময় সারাদেশে বার মাসে তের পার্বণ পালিত হত। গ্রামে গঞ্জে একটার পর একটা উৎসব লেগেই থাকত। হেমন্ত উৎসব, পৌষ পার্বণ, বসন্ত উৎসব, নববর্ষ, বিবাহ উৎসব, কনের বাড়ীতে আম কাঠঁল প্রদানের সময় হাতের তৈরী রুটি পিঠা তৈরির উৎসব, হিন্দুদের পূজা, মেলাসহ হরেক রকমের অনুষ্ঠানের আয়োজন হত বা এখনও হচ্ছে। এসব উৎসবে পিঠা পায়েস সন্দেস ইত্যাদি তৈরির ধুম পড়ে যেত। আর এসব তৈরীর মূল উপকরণ হচ্ছে চালের গুড়ি। চালের গুড়ি তৈরীর জন্য অতীতে ঢেঁকির আশ্রয় নেয়া হত। ঈদ বা উৎসবের সময় ঘনীভুত হয়ে এলে প্রত্যেক বাড়ীতেই ঢেঁকির ছন্দময় শব্দ শুনেই আন্দাজ করা যেত ঈদ বা উৎসব এসেছে। গ্রাম বাংলার শৌখিন মহিলারা চালের গুড়ি দিয়ে চুই পিঠা, চিতল পিঠা, রুটি পিঠা, তালের পিঠা, সমছা সহ তৈরী করতেন হরেক রকমের পিঠা। কিন্তু বর্তমান আধুনিক এ যান্ত্রিক যুগে বিভিন্ন অনুষ্ঠান উৎসবে আর অতীতের মতো জৌলুস নেই। উৎসবগুলো আজকাল প্রথা বা রেওয়াজ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

একটা সময় ছিল বড় গৃহস্থ বা কৃষকের ঘরে অবসর সময়ে বা রাতের অধিকাংশ সময়ই ঢেঁকিতে ধান বানার কাজ করতে হতো। ধান বানতে বানতে অনেক মহিলার হাতে ফসকা পড়ে যেত। গরিব মহিলারা বা গৃহ পরিচারিকারা এক আধসের চাল বা ধান পারিশ্রমিকের মাধ্যমে কেহবা শুধু পেটপুরে খাবার বিনিময়ে ধনিদের ঘরে চাল ভাঙার কাজে নিয়োজিত থাকতো। যে গৃহস্থ যতো বেশি ধান বা চাউল উৎপাদন করে বিক্রয় করতে পারতেন তিনিই এলাকায় ততো বড়ো ধনী হিসেবেই খ্যাতি অর্জন করতেন। তাই বড়ো বড়ো গৃহস্থের বাড়ীতে ঢেঁকিতে ধান বানার আওয়াজ তথা ঢেকুর ঢেকুর শব্দ শুনা যেত হরদম।

কালের বিবর্তনে হারিয়ে যেতে বসেছে ঢেঁকির ছন্দময় শব্দ। এখন শুধু চাল নয় মশলাপাতিও মেশিনের মাধ্যমে ভাঙ্গানো হয়। পাটা পুতাইলের ঘষায় যে মরিছ পিষা হতো তাও এখন বিলুপ্ত প্রায়। মহিলাদের আরামের পরিধি বেড়েছে। বেড়েছে আধুনিকতা ও আধুনিক যান্ত্রিক জীবন যাপন। গ্রামের দু-এক বাড়ীতে ঁেঢকির অস্তিত্ব থাকলেও এর ব্যবহার নেই বললেই চলে। আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম হয়তো যাদুঘরে গিয়ে জানতে হবে ঢেঁকি কী জিনিস এবং এর মাধ্যমে কোন ধরনের কাজ করা হতো।

গ্রাম বাংলার হারানো ঐতিহ্য : গরুর গাড়ি ।। জহির রহমান

Saturday, June 4, 2011

ওকি গাড়িয়াল ভাই
কত রব আমি পন্থের দিকে চাহিয়ারে...
যে দিন গাড়িয়াল উজান যায়,
নারীর মন মোর ঝুরিয়া রয় রে।
ওকি গাড়িয়াল ভাই
হাকা গাড়ি চিলমারীর বন্দরে রে...

দূর থেকে বাতাসে ভেসে আসছে গান। কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে কে গাচ্ছে এ গান! কে আবার? গাড়োয়ান ভাই। গাড়োয়ান ভাই গরুর গাড়ি চালায়। ছুটে চলে দূর-দূরান্তে, গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে। মাল নিয়ে ছুটে চলে বন্দর থেকে বন্দরে, এক গঞ্জ থেকে আরেক গঞ্জে। দূরের যাত্রাপথে সুরেলা কণ্ঠে ভাওয়াইয়া গান ধরে গাড়োয়ান ভাই।


বাতাসে গাড়ি চলার কোঁ-ওঁ-ওঁ-ওঁ শব্দ ভেসে আসছে। বেড়ার ফাঁকে দাঁড়িয়ে দেখে বাড়ির বউ। তাই তো গরুর গাড়িই যাচ্ছে! পর্দার ফাঁকে দেখা যাচ্ছে বড় বাড়ির বউ। নিশ্চয়ই নাইওর যাচ্ছে বাপের বাড়ি। ছোট ছোট ছেলেপুলেরা গরুর গাড়ির পেছন পেছন ছুটে চলছে। গরুর গাড়ি বাতাসে ছড়িয়ে দিচ্ছে কোঁ-ওঁ-ওঁ-ওঁ আওয়াজ।

পল্লী বধূরা মাথার গোমটা পরিয়ে মিষ্টি হেসে ঘরের জানালায় দাঁড়িয়ে মনে নানা পরিকল্পনার চিত্র আঁকে। এখন সবকিছু স্মৃতি। বাস্তবের সলিল সমাধি হয়ে গেছে সেই বহুকাল আগে থেকে।

শত বছর আগের এমনই ছিল গ্রাম বাংলার অবস্থা। যেখানে নৌকা চলত না, গরুর গাড়িই ছিল সেখানকার একমাত্র যানবাহন। গঞ্জ, নদী-বন্দর, ছোট শহর, হাট-বাজার সব জায়গায় সচল ছিল গরুর গাড়ি। মালপত্র আনা নেওয়া হতো গরুর গাড়িতে। অভিজাত পরিবারের সদস্যরা যাতায়াত করতো গরুর গাড়িতে। আত্মীয়ের বাড়ি বেড়াতে যেত গরুর গাড়ি চড়েই। বাড়ির বাইরে গরুর গাড়ির আওয়াজ শুনেই বোঝা যেত অতিথি এসেছে। গরুর গাড়ি এসেছে যখন তখন নিশ্চয়ই এসেছে কোনো বিশেষ অতিথি!
গরুর গাড়ি সম্পূর্ণরূপে আমাদের দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি। আমাদের দেশের বাঁশ, কাঠ ব্যবহার করা হয় গরুর গাড়ি তৈরিতে। গরুর গাড়িতে খুব বড় বড় দুইটি চাকা থাকে। চাকা দুইটি কাঠের তৈরি। কাঠের চাকায় পুরানো থাকে লোহার রিং। তার উপর আবার রবারের টায়ারও পরনো হয়। কাঠের চাকায় খোদাই করে নানান নকশা করা হয়।
কাঠমিস্ত্রি ও কামারের যৌথ চেষ্টায় গরুর গাড়ির চাকা তৈরি হয়। গরুর গাড়িও পল্লীবাংলার এক ধরনের লোকশিল্প; কুটির শিল্পও বটে। গরুর গাড়ির চাকা তৈরি করে এক বিশেষ শ্রেণীর কারিগর। চাকা কিনে নিয়ে মূলত গায়ের মিস্ত্রি বা লোকেরা নিজেরাই গরুর গাড়ি তৈরি করেন। গরুর গাড়ি মূলত বাঁশের তৈরি। তবে কোনো কোনো অংশ যেমন- চাকা তৈরি হয় বাবলা কাঠ দিয়ে। চাকার কেন্দ্রস্থলে বিয়ারিং থাকে। দুটি চাকা একটা দণ্ড দিয়ে যুক্ত করা হয়। এর উপরেই থাকে গরুর গাড়ির সব ভার। চালির মতো বাঁশের তৈরি অংশকে বলে চালি। চালির পেছন দিক চওড়া, সামনের দিক চাপা। পুরো চালির দু'পাশে থাকে মজবুত দুটি বাঁশের দণ্ড। সামনে এ দুটি দণ্ড একটি চণ্ডি কাঠ দিয়ে যুক্ত থাকে, যাকে জোয়াল বলে। চণ্ডি কাঠের সামনে থাকে  বিষখিলি, জোয়াল ও কানখিল। জোয়াল গরুর কাঁধে তুলে দেওয়া হয়। দু'পাশে দুটি গরু জোয়াল কাঁধে গাড়ি টেনে চলে। যাত্রীবহনের গাড়িতে নৌকার মতো ছই থাকে। ছইয়ের ভেতরে চালির ওপর পাটি বা বিছানা পেতে যাত্রীরা বসে থাকে।

গাড়িতে ব্যবহৃত গরুর পায়ের খুরে দেয়া হয় এক ধরনের লোহার পাট্টা। পাট্টা লাগিয়ে দেয়ার দুইটি কারণ রয়েছে। এক-গরুর পায়ের খুরে লোহার পাট্টা লাগিয়ে দেয়ার কারণে গরু রাস্তায় চলাচলে গায়ে শক্তি পায়। এ পাট্টার কারণে পা রাস্তায় তেমন একটা সিলিপ করে না। দুই, পায়ে পাট্টা লাগানোর কারণে গরুর পায়ের খুর ক্ষয় হয় না। স্থায়ীভাবে পাট্টা লাগানোর ব্যবস্থা নেই বলে ৪/৫ দিন পর পর গরুর পায়ের খুরে পাট্টা লাগিয়ে দিতে হয়। একটি গরুর গাড়িতে পায় দুই টন মালামাল বহন করা যায়।
এখন যন্ত্রচালিত যানবাহনের যুগ। মালামাল বহনের জন্য রয়েছে ট্রাক, লরি, মালগাড়ি। মানুষের যাতায়াতের জন্য রয়েছে মোটরগাড়ি, রেলগাড়ি, বেবী ট্যাক্সি, রিকশা ইত্যাদি। মানুষ এখন খুব একটা প্রয়োজন না হলে গরুর গাড়ি ব্যবহার করে না। আধুনিক যানবাহনের ভিড়ে গরুর গাড়ি অনেকটা হারিয়ে গেছে। তারপরও মিটিমিটি করে এর অস্তিত্ব টিকে আছে।
গরুর গাড়ির একটি সুবিধা হলো এতে কোনো জ্বালানি লাগে না। ধোঁয়া হয় না। পরিবেশের কোনো ক্ষতি করে না। এটি খুবই পরিবেশ সহায়ক একটি যানবাহন।
রহিম মিয়া একজন সৌখিন গরুর গাড়ির মালিক। গ্রামীণ আবহে সে গরুর গাড়ি চালাতো। মনের অদম্য সাহস এবং উপস্থিত বুদ্ধিমত্তার জোরে রহিম মিয়া তার গাড়ির গরুগুলোকে আগলে রাখতো। গরুর ঘাড়ে যখন গাড়ির জোয়াল চাপিয়ে রহিম মিয়া তার গরুর গাড়ি নিয়ে ছুটে চলতেন তড়িৎ গতিতে। নানা ধরণের মালামাল বহনে তার গাড়ির তুলনা ছিলো না। স্থানীয় মানুষজন তাকে রহিম মিয়াকে আগেই বলে রাখতো মাল বহনের জন্য। সততা এবং সাহসের জোরে রহিম মিয়া সবার কাছে ছিল প্রিয় ব্যক্তি। চিরন্তন সত্য মৃত্যু তাকেও একদিন নিয়ে যায় না ফেরার দেশে। আজ রহিম মিয়া নেই, নেই তার বাহারি গরুর গাড়িও।

ঐতিহ্যের ধারকবাহক এই গরুর গাড়ি একদিন বইয়ের পাতায় জায়গা করে নেবে। বর্তমান প্রজন্মের কেউ গরুর গাড়ি চিনবে না।
গরুর গাড়ি ঐতিহ্যেরই একটা অংশ। গ্রামীণ পরিবেশে গরুর গাড়ির প্রচলন থাকলেও বর্তমানে তেমন একটা চোখে পড়ে না। ইতিহাস-ঐতিহ্যের অনেক কিছু আমরা ক্রমান্বয়ে হারাচ্ছি। কালের গতিধারায় উন্নয়নের গতি থেমে নেই। আমাদের জীবন থেকে হারাচ্ছে এরকম নানা ঐতিহ্য। পরিকল্পনা অনুসারে মোকাবেলা করা গেলে কিছুটা হয়তো রক্ষা পেতো। এজন্য দরকার সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে সফল উদ্যোগ গ্রহণ এবং  তা বাস্তবায়ন। এভাবে করা গেলে গণ-হারে ঐতিহ্য ধ্বংস না-ও হতে পারতো।


জহির রহমান এর দুটি ছড়া

      বিড়াল ছানা

সেদিন রাতে         বিড়াল ছানা
নষ্ট করে             রিমুর খানা
তাইন দেখে          বেজায় রাগে
ছুটল নীরব         ঝড়ের বেগে
খবর পেয়ে          রিমুর মামা
চললো সোজা        রায়পুর থানা
নীরবও যায়        পিছে পিছে
বিড়াল ছানা        আস্ত মিছে।


       
      বর্ষার বৃষ্টি

বর্ষার বৃষ্টি        আল্লাহর সৃষ্টি
খাল বিল ছৈছৈ   শিশুরা করে হৈছে
আকাশ জুড়ে     মেঘের খেলা
দেখতে দেখতে     কাটবে বেলা
রিমঝিম বৃষ্টি     কিদারুন মিষ্টি
বৃষ্টি পড়ে         টাপুর টুপুর
মন হারায়       সকাল দুপুর।

গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য : হারিয়ে যাচ্ছে পালকি ।। জহির রহমান

Saturday, April 30, 2011

চিরায়ত গ্রামবাংলার ঐতিহ্যের ধারক পালকি আর চোখে পড়ছে না। পালকিও কোন কোন খানদানি বাড়িতে অচল হয়ে পড়ে আছে। কিংবা মিউজিয়াম পিস হয়ে কালের স্থানু সাক্ষী হয়ে আছে জাদুঘরে। বেহারাদের সুর করে সেই কিনু গোয়ালার গলি ঘুরে মাঠ প্রান্তর পেরিয়ে গন্তব্যের কাছে দূর থেকে সেই ছয় বেহারাদের আর দেখা যাচ্ছে না। তাদের ছন্দিত লয়ে হাঁটার সাথে সাথে এ গাঁও থেকে ওগাঁয়ে নাইয়র, বিয়ের কনে-বর কিংবা মান্যগণ্য ব্যক্তিদের নিয়ে যাওয়ার এ চক্রবিহীন যান সম্ভবত তার অন্তিম প্রহর গুনছে।

ছন্দের জাদুকর সত্যেন্দ্র নাথ দত্তের ভাষায়, রবীন্দ্রনাথের কবিতায়, হেমন্তের গানে কিংবা ভূপেন হাজারিকার মাদল মাদক তানে চলা পালকি এখন ঐতিহ্যের খাতায় নাম লেখাচ্ছে। সেই ন্যাংটা পুঁটো ছেলেটা আর বলে না পালকি চলে, পালকি চলে ঃ আদুল গায়ে যাচ্ছে কারা — যাচ্ছে কারা হনহনিয়ে।
রবি ঠাকুরের ’বীরপুরুষ’ কবিতার খোকা তার মাকে পালকিতে নিয়ে যাওয়ার সময় লড়ে না ডাকাতের সাথে যখন ওরা আসে তেড়ে ‘হারে রে রে’ বলে। সেই ভীষণ যুদ্ধের বর্ণনাও দিতে পারে না মাকে। মাও বলতে পারেন না , ভাগ্যে খোকা ছিল তাঁর সাথে। দাদা তার সদ্য বিয়ে হওয়া দিদিটিকে আর বলে না, এ কটা দিন থাক না দিদি , কেঁদে কেটে কঁকিয়ে, দুদিন বাদে তো নিয়েই যাবে পালকি করে সাজিয়ে। ‘মৈমনসিং গীতিকার’ দেওয়ানা মদিনাও ছুটবে না পালকিতে আবের পাংখা নিয়ে আর।

পালকি বহরের আর সেই পরিচিত দৃশ্য এখন আর দেখা যায় না। আধুনিক যোগাযোগের গোগ্রাসে পালকি হারিয়ে যাচ্ছে বিস্মৃতির অতল তলে প্রাচীন বাংলার এ বাহনটি। আসলে পালকি নামটির উৎপত্তি ফারসি ও সংস্কৃত – উভয় ইন্দোভারতীয় ভাষা থেকে আর সেই সাথে ফরাসি থেকেও। সংস্কৃতে পলাঙ্কিকা। 


পল্লীকবি জসিমউদ্দীন তাঁর স্মৃতিকথায় এ গাঁও থেকে ওগাঁওয়ে যাওয়া বেহারাদের পালকি নিয়ে চলার যে বিবরণ দিয়েছেন তা আমাদের আবহমান বাংলার ঐতিহ্যের অংশ। বিলুপ্ত প্রায় এ পালকি এখন নানা জাদুঘরে শোভা পাচ্ছে।

এককালে নদীনালা কম এরকম কিছু জেলা যেমন যশোর, খুলনা, সাতক্ষীরা, নড়াইল, ঝিনাইদহ, মাগুরা, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, ফরিদপুর, মাদারিপুরসহ বিভিন্ন জেলায় ৫০’ -৬০’-এ দশকেও অনেক পালকি চোখে পড়তো। বিশেষ করে বিয়ে বাড়িতে নব বরবধূ আনা নেয়ায় পালকি ব্যবহার করা হতো। চক্রযানের বিপ্লবে পালকির জায়গা করে নেয় ছৈওয়াল নকশী গরু গাড়ি। আর আধুনিকোত্তর এই যুগে জায়াগা দখল করে নিয়েছে প্রাইভেটকার ও মাইক্রোবাস। হালে লাঙ্গল যেমন গ্রামেও অচল তেমনি ধনী-গরিব নির্বিশেষে সকলে নানা অনুষ্ঠানে ব্যবহার করছে কার আর মাইক্রোবাস। এ যানের রমরমা ব্যবসাও একই কারণে জমে উঠেছে। 

ছড়ায় বলা হয়েছে বউ সাজবে কালকি, চড়বে সোনার পালকি! না সোনার বরনীকন্যা এখন আর পালকির বদ্ধ পরিবেশে যাবে না, উঠবে আসল বা নকল ফুলে সাজানো ফুলেল এয়ারকন্ডিশন্ড কারে।

ছেলে বেলার গল্প ।। জহির রহমান

Tuesday, April 19, 2011

ছেলে বেলার ছবি গুলি
ভেসে উঠে নয়নে,
মনের মাঝে লুকিয়ে ছিল
কত কি যে গোপনে !
অ আ পড়া আর
দুষ্টুমি রত,
ঝগড়া ফ্যাসাদ করে কত
সময় করেছি যে ক্ষত !
কোথা গেল সেসব
সোনালী দিন,
তা তা তৈ থৈ থৈ
তাধিন তাধিন।

কানামাছি ভৌঁ ভৌঁ
আরও কত খেলা,
খেলা আর ম্যালার মাঝে
কাটিয়ে দিতাম বেলা;
স্কুল পালানো আর ঘুড়ি উড়ানো
এসব কথা বাজে এখন
বহুত আগের পুরনো।

এমন দিন বুঝি
ফিরিবে না আর;
খেলা শেষে ফিরে যেতাম
বাড়ি বাড়ি যার।

পহেলা বৈশাখ ।। জহির রহমান

সে অনেক আগের কথা,
কয়েক পুরুষ আগের কথা। আমাদের পূর্ব পুরুষেরা যা কিছু দেখতেন, সম্মোহিত হতেন, সবকিছুর সম্মানের কাছে, সব কিছূর শক্তির কাছে তারা নিজেদেরকে নিতান্ত ক্ষুদ্র মনে করতেন। সাপ-বিচ্ছু থেকে শুরু করে বস্তুজগতের এমন কোন শক্তি কিংবা প্রাণের অস্তিত্ব ছিল না যা মানুষের পূজার সামগ্রীতে পরিণত হয় নি। আমাদের পূর্বপুরুষেরা মানুষের ভেতর সৃষ্টিকরে রেখেছিল শ্রেণীভেদ, একের স্পর্শে অন্যের পবিত্রতা নষ্ট হতো, একের উপস্থিতিতে অন্যের আসবাবপত্র, বাসন কোসন সবকিছু অপবিত্র হতো। তখনকার সমাজে ইশ্বরের বানীও ছিল গুটিকয়েক মানুষের সম্পত্তি, ইশ্বরের বানী শোনার অধিকার ছিল সংরক্ষিত। তাই তো কারো কানে ইশ্বরের বানী ভুলেও পৌঁছুলে তাকে গুনতে হতো চরম মাশুল, গলিত সীসায় বন্ধ করে দেয়া হতো তার কান ।
সে সময়ে,
আরবে এক জোতির্ময় পুরুষ এলেন, যিনি শেখালেন মানুষের প্রকৃত পরিচয়। আর দশটা জীবের মতো মানুষও সাধারণ কোন প্রানী নয় বরং মানুষের পরিচয় হলো মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব, আশরাফুল মাখলুকাত। তিনি এসে শোনালেন সাম্যের গান। মানুষে মানুষে নেই কোন ভেদাভেদ, সবাই এক আল্লাহরই বান্দা, তিনি শেখালেন ।
তার আগমনে বিশ্বের কোনে কোনে পরে সাড়া, সে সত্যের স্রোতধারা এক সময় আরব সাগর পারি দিয়ে ভাসিয়ে দেয় বাংলাদেশ। মানুষের তৈরী শ্রেণী বৈষম্যের দেয়াল এতদিন যাদের ইতরের চেয়ে নিম্নস্তরের জানোয়ার বানিয়ে রেখেছিল, সেই মহাপুরুষের অনুসারীদের ভালোবাসায় নিমিষেই ভেঙ্গেপড়ে দাসত্বের শৃংখল। বাংলাদেশের লাঞ্ছিত, সুবিধা বঞ্চিত, নীচু জাতের মানুষেরা দলে দলে শামিল হলেন ইসলামে, ইতর প্রাণী থেকে উঠে এলেন মানুষের কাতারে।

হ্যা, তখন আমাদের সংস্কৃতি ছিল, সে সংস্কৃতি ছিল পূজোর সংস্কৃতি। গাছ, মাটি, পাথর, সূর্য, চন্দ্র, তারা সবকিছুর পুজোয় জড়িয়ে ছিল আমাদের সংস্কৃতি। কৃষি কাজে পুজো, ফসল তুলতে পুজো, নতুন অন্নে পুজো, সবকিছুতেই পুজোর ছড়াছড়ি। সে সংস্কৃতিকে ছুড়ে ফেলে দিয়ে সকল শক্তি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে একমাত্র আল্লাহর দাসত্ব মেনে নিয়েছিলেন পূর্বপুরুষেরা।  গ্রহণ করেছিলেন ইসলাম, হয়ে ছিলেন মুসলমান, হয়েছিলেন পুতপবিত্র মানুষ।

আজ এতো বছর পরে কেউ কেউ আবার ফিরে পেতে চায় সেই পতিত সংস্কৃতি, যাকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন সবাই। ফিরে পেতে চান সেই সংস্কৃতিকে যে সংস্কৃতির প্রতিটি নিয়মে ছিল পৌত্তলিকতার গন্ধ। তাইতো আজ বাঙ্গালী সংস্কৃতির নামে পৌত্তলিকতাকে ফিরিয়ে আনায় অবিরাম প্রচেষ্টা। একটি ভাষাকে কেন্দ্র করে সংস্কৃতি জন্মাতে পারে, তবে বাংলার কোন স্বতন্ত্র সংস্কৃৃতি নেই, বাঙ্গালী সংস্কৃতি নামে পুরোটাই হিন্দু ধর্মীয় সংস্কৃতি। পহেলা বৈশাখের  নামে এখানে বাংলা সনের শুরুর দিনের একটা রঙচঙা উৎসব হয় বটে, বলা হয় ওটা সার্বজনীন উৎসব, অথচ ইতিহাস ভিন্ন কথা বলে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশদের বিজয় কামনা করে ১৯১৭ সালের পহেলা বৈশাখে হোম কীর্ত্তণ ও পূজোর মাধ্যমে শুরু হয় আধুনিক পহেলা বৈশাখের মঙ্গলযাত্রা। পহেলা বৈশাখে হালখাতা পূজা নামে হিন্দুদের আলাদা উৎসব রয়েছে, রয়েছে চৈত্রসংক্রান্তি, শিবপূজা, রয়েছে লোমহর্ষক চরক পূজা।  বাংলা সনের প্রতিটি পার্বনই হিন্দু ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানসর্বস্ব। পৌষ সংক্রান্তি , পৌষ পার্বণ এর সবগুলোই হিন্দুধর্মীয় সংস্কৃতি।

যারা মুসলমান তারা একবারও তলিয়ে দেখে না যে ওটা তাদের সংস্কৃতির অংশ নয়, এমনকি বাঙ্গালী সংস্কৃতিও নয়। কেউ যদি বাঙ্গালী সংস্কৃতির নামে হালখাতা পূজো শুরু করতে চায়, হোম কীর্ত্তণ করতে চায়, চৈত্র সংক্রান্তির শিবপূজা করতে চায়, পৌষ পার্বণের নামে দেবতার নামে পিঠে উৎসর্গ করতে চায় তবে সেতো সেই পৌত্তলিকতাকেই গ্রহণ করলো। ইদানিং কট্টর মুসলিমরাও রমনার পার্কে আলাদা ভাবে বর্ষবরণ অনুষ্ঠান করে। হিন্দুদের অনুষ্ঠানের চাকচিক্য দেখে এরা এতটাই বিভ্রান্ত যে, যে কোন মূল্যে পৌত্তলিকতাকে ইসলামের নামে গ্রহণ করে জোড়াতালি দিয়ে মুসলমানিত্ব টিকিয়ে রাখতে চায়। এরা মহররমে রথ যাত্রার মতো তাজিয়া মিছিল করে, মঙ্গলযাত্রা করে, হিন্দুরা যেমন দেবতার পায়ের কাছে মঙ্গলপ্রদীপ জ্বালে, এরাও তেমনি মঙ্গলপ্রদীপ জ্বেলে বর্ষবরণ করে।

একজন হিন্দু পূজো করবে এটাই স্বাভাবিক। তার ধর্মের প্রতি তার শ্রদ্ধা আছে, ভালোবাসা আছে, তার ধর্মকেই সে শ্রেষ্ঠ মনে করে বলেই পালন করে ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান। তাই বলে তার ধর্ম-কর্মের জৌলুশ দেখে মুসলমানরাও যদি বিভ্রান্ত হয়, যে কোন মূল্যে সেসব অনুষ্ঠানকে সার্বজনীন অনুষ্ঠান নাম দিয়ে পালন করে, তবে তাতে কেবল ইসলামী সংস্কৃতি সম্পর্কে তার অজ্ঞতাই প্রকাশ পায়। সার্বজনীন নাম দিলেই যদি সব কিছু জায়েজ হয়ে যায় তবে নাম সর্বস্ব মুসলমানেরা সার্বজনীন দূর্গাপূজাই বা বাদ রাখে কেন, নাকি ওখানেও ওরা ধুপকাঠি নেড়ে নেড়ে ঠিকই আরতী দিয়ে আসে?

অথচ ইসলামের স্বতন্ত্র সংস্কৃতি রয়েছে। এ সংস্কৃতি সব ধরণের শেরক ও বেদায়াত থেকে মুক্ত। আমরা বাঙ্গলা ভাষাভাষীরা ইসলাম গ্রহণ করে মুসলমান হয়েছি, আরব হই নি, আরব ভাষাকে মাতৃভাষা বলে গ্রহণ করিনি, তাহলে বুঝা যায় ভাষা সংস্কৃতির প্রধান কোন বিষয় নয়। বাংলাদেশে ইসলামের আগমনের পূর্বে যে সংস্কৃতি ছিল তা ছিল পৌত্তলিক সংস্কৃতি, হিন্দু সংস্কৃতি, বাঙ্গালী সংস্কৃতি নয়। ঠিক তেমনি মুসলমানদের আছে ইসলামী সংস্কৃতি, শেরক বিদয়াত মুক্ত সংস্কৃতি, আরবীয় সংস্কৃতি নয়। আমাদের সংস্কৃতি ভাষা কেন্দ্রিক নয়, তাওহীদভিত্তিক।

তাই যারা বাংলা ভাষা ও ইসলামপূর্ব এ দেশীয় পৌত্তলিক সংস্কৃতিকে গুলিয়ে ফেলেন তাদের একবার ভেবে দেখা উচিত, যে সংস্কৃতি মানুষকে মানবীয় গুণগুলো বিসর্জন দেয়া শেখায়, মানুষে মানুষে শ্রেণীভেদ সৃষ্টি করে, যে সংস্কৃতিতে ইশ্বর গুটিকয়েক লোকের সম্পত্তি হয়ে যায় সে সংস্কৃতিকে বাঙ্গালী সংস্কৃতির নামে আমরা আবার কেন গ্রহণ করবো? ইসলামী সংস্কৃতি যদি ব্যর্থ হয়ে যায়, ইসলামী সংস্কৃতি যদি পৌত্তলিক সংস্কৃতির চেয়ে নিম্নমানের প্রতীয়মান হয় তবে ফিরে যাওয়ার সুযোগ ছিল। অথচ বিশ্বের প্রতিটি জ্ঞানীব্যক্তি মাত্রই জানেন ইসলামের চেয়ে সফল আদর্শ আজো পৃথিবীর কোথাও সৃষ্টি হয় নি। তাহলে একটি সর্বশ্রেষ্ঠ সংস্কৃতিকে বিসর্জন দিয়ে আস্তাকুড়ে ফেলে দেয়া সংস্কৃতিকে আবার বুকে তুলে নেয়া কতটুকু যৌক্তিক একবার কি তা ভাবা উচিত নয়?


লেখক : সম্পাদক, মাসিক কিশোর সাহিত্য
 
Support : Dhumketo ধূমকেতু | NewsCtg.Com | KUTUBDIA @ কুতুবদিয়া | eBlog
Copyright © 2013. Edu2News - All Rights Reserved
Template Created by Nejam Kutubi Published by Darianagar Publications
Proudly powered by Dhumketo ধূমকেতু