মিসর ও তিউনিসিয়া- এক যাত্রা পৃথক ফল by রোকেয়া রহমান

Friday, January 31, 2014

মিসর ও তিউনিসিয়া—আরব বিশ্বের দুটি দেশ। তাদের মধ্যে যোজন যোজন দূরত্ব তৈরি করেছে লিবিয়া। এই দূরত্ব সত্ত্বেও দেশ দুটির মধ্যে কত-না মিল ছিল।
দেশ দুটি দীর্ঘদিন স্বৈরশাসকদের শাসনে ছিল। ধর্মীয় কট্টরপন্থা যাতে সে দেশের শাসনব্যবস্থায় গেড়ে না বসতে পারে, এ জন্য মিসর ও তিউনিসিয়ার শাসকেরা ছিলেন নির্দয়। কিন্তু তলে তলে দেশ দুটিতে কট্টর ইসলামপন্থীদের সক্রিয় হয়ে ওঠা ও ক্ষমতা দখল—দুটোই কঠিন বাস্তব।

কিন্তু এই বাস্তবতা মোকাবিলায় দেশ দুটি আবার ভিন্ন পথে হেঁটেছে। একজন বেছে নিয়েছে আলোচনার পথ, অন্যজন বলপ্রয়োগের। অথচ ‘কথিত’ আরব বসন্তের সূত্রপাত করেছিল এই মিসর ও তিউনিসিয়া। এখন দুই বিপরীতমুখী ধারার সম্মিলন গোটা আরব বিশ্বকে বিভ্রান্তির মধ্যে ফেলে দিয়েছে বলা যায়।
১৯৫৬ সালে ফ্রান্সের কাছ থেকে স্বাধীনতা পাওয়ার পর থেকে তিউনিসিয়া সাংবিধানিকভাবে ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবেই পরিচিত ছিল। নামে গণতন্ত্র হলেও ব্যক্তিকেন্দ্রিক স্বৈরাচার ও অনাচার দেশটিকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে। শেষমেশ ২০১১ সালের জানুয়ারিতে এক গণ-অভ্যুত্থানে দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বেন আলী। এরপর অনেক ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে সংবিধান পরিষদ নির্বাচিত হয়। ১৫ জানুয়ারি এই সংবিধান পরিষদ ঐকমত্যের ভিত্তিতে নতুন সংবিধান গ্রহণ করেছে, যা আরব বিশ্বে এখনো পর্যন্ত সবচেয়ে উদার সংবিধানই বলা যায়। তিউনিসিয়ার পার্লামেন্ট গত রোববার দেশটির নতুন সংবিধান অনুমোদন দিয়েছে। সংবিধানে অনুমোদনের পক্ষে ২১৬ ভোটের মধ্যে ২০০টি ভোট পড়ে। গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন বিষয়ে এই সংবিধানে শব্দ চয়ন করা হয়েছে এমনভাবে, যাতে শাসক ইসলামপন্থী দল ও এর বিরোধী ধর্মনিরপেক্ষ দলের কাছে তা গ্রহণযোগ্য বলেই মনে হয়েছে। সামাজিক জীবনে ইসলামের ভূমিকা ঠিক কী হবে, এই কঠিন প্রশ্নে দল দুটি মতৈক্যে আসতে পেরেছে, যা আপস বা সমন্বয়ের এক বিরল নিদর্শন।
তিউনিসিয়ার নতুন সংবিধানে বলা হয়েছে, ‘তিউনিসিয়া হবে মুক্ত, স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ; ইসলাম এর ধর্মীয় পরিচয়; আরবি এর ভাষা এবং এর শাসনব্যবস্থা প্রজাতান্ত্রিক।’ এতে আরও বলা হয়েছে, ‘তিউনিসিয়া হবে নাগরিক রাষ্ট্র, যা জনমতের ইচ্ছায় গড়ে উঠবে এবং এখানে আইনই সর্বোচ্চ।’ ভবিষ্যতে কোনো দল যত গরিষ্ঠতা নিয়েই ক্ষমতায় আসুক না কেন, সংবিধানের এই দুই মৌলিক বিষয়কে তারা কখনো সংশোধন করতে পারবে না।
তিউনিসিয়ার পার্লামেন্ট গত বুধবার একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের বিষয়টি অনুমোদন করে। নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত এই সরকার দেশ পরিচালনা করবে।
