ভালোবাসার স্ট্যাটাস by আনিসুল হক

Tuesday, February 11, 2014

ভালোবাসা কি এখন এসে ঠেকল এক দিনের ব্যাপারে? ভালোবাসার স্ট্যাটাস কি এখন পরিণত হয়েছে ফেসবুকের স্ট্যাটাসে? জানা যাক সাহিত্যিক আনিসুল হকের লেখায়। সেই সঙ্গে রইল তাঁর দেওয়া ভালোবাসার কিছু নমুনা স্ট্যাটাস।

‘আমি বললাম, ‘ফুল।’ তুমি বললে, ‘ও তো কাগজের।’ আমি বললাম, ‘তবু তো ফুল। লোকটা তো কাগজ দিয়ে বন্দুকও বানাতে পারত।’ কবি সমুদ্র গুপ্তর কবিতা, স্মৃতি থেকে আওড়াতে হচ্ছে।
ভালোবাসা জিনিসটা কি এখন এসে ঠেকল এক দিনের ব্যাপারে? ১৪ ফেব্রুয়ারিতেই শুধু ভালোবাসা হবে। বাকি ৩৬৪ দিন কি তবে মন্দবাসা?
পণ্যবাদী সময়ে বাস করছি আমরা, বিপণিবিতানগুলোয় থরে থরে সাজানো নানা পণ্য, ওসব বিক্রি করতে তো হবে। তাই চাই দিবস! বাবা দিবস, মা দিবস, বন্ধু দিবস, শিক্ষক দিবস। পশ্চিমের দেশগুলোয় এসব দিবসের আগে মার্কেটগুলো সাজানো থাকে উদ্দেশ্যমূলক পণ্যে, বাবাকে কী দেবেন, মাকেই বা কী, তা ওরাই ভেবে রেখেছে, কী বলবেন, সেটা আগেভাগেই রেখেছে লিখে। পয়সা দিলে সেসব আপনার বাবা, মা, বন্ধু, প্রেমিকা, শিক্ষকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্বও ওদেরই।

তবু ভালো যে একটা দিন ভালোবাসা দিবস পালন করা হচ্ছে। ওরা তো ঘৃণা দিবসও পালন করতে পারত।
এই জগৎ চলছেই ভালোবাসার টানে, নীল আকাশ, অগণন নক্ষত্র, চাঁদের আলো, সবুজ পাতা, রঙিন ফুলে ভালোবাসাই প্রকাশিত হচ্ছে দিবস-রজনী। তবু এই নিখিল ভালোবাসা এখন কি এসে আশ্রয় নিল মুঠোফোনে, বুড়ো আঙুলে লিখে চলা এসএমএসে কিংবা স্ট্যাটাসে, আইপ্যাডে, ল্যাপটপে, ডেস্কটপের ১৪ ইঞ্চিতে! ভালোবাসার স্ট্যাটাস কি এখন পরিণত হয়েছে ফেসবুকের স্ট্যাটাসে?
নারী-পুরুষের মধ্যে কী যে এক দুর্নিবার টান, তার ব্যাখ্যারও কোনো শেষ নেই। কবিরা কবিতা লিখে, শিল্পীরা ছবি এঁকে, গায়কেরা গান গেয়ে, বিজ্ঞানীরা নিরীক্ষা করে কোটি কোটি পাতা লিখলেন। তবু কি ব্যাখ্যা পাওয়া গেল?
প্রেম বা ভালোবাসা জিনিসটা আসলে ব্যাখ্যা করার নয়। এমনকি প্রেম করারও নয়, এটা হয়ে যায়। সবারই জীবনে প্রেম আসে। প্রেম আসুক বা না আসুক, ভালোবাসাকে জগতের সবাই ভালোবাসে। তাই তো যেকোনো গানেই শুধু তুমি আর আমি... তুমি আর আমি ছাড়া নাকি গান হয় না, কবিতা হয় না, শিল্প-সাহিত্যের একটা বড় অংশ জুড়ে প্রেম ছিল, আছে, থাকবেও হয়তো।
ফেসবুকের স্ট্যাটাসের বড় অংশ জুড়ে তাই ভালোবাসা। আমার তরুণতর বন্ধুরা, সহকর্মীরা, ভ্রাতুষ্পুত্রীরা অর্ডার দিয়ে রেখেছে, আপনি প্রেমের কবিতা দেবেন স্ট্যাটাসে। আমরা সেটা শেয়ার করব। উৎসাহ পেয়ে লেগে যাই।
সকালবেলা লিখি:
বারান্দাতে অলকানন্দাগুচ্ছ,
জানান দিল এখনো তুমি ঘুমুচ্ছ।
আকাশে চাঁদ উঠেছে, পূর্ণিমায় ভেসে যাচ্ছে চরাচর। আমাকে বসে বসে স্ট্যাটাস লিখতে হচ্ছে:
আমি যখন চাঁদের নিচে দাঁড়াই,
মুগ্ধ, কাঁপি, তোমাকে খুব হারাই।
তারপর চাঁদ দেখব কী, একটু পর পর ফেসবুকেতে নোটিশ দেখি, কটা লাইক পড়ল। গবেষকেরা বলছেন, ফেসবুক হলো আত্মপ্রেমের চূড়ান্ত কারখানা, যে বেশি ফেসবুকিং করে সে নার্সিসিজমে ভোগে। হবেই হয়তো। আমার মতো আত্মপ্রেমিক তো আমি কাউকে দেখি না। আমাদের এক বন্ধু বইমেলা উপলক্ষে নিজের বইসংক্রান্ত স্ট্যাটাস দিয়ে বলেছেন, ভাইরে, বই কিনতে হবে না, আমি চাই লাইক। এই স্ট্যাটাসে একটা লাইক দিন।
তবু বলি, দিন যতই পাল্টাক, নারীপুরুষের যোগাযোগের মাধ্যম যতই সহজ হোক, যত সহজেই ছেলেটি মেয়েটির হোস্টেলে ঢুকে পড়তে পারছে মোবাইলে-ফেসবুকে, ভালোবাসার রহস্যটা তত উন্মোচিত হয়ে পড়েনি। এখনো রবীন্দ্রনাথই ভরসা:
সখী ভালোবাসা কারে কয়?
সে কি কেবলই যাতনাময়?
সে কি কেবলই চোখের জল
সে কি কেবলই দুখের শ্বাস
লোকে তবে করে কী সুখেরই তরে এমন দুখের আশ?
কিংবা তারাশঙ্করের কবি থেকে যখন কেউ স্ট্যাটাস দেয়, যে যাহারে ভালোবাসে, সে তাহারে পায় না কেনে, বুকটা কেন যে মোচড় দিয়ে ওঠে।
এই ভালোবাসা দিবসে ‘একজন বন্ধু চাই’ জাতীয় বিজ্ঞাপনের জন্য ব্যবহার করতে পারেন, এ রকম দু-চারটা স্ট্যাটাস আমি রচনা করে দিই।
১. একা আছি ভালোই আছি,
বকছি কত আবোল তাবল,
তোমায় পেলে ভালোই হতো!
জোছনা গোলাপ সবই ডাবল।
২. তোমার জন্য জন্মেছিলাম
তোমার জন্য হলাম বড়,
তোমার জন্য মরছি আমি,
ইনবক্সে মেসেজ করো।
৩. ভালোবাসা দিবসে
একা থাকবে কি বসে?
৪. আজ সারা দিন তোমায় নিয়ে ভাবব
আজ সকালে এটাই আমার কাব্য
একবার একেবারেই রোমান্টিক কয়েকটা পঙিক্ত লিখে বেশ লাইক পেয়েছিলাম:
যদি কাউকে না বলিস
তোকে একদিন দেখাতে নিয়ে যাব
কাউকে বলবি না
আমি একটা সমুদ্র গড়ছি
একটু একটু করে
অনেকটা হয়ে গেছে খোঁড়া...
যদি কাউকে না বলিস একদিন তোকে ওই দ্বীপেও নিয়ে যাব...
মাত্র দুদিন আগের ঘটনা। বইমেলায় এক ভদ্রলোক দুটো বাচ্চা নিয়ে এসেছেন। অহনা আর মোহনা। দুটো বই নিলেন। দুটো অটোগ্রাফ দুই মেয়ের জন্য। তারপর ‘ফাঁদ’ বইটা বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, ‘এটা শেলীর জন্য। ওদের মা। তিনি আমাকে এই বইটা উপহার দিয়েছিলেন অনেক বছর আগে।’
আমি বললাম, তিনি কই?
‘তিনি মারা গেছেন। ক্যানসারে।’
আমি কী লিখব? আমি কী লিখব? শেলী আপা! শেলী ভাবি! আপনি কোথায় আছেন? কেমন আছেন? আপনার স্বামী আজও আপনাকে মনে রেখেছেন। ‘ফাঁদ’ বইটা দেখলে আপনার কথা তাঁর মনে পড়ে। বইমেলা দেখলে আপনার কথা মনে পড়ে। আহা রে, বাচ্চা দুটোর মুখের দিকে আমি তাকাতে পারি না। আমরা কিছুই লিখিনি, তারাশঙ্করের কবি নিতাই যা লিখেছেন,
ভালোবেসে মিটিল না সাধ
কুলাল না এক জীবনে।
হায়রে জীবন এত ছোট কেনে?
আমি পাষাণ, আমি বুক বেঁধে রেখেছি, আমাদের বন্ধু তাপসের কথা আমি বলতে পারব না, আহা রে আগামী সোনা, ফুলের মতো বাচ্চাটা, তোমার মামণি নীতা গান গাইত, ও তোতাপাখি রে, শেকল খুলে দিতে পারি আমার মাকে যদি এনে দাও... তোমার মামণি আকাশের তারা হয়ে গেছেন, গত বছর এমনি সময়ে তোমরা এসেছিলে ঢাকায়, বইমেলা করতে, শাহবাগ করতে, তোমরা বাবা-ছেলে ফিরে গেলে, মা ফিরলেন না, বাংলাদেশের আকাশে তারা হয়ে রইলেন...গত মে মাসটা আমি তোমাদের বাসায় আমেরিকায় ছিলাম, সেদিনও তুমি ফোন করে বললে, ‘আনিশ চাচ্চু, তুমি কই, আই ওয়ান্ট টু সি ইউ...।’ তাপস ফেসবুকে নীতার ছবিগুলো দিচ্ছেন, আজ ইনবক্সে পাঠিয়েছেন নীতার জন্য গানের সিডির প্রচ্ছদ...
আমার চোখ ভেসে যায়, আমার বুক ভেঙে যায়। জীবন এত ছোট কেনে? জীবন এত ছোট কেনে?

ভালোবাসা দিবসে স্ট্যাটাস-বৈষম্য- হতভাগ্য তরুণেরা কী করবে?

বিশ্বের অধিকাংশ দেশে গণতন্ত্রের জয়জয়কার। প্রতিটি মানুষের সমান অধিকার নিয়ে সোচ্চার সবাই। কিন্তু ১৪ ফেব্রুয়ারিতেই পুরো দুনিয়ায় পালিত হয় এক অগণতান্ত্রিক দিবস।
যেখানে বৈষম্যের শিকার অগুনতি তরুণপ্রাণ। এই তরুণসমাজ পরিচিত ‘সিঙ্গল’ নামে। দোকলারা যখন যথাযোগ্য মর্যাদা ও তুমুল উৎসাহ-উদ্দীপনার সঙ্গে পালন করে ভ্যালেটইনস ডে, তখন এই তরুণেরা রেকর্ড করে পৃথিবীর দীর্ঘতম নিঃশ্বাস ত্যাগের। অথচ ভালোবাসা দিবস নিয়ে সবাই এমন ব্যস্ত হয়ে থাকে যে সেই রেকর্ড লেখা হয় না পৃথিবীর কোনো বইয়ে! কী নির্মম বৈষম্য ও অবহেলা!

কেবল দীর্ঘতম নিঃশ্বাসই নয়, এই নিপীড়িত তরুণেরা বিশ্বের অর্থনীতিকেও রাখে ভারসাম্যপূর্ণ। প্রতিবছর ১৪ ফেব্রুয়ারি এলে প্রেমিক-প্রেমিকারা কার্ড, চকলেট, ফুল ও অন্যান্য উপহারসামগ্রীর যত্রতত্র অপচয় করে। অথচ সিঙ্গল তরুণ-তরুণীরা দিনটিতে ঘরে বসে থেকে রোধ করে অর্থের নিদারুণ অপচয়। মানুষের প্রেমে না পড়লেও এই তরুণ-তরুণীরা খাঁটি প্রকৃতিপ্রেমী। কারণ, প্রেমিক-প্রেমিকারা ভালোবাসা দিবসে একে অপরকে উপহার হিসেবে দেয় ফুল। আর সিঙ্গলরা একটা ফুলও না ছিঁড়ে প্রকৃতিকে রাখে সুরক্ষিত। কেবল প্রকৃতিই নয়, জড়বস্তুর প্রতিও তাদের অসীম ভালোবাসা। প্রেমিক-প্রেমিকা না থাকায় ভালোবাসা দিবসে এদের সর্বক্ষণের সঙ্গী হয় টিভি, ল্যাপটপ কিংবা গেমস। এই জড় বস্তুগুলো যে মানবজীবনের কত নিঃসঙ্গ প্রহরের সঙ্গী, তার মর্ম কেবল এই তরুণেরাই উপলব্ধি করে।
এই নির্যাতিত তরুণেরাই সত্যের কান্ডারি। ভালোবাসা দিবসে ‘ডেট’ করার জন্য প্রেমিক-প্রেমিকারা অভিভাবকদের সঙ্গে কত মিথ্যাচারই না করে! আর এই তরুণসমাজ সেদিন বাধ্য সন্তানের মতো বাসায় বসে খায় মায়ের হাতের রান্না, খায় বাবার ঝাড়ি আর বোনের খোঁটা! এত কিছুর পরও এই ‘সিঙ্গল’ সমাজের পাশে দাঁড়াচ্ছে না কেউ। ভালোবাসা দিবসে একটু মিষ্টি হাসিও উপহার পায় না তারা। অথচ একটি গণতান্ত্রিক বিশ্বে আমরা এমন বৈষম্য চাইনি। এমন বৈষম্যের শিকার হওয়ার ফলে এই তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য প্রচণ্ড ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। তাই ১৪ ফেব্রুয়ারি ‘বিশ্ব ভালোবাসা দিবস’-এর পাশাপাশি ‘বিশ্ব একাকী দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করারও জোর দাবি জানাই আমরা। আশা করি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি গভীরভাবে ভেবে দেখবে।

ফুটপাত থেকে ইংরেজি মাধ্যম স্কুল পর্যন্ত মাদকের থাবা by পারভেজ খান

Saturday, September 17, 2011

রাজধানীর হাজারীবাগের গৃহবধূ জোবায়দা সোলায়মান বলছিলেন, তাঁর চার ছেলে আগে গাঁজা সেবন করত। এরপর হেরোইন, ফেনসিডিল হয়ে ধরে ইয়াবা। আর এখন তো তারা সেসব নেশার সঙ্গে যুক্ত করেছে আরো নানা আজব নেশা; যেগুলো দেখলেই গা ঘিনঘিন করে। জোবায়দার স্বামী ট্যানারি ব্যবসায়ী আবু সোলায়মান ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, 'আমার মতো অনেক বাবা-মা সন্তানদের মাধ্যমে ঘরে বসেই টের পাচ্ছেন, মাদক কতটা ভয়াবহতার পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে।' আবু সোলায়মান মনে করেন, সরকারের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হচ্ছে জাতিকে মাদকের থাবা থেকে মুক্তি দিতে না পারা।
রাজধানীর এমন কোনো এলাকা নেই যেখানে মাদক অবাধে বেচাকেনা বা সেবন চলছে না। মাদকদ্রব্য ছড়িয়ে পড়েছে ফুটপাত থেকে স্কুল পর্যন্ত। নেশা এবং নেশার কারণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করছেন ঢাকার ব্রেইন অ্যান্ড লাইফ হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফখরুল হোসেন। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, তাঁর এখানে আসা রোগীদের সঙ্গে কথা বলে তিনি জেনেছেন, মূলত হতাশা থেকেই তাদের বেশির ভাগ নেশায় আসক্ত হয়েছে। এই হতাশার সৃষ্টি হয়েছে পারিবারিক থেকে শুরু করে অর্থনৈতিক কারণে। আবার নেশায় আসক্তদের একটি বড় অংশ কোনো না কোনোভাবে নানা অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত। নেশা যারা গ্রহণ করে তারা শুধু শারীরিক নয় মানসিকভাবেও অসুস্থ। ফলে তাদের কাছে অপরাধ কোনো ব্যাপার নয়। আর নেশার অর্থ জোগাতেও তারা ছিনতাই, চুরি, ডাকাতিসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। ইদানীং নারী ও শিশুদের মধ্যেও এই ইয়াবা সেবনের হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে। বিশেষ করে তাঁর প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসা নিতে কিছু নামিদামি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের ছাত্রছাত্রী আসছে, যা দেখে তিনি নিজেও বিস্মিত। একটি সুসংগঠিত চক্রই বিশেষ করে বিত্তবান পরিবারের শিশুদের টার্গেট করেছে।
বিভিন্ন সূত্র মতে, এখন রাজধানীতে খুচরা মাদক বেচাকেনা বেশি হয় কোতোয়ালি, শাহবাগ, লালবাগ, চকবাজার, কামরাঙ্গীরচর, বংশাল, মোহাম্মদপুর, নিউ মার্কেট ও হাজারীবাগ থানা এলাকায়। আর তা নিয়ন্ত্রণ করে মাত্র কয়েকজন মাদক ব্যবসায়ী। এরা হচ্ছে হাজারীবাগ, লালবাগ ও চকবাজার থানার পুলিশের সোর্স এবং কমপক্ষে ১৫টি করে মামলার আসামি আজমল ও তার ভাই অসিম, হাজারীবাগের নাটকু সোহেল, সোর্স আজমলের স্ত্রী পপী, হেরোইন সম্রাজ্ঞী হিসেবে পুলিশের নথিতে চিহ্নিত জমিলা ওরফে জামিলা, বেড়িবাঁধের নোনা চোরা, বিজু ও তার ভাই সেলিম, মুসলিম ও ভাগলপুর লেনের লতিফ। কামরাঙ্গীরচরের আনন্দ ওরফে মুহুরী আনন্দ ওরফে দাদা আনন্দ, জেলখানা ঢালের বেগম, আম্বিয়া, ফুলবাড়িয়া নিমতলী এলাকার আনন্দবাজার বস্তির রিপন ও লাভলু। এই চক্রের নেতা হচ্ছে হাজারীবাগ পার্ক এলাকার কালা বাবু। সে মাদক সর্দার হিসেবে চিহ্নিত। কয়েক মাস আগেও সে আগ্নেয়াস্ত্রসহ গ্রেপ্তার হয়েছিল। এখন জামিনে বের হয়ে এসেছে। এই চক্রের হয়ে পুলিশ নিয়ন্ত্রণ করে পলাশ, আরিফ ও চপল নামের হাজারীবাগ এলাকার তিন ব্যক্তি। এরা এলাকায় রাজনৈতিকভাবেও প্রভাবশালী এবং পুলিশের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে চিহ্নিত। ফলে এই চক্র এখন রাজধানীতে সবচেয়ে সুবিধাজনক অবস্থায় আছে। এসব এলাকায় রয়েছে ৫৫টির মতো মাদক ও নেশাজাত দ্রব্যের আড়ত। এসব আড়তে নেশাজাত দ্রব্য সরবরাহ করে আমিনবাজারের সবচেয়ে বড় মাদক ব্যবসায়ী টিক্কার স্ত্রী কল্পনা। কল্পনা ও টিক্কা এখন নগরীর বাড্ডা এলাকায়ও মাদক ব্যবসা জমিয়ে তুলেছে।
সূত্র মতে, রাজধানীর পাইকারি মাদক বেচাকেনা সবচেয়ে বেশি হয় মিরপুরের গাবতলী, ১ নম্বর গুদারাঘাট, মতিঝিলের কলোনি এলাকা, পুরানা পল্টন, শান্তিনগর বাজার, বিজয়নগর, ফকিরাপুল, ফুলবাড়িয়া বাসস্ট্যান্ড. বাসাবো, কমলাপুর রেলস্টেশনের পাশের মেথরপট্টি, মুগদাপাড়া, সবুজবাগ, মাদারটেক, নন্দীপাড়া, সায়েদাবাদ, শনির আখড়া, মাতুয়াইল, নয়াবাজার, ধলপুর, দনিয়া, নারিন্দা, সিদ্দিকবাজার, মহাখালী, প্রগতি সরণি, কুড়িল, জোয়ারসাহারা, আশকোনা ও বাড্ডা এলাকায়।
সূত্র মতে, প্রকাশ্যে বা খোলা রাজপথে মাদক সেবন সবচেয়ে বেশি চলে চানখাঁরপুল, নয়াবাজার আর কারওয়ান বাজার এলাকায়। কোনো গোপনীয়তা বা রাখঢাক নেই এই এলাকার মাদকসেবীদের। তবে এসব এলাকার মাদকসেবীদের বেশির ভাগই বেকার, টোকাই, রিকশাচালক, পরিবহন শ্রমিক ও ছিঁচকে অপরাধীসহ সমাজের নিম্ন আয়ের মানুষ। অভিজাত এলাকায় প্রকাশ্যে নেশাদ্রব্য বেচাকেনা বা গ্রহণ খুব কম হয়। তবে ইদানীং 'সিসা' বা হুক্কা নামে এক ধরনের নেশা অভিজাত এলাকায় জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এই হুক্কা বা সিসার আসর বসে মূলত অভিজাত পাড়ার কয়েকটি রেস্টুরেন্টে। এই নেশায় আসক্তদের বেশির ভাগই নগরীর বিভিন্ন নামিদামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রী এবং অভিজাত পাড়ার ধনী পরিবারের ছেলেমেয়ে। তবে পুরান ঢাকার তাঁতীবাজারের স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের মধ্যেও সাম্প্রতিক সময়ে এই নেশা গ্রহণের প্রবণতা দেখা দিয়েছে।
পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) খন্দকার হাসান মাহমুদ কালের কণ্ঠকে বলেন, অস্ত্র, ডাকাতি, খুন, ছিনতাইসহ দেশে প্রতিনিয়ত যেসব অপরাধ ঘটে চলছে সেগুলোর বেশির ভাগের পেছনেই রয়েছে মাদক। তিনি বলেন, মাদক নিয়ন্ত্রণের জন্য সরকারের পৃথক একটি সংস্থা আছে। পাশাপাশি পুলিশ ও র‌্যাব তাদের মতো করে কাজ করে যাচ্ছে। মাদকের বিরুদ্ধে তাদের বিশেষ অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলেও তিনি জানান।
বেশ কয়েকজন নেশাগ্রস্ত তরুণ-তরুণী এবং ঢাকার ব্রেইন অ্যান্ড লাইফ হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফখরুল ইসলামের সঙ্গে আলাপকালে বের হয়ে এসেছে নেশার নানা উপকরণের বিষয়। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিনে অনুসন্ধান চালিয়েও এই নেশা গ্রহণের নানা দৃশ্য চোখে পড়েছে। এর মধ্যে কিছু এখানে উল্লেখ করা হচ্ছে।
ককটেল : এটিকে ফেনসিডিলের সহজ সংস্করণ বা লোকাল ফেনসিডিলও বলে অনেকে। আর্থিক কারণে যারা ফেনসিডিল কিনে খেতে পারে না, তারাই ঝুঁকছে এর প্রতি। নগরীর বিভিন্ন অলিগলির ছোটখাটো ওষুধের দোকানে অবাধে বিক্রি হচ্ছে এই ককটেল তৈরির উপাদান। ককটেলের উপকরণ নেশায় আসক্তরা আলাদাভাবে কিনে নিয়ে যায়। এর দাম পড়ে বোতলপ্রতি বড়জোর ৩০ টাকা। বিক্রেতারা পরিচিত এবং নির্দিষ্ট কিছু ক্রেতা ছাড়া অন্য কারো কাছে এগুলো বিক্রি করে না।
সাত রাস্তার মোড় : পুরান ঢাকায় এর প্রচলন কিছুটা বেশি। প্যাথিডিন, মরফিন বা ফ্যানারগান-জাতীয় তরল ইনজেকশনের মাধ্যমে শরীরের জঙ্ঘার (কুঁচকি) কাছে রগে নেওয়া হয়। রাজধানীর চানখাঁরপুল এলাকার ওষুধের মার্কেটের সামনে দেখা গেল একটি ট্রাকের আড়ালে দুজন এই ইনজেকশন নিচ্ছে। তাদের ভাষ্য, কুঁচকি সাতটি রগের মিলনকেন্দ্র। তাই নাম দেওয়া হয়েছে সাত রাস্তার মোড়। ইনজেকশনগুলো তারা হাসপাতালের কর্মচারীদের কাছ থেকে জোগাড় করে বলেও জানায়।
টাইটানিক : জিহ্বা বা তালুতে ইনজেকশনের মাধ্যমে প্যাথিডিন-জাতীয় ওষুধ গ্রহণ করা। এর প্রবণতা পুরান ঢাকাতেই বেশি। নয়াবাজার ইউসুফ মার্কেটের পেছনে গিয়ে এই নেশায় আসক্তদের কয়েকজনকে পাওয়া যায়। তাদের মতে, সদরঘাটের কিছু নৌযান শ্রমিকের মাধ্যমে এ নেশাটি ঢাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। নদীপথের শ্রমিকরা এ নেশায় আসক্ত বেশি। তাই এর নাম হয়েছে টাইটানিক।
পুলিশ ভাজা বা টিকটিকি ফ্রাই : টিকটিকির শরীরের উপকরণ নিয়ে বানানো হয় বলেই এমন নাম। সায়েদাবাদ টার্মিনাল এলাকার পরিবহন শ্রমিক রাজু ও কামাল এই প্রতিবেদককে জানায়, তারা নিছক মজা করতে করতেই এ নেশায় জড়িয়ে গেছে। মোবারক নামের তাদেরই আরেক বন্ধু জানায়, এক বড় ভাইয়ের কাছ থেকে সে এই নেশা নিতে শিখেছে। পুলিশকে তাদের অনেকে টিকটিকি বলে। আর এ কারণেই তারা মজা করে এই নেশাকে পুলিশ ভাজাও বলে। রাজধানীতে এ ধরনের নেশাখোরের সংখ্যা হাতে গোনা। সায়েদাবাদ, নিমতলী, ফুলবাড়িয়া ও গাবতলী এলাকায় কয়েকজন পরিবহন হেলপার আছে, তারা প্রতি সপ্তাহে তিন থেকে চারবার এই নেশা নিয়ে থাকে।
জিনের বাদশা : কারওয়ান বাজার এলাকার এক বালক। বয়স খুব বেশি হলে ১২ বছর। কাঁচামালের বোঝা টানার কাজ করে। রাত সাড়ে ১০টার দিকে তাকেও দেখা গেল মসজিদ গলিতে বসে নেশা করছে। তবে একা। পাশে গোল হয়ে বসে আরো দুই বালক তার এই নেশা গ্রহণের দৃশ্য দেখছে। জটলা দেখে এগিয়ে যাওয়ার পর ওই বালকেরই এক বন্ধু জানাল, 'স্যার, ওরে জিনের বাদশা ধরছে।' নেশা গ্রহণকারী ওই বালক জানায়, তার নাম সামসু। গত এক বছর ধরে সে এই নেশা গ্রহণ করে। পলিথিনের ভেতর পানির সঙ্গে এক ধরনের আঠা মিশিয়ে ঝাঁকিয়ে এই নেশাদ্রব্য তৈরি করা হয়। ছেলেগুলো বলে, এই নেশা নিলে শরীরটা অনেক হালকা হয়-মনে হয় আকাশে জিন-পরীর মতো উড়ছে। তাই নাম জিনের বাদশা। রাজধানীর বস্তি বা টার্মিনাল এলাকায় পলিথিনে ঢুকিয়ে এই নেশা শ্বাসের সঙ্গে নিতে দেখা যায়।
স্যান্ডউইচ : জেলির সঙ্গে এক ধরনের মলম ও বিশেষ কালি মিশিয়ে এক ধরনের পেস্ট তৈরি করা হয়। এরপর পাউরুটিতে মাখিয়ে স্যান্ডউইচের মতো গ্রহণ করা হয়। তিন-চার বছর হলো গণকটুলী সুইপার কলোনির মাদক বিক্রেতারা স্যান্ডউইচ নাম দিয়ে এই নেশা চালু করেছে। এগুলো সাধারণত কিনতে পাওয়া যায় না। সেবনকেন্দ্রে গিয়ে অর্ডার দিলে পরিবেশন করা হয়। গণকটুলী সুইপার কলোনি এবং ধলপুর সিটি পল্লীতে এ ধরনের কয়েকজন নেশায় আসক্তকে পাওয়া গেছে।
এ ছাড়া ধনাঢ্য পরিবারের অনেক সন্তান এখনো ইয়াবা গ্রহণ করছে। বাবা, লাল জবা, লাল গোলাপ, চামেলী, ক্রেজি, ক্যান্ডি, চকোলেট_নানা নামে নেশাটি প্রচলিত। যথারীতি আছে ফেনসিডিল। ফেনসি, ডাইল, ফেন্টুস, মধু বা ইঞ্চিসহ নানা নামে এটি পরিচিত। আরো আছে হেরোইন ও গাঁজা। দুটিই মূলত পুরিয়া নামে প্রচলিত।

