পুলিশের ঈদ চাঁদাবাজি by আবু হেনা রাসেল ও এস এম আজাদ

Thursday, August 11, 2011

ঢাকার মিরপুর ১ নম্বরের শপিং কমপ্লেক্সে সামনে ফুটপাতের কাছে গত শনিবার মোটরসাইকেলে করে এসে দাঁড়ালেন শাহ আলী থানার এসআই তরিকুল ইসলাম। ফুটপাতের এক দোকানদারকে লক্ষ্য করে তিনি বললেন, 'তাড়াতাড়ি সরা। দুই দিন তো মালপানি দিস না।' দোকানি বললেন, 'স্যার, যে বৃষ্টি, দোকানই তো সাজাইতে পারি না! আপনাগো কী দিমু?' পরে নিজের দোকান গুটানোর সময় সিদ্দিক মিয়া নামের ওই হকার বললেন, "ভাই, পুলিশকে প্রতিদিন ২৭০ থেকে ৩০০ টাকা করে দিতে হয়। একে বলে 'পুলিশের কাবজাব'। টাকা না দিলে ওরা আমগো ধইরা মাজারের পাশে নিয়া আটকাইয়া রাইখা টাকা আদায় করে।"
নিউমার্কেট এলাকায় ঢাকা কলেজের বিপরীত দিকের গ্লোব শপিং কমপ্লেক্সে সামনে ফুটপাতের গেঞ্জি বিক্রেতা সেলিম বললেন, 'ঈদের সময় বেচাকেনা না অইলেও ট্যাকা বাড়াইয়া দিতে অইতাছে। ওগো ঠিকমতো ট্যাকা না দিলেই বিপদ। কিছুই কওয়ার নাই। কিছু কইলেই রোজার দিনে ইফতারির বদলে লাথি আর লাঠি জুটব কপালে। ঘাড় ধইরা উঠাইয়া দিব।'
সরকারি রাস্তার ওপর ৪০ ইঞ্চি ও ৫২ ইঞ্চি প্রশস্ত দুটি চৌকি-দোকানের জন্য সেলিমকে এখন প্রতিদিন চাঁদা দিতে হয় ৫০০ টাকা করে। পুলিশের হয়ে এই টাকা তুলছে 'লাইনম্যান' রফিক ও আকবর।
রমজানের আগে চাঁদা ছিল ২০০ টাকা, ঈদ উপলক্ষে ৩০০ টাকা বেড়েছে।
গত সোমবার বিভিন্ন সূত্রে এসব তথ্য সংগ্রহের সময় কালের কণ্ঠকে সেলিম বললেন, 'ভাই, আমি সামান্য হকার। উল্টা-পাল্টা কিছু লেইখেন না। আমি কারো বিরুদ্ধে বলতে চাই না।'
সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা গেছে, পেশাদার চাঁদাবাজদের পাশাপাশি পুলিশের চাঁদাবাজিতে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন রাজধানীর ফুটপাত ব্যবসায়ীরা। শুধু চাঁদাবাজিই নয়, ঈদকে সামনে রেখে নিউমার্কেটের এসব ফুটপাতও ব্যবসায়ীদের কাছে রীতিমতো বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। হকার-ব্যবসায়ীদের কাছে এটার নাম 'পজিশন বাণিজ্য'। ৪০ ইঞ্চি ফুটপাতের পজিশন শুধু চলতি মাসের জন্য বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকায়। ঈদের কারণে দৈনিক চাঁদার হারও তারা বাড়িয়ে দিয়েছে। ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, ফুটপাতে ব্যবসা করতে গেলে স্থানীয় ক্ষমতাসীন দলের নেতা, ছাত্রনেতা, পেশাদার সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজসহ অনেককেই টাকা দিতে হয়। আর পুলিশকে টাকা না দিয়ে দোকান বসানোর তো প্রশ্নই ওঠে না।
নিউমার্কেটের আটটি ফুটপাত-মার্কেটসহ রাজধানীর প্রধান প্রধান ফুটপাত-বাজারগুলো ঘুরে পুলিশের চাঁদাবাজির ভয়াবহ চিত্র দেখা গেছে। জানা গেল, মিরপুর রোডের নেওয়াজ পাম্পের সামনে থেকে নিউমার্কেট ফুট ওভারব্রিজ পর্যন্ত রাস্তার দুই পাশে পুলিশের হয়ে টাকা ওঠায় লাইনম্যান রফিক ও আকবর। রফিক নিজেকে হকার্স লীগের নেতা বলেও পরিচয় দেয়।
বাংলাদেশ জাতীয় হকার্স ঐক্য পরিষদের আহ্বায়ক কামাল সিদ্দিকী কালের কণ্ঠকে বলেন, 'হকাররা এখন চলে গেছে পুলিশের লাইনম্যানের নিয়ন্ত্রণে। এরা মূলত পুলিশের দালাল। ওদের ভয়ে হকাররা প্রতিবাদও করতে পারে না।'
রাজধানীতে সবচেয়ে বেশি হকার বসে নিউমার্কেট ও গুলিস্তান এলাকায়। ছিন্নমূল হকার্স সমিতির তথ্য অনুযায়ী, গুলিস্তান এলাকায় হকারের সংখ্যা প্রায় ৫০ হাজার। নিউমার্কেট এলাকায় প্রায় ৪০ হাজার। এর পরই হকারের সংখ্যাধিক্য সায়েদাবাদ-যাত্রাবাড়ী, তারপর ফার্মগেট-কারওয়ান বাজার এলাকায়।
পুরানা পল্টনের ৬২/২ নম্বর ভবনের সামনের ফুটপাতের টুপি বিক্রেতা আবুল বাশার বললেন, 'এত দিন ৩০ ট্যাকা কইরা দিয়া আসতাছি। হুনলাম আজ থাইক্যা ২০ ট্যাকা বাড়াইয়া ৫০ করছে। অহনো দেই নাই। তয় দিতে অইব।' তিনি আরো জানান, দৈনিক বাংলা মোড় থেকে পল্টন মোড় পর্যন্ত পুরো ফুটপাতে পুলিশের হয়ে চাঁদা আদায় করে লাইনম্যান নূর মিয়া ওরফে কাইল্যা নূর, শাহজালাল, কামরুল ও গোলাপ।
সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা গেছে, বায়তুল মোকাররমের মোড় থেকে গুলিস্তানের সব ফুটপাতেই দোকানপ্রতি এখন প্রতিদিন ১০০ থেকে ২০০ টাকা করে চাঁদা দিতে হয় পুলিশকে। কিছুদিন আগেও এ হার ছিল ৩০ টাকা। গুলিস্তানের ২২টি ফুটপাতই নিয়ন্ত্রণ করছে আবদুস সালাম নামে পুলিশের এক লাইনম্যান। সালাম নিজেকে যুবলীগ নেতা পরিচয় দিয়ে থাকে। তবে জানা গেছে, গত সরকারের আমলেও সালাম ওই এলাকায় লাইনম্যান হিসেবে কাজ করেছে।
বায়তুল মোকাররমের পশ্চিম পাশ হয়ে বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামের ফুটপাতে পুলিশের হয়ে চাঁদা তোলে লাইনম্যান কোটন। বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ের আশপাশে আকতার হোসেন এবং আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের সামনে ফুটপাতে দোকানপ্রতি ১০০ টাকা করে চাঁদা নেয় লাইনম্যান আবুল হোসেন। ভাষানী হকি স্টেডিয়ামের সামনে ও বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামের ২ নম্বর গেটে দীর্ঘদিন ধরেই পুরনো এবং চোরাই ইলেকট্রনিঙ্ পণ্যের ফুটপাত-বাজার চলছে। এই এলাকায় টাকা তুলছে পল্টন থানার লাইনম্যান আলী। সে নিজেকে ৩৬ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের নেতা পরিচয় দেয়। তার সহযোগীরা হচ্ছে জুনিয়র লাইনম্যান সোহেল, পায়েল, আনোয়ার ও কবির। বায়তুল মোকাররম মসজিদের ২ নম্বর গেট এলাকার লাইনম্যানগিরি করে পটল আর মসজিদের সামনে কাদির। রমনা ভবনের পাশে ফুটপাত থেকে দোকানপ্রতি ১০০ টাকা করে চাঁদা তুলছে লাইনম্যান রানা। পাশের রাস্তা দখল করে গড়ে উঠেছে ফল বাজার। দোকানদাররা জানান, থানার জন্য চাঁদার টাকা ওঠায় লাইনম্যানরা। আর প্রতিদিন টহল পুলিশ নিজেরাই এসে নিয়ে যায় দোকানপ্রতি ২০ টাকা করে। পুলিশের ভাষায় এটা চাঁদা না, 'চা খরচা'।