অন্যদিকে, পিরামিডখ্যাত মিসরকে দেখুন। উত্তাল তাহরির স্কয়ারের কথা এ দেশের পাঠকের কে না জানে। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে সংগঠিত আন্দোলন ও হাজারো তরুণের আত্মত্যাগ স্বৈরশাসকবিরোধী এ আন্দোলনকে স্মরণীয় করে রেখেছে। ২০১১ সালের জানুয়ারির সেই হোসনি মোবারকবিরোধী আন্দোলন ও ফেব্রুয়ারিতে প্রেসিডেন্ট মোবারকের পতন মিসরবাসীকে নতুন স্বপ্ন দেখাতে শুরু করেছিল।
কিন্তু তারুণ্যের এই আত্মত্যাগের ফসল তুলল মিসরের মুসলিম ব্রাদারহুড। ২০১১ সালের ২৮ নভেম্বর দেশের প্রথম সংসদ নির্বাচনে জয় ছিনিয়ে নিয়ে প্রেসিডেন্ট হলেন ব্রাদারহুডের নেতা মোহাম্মদ মুরসি। চলতে শুরু করলেন নিজের পথে, নিজের মতো করে। এক বছরের মধ্যে নতুন সংবিধান অনুমোদনের জন্য গণভোটের ব্যবস্থা করলেন। বিরোধী রাজনীতিকেরা শুরু থেকে ব্রাদারহুডের বিপক্ষে অবস্থান নেন। বুদ্ধিমান মুরসি তাঁদের কাছে আলোচনার প্রস্তাব দিলেও নিজের উদ্দেশ্য পূরণে অটল থাকলেন; যার ফলে গত বছরের মাঝামাঝি মিসরজুড়ে শুরু হয় মুরসিবিরোধী আন্দোলন।
জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ে আরবের আইনকানুনের ব্যাপারে বিশেষজ্ঞ নাথান ব্রাউন বলছেন, প্রথমত, বিরোধীরা এটা জানত যে পরের নির্বাচনেও তারা কোনোভাবেই জিততে পারবে না। দ্বিতীয়ত, সেনাবাহিনী সেখানে ছিল। কার্যক্ষেত্রে হলোও তা-ই।
ঘরে-বাইরে মুরসিবিরোধী তীব্র মনোভাবের সুযোগ নিল সে দেশের সেনাবাহিনী, যারা ১৯৫২ সাল থেকে একটানা ৬০ বছর মিসরের শাসন পরিচালনা করেছে। ক্ষমতা হারালেন মুরসি। সেনাশাসনকে পাকাপোক্ত করতে কোনো ধরনের মতৈক্য ছাড়াই আয়োজিত গণভোটে রায় এল ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে এবং বিপুলভাবে। আসলে ‘না’ যে বলা যাবে, এটাই বহু ভোটার জানতেন না। মিসরের নতুন শাসকেরা ব্রাদারহুডকে ‘সন্ত্রাসী’ তকমা দিয়ে নিষিদ্ধ করেছেন, কারাগারে পাঠিয়েছেন এ দলের নেতাদের, জব্দ করেছেন সম্পদ। ইজিপশিয়ান ইনিশিয়েটিভ ফর পার্সোনাল রাইটসের প্রতিষ্ঠাতা হোসাম বাঘাতের ভাষায়, এই শাসকেরা মোবারকের জামানাকেও হার মানিয়েছে। উল্লেখ্য, হোসনি মোবারক নিজেও সেনাবাহিনী থেকে এসে প্রায় ৪০ বছর মিসর শাসন করে গেছেন।
সামরিক বাহিনী ক্ষমতায় আসার মিসরের উদারপন্থীরা খুশি। তাদের সেই খুশি ঝরে পড়ছে সেনাশাসক সিসির প্রতি আপ্লুত ভাবাবেগে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেনাবাহিনী কি শেষ পর্যন্ত দেশটিতে শান্তি আনতে পারবে? নাকি এখানেও দুই পক্ষের মধ্যে একটা সমঝোতার দরকার ছিল, যে পথ ইতিমধ্যে তিউনিসিয়া দেখিয়ে দিয়েছে। কায়রোর আইনজ্ঞ জায়েদ আল-আলীর কথায়, ‘তিউনিসিয়ায় পুরো পাতাটাই উল্টানো হয়েছে এবং তাই তুমি বুঝতে পারবে যে সেখানে বিপ্লব এসেছিল। কিন্তু মিসরের ক্ষেত্রে তা (বিপ্লব/আরব বসন্ত) তা বিতর্কিতই থেকে গেল।’
২০১১ সালের একই সময়ে একই পথে যাত্রা করে আরব বিশ্বের দুটি দেশের যাত্রা কেন বিপরীতমুখী হয়ে গেল, তা হয়তো ভবিষ্যতের গবেষকদের জন্য তোলা থাকবে। তত দিনে নীল নদের তীরের এই দেশে আর কত রক্তপাত হবে কে জানে!
ইন্টারন্যাশনাল নিউইয়র্ক টাইমস অবলম্বনে

তিউনিসিয়ার গণবিক্ষোভে অস্বস্তিতে ভুগছে আরব বিশ্বের নেতারা

Monday, January 17, 2011

তিউনিসিয়ার প্রেসিডেন্ট জয়নুল আবেদিন বেন আলীর ক্ষমতাচ্যুতির পর আরববিশ্বের সরকারগুলো উদ্বিগ্নভাবে সেখানকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। আরববিশ্বে এই আশঙ্কার সৃষ্টি হয়েছে যে গণবিক্ষোভের ধাক্কা শেষ পর্যন্ত আরববিশ্বের অন্যান্য দেশেও লাগতে পারে।
দীর্ঘ ২৩ বছর লৌহকঠিন হাতে দেশ শাসনের পর গত শুক্রবার গণবিক্ষোভের কাছে নতি স্বীকার করে সৌদি আরবে পালিয়ে যান বেন আলী। এই প্রথম কোনো আরব নেতা গণবিক্ষোভের কাছে হার মেনে দেশ ছাড়লেন।
বেন আলীর ক্ষমতাচ্যুতি সম্পর্কে মন্তব্য করার ব্যাপারে সতর্ক মধ্যপ্রাচ্যের প্রশাসনগুলো। উত্তর আফ্রিকার ওই দেশটিতে গণ-অভ্যুত্থানের সুবিধা নিতে চাইছে বিরোধী পক্ষগুলো। এই পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো ক্রমবর্ধমান অস্বস্তিতে ভুগছে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
আরববিশ্বের ঘটনাবলি থেকে দূরে থাকতে পশ্চিমাবিশ্বকে সতর্ক করে দিয়েছেন মিসরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আহমেদ আবুল ঘেইত। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন চলতি সপ্তাহে সংস্কারের জন্য জনগণের সঙ্গে কাজ করতে আরব নেতাদের প্রতি আহ্বান জানানোর পর তিনি এই সতর্কবাণী উচ্চারণ করলেন।
এদিকে তিউনিসিয়ার মতো গণ-অভ্যুত্থান অন্যান্য আরব দেশেও ছড়িয়ে পড়তে পারে—এই আশঙ্কাকে ‘অর্থহীন’ বলে বর্ণনা করেছেন মিসরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। অর্গানাইজেশন অব দ্য ইসলামিক কনফারেন্স (ওআইসি) তিউনিসিয়ার ঘটনাবলিকে ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়’ হিসেবে বর্ণনা করেছে।
জাতীয় ঐক্য বজায় রাখতে ও দেশের ভিত্তি দুর্বল করার যেকোনো অপচেষ্টা রুখে দেওয়ার জন্য তিউনিসীয়দের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত।
এদিকে বেন আলীর পতন ইয়েমেনি তরুণদের মনে সাহসের সঞ্চার করেছে বলেই মনে হচ্ছে। দেশটির প্রায় এক হাজার তরুণ নেমে আসেন রাজধানী সানার রাজপথে। নিজ নিজ নেতাদের বিরুদ্ধে জেগে ওঠার জন্য আরবদের প্রতি তাঁরা আহ্বান জানান।
সানা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে শিক্ষার্থীদের একটি শোভাযাত্রা তিউনিসিয়া দূতাবাস অভিমুখে যায়। নিজ নিজ ‘সন্ত্রস্ত ও কপট নেতাদের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানের জন্য’ তাঁরা আরব জনগণের প্রতি আহ্বান জানান।
শোভাযাত্রায় শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন ধরনের ব্যানার বহন করেন। একটি ব্যানারে ইয়েমেনের প্রেসিডেন্ট আলী আবদুল্লাহ সালেহর নাম উল্লেখ না করে বলা হয়, ‘ক্ষমতাচ্যুত করার আগেই ক্ষমতা ত্যাগ করুন।’ সিরিয়ার সরকারপন্থী দৈনিক আল-ওয়াতান-এ বলা হয়, তিউনিসিয়ার ঘটনাবলি এমন একটি শিক্ষা, যা কোনো আরব সরকারেরই উপেক্ষা করা ঠিক হবে না।
জর্ডানের শক্তিশালী ইসলামি সংগঠন সত্যিকারের সংস্কার সাধনের জন্য আরব নেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। সরকারের অর্থনৈতিক নীতির প্রতিবাদে পার্লামেন্টের বাইরে আয়োজিত এক সমাবেশে ব্রাদারহুডের প্রধান হাম্মাম বলেন, ‘তিউনিসিয়ার জনগণ যেভাবে ভুগেছিল, জর্ডানে আমরাও একইভাবে ভুগছি।’ এএফপি।

বিপ্লবের প্রতীক বোয়াজিজি

Sunday, January 16, 2011

নগণের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনেই জাইন এল আবিদিন বেন আলীর পতন ঘটেছে। কোনো একক দল বা নেতা এই আন্দোলন গড়ে তোলেননি। ২৩ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা রাষ্ট্রনায়কের বিরুদ্ধে রাস্তায় নামতে মানুষকে সাহস জুগিয়েছেন অখ্যাত যুবক মোহাম্মদ বোয়াজিজি।

নিজের জীবন দিয়ে তিনি জাইন এলের অপশাসনের চিত্র তুলে ধরেছেন দেশবাসীর সামনে। তাই সরকার পতনের পর বোয়াজিজি পাচ্ছেন জাতীয় বীরের মর্যাদা।
তিউনিসিয়ায় গণ-আন্দোলন শুরু হয় বোয়াজিজির প্রতিবাদের মাধ্যমেই। ২৬ বছর বয়সী এ যুবক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা নিয়েও চাকরি পাচ্ছিলেন না। নিরুপায় হয়ে রাস্তায় ফল বিক্রি শুরু করেন। কিন্তু সরকারের কাছ থেকে দোকানদারির অনুমতি নেননি বলে ১৭ ডিসেম্বর পুলিশ তাঁর ফলের ঝুড়ি ও টাকাপয়সা কেড়ে নেয় এবং নির্যাতন করে। স্থানীয় কর্মকর্তাদের কাছে গিয়ে বোয়াজিজি প্রতিবাদ জানালেও কেউ তাঁকে সহায়তা করেননি। ক্ষোভ-দুঃখ আর অপমানে ওই দিনই সিদি বোজিদ এলাকায় শত শত মানুষের সামনে গায়ে আগুন ধরিয়ে দেন তিনি। এ ঘটনার পরই বেকারত্ব দূর করার দাবিতে তিউনিসিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিক্ষোভ শুরু হয়। ধীরে ধীরে তা ছড়িয়ে পড়ে সব শ্রেণী-পেশার মানুষের মধ্যে। গত ৪ জানুয়ারি যখন হাসপাতালে বোয়াজিজির মৃত্যু হয়, তখন প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়েছে তিউনিসিয়ার অলি-গলিতে।
তিন সপ্তাহের আন্দোলনে তিউনিসিয়ায় ৬৬ জন বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছে বলে দাবি করছে মানবাধিকার সংগঠনগুলো। এত মৃত্যুর মধ্যেও বোয়াজিজির আত্মাহুতির বিষয়টি বিশেষ মর্যাদা পাচ্ছে। মানুষকে রাস্তায় নামতে অনুপ্রাণিত করার জন্য তাঁর শরীরে আগুন লাগানোর ছবিটিই ব্যবহার করেছে বিক্ষোভকারীরা। বোয়াজিজির নামে ফেইসবুকে একটি পেইজ খোলা হয়েছে, যাতে তাঁর পরিচয় দিয়ে লেখা হয়েছে, 'তিউনিসিয়ার বিপ্লবের প্রতীক'। আর বোয়াজিজির মতো সাহসী ও প্রতিবাদী যুবকের অপেক্ষা করছে অন্যান্য আরব দেশের নিপীড়িত মানুষ। মিসরের মানবাধিকারকর্মী আবদেল হালিম কানদিল যেমন বলেছেন, 'বোয়াজিজির মতো একজন মানুষ দরকার আমাদের।' সূত্র : নিউইয়র্ক টাইমস।

তবে কি ঘুম ভাঙল আরবদের by ইব্রাহীম বিন হারুন

Saturday, January 15, 2011

ণ-আন্দোলন কিভাবে ক্ষমতা আঁকড়ে থাকা শাসককে রাস্তায় ছুড়ে ফেলে, এর সর্বশেষ নজির তিউনিসিয়া। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে এই নজির ঢের থাকলেও তেল-সমৃদ্ধ আরব দেশগুলো কখনোই এমন অভিজ্ঞতার মুখে পড়েনি। সেই দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন জায়িন এল আবিদিন বেন আলী।

উত্তর আফ্রিকার দেশ তিউনিসিয়ার প্রেসিডেন্ট জায়িন এল আবিদিন গত শুক্রবার গণ-আন্দোলনের মুখে দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। ২৩ বছর ধরে ক্ষমতায় ছিলেন তিনি। অথচ তিন সপ্তাহের আন্দোলনেই তাঁর 'ফাঁপা' মসনদ গুঁড়িয়ে গেছে। আর এ ঘটনাই নতুন বার্তা ছড়িয়ে দিয়েছে আরব বিশ্বে। বিশ্লেষকদের ধারণা, তিউনিসিয়া থেকে বিক্ষোভের স্ফুলিঙ্গ আরবের অন্য দেশেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
তিউনিসিয়া ভৌগোলিকভাবে উত্তর আফ্রিকার অংশ হলেও জাতিগত বিচারে আরব বিশ্বের অংশ। শুধু জাতিতে না, পরম্পরায়ও মিল আছে এসব দেশের মধ্যে। বেশির ভাগ আরব দেশেই আজও জনগণের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়নি। কয়েকটি দেশ রাজতন্ত্র থেকে সরে এলেও সত্যিকার অর্থে সেখানে গণতন্ত্র আসেনি। একবার ক্ষমতা দখল করা শাসকরা নানা কৌশলে বছরের পর বছর ক্ষমতা আঁকড়ে রাখছেন। প্রকাশ্যেই বিরোধীদের ওপর দমন-নিপীড়ন চালিয়ে মসনদ নিরাপদ রেখেছেন তাঁরা। তিউনিসিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতায় থাকা একনায়করা (লিবিয়ায় গাদ্দাফি ৪১ বছর, মিসরে মোবারক ২৯ বছর, সুদানে বশির ১৮ বছর, আলজেরিয়ায় আজিজ ১২ বছর) এ প্রবণতার প্রমাণ। তবে ক্ষমতা আঁকড়ে থাকলেও তাঁরা কখনো গণ-আন্দোলনের মুখে পড়েননি। তাই একটি ধারণা সৃষ্টি হয় যে, আন্দোলনের মাধ্যমে আরব বিশ্বে সরকারের পতন ঘটানো যায় না। কিংবা আরবরা বড় ধরনের আন্দোলন গড়ে তুলতে পারে না।
গণ-আন্দোলন না ঘটলেও আরব দেশগুলোতে সামরিক অভ্যুত্থান কিংবা বিদেশি হস্তক্ষেপের মাধ্যমে মাঝেমধ্যে ক্ষমতার পালাবদল ঘটেছে। এ ভয় থেকেই প্রতিবেশী একনায়কদের মতো সামরিক বাহিনীর ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ছিল জায়িন এলের। সাদ্দাম হোসেনের মতো ভুল করে তিনি যুক্তরাষ্ট্রকেও খেপিয়ে তোলেননি। যাবতীয় সুরক্ষা-ব্যবস্থা থাকায় ৭৪ বছর বয়সী এ নেতা তিউনিসিয়ায় পরিচিত ছিলেন 'বিন এ ভাই' বা 'আমৃত্যু প্রেসিডেন্ট' হিসেবে। তবে শেষ রক্ষা হলো না। এ ঘটনায় নড়েচড়ে বসেছেন প্রতিবেশী একনায়করাও। বিশ্লেষকরা এ ঘটনাকে দেখছেন আরব জনগণের 'ঘুম ভাঙা' হিসেবে। প্যারিসের রাজনৈতিক বিশ্লেষক বুরহান ঘালিউন বলেছেন, 'বছরের পর বছর ঘুমিয়ে থাকা আরবদের জাগিয়ে তুলবে তিউনিসিয়া।' এক মিসরীয় তাঁর টুইটার বার্তায় লিখেছেন, 'আরব নেতারা ভয়ে ভয়ে তিউনিসিয়ার ঘটনা পর্যবেক্ষণ করছে। আর আরব নাগরিকরা আশা নিয়ে তাকিয়ে আছেন দেশটির দিকে।'
বিশ্লেষকদের মতে, লিবিয়া বা মিসরের মানুষ কখনো অভিন্ন দাবি নিয়ে একনায়কের বিরুদ্ধে আন্দোলনের বিষয়ে একমত হতে পারেনি। যদিও অর্থনৈতিক মন্দা ও দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি এসব দেশের জনগণের জন্য অভিন্ন ইস্যু সৃষ্টি করছে। কারণ, আরব দেশগুলো ধনী হলেও এসব দেশেও সাধারণ মানুষের বেকারত্ব ও দারিদ্র্য ব্যাপকভাবে বেড়েছে। বেড়েছে ধনী-দরিদ্র বৈষম্য। এ পরিস্থিতিতে একনায়ক, তাঁদের স্বজন ও কাছের লোকদের দুর্নীতি ও বিপুল অর্থবিত্ত স্বাভাবিকভাবেই ক্ষুব্ধ করে তুলছে জনগণকে। তিউনিসিয়ার আন্দোলনও শুরু হয় বেকারত্ব ও দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদে। ইতিমধ্যে আরব বিশ্বের জর্দান, লিবিয়া, মরক্কো, মিসর ও আলজেরিয়ায়ও একই দাবিতে বিক্ষোভ হয়েছে। বিক্ষোভকারীরা তিউনিসিয়ার ঘটনা থেকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হবেন বলেই ধারণা করা হচ্ছে। গতকালই কায়রোতে একটি মিছিল থেকে স্লোগান দেওয়া হয়, 'মোবারকের পতন চাই। জায়িন এলও প্রতারক, মোবারকও প্রতারক, গাদ্দাফিও প্রতারক।' মিছিলেরই একজন চিৎকার করে বলেন, 'জায়িন এল, মোবারককে বলে দিও_তাঁর পালানোর জন্যও একটি বিমান অপেক্ষা করছে।'

তিউনিসিয়ায় স্পিকার অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট

ণবিক্ষোভের মুখে তিউনিসিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট জয়নুল আবেদিন বেন আলীর দেশত্যাগের পর সেখানে নৈরাজ্য ছড়িয়ে পড়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে তিউনিসিয়ার অন্তবর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিয়েছেন দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকার ফুয়াদ মেবাজা।

অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট বিরোধীদের নিয়ে তিউনিসিয়ায় একটি ঐকমত্যের সরকার গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
এদিকে, সাবেক প্রেসিডেন্টের পদত্যাগের পর থেকেই রাজধানী তিউনিসসহ সারা তিউনিসিয়ায় ব্যাপক লুটপাট শুরু হয়েছে। বিক্ষুব্ধ জনতা বিভিন্ন স্থাপনায় অগ্নিসংযোগ করছে। পাল্টাপাল্টি গুলির ঘটনাও ঘটছে।
গতকাল শনিবার তিউনিসিয়ার পর্যটন নগর মোনাসিরের একটি কারাগারে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এতে কমপক্ষে ৪২ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। তাত্ক্ষণিকভাবে এই অগ্নিকাণ্ডের কারণ জানা জায়নি। তবে ধারণা করা হচ্ছে, কারাবন্দীরা পালিয়ে যাওয়ার জন্য এ ঘটনা ঘটাতে পারে। দেশটির অন্য কারাগারগুলোতে সহিংস ঘটনার খবর পাওয়া গেছে।
পুরো দেশেই মানুষ আইন নিজের হাতে তুলে নিয়েছে বলে জানা গেছে। দেশজুড়েই বিভিন্ন বিপণি-বিতান ও ঘরবাড়িতে ভাঙচুর এবং লুটপাটের ঘটনা ঘটছে। সাবেক প্রেসিডেন্ট বেন আলী ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বাড়িঘরই বিক্ষুব্ধ জনতার আক্রমণের প্রধান লক্ষ্যে পরিণত হয়েছে।
এই অরাজক পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে দেশটিতে কারফিউ বলবত্ করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, সাবেক প্রেসিডেন্টের অনুসারীরাই পরিস্থিতি অস্থিতিশীল ও অরাজক করতে এসব সহিংস ঘটনা ঘটাচ্ছে।
গতকাল শনিবার দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট বেন আলী জনতার তীব্র রোষের মুখে পদত্যাগ করেন এবং দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। বেন আলী সরকারের দুর্নীতি, অপশাসন ও ব্যর্থতার বিরুদ্ধে কয়েক সপ্তাহ ধরে দেশটিতে বিক্ষোভ চলছিল। রয়টার্স, বিবিসি অনলাইন, আল-জাজিরা।
 
Support : Dhumketo ধূমকেতু | NewsCtg.Com | KUTUBDIA @ কুতুবদিয়া | eBlog
Copyright © 2013. Edu2News - All Rights Reserved
Template Created by Nejam Kutubi Published by Darianagar Publications
Proudly powered by Dhumketo ধূমকেতু