রাজধানীতে ৫০০ কিশোর চালক by হায়দার আলী

Tuesday, August 16, 2011

রাজধানীর ব্যস্ততম প্রতিটি সড়কেই গাড়ি চালাতে দেখা যাচ্ছে কিশোর চালকদের। এসব কিশোরের বয়স ১৫ থেকে ২০ বছরের মধ্যে। তাদের বেশির ভাগেরই বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স নেই। কিশোর চালকদের কেউ কেউ বিআরটিএর লোকজনদের মোটা অঙ্কের টাকা ঘুষ দিয়ে ভুয়া লাইসেন্স তৈরি করে নিচ্ছে।

এসব লাইসেন্স দিয়ে তারা অনায়াসে গাড়ি চালাচ্ছে। কিছু কিশোর চালক বয়স বাড়িয়ে বিআরটিএ থেকে আসল লাইসেন্সও জোগাড় করে নিয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ভুয়া লাইসেন্সধারীরা ট্রাফিক পুলিশ, সার্জেন্টদের ম্যানেজ করে নিয়মিত গাড়ি চালাচ্ছে। এসব কিশোর চালক রাজধানীতে সাধারণত লেগুনা, টেম্পো, হিউম্যান হলার চালায়। এ ছাড়া কখনো কখনো পিকআপ ভ্যান, মিনিবাসসহ অন্যান্য যানবাহনও চালায় তারা। শুধু রাজধানীতে নয়, সারা দেশেই অপ্রাপ্তবয়স্করা গাড়ি চালাচ্ছে। মফস্বল এলাকায় নসিমন, করিমন, ভটভটিসহ বিভিন্ন ধরনের গাড়ি চালাচ্ছে। এসব যানবাহন এবং চালক উভয়েরই নেই বৈধ লাইসেন্স। ফলে সড়ক দুর্ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েই চলছে।
হেলপার থেকে চালক : লেগুনা গাড়ির চালক মনির। এখনো মুখে গোঁফের রেখা দেখা দেয়নি। চার মাস হতে চলেছে গাবতলী থেকে মহাখালী পর্যন্ত লেগুনা চালায়। প্রতিদিনই সকাল থেকে রাত পর্যন্ত একাধিক ট্রিপ মারে। মনির কালের কণ্ঠকে বলে, 'তিন বছর গাড়ির হেলপার হিসেবে কাজ করছি।
হেলপারি করতে করতে এখন নিজেই গাড়ি চালাই।' লাইসেন্স আছে কি না জানতে চাইলে মনির বলে, 'লাইসেন্স না থাকলে তো ট্রাফিক পুলিশ রাস্তায় গাড়ি চলতে দেবে না, তবে বয়স কম বলে আসল লাইসেন্স দিতে চায় না। কিছু টাকা দিয়া নকল লাইসেন্স বানাইতে হইছে।'
একই গাড়ির হেলপার আনিস (১৫) বলে, 'আমিও গাড়ি চালানো শিখে ফেলেছি। লাইসেন্স করতে দিছি। লাইসেন্স পাইলেই গাড়ি নিজেই চালামু।'
আদাবর বেড়িবাঁধ থেকে শ্যামলী রুটে এক বছর ধরে লেগুনা চালায় খোরশেদ হোসেন। বয়স সবে ১৫ পেরিয়েছে। খোরশেদ বলে, 'গাড়ি চালাইতে হলে বয়স লাগে নাকি? আমাগো চেয়ে অনেক বেশি বয়সের লোকও তো গাড়ি চালাইতে পারে না। মহল্লায় গাড়ি চালাইলে পুলিশ বেশি ধরে না। মালিকের লগে এলাকার নেতাগো খাতির আছে।' দুর্ঘটনার কথা তুললে খোরশেদের জবাব, 'গাড়ি চালাইলে তো কিছু না কিছু এঙ্েিডন্ট হইব।'
মনির আর খোরশেদের মতোই রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে ১৪ থেকে ২০ বছরের পাঁচ শতাধিক কিশোর গাড়ি চালাচ্ছে। তাদের বেশির ভাগই ভুয়া লাইসেন্স নিয়ে গাড়ি চালায়। গাবতলী কিংবা মিরপুর থেকে ছেড়ে আসা অনেক মিনিবাসের চালকও কিশোর। মূল চালক না এলে মালিকরা হেলপারদের দিয়েই বাস রাস্তায় নামিয়ে দেন। কখনো ট্রাফিক পুলিশ ধরলে কিছু টাকা দিলেই ছেড়ে দেয় বলে কিশোর চালকদের অনেকেই এ প্রতিবেদককে জানায়।
বেপরোয়া গাড়ি চালানো : কিশোর চালকরা রাস্তায় বেপরোয়া গাড়ি চালানোর কারণেই সড়কে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে। একে অপরের সঙ্গে পাল্লা দিতে গিয়ে ঘটাচ্ছে একের পর এক দুর্ঘটনা। এ অসুস্থ প্রতিযোগিতার কারণে অনেক নিরীহ মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে। অদক্ষ কিশোর চালকের বেপরোয়া গাড়ি চালানোর কারণে বেশির ভাগ সময় দক্ষ এবং প্রশিক্ষিত গাড়ির চালকরাও দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন।
মহাখালী থেকে টাঙ্গাইলগামী নিরালা পরিবহনের চালক আনিসুর রহমান বলেন, '২০ বছর ধরে রাস্তায় গাড়ি চালাই, কিন্তু এখন কয়েক মাস হেলপারি করেই রাস্তায় অল্প বয়সে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। অল্প বয়সের চালকের উল্টাপাল্টা চালানোর কারণে আমরা অনেক সময় বিপদে পড়ে যাই। তাদের কারণেই রাস্তায় প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে।' একই কথা বলেছেন এস এ খালেক পরিবহনের চালক মোহাম্মদ আলী। তিনি বলেন, 'কিশোর চালকরা গাড়ি চালানোর সময় নিয়মকানুনের কোনো তোয়াক্কা করে না। তারা নিজেদের খেয়াল-খুশিমতো গাড়ি চালানোর কারণে রাস্তায় এমন দুর্ঘটনা ঘটছে। তাদের কারণে আমাদের মতো দক্ষ চালকরা বড় ধরনের দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছি।'
অনুসন্ধানে জানা গেছে, কিশোর চালকদের অনেকেই মাদকাসক্ত হয়ে গাড়ি চালায়। রাতভর মাদক গ্রহণ করে দিনের বেলায় গাড়ি চালাতে গিয়ে শারীরিক ভারসাম্য হারিয়েও দুর্ঘটনা ঘটাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রশিক্ষিত চালকের অভাব, পথচারীদের অসতর্কতা, ফিটনেসহীন গাড়ির অবাধ চলাচল, গাড়ির অতিরিক্ত গতি, সড়ক নির্মাণে ত্রুটি, অতিরিক্ত গাড়ি, ত্রুটিপূর্ণ সেতু এবং অতিরিক্ত পণ্য পরিবহনের কারণেই দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির সংখ্যা বেড়ে চলেছে।
লাশের মিছিল : জানা যায়, সারা দেশে ভুয়া ড্রাইভিং লাইসেন্সধারী ও লাইসেন্সবিহীন চালক রয়েছে প্রায় পাঁচ লাখ। এর মধ্যে ফিটনেসবিহীন গাড়ি রয়েছে প্রায় ৮৬ হাজার। আর লাইসেন্সপ্রাপ্ত চালকদের মধ্যেও রয়েছে অদক্ষ চালকের ছড়াছড়ি। ঢাকার বাইরে প্রতিটি জেলায় অসংখ্য কিশোর চালক রয়েছে। মফস্বলের প্রতিটি রাস্তায় দারিদ্র্যের কারণে ১২ থেকে ২০ বছর বয়সের হাজার হাজার কিশোর চালক নির্বিঘ্নে গাড়ি চালাচ্ছে। যানবাহন আইন সম্পর্কে সঠিক ধারণা নেই তাদের। ফলে প্রতিদিনই ঘটছে মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনা। প্রাণ হারাচ্ছে বহু মানুষ। আহতদের অনেকেই পঙ্গু হয়ে দিন কাটাচ্ছে। বিআরটিএ সূত্রে জানা যায়, ২০১০ সাল পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ১৫ লাখ নিবন্ধিত যানবাহনের বিপরীতে বৈধ লাইসেন্সপ্রাপ্ত চালকের সংখ্যা প্রায় ১০ লাখ। বাকি সাড়ে পাঁচ লাখ গাড়ি চালাচ্ছে ভুয়া লাইসেন্সধারীরা। বেসরকারি পরিসংখ্যানে ঢাকাসহ সারা দেশে ৬১ শতাংশ চালক বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়াই গাড়ি চালাচ্ছে। দেশে ১৯৯৪ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহত হয়েছে এক লাখ তিন হাজার জন। এর মধ্যে মারা যায় ৫০ হাজার ৫৪৪ জন। পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ২০১০ সালে দুই হাজার ৮২৭টি সড়ক দুর্ঘটনায় মোট হতাহত হয়েছে চার হাজার ৪৪৯ জন। অন্যদিকে সেন্টার ফর মিডিয়া রিসার্চের (এমআরটি) বার্ষিক প্রতিবেদনে ২০১০ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা বলা হয়েছে চার হাজার ৪৮১ জন। মৃত্যুর হার গড়ে প্রতিদিন ১২ জনেরও বেশি। এসব ঘটনায় ১৫ হাজার ৫৬৯ জন অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে ৪২ জনেরও বেশি মানুষ আহত হচ্ছে বলে সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউট, বিআরটিএ ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের এঙ্েিডন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (এআরআই) সাবেক পরিচালক ড. শামসুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, 'সড়ক দুর্ঘটনা দিনের পর দিন বেড়েই চলেছে। পত্রিকার পাতা খুললেই দুর্ঘটনার খবর পাই। এ ছাড়া রাজধানীসহ সারা দেশেই অদক্ষ এবং কিশোর চালক রাস্তায় গাড়ি চালাচ্ছে। নসিমন, করিমন, ভটভটিসহ হাজার হাজার গাড়ির বেশির ভাগ চালক কিশোর।'
তাঁর মতে, সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে হলে প্রতিটি সড়কে রোড ডিভাইডার স্থাপন করার পাশাপাশি চালকদের উন্নত প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) চেয়ারম্যান আইয়ুবুর রহমান খান কালের কণ্ঠকে বলেন, 'এখন পরিস্থিতি ভয়াবহ। বছরে প্রায় চার থেকে পাঁচ হাজার দুর্ঘটনার হিসাব রাখা যাচ্ছে। আমাদের দেশে ওস্তাদের কাছ থেকে গাড়ি চালানো শেখার সংস্কৃতির কারণে চালক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। এ অবস্থায় দেশের ছয়টি বিভাগে ছয়টি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব আমাদের রয়েছে।'

চাকরি না ব্যবসা by মোর্শেদ নাসের

Wednesday, January 19, 2011

ছাত্রাবস্থায় পড়াশোনার মূল উদ্দেশ্য কিন্তু আর কিছু নয়। সেটা হলো পেশা। এই পেশাকে সামনে রেখেই সবাই যার যার দক্ষতা বৃদ্ধি করে। সেটা পড়াশোনার মাধ্যমেই হোক আর বিভিন্ন কোর্স করার মাধ্যমেই হোক। তবে, পৃথিবীতে সবাই কিন্তু একই রকম পেশা বেছে নেয় না।

কেউ হয়তো চিকিৎসক হবে কিংবা কেউবা চায় স্বাধীনভাবে চলতে। কেউবা চায় শিক্ষকতা। কিন্তু একটা বিতর্কের বিষয় থেকেই যায়। পেশা হিসেবে কোনটা ভালো, চাকরি না কি ব্যবসা। আসলে এই বিষয় নিয়ে মনে প্রশ্ন জাগেনি_এমন তরুণের সংখ্যা খুব কমই পাওয়া যাবে। তাই খোঁজা যাক প্রশ্নের উত্তর_কোনটা বেশি মাননসই চাকরি, না কি ব্যবসা।

চাকরি ব্যাপারটা মানেই হলো মাস শেষে নির্দিষ্ট অঙ্কের একটা বেতন পাওয়া সেটা ছোট অঙ্কেরও হতে পারে কিংবা হতে পারে বিশাল অঙ্কের। তবে অনেকেরই আবার বসকে তেল দেওয়া বা তোষামোদ করার মতো মন-মানসিকতা নেই। তাদের কাছে চাকরি ভালো লাগবে না_এটাই স্বাভাবিক নয় কি? চাকরিতে আছে প্রতিদিন বসের ঝাড়ি খাবার সম্ভাবনা। নিজের মুখ ফুটে যে নিজের মতামত প্রকাশ করবেন, সেটাও করা সম্ভব হয় না অনেকের ক্ষেত্রে। তবে, মানিয়ে নেওয়াটাই হলো আসল কথা। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় চাকরিজীবি পরিবারের তরুণ-তরুণীরা চাকরি করতেই অভ্যস্ত। তাদের কাছে চাকরি মানে নিশ্চিন্ত জীবন, মাস শেষে নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা এই আর কি। তাদের কাছে পড়াশোনার মূল লক্ষ্যই হচ্ছে জ্ঞান অর্জন নয়; ডিগ্রি অর্জন আর একটা চাকরি। চাকরি ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েন তারা, যারা একটু ঠোঁটকাটা স্বভাবের। দেখা যায়, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তারা সহকর্মীদের সাথে তো বিতর্কে জড়িয়ে পড়েনই, এমনকি বসের মুখের উপরও যখন তখন না বুঝে-শুনে দুম করে একটা কিছু বলে বসেন। তাদের জন্যে চাকরি না করাই ভালো। তবে চাকরিতে একটা ভালো দিক হলো যে, লাভ-লোকসান নিয়ে খুব একটা বেশি মাথা ঘামাতে হয় না। কাজ করো মন দিয়ে আর মাস শেষে টাকা পাও। লাভ-লোকসান নিয়ে চিন্তা করবেন বস। বলা হয়ে থাকে, চাকরি করলে নাকি নিজের উপর আত্মবিশ্বাস খানিকটা কমে যায়। কেননা, ব্যবসা যারা করে, তারা রিস্ক নিতে ভয় পায় না। কিন্তু চাকরিজীবী কেউ একজন জীবনের যেকোনো ক্ষেত্রে রিস্ক নিতে সাত-পাঁচ ভেবে চিন্তা করে, এগোবে না কি পিছাবে। প্রাচীনকাল থেকেই ব্যবসা করার জন্য বিভিন্ন অঞ্চলে পাড়ি জমিয়েছে বণিকরা। সেসময় শুধুমাত্র একটা শ্রেণীই ব্যবসা বাণিজ্য

করত। বলা হতো বাণিজ্যে লক্ষ্মীর বসতি। সময় পাল্টেছে, সেইসাথে পাল্টেছে ব্যবসার পদ্ধতি আর ধ্যান-ধারণাও। কিন্তু ব্যবসাতে আগ্রহ আছে সবার এখনও। বেশিরভাগ ব্যবসায়ী ফ্যামিলির সন্তানরাই ব্যবসাতে বেশি আগ্রহ প্রকাশ করে। ফ্যামিলিতে ব্যবসার চল না থাকলে নাকি পাকা ব্যবসায়ী হওয়া যায় না_এ রকম ধ্যান-ধারণা ভেঙ্গে অনেকেই এখন ব্যবসায় হাত পাকানো শুরু করেছে। তরুণ-তরুণীদের কাছে ব্যবসাটাও ইদানিংকার আগ্রহের বিষয়। কেননা, চাকরিতে নাকি শটকার্টে বড়লোক হবার সুযোগ নেই, কিন্তু ব্যবসাতে সেটা আছে। তবে, এক্ষেত্রে যে ব্যবসা করবে, তাকে অবশ্যই ভালোভাবে ব্যবসাকে বুঝতে হবে। কেননা, ব্যবসা ভালোভাবে না বুঝে করলে লাভের চেয়ে যে ক্ষতির পালস্নাটাই ভারী হবে_এটাই স্বাভাবিক। ব্যবসায় যেমন উপরে উঠা যায় তাড়াতাড়ি, তেমনি নামায়ও খুব তাড়াতাড়ি। যে সকল তরুণ একটু স্বাধীনচেতা, ফ্যামিলিতে আগে ব্যবসা করার অভিজ্ঞতা আছে কিংবা অফিসে কাজ করতে ভালো লাগে না, তারাই সাধারণত ব্যবসায় আসে। ব্যবসাতে আছে রিস্ক। তাই দেখে শুনে বুঝে পা ফেলতে হয়। কেননা, ঠান্ডা মাথায় কাজ না করে যদি ঝোঁকের মাথায় কিছু করে বসেন, তাহলেই কিন্তু সমূহ বিপদের আশঙ্কা। ব্যবসার কিছু কৌশলও আছে, সেগুলো বুঝতে পারলেই লাভ হবে কিন্তু না বুঝলেই ঠেলা সামলাতে হবে ব্যবসায়ীকে। পরিণামে মাথায় হাত দিয়ে হায় হায় করা ছাড়া আর কোনো উপায় সামনে থাকবে না। সেদিক থেকে চাকরি অনেক নিরাপদ। অতশত দিক চিন্তা না করলেও চলে। শুধু বসের নির্দেশ মেনে ঠিকঠাক কাজ করলেই হলো। চাকরিজীবীর সুবিধা হলো দিন শেষে আছে ছুটির হাতছানি। অনেকটা ঠিক রুটিনের ছকের মধ্যে চলাফেরা করেন চাকরিজীবীরা। কিন্তু একজন ব্যবসায়ীর জীবনে কাজ করতে হয় আনলিমিটেডভাবে। বেশিরভাগ চাকরিজীবীই যখন শুক্রবারে নাক ডাকিয়ে ঘুমান, তখন ব্যবসায়ীদের হয়তো শ্বাস ফেলারও জো নেই। তবে, সময়ের পরিবর্তনের সাথে পুরোনো ধ্যান-ধারণাও পাল্টাচ্ছে। তেমনি ব্যবসা বা চাকরির পদ্ধতি, সুযোগ-সুবিধা, চিন্তাও বদলাচ্ছে। তবে ব্যবসা বা চাকরি কোনটা ভালো, সেটা বলা মুশকিল। আসলে দুটি পেশাই দুটো দিক থেকে আলাদা। দুটো ক্ষেত্রেই আছে সফলতার সম্ভাবনা। তবে সেজন্য দরকার চিন্তা, দক্ষতা ও সঠিক পদক্ষেপ। আজকের তরুণ প্রজন্ম ব্যবসা বা চাকরি যেটাই বেছে নেন না কেন, তাদের সেটাই বুঝে শুনে নিষ্ঠার সাথে করতে হবে।
 
Support : Dhumketo ধূমকেতু | NewsCtg.Com | KUTUBDIA @ কুতুবদিয়া | eBlog
Copyright © 2013. Edu2News - All Rights Reserved
Template Created by Nejam Kutubi Published by Darianagar Publications
Proudly powered by Dhumketo ধূমকেতু