বঙ্গবন্ধু হকার্স মার্কেটের পাশে ফুটপাতের দোকানগুলোতে চাঁদা আদায় করছে লাইনম্যান দুলাল ও মনির, গোলাপশাহ মাজার থেকে ঢাকা ট্রেড সেন্টার পর্যন্ত দেড় শ টাকা করে চাঁদা তুলছে লাইনম্যান বিমল বাবু। জাতীয় গ্রন্থাগারের পাশে বাবুল ও শহীদ, সুন্দরবন স্কয়ার মার্কেটের আশপাশে জজ মিয়া, জিপিওর সামনে কবির, আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের পেছন দিকে সালাম, হিন্দু বাবুল ও বিমল বাবু, গুলিস্তান হল মার্কেটের সামনে স্বেচ্ছাবেক লীগ নেতা পরিচয়ধারী বাবুল এবং জুতাপট্টিতে মঙ্গল নামে আরেক যুবলীগ নেতা পুলিশের হয়ে টাকা তোলে। গুলিস্তান ট্রেড সেন্টারের পাশে আহাদ, পুলিশ বঙ্ জুতাপট্টিতে ওয়ার্ড ছাত্রলীগ সেক্রেটারি রাহাত এবং ট্রেড সেন্টারের পাশ থেকে নিউ রাজধানী পর্যন্ত ৫৬ নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক নাছির পুলিশের লাইনম্যান। তাদেরকে চৌকিপ্রতি প্রতিদিন ১০০ ও সপ্তাহে আলাদাভাবে ২০০ টাকা করে দিতে হয় ব্যবসায়ীদের। মহানগর নাট্যমঞ্চের সামনে থেকে গুলিস্তান আন্ডারপাস পর্যন্ত টাকা তোলে লাইনম্যান হারুন, গুলিস্তান গার্ডেনের সামনে আল মুনসুর থেকে হল মার্কেট পর্যন্ত বড় মিয়া এবং উল্টো পাশের ফুটপাত দেখে হাসান ও সুলতান। কাজী বসিরউদ্দিন নাট্যমঞ্চের পেছনে টাকা ওঠায় রিপন।
এদিকে ধানমণ্ডি হকার্স মার্কেটের সামনে থেকে গ্লোব শপিং সেন্টার পর্যন্ত হকার্স লীগ নেতা রফিক, ৫২ নং ওয়ার্ড যুবলীগ নেতা ইসমাইল, হোসেন ও আকবর দোকানপ্রতি ৫০ থেকে ২৫০ টাকা করে চাঁদা তুলছে। প্রিয়াঙ্গন শপিং সেন্টারের সামনে থেকে সানমুন টেইলার্সের কোনা পর্যন্ত ৫২ নং ওয়ার্ড ছাত্রলীগ সভাপতি ফরিদ ও সাধারণ সম্পাদক মিজানের নামে লাইনম্যান বাচ্চু; গাউছিয়া মার্কেট এলাকায় বাংলাদেশ হকার্স সমিতির সভাপতি হোসেন মোল্লা ও ধানমণ্ডি থানা ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি আমির হোসেন এবং নিউমার্কেট ৪ নম্বর গেট থেকে ২ নম্বর গেট পর্যন্ত চাঁদা তোলে নিউমার্কেট থানা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি সাত্তার মোল্লা। জানা গেছে, নিউমার্কেটের দুটি ফুটপাত ঢাকা সিটি করপোরেশন থেকে ইজারা নেন ৫২ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সহসভাপতি মুখলেছুর রহমান ও ৫২ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর। এ নিয়ে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা মামলাও করেন। কিন্তু কোনো কাজ হয়নি। এ দুটি ফুটপাতে তাঁরা দোকান বরাদ্দ দিয়েছেন ২৮০টি। এখন দুই ফুটপাতে পজিশন বিক্রি করে ও টাকা তোলে লাইনম্যান সাত্তার মোল্লা। রাফিন প্লাজার সামনে স্থানীয় যুবলীগের মাইনুল ইসলাম, আনন্দ বেকারির পাশ থেকে নিউমার্কেট কাঁচাবাজার পর্যন্ত আবদুল জলিল, চন্দ্রিমা সুপার মার্কেটের সামনের ফুটপাতে মনির, ঢাকা কলেজের সামনের ফুটপাতে বিভিন্ন দোকান থেকে ঢাকা কলেজের ছাত্রলীগ নেতা পরিচয়ে চাঁদা আদায় করে কয়েকজন। পুলিশও নিয়মিত ১০ টাকা করে নিয়ে যায়।
যাত্রাবাড়ী এলাকায় শহীদ ফারুক সড়কসহ আশপাশে চাঁদা তুলছে লাইনম্যান মান্নান, মনির, সোনা মিয়া, অনু ও তোরাব আলী। প্রতিদিন লাইম্যানরা এই টাকা বুঝিয়ে দেয় যাত্রাবাড়ী থানার এসআই হোসেনের হাতে।
এ ছাড়া মতিঝিলের জনতা ব্যাংক ভবনসংলগ্ন ফুটপাতে বড় হারুন, লিটন ও চুইলা বাবু, ফার্মগেট এলাকায় চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করে যুবলীগ নেতা শাহআলম ও বিএনপি নেতা দুলাল আর ফুটপাতে টাকা তোলে লাইনম্যান হায়দার, বরিশাইল্লা হারুন, চুন্নু, আলমগীর, ঘড়ি সাইদ, সাইদ, মোবারক, শামসু, তোয়ালে কামাল, তৌহিদ, কাজল ও মোফাজ্জল। কারওয়ান বাজার এফডিসিসংলগ্ন রেলক্রসিং এলাকায় কমিউনিটি পুলিশ নেতা সিরাজ ও জিআরপির কনস্টেবল নুরু টাকা তোলে। পুলিশের হয়ে পুরো কারওয়ান বাজার নিয়ন্ত্রণ করে আনোয়ার হোসেন, এল রহমান এবং সাহেব আলী নামের তিন প্রভাবশালী ব্যক্তি। চেয়ারম্যানবাড়ী থেকে কাকলী ব্রিজ পর্যন্ত আবদুল ও মাসুম, মহাখালী ফ্লাইওভারের নিচে বাদল, খলিল ও আকরাম আর বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশন এলাকায় জিআরপির এসআই নজরুল নিজেই হকারদের কাছ থেকে টাকা আদায় করেন।
বাংলাদেশ হকার্স লীগের সভাপতি এম এ কাশেম কালের কণ্ঠকে বলেন, 'এই চাঁদাবাজরা আসলে পুলিশের লাইনম্যান ও দালাল। পুলিশ নিজেরা চাঁদা তুলতে পারে না বলে এদের ব্যবহার করছে। এসব বিষয়ে সরকারের ঊর্ধ্বতন মহলে জানিয়েও প্রতিকার মিলছে না। কারণ, এই চক্রে সব সময়ই সরকারি দলের নেতারা জড়িত থাকেন।'
ফুটপাতের ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে গুলিস্তানের সার্জেন্ট আহাদ পুলিশ বক্সের দায়িত্বরত টিএসআই শাহাবুদ্দিন বলেন, 'এখানে ফুটপাতে দোকান বসতে দেওয়া হয় না। চাঁদা কারা নেয় তা ভালো করে খোঁজ নিলেই জানতে পারবেন। বক্স পুলিশ এসবের সঙ্গে জড়িত না।'
চাঁদাবাজির অভিযোগ সম্পর্কে জানতে আবদুস সালামের মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তাঁর ভাই পরিচয় দিয়ে এক ব্যক্তি বলেন, 'এই এলাকায় সালাম একা চাঁদা নেয় না। মূলত সে প্রশাসনের দিকটা দেখে।'
পল্টন থানার ওসি শহীদুল হক ফুটপাত থেকে চাঁদা নেওয়ার অভিযোগ সম্পর্কে বলেন, 'থানা পুলিশের মাঠপর্যায়ের কেউ কেউ এ কাজ করতে পারে, তবে তিনি বা তাঁর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এ বিষয়ে জানেন না। আসলে পুলিশ নয়, রাজনৈতিক দলের নেতারাই নিয়ন্ত্রণ করে ফুটপাত। বিভিন্ন সংগঠনের নামে চাঁদা তোলা হয়। ফুটপাত হকারমুক্ত করতে গিয়ে গত বছর পুলিশের ওপর হামলা হয়েছিল। মানবিক কারণে হকারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যায় না।'
অথচ মিরপুর এক নম্বরের ফুটপাতের কয়েকজন হকার জানান, এই এলাকায় পুলিশ নিজেরাই সরাসরি মাঠে নেমেছে। শাহআলী থানার সিভিল টিমের এসআই বাবু কৃষ্ণ সাহা ও লতিফ কাঁচাবাজার, মুক্তিযোদ্ধা মার্কেটসহ আশপাশের প্রতিটি দোকান থেকে মাসে চার হাজার টাকা ওঠান। সঙ্গে থাকে সাঈদ নামে তাঁদের লাইনম্যান। কো-অপারেটিভ মার্কেটে তৈরি পোশাক বিক্রেতা শামছু ও মিজান জানান, প্রতিদিন দোকানপ্রতি থানা পুলিশকে দিতে হয় ১৫০ টাকা। কালু মিয়া নামে শাহআলী থানার ওসির এক লাইনম্যান কাঁচাবাজার থেকে প্রতি মাসের জন্য ছয় হাজার করে টাকা তোলে। গাবতলী টার্মিনাল ও দারুস সালামে পেট্রোল ইন্সপেক্টর (পিআই) তৈয়বুর রহমান নিজেই টাকা তোলেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। দিয়াবাড়ী এলাকায় পুলিশের লাইনম্যান কালাম টাকা ওঠায় দারুস সালাম থানার ওসি আবদুল মালেক ও অপারেশন অফিসার আবদুস সালামের নামে। ব্যবসায়ীরা এই অভিযোগ করলেও কালের কণ্ঠের কাছে ওই দুই পুলিশ কর্মকর্তা অভিযোগ অস্বীকার করেন।
মতিঝিলের আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের পাশে হকাররা গড়ে তুলেছে ফুটপাত মার্কেট। স্থানীয় লোকজনের কাছে এটি লেডিস মার্কেট নামে পরিচিত। এখানকার ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, শাহজাহানপুর পুলিশ ফাঁড়ি ও মতিঝিল থানা তাঁদের কাছ থেকে লাইনম্যানদের মাধ্যমে প্রতিদিনই টাকা নেয়। সাইফুল ও ফল বেপারি নামে পরিচিত এক লাইনম্যান এসব চাঁদা তুলে থাকে।
এই অভিযোগের ব্যাপারে মতিঝিল থানার ওসি তোফাজ্জল হোসেন বলেন, 'শুক্রবারে রাস্তায় বসে হকাররা। আর অন্য দিন ফুটপাতে। পুলিশের নামে চাঁদাবাজির অভিযোগ বহু আগে থেকেই শুনে আসছি। এর কোনো ভিত্তি আছে বলে মনে করি না।'

পুলিশ বেপরোয়া রুখবে কে by শরীফুল ইসলাম ও সাহাদাত হোসেন

Wednesday, August 10, 2011

বেপরোয়া হয়ে উঠছে পুলিশ। একের পর এক লোমহর্ষক ও বিতর্কিত ঘটনার জন্ম দিয়ে চলেছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত এ সংস্থাটি। জানমাল রক্ষার পরিবর্তে পুলিশ এখন ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে বলে ধারণা অনেকের মধ্যে বদ্ধমূল হচ্ছে। অভিযোগ উঠেছে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও পুলিশকে যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। গণমাধ্যমে এ নিয়ে বেশ সমালোচনাও হচ্ছে। সরকারের ভাবমূর্তিও নষ্ট হচ্ছে ব্যাপকভাবে। জনমনে প্রশ্ন, বেপরোয়া এ পুলিশকে রুখবে কে? বিশিষ্টজনরা এ ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করে সমকালকে বলেছেন, রাজনৈতিক বিবেচনায় পুলিশে লোক নেওয়া বন্ধ করতে হবে। পুলিশকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারের প্রথাও বন্ধ করার কথা বলেছেন তারা। এসব ঘটনায় সারাদেশ তোলপাড়। নিরুদ্বিগ্ন শুধু স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
গত ২৭ জুলাই সকালে নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জে পুলিশ এক ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটায়। ১৬ বছরের এক কিশোরকে পুলিশের গাড়ি থেকে নামিয়ে জনতার হাতে তুলে দেওয়া হয়। তারপর গণপিটুনিতে সে মারা
যায়। এ নির্মম হত্যাকা পুলিশের সামনেই ঘটে। মোবাইল ফোনে ধারণ করা এ ঘটনার ভিডিও টেপ প্রচার করা হয়েছে গণমাধ্যমে। ঘটনাটি বিবেকমান মানুষকে হতবাক, অশ্রুসিক্ত করেছে। সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবদুল কাদেরকে নিয়ে পুলিশের 'প্যাকেজ' নাটক আরেকটি অবিশ্বাস্য ঘটনা। এর আগে সাভারের আমিনবাজারের বড়দেশী গ্রামে ছয় ছাত্রকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। পুলিশ ওই ছাত্রদের ডাকাত বানানোর অপচেষ্টা চালায়। এর আগে ঝালকাঠিতে লিমনকে গুলিতে আহত করে র‌্যাব। তাকেও সন্ত্রাসী বানানোর নানা অপচেষ্টা চালানো হয়।
কখনও কখনও স্বতঃপ্রণোদিত উচ্চ আদালত নির্যাতিতদের পাশে দাঁড়াচ্ছেন। পুলিশকে ভর্ৎসনাও করেছেন। এতেও তেমন সুফল আসছে না।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দুর্বলতা, পুলিশ প্রশাসনে দলীয়করণের মাত্রা বেড়ে যাওয়া, পুলিশের অভ্যন্তরীণ গ্রুপিং এবং চেইন অব কমান্ড দুর্বল হয়ে যাওয়ার কারণে পুলিশে অপরাধপ্রবণতা বেড়ে যাচ্ছে। এসব অপরাধ কমাতে হলে পুলিশকে দলীয়করণমুক্ত করতে হবে। অপরাধী পুলিশের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। এটি না করলে দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে বলে তারা আশঙ্কা করছেন।
তবে পুলিশের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ মানতে নারাজ স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু। এগুলোকে তিনি বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে দাবি করেছেন। তিনি সমকালকে বলেন, পুলিশ প্রশাসন বিগত সময়ের চেয়ে অনেক ভালোভাবেই চলছে। পুলিশ প্রশাসনের ভালো কাজের কারণেই আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটেছে। নির্বিঘ্নে সাধারণ মানুষ চলাচল করছে। কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনার তদন্ত হচ্ছে। এতে কারও জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এসব প্রথাসিদ্ধ বক্তব্য।
প্রতিমন্ত্রীর এ বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক এসএম শাহজাহান সমকালকে বলেন, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি তেমন ভালো নয়। দলীয়করণ বেড়ে যাওয়ার কারণে বেশ কিছু ঘটনা ঘটছে, যা পুলিশের কাছ থেকে কেউ আশা করে না। এতে সরকার ও পুলিশের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে। পুলিশকে বিরোধী দল দমনের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসতে হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
ঘটনা এক : ২৭ জুলাই সকালে নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জে ঘটে এক অকল্পনীয় ঘটনা। মিলন নামে ১৬ বছরের এক কিশোরকে পুলিশের গাড়ি থেকে নামিয়ে জনতার হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়। তারপর গণপিটুনিতে সে মারা যায়। অবিশ্বাস্য এ হত্যাকা ঘটে পুলিশের উপস্থিতিতে। কোম্পানীগঞ্জে ওইদিন ডাকাত সন্দেহে পৃথক স্থানে ছয়জনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয় বলে পুলিশ দাবি করেছিল। এর মধ্যে টেকেরবাজার মোড়ে মারা হয় তিনজনকে। তাদেরই একজন কিশোর শামছুদ্দিন মিলন। মিলনকে মারা হয় সকাল সাড়ে ১০টায়। আর বাকি দু'জনকে মারা হয় ভোরবেলায়। মিলনকে হত্যার অভিযোগ এনে তার মা বাদী হয়ে আদালতে মামলা করেন। এ ঘটনায় 'দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে' শনিবার রাতে কোম্পানীগঞ্জ থানার তিন পুলিশ সদস্যকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। পুলিশ এখানেই তার দায়িত্ব শেষ করেছে। এ ঘটনায় দেশব্যাপী আলোচনার ঝড় উঠেছে।
ঘটনা দুই : সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র কাদেরকে ডাকাত প্রমাণ করতে মরিয়া হয়ে ওঠে পুলিশ। তাকে তিনটি মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর চেষ্টা করে। পুলিশের দাবি, ১৫ জুলাই রাতে ঢাবি ছাত্র আবদুল কাদের ও মামুন হোসেন নামে অপর একজনকে গ্রেফতার করা হয়। গাড়িযোগে ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের প্রস্তুতিকালে খিলগাঁও বিশ্বরোড এলাকা থেকে তাদের গ্রেফতার করা হয়। এ সময় তাদের সঙ্গে থাকা চারজন পালিয়ে যায়। পুলিশের দাবি, স্থানীয় জনতা কাদের ও মামুনকে গণপিটুনি দেয়। তবে গণপিটুনির কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। কাদেরকে গ্রেফতার করে খিলগাঁও থানা পুলিশ নির্মম নির্যাতন চালায়। খিলগাঁও থানার অফিসার ইনচার্জ কাদেরকে কুপিয়ে জখম করেন। সংবাদপত্রে এমন মর্মন্তুদ খবর প্রকাশিত হলে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। শেষ পর্যন্ত দায়ী পুলিশ কর্মকর্তাদের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়। জামিনে মুক্তি পান কাদের। অনেকের অভিযোগ, কাদেরের মতো অনেককেই পুলিশ ফাঁসিয়ে দিচ্ছে। কাদেরের বিষয়টি আলোর মুখ দেখলেও অনেক ঘটনাই থাকে আড়ালে।
ঘটনা তিন : চলতি বছরের ১৮ জুলাই আমিনবাজারে ডাকাত সন্দেহে ছয় ছাত্রকে পিটিয়ে হত্যা করে গ্রামবাসী। চাঞ্চল্যকর ওই ঘটনার পরও পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। আমিনবাজারের ঘটনায় বেঁচে যাওয়া কিশোর আল আমিন জানায়, স্থানীয় জনগণ যখন তাদের বেধড়ক পেটাতে থাকে তখন সেখানে পুলিশ উপস্থিত ছিল। পুলিশের এক সদস্যকে পা জড়িয়ে ধরে তারা বলতে থাকে, 'ভাই আমরা ডাকাত নই। আমরা ঘুরতে এসেছি।' এরপর এক পুলিশ সদস্য তাকে বলে, 'যদি বাঁচতে চাস, তাহলে ডাকাতির পক্ষে সাক্ষী দিতে হবে। না হলে তোকে গ্রামবাসীর হাতে ছেড়ে দেওয়া হবে।' আমিনবাজারের ঘটনার পর পুলিশের ভূমিকাকে কেন অবৈধ ও বেআইনি ঘোষণা করা হবে না তা সরকারের কাছে জানতে চান হাইকোর্ট।
ঘটনা চার : ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলার সাতুরিয়া গ্রামের বাসিন্দা লিমনকে ২৩ মার্চ বিকেলে র‌্যাব-৮-এর একটি দল আটক করে। এ সময় লিমন নিজেকে কাঁঠালিয়া পিজিএস কারিগরি কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থী বলে পরিচয় দেন; কিন্তু র‌্যাবের এক সদস্য লিমনের কথা না শুনেই তার বাঁ পায়ে অস্ত্র ঠেকিয়ে গুলি করেন। চিকিৎসাধীন অবস্থায় লিমনের একটি পা কেটে ফেলতে হয়। লিমনের এ ঘটনা জানাজানি হলে দেশব্যাপী ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়। সোচ্চার হয়ে ওঠে দেশি-বিদেশি একাধিক মানবাধিকার সংগঠন। আদালত লিমনের সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করতে সরকারকে নির্দেশ দেন। এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তে সরকারের পক্ষ থেকে একটি তদন্ত টিমও গঠন করা হয়। এরই মধ্যে তদন্ত দল তাদের রিপোর্ট স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছে; কিন্তু রিপোর্টটি ফ্রিজে চলে গেছে। আজ পর্যন্ত রিপোর্টটি প্রকাশ করেনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। উল্টো লিমনকে দোষী বানাতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একাধিক বক্তব্য দেন।
সমন্বয়হীনতা : আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে সাম্প্রতিককালে অপরাধপ্রবণতা বেড়ে যাওয়ার পেছনের কারণ অনুসন্ধান করেছে সমকাল। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ে আলাপ করা হয়। তাদের মতে, পুলিশে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। চেইন অব কমান্ডও পুরোপুরি মানা হচ্ছে না। ফলে এসব ঘটনা ঘটছে।
অভিযোগ রয়েছে, খোদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন পুলিশকে কোনো নির্দেশ দিলেও তারা শুনছে না। তারা দোহাই দিচ্ছে কোনো উপদেষ্টা বা দলীয় কোনো উচ্চ পর্যায়ের নেতার। গত জুনে পুলিশের এক কর্মকর্তার ব্যর্থতার কারণে তার কর্মস্থল থেকে অন্য কর্মস্থলে বদলি করতে পুলিশ হেডকোয়ার্টারকে নির্র্দেশ দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। হেডকোয়ার্টার থেকে বলা হয়, সরকারের একজন উপদেষ্টার নির্দেশ রয়েছে তাকে ওই কর্মস্থলে বহাল রাখার। এ ব্যাপারে তারা লিখিত একটি চিঠিও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে পাঠান। পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ প্রসঙ্গটি চেপে যান। এভাবে পুলিশের কিছু কিছু অপরাধের দায়ভার নিতে হচ্ছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সভায় পুলিশের যে পদমর্যাদার কর্মকর্তার উপস্থিত থাকার কথা তারা উপস্থিত না থেকে প্রতিনিধি হিসেবে জুনিয়র কর্মকর্তাদের পাঠাচ্ছেন। এতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে বিলম্ব হচ্ছে। বারবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বৈঠকের জন্য নির্ধারিত কর্মকর্তাকে উপস্থিত থাকার নির্দেশ দেওয়া হলেও তারা তা মানছেন না। বিশেষ করে পুলিশের পদোন্নতির জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ডিপিসির বৈঠকে আইজিপির উপস্থিত থাকার কথা থাকলেও তিনি উপস্থিত থাকছেন না। আইজিপির প্রতিনিধি দিয়ে মিটিং চালাতে হচ্ছে। ফলে সঠিক মূল্যায়ন করে অনেক ক্ষেত্রে নীতিমালা অনুযায়ী পদোন্নতি দেওয়া যাচ্ছে না। পুলিশের পক্ষ থেকে যে তালিকা পাঠানো হচ্ছে তাদেরই যাচাই-বাছাই না করে পদোন্নতি দিচ্ছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। পদায়নের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটছে। এর প্রভাব পুলিশ প্রশাসনের উচ্চ থেকে তৃণমূল পর্যায়ে পড়ছে।
মাঠ পর্যায়ে পুলিশ : তৃণমূলে ওসি শুনছেন না এসপির কথা, আবার এসপি শুনছেন না ডিআইজির কথা। তারা কথায় কথায় এমপি-মন্ত্রীদের দোহাই দিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশকে পাশ কাটিয়ে যাচ্ছেন। এতে বেড়ে যাচ্ছে পুলিশের অপরাধপ্রবণতা। অপরাধ করলেও শাস্তি দেওয়ার মতো কেউ থাকছেন না। এসব অপরাধ তদন্তে পুলিশের কর্মকর্তা দিয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও তা কোনো কাজে আসছে না। নানা ফাঁক-ফোকর দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে পুলিশের এসব অপরাধী। এমনকি অপরাধে জড়িয়ে পড়া এসব পুলিশ কর্মকর্তাকে শাস্তি না দিয়ে প্রাইজ পোস্টিংও দেওয়া হচ্ছে। সম্প্রতি এমন কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় জড়িত পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে তেমন কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তাৎক্ষণিক এসব কর্মকর্তাকে লঘু শাস্তি দেওয়া হলেও পরে এ শাস্তি প্রত্যাহার করা হচ্ছে। আর অপরাধে জড়িয়ে পড়া পুলিশকে গুরুদণ্ড না দেওয়ায় তারা বেপরোয়া হয়ে উঠছেন। এ বিষয়টি এখন ওপেন সিক্রেট হওয়ায় ওসিসহ কর্মকর্তা নিয়োগ হচ্ছে স্থানীয় এমপিদের ইচ্ছায়। বিনা বাক্যব্যয়ে এমপির হুকুম তালিম করা না হলে তাকে শাস্তিমূলকভাবে বদলি করা হয়। এ ক্ষেত্রে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অসহায়।
পুলিশ মহাপরিদর্শকের বক্তব্য : পুলিশ মহাপরিদর্শক হাসান মাহমুদ খন্দকার সমকালকে বলেন, পুলিশ সদস্যরা সততা, নিষ্ঠা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছে। তবে মুষ্টিমেয় কিছু সদস্য ক্ষমতার অপব্যবহার, অনিয়ম ও অপরাধে জড়াচ্ছে_ এটা অস্বীকার করছি না। যাদের বিরুদ্ধে অপরাধে জড়িয়ে পড়ার প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধেই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। পুলিশ কোনো ধরনের অপরাধের সঙ্গে আপস করে না, যার প্রমাণ পুলিশের বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থার নজির। বাংলাদেশ পুলিশের যে সংখ্যক সদস্যের বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয় তা জনপ্রশাসনে নজিরবিহীন।
এক প্রশ্নের জবাবে পুলিশ মহাপরিদর্শক বলেন, সাভারের বড়দেশী গ্রামে ছয় ছাত্রকে পিটিয়ে হত্যা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র কাদেরের ঘটনায় পুলিশের বিভাগীয় পর্যায়ে তদন্ত চলছে। কাদেরের ঘটনায় অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তাকে তার দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। এসব ঘটনায় তদন্ত কমিটির রিপোর্ট পাওয়ার পরই প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসবে।
পুলিশ প্রায়ই নানা বিতর্কে জড়িয়ে পড়ছে_ এটা এড়ানো সম্ভব কি-না, এমন প্রশ্নের জবাবে হাসান মাহমুদ খন্দকার বলেন, পুলিশের প্রশিক্ষণ প্রক্রিয়ার মধ্যেই রয়েছে তারা কী ভাবে জনগণের বন্ধু হিসেবে কাজ করবে। পুলিশের প্রশিক্ষণ একটি চলমান প্রক্রিয়া। এ প্রক্রিয়ার মধ্যে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন বিষয় অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে। পুলিশ বাহিনীতে মানবাধিকার, নারীর অধিকার, সমঅধিকার, লিঙ্গ ইত্যাদি অনেক বিষয়েই আগের চেয়ে বেশি গুরুত্বসহকারে ধারণা দেওয়া হচ্ছে। কাদের ও সাভারের বড়দেশী গ্রামের ঘটনায় তদন্ত কমিটির সুপারিশেই থাকবে কী ভাবে পরে এ ধরনের পরিস্থিতি এড়ানো যায়।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে পুলিশের দূরত্ব রয়েছে কি-না এমন প্রশ্নের জবাবে পুলিশ মহাপরিদর্শক বলেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আমাদের ভালো সমঝোতা রয়েছে। আমরা বোঝাপড়ার ভিত্তিতেই কাজ করছি।
এমন অভিযোগ পাওয়া যায় ওসিদের সঙ্গে রাজনৈতিক নেতাদের 'মধুর' সম্পর্কের কারণে পুলিশের কাজে ব্যাঘাত ঘটছে_ এ প্রশ্নের উত্তরে হাসান মাহমুদ খন্দকার সমকালকে বলেন, আমাদের কাছে এ ধরনের কোনো অভিযোগ নেই। পুলিশের প্রত্যেক সদস্য তার কাজের বিষয়ে অবগত। রাজনৈতিক প্রভাব ব্যক্তিগত বিষয়।
সাবেক দুই মহাপরিদর্শকের বক্তব্য : সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক এম আজিজুল হক সমকালকে বলেন, সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতায় আমাদের গোটা ক্রিমিনাল জাস্টিস সিস্টেমের ওপর একটি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। মানুষ পুলিশের ওপর আস্থা হারিয়ে নিজের হাতে আইন তুলে নিচ্ছে। নোয়াখালীতে পুলিশের সামনে গণপিটুনিতে এক কিশোরের মৃত্যুর ঘটনাটি দুঃখজনক ও নিষ্ঠুর ।
এক প্রশ্নের জবাবে আজিজুল হক আরও বলেন, বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক দলগুলো পুলিশকে তাদের লাঠিয়াল বাহিনী হিসেবে ব্যবহার করেছে। এতে পুলিশের চেইন অব কমান্ড কিছুটা হলেও বিঘ্ন হয়। সব কিছুর পরও বিপদে পড়লে মানুষ শেষ আশ্রয়স্থল হিসেবে পুলিশের কাছেই যায়। সেখানে ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা জরুরি। এটা ঠিক, যে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পর সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র কাদেরের ঘটনায় ওসির শাস্তি হয়েছে। নোয়াখালীর ঘটনায়ও সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সাভারের আমিনবাজারের ঘটনায় তদন্ত হচ্ছে।
সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক নুরুল হুদা সমকালকে বলেন, পুলিশের বর্তমান কিছু কর্মকাণ্ড দেখে মনে হচ্ছে, তাদের তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণে কোথাও যেন একটা গলদ রয়েছে। নোয়াখালী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র কাদেরের ঘটনায় মনে হয় পুলিশ বাহিনীর কিছু সদস্যের আইন-কানুন সম্পর্কে জানা নেই। সব পুলিশ সদস্যকেই তাদের দায়িত্ব ও আইন-কানুন সম্পর্কে বিস্তারিত শিক্ষা দেওয়া হয়।

এসব কি গুপ্তহত্যা? by গোলাম মর্তুজা

Monday, August 8, 2011

১ জুলাই, সকাল নয়টা, দয়াগঞ্জ বাজার মোড়। স্থানীয় তরুণ জুয়েল গিয়েছিল চিনি, চা-পাতা কিনতে। আর রাজীব বের হয়েছিল নাশতা করতে। এখান থেকেই এদের ধরে নিয়ে যায় সাদা পোশাকের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি দল। এরা নিজেদের ‘ডিবি’ বলে পরিচয় দিয়েছিল। আরেক তরুণ ওয়ার্কশপ কর্মী মিজানুর হোসেনকেও এদের সঙ্গে গ্রেপ্তার করা হয়।
এর পাঁচ দিন পর ৫ আগস্ট এই তিনজনের মধ্যে দুজনের লাশ পাওয়া যায় গাজীপুরের পুবাইলে রাস্তার ঢালে। ঢাকা-মাওয়া সড়কের পাশ থেকে পাওয়া যায় আরেক তরুণের লাশ। তিনজনেরই হাত-পা বাঁধা ছিল গামছা দিয়ে। মুখেও গোঁজা ছিল গামছা। জুয়েলের কপালের বাঁ পাশে ও গলায় আর রাজীবের মাথার চাঁদিতে গুলির চিহ্ন ছিল। মিজানের শরীরে গুলির কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি বলে তাঁর বাবা জানিয়েছেন। তিন যুবক নিখোঁজ হওয়ার বিষয়ে পরিবারগুলো গেন্ডারিয়া ও যাত্রাবাড়ী থানায় পৃথক সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে। এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনারের মুখপাত্র ও গোয়েন্দা পুলিশের (দক্ষিণ) উপকমিশনার মনিরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘ডিবির এ ধরনের হত্যার কালচার নেই। ডিবি আসামি ধরে, মামলা ডিটেক্ট করে, আসামি আদালতে চালান দিয়ে দেয়। ওই সময় যারা ডিবির নাম বলেছে, তারা অবশ্যই মিথ্যা পরিচয় দিয়েছে।’
কারা এ গুপ্তহত্যা ঘটাচ্ছে? কী তাদের উদ্দেশ্য? এসব প্রশ্নের জবাব মেলেনি। পুলিশের দায়িত্বশীল কেউ এ বিষয়ে কিছু বলতে পারছেন না।
তবে যোগাযোগ করা হলে পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এ এস এম শাহজাহান প্রথম আলোকে বলেন, ‘যে বা যারাই এ ঘটনা ঘটাক না কেন, আমাদের এজেন্সিগুলো তা খুঁজে বের করবে বলে আমি আশা করি।’
তিন তরুণের পরিচয়: গাজীপুরের পুবাইল থেকে উদ্ধার হয় জুয়েল সরদার (১৮) ও মিজানুর হোসেনের (২০) লাশ। আর সিরাজদিখান থেকে উদ্ধার হয় রাজীব সরদারের (২৩) লাশ।
জুয়েল আর রাজীব চাচাতো ভাই। দয়াগঞ্জের ৩১/১ সরদারবাড়ি তাদের ঠিকানা। তাদের স্বজনেরা জানান, জুয়েল একটি এসি-ফ্রিজ মেরামতের দোকানে কাজ করত। রাজীব বড় ভাইয়ের সঙ্গে মোবাইল ফোনের ব্যবসা ও টিউশনি করত। মিজানুরের বাড়ি দক্ষিণ যাত্রাবাড়ীতে। ভাইয়ের সঙ্গে ওয়ার্কশপে কাজ করত সে।
তবে মিজানুর হোসেন চার বছর আগে দয়াগঞ্জে মোহন হত্যা মামলার ৩ নম্বর আসামি। অন্য দুজনের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই। অবশ্য রাজীবের এক ভাই রানা সরদার ২০০৫ সালে সন্ত্রাসীদের হাতে খুন হয়।
রাজীব আর জুয়েলের বিষয়ে জানতে চাইলে গেন্ডারিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফারুক আহমেদ বলেন, গেন্ডারিয়া থানার কাজ শুরু হয়েছে দেড় বছর আগে। এই সময়ের মধ্যে এ দুজনের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ আসেনি। এদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা বা জিডি নেই।
ওসি বলেন, ১ আগস্ট রাজীব ও জুয়েলের পরিবার তাদের নিখোঁজ হওয়ার কথা জানিয়ে থানায় দুটি জিডি করে।
যেভাবে নিখোঁজ: জুয়েলের বাবা সালাম সরদার বলেন, স্থানীয় জনি চৌধুরীর এসি-ফ্রিজ মেরামতের দোকানে কাজ করত জুয়েল। ৩১ জুলাই খুব সকালে তাদের এক জায়গায় এসি মেরামতে যাওয়ার কথা ছিল। জুয়েল ঘুম থেকে উঠে জনির বাসায় যায়। এর কিছুক্ষণ পরই শোনা যায়, বাজারের মোড়ে কারা যেন জুয়েলকে মারধর করে ধরে নিয়ে গেছে।
জুয়েলের দোকানমালিক জনি চৌধুরী জানান, সকালে জুয়েল কাজে যাওয়ার জন্য বাসায় এলে তাঁর মা জুয়েলকে চিনি ও চা-পাতা কিনতে পাঠান। টাকা নিয়ে বের হয়ে যায় জুয়েল। বেশ কিছু সময় পরও ফিরে না আসায় জনি ফোন করলে জুয়েল বলে, তাকে পুলিশ ধরেছে। এরপর জনি দয়াগঞ্জ বাজার মোড়ে যান।
জনি বলেন, ‘আমি গিয়া দেহি, সিটি তেহারির দোকানের সামনে কয়েকজন মিল্লা জুয়েলরে সমানে মারতাছে। আমি ভয়ে আর সামনে আগাইলাম না। আমি দৌড়ায়া মহল্লায় আইয়া জুয়েলের এক চাচিরে কইলাম, জুয়েলরে ডিবি ধরছে। এরপর পঞ্চায়েতের সরদার ফরিদ চাচারে কইলাম। পরে ফরিদ চাচাসহ মোড়ে গিয়া দেহি, হ্যারা কেউই নাই।’
জুয়েলের বাবা সালাম সরদার বলেন, ‘বাজারের মোড়ে গিয়া আমরা শুনি, ডিবির লোক আইছিল। সাদা মাইক্রোতে জুয়েল আর রাজীবরে তুইল্লা নিয়া গ্যাছে। তারা ওইহানেই মাইরা জুয়েলের মাথা ফাটায়া ফালাইছে। এই সময় একটা পোলা আবার দৌড় পাইড়া ভাগছে।’
রাজীবের ভাই রনি সরদার জানান, সকালে মায়ের কাছ থেকে টাকা নিয়ে নাশতা করার জন্য বের হয় রাজীব। এর একটু পরেই শোনা যায়, রাজীবকে ধরে নিয়ে গেছে ডিবি।
দয়াগঞ্জ বাজার মোড়ে স্থানীয় একজন ব্যবসায়ী জানান, ওই দিন সকালে সশস্ত্র কয়েকজন লোক সিটি তেহারির দোকানের সামনে জুয়েল আর রাজীবকে পাকড়াও করে। এ সময় জুয়েল তাদের সঙ্গে তর্কাতর্কি শুরু করে। একপর্যায়ে তারা দুজনকে ধরে কী যেন জিজ্ঞেস করতে করতে মারতে থাকে। এ সময় মনে হয়, জুয়েলের মাথাও ফেটে যায়। স্থানীয় কয়েকজন এগিয়ে আসার চেষ্টা করলে ওই লোকগুলো নিজেদের ‘ডিবির লোক’ পরিচয় দেয়। তারা তাদের আশপাশে কাউকে ভিড়তে দেয়নি। তাদের হাতে ছোট পিস্তল ও শটগান ছিল।
একটি রেস্তোরাঁর কর্মী বলেন, রাস্তার ওপর দুজনকে পেটাতে দেখে সেনাবাহিনীর একটি পিকআপ ভ্যান ওইখানে দাঁড়ায়। এ সময় জুয়েল আর রাজীবকে মারধরকারী ব্যক্তিদের একজন এগিয়ে গিয়ে নিজের পরিচয়পত্র দেখালে সেনাবাহিনীর পিকআপটি চলে যায়। একটু পরেই সাদা একটি মাইক্রোবাসে রাজীব আর জুয়েলকে তুলে নিয়ে যায় তারা। এ সময় এক যুবক দৌড়ে পালিয়ে যায়।
জুয়েল আর রাজীব স্থানীয় হওয়ায় তাদের এলাকার প্রায় সব ব্যবসায়ীই চেনেন। স্থানীয় একাধিক ব্যবসায়ী বলেছেন, ওই দিন এলাকার অনেক ব্যবসায়ীই জুয়েল আর রাজীবকে হাতকড়া লাগিয়ে সাদা মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে যেতে দেখেছেন। প্রথমে কেউ কেউ ভেবেছিলেন, স্থানীয় যুবকদের মধ্যে মারামারি লেগেছে। মুরব্বিরা এগিয়ে এলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওই দলটির একজন বলেন, ‘আমরা ডিবির লোক। আমাদের কাজ করতে দেন, এখানে ভিড় করবেন না।’
নিহত মিজান হোসেনের বাসা ৩৬ বি দক্ষিণ যাত্রাবাড়ী। সেখানে তার বাবা ফারুক হোসেনের সঙ্গে কথা হয়। ফারুক জানান, ৩১ জুলাই সকালে কাজে যাওয়ার জন্য বের হয়েছিল মিজান। রাজীব তাকে ফোন করে ডেকে নেয়। ওই দিন দুপুরে তাঁকে একজন খবর দেন যে মিজানকে ডিবি ধরে নিয়ে গেছে।
ফারুক হোসেন বলেন, তাঁদের সঙ্গে রাজন নামের করাতিটোলার এক তরুণকেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওই দলটি ধরেছিল। পরে রাজন দৌড় দিয়ে পালিয়ে যায়। এখন আর রাজনের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না।
খোঁজাখুঁজি: রাজীব ও জুয়েলকে ধরে নিয়ে যাওয়ার পর পরিবারের সদস্যরা গেন্ডারিয়া থানা, মিন্টো রোডের ডিবি কার্যালয়, মালিবাগের সিআইডি কার্যালয়, র‌্যাব-১০, র‌্যাব-৩ এবং অন্যান্য জায়গায় খোঁজাখুঁজি করেও তাদের পাননি।
রাজীবের ভাই রনি সরদার বলেন, ‘থানায় যাওয়ার পর প্রথমে থানা জিডি নিতে চায়নি। থানার এক দারোগা কইল, হয়তো সন্দেহ করে আটক করছে। চার-পাঁচ দিনের মধ্যে তদন্ত শেষ হইলে ছাইড়া দিব। এই কতা শুইনা আমার মায় একটু সান্ত্বনা পাইল।’
গেন্ডারিয়া থানা থেকে একই রকম সান্ত্বনার বাণী শুনেছেন জুয়েলের বাবা সালাম সরদারও। তিনি বলেন, ‘থানায় যাওয়ার পর দারোগারা কইছে, চিন্তা কইরেন না, ডিবি ধরলে তদন্ত শ্যাষে ছাইড়া দিব।’
মিজানের বাবা ফারুক হোসেন বলেন, ‘আমি সব জায়গায় খুঁইজাও কোথায় পাইনি। যাত্রাবাড়ী থানায় জিডি করতে গ্যালে ডিবির কথা হুইনা হ্যারা প্রথমে জিডি নিতে চায়নি। এক দিন পর নিছে।’

মিলন হত্যায় পুলিশের সহায়তা ছিল by মাহবুবুর রহমান

নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জে কিশোর শামছুদ্দিন মিলনকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় পুলিশের সহায়তা ছিল। জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের নেতৃত্বে করা প্রাথমিক তদন্তে এটা নিশ্চিত হওয়া গেছে। কমিটি গত রাতে তাদের খসড়া প্রতিবেদন জেলা পুলিশ সুপারের কাছে জমা দিয়েছে।
এদিকে কোম্পানীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রফিক উল্লাহকে গতকাল প্রত্যাহার করা হয়েছে। এর আগে এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট থাকার অভিযোগে তিন পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।
এদিকে আমলি আদালতে করা মিলনের (১৬) মা কহিনুর বেগমের মামলা গত রাতে থানায় এফআইআর হিসেবে রেকর্ড করা হয়েছে। আজ মঙ্গলবার চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি বিশ্বাস আফজাল হোসেন কোম্পানীগঞ্জে আসছেন।
গত ২৭ জুলাই সকালে কিশোর মিলনকে কোম্পানীগঞ্জের টেকেরহাট মোড়ে পুলিশের গাড়ি থেকে নামিয়ে জনতার হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়। পুলিশের উপস্থিতিতে জনতা কিশোরটিকে পিটিয়ে মেরে ফেলে। পরে পুলিশ তার লাশ গাড়িতে তুলে থানায় নিয়ে যায়।
পুলিশ সুপার হারুন-উর-রশীদ হাযারী মুঠোফোনে প্রথম আলোকে জানান, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মাহবুব রশিদের নেতৃত্বাধীন তদন্ত কমিটির খসড়া প্রতিবেদনে মিলন হত্যাকাণ্ডে পুলিশের সহায়তার প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
গতকাল অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মাহবুব রশীদের নেতৃত্বে গঠিত তদন্ত কমিটি প্রথম ঘটনাস্থল বেপারী বাড়ির মসজিদ এলাকা, টেকেরহাট বাজার, মিলনের স্কুলপড়ুয়া আত্মীয়ের বাড়ি এবং মিলনের বাড়িতে যায়। মাহবুব রশীদ প্রথম আলোকে জানান, ‘প্রতিটি স্পটে গিয়েছি। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে কথা বলেছি। স্থানীয় লোকজনের সঙ্গেও কথা হয়েছে। বিচার-বিশ্লেষণ করছি, কেন ঘটনাটি ঘটল। এ ঘটনায় কারা কীভাবে দোষী।’
গত রাতে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মাহবুব রশিদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘চরকাঁকড়া ইউনিয়নের টেকেরহাট বাজারে পুলিশের কাছ থেকে নিয়ে মিলনকে পিটিয়ে হত্যার সময় পুলিশ যথাযথ ভূমিকা নেয়নি। এমনকি দায়িত্ব পালনে চরম গাফিলতির বিষয়টি তদন্তে বেরিয়ে এসেছে। পুলিশ তখন মিলনকে রক্ষায় কোনো উদ্যোগ নেয়নি বলেই তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে।’
গতকাল ঘটনাস্থল টেকেরহাট বাজারে গিয়ে ব্যবসায়ীদের কয়েকজনের কাছে ওই দিনের ঘটনা সম্পর্কে জানতে চাইলে তাঁরা কেউই নাম প্রকাশ করে কথা বলতে রাজি হননি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, ওসি রফিক উল্লাহ ও স্থানীয় এক জনপ্রতিনিধি গত রোববার টেকেরহাট বাজারে গিয়ে ব্যবসায়ীদের পুলিশের গাড়ি থেকে কিশোর মিলনকে নামিয়ে দেওয়ার কথা তদন্ত কমিটির কাছে বলতে নিষেধ করেন। ‘ডাকাত হিসেবেই জনতা তাকে পিটিয়ে মেরেছে’—এমনটি বলতে বলা হয় তাঁদের। অন্যথায় গণপিটুনির মামলায় তাঁদের জড়ানো হবে বলে শাসিয়ে দেওয়া হয়।
সেদিন আসলে কী ঘটেছিল—জানতে চাইলে বর্তমানে থানার দায়িত্বে থাকা হুমায়ুন কবির প্রথম আলোকে বলেন, ‘স্থানীয় লোকজনের মোবাইল ফোনে খবর পেয়ে ঘটনাস্থল থেকে আটক মিলনকে থানায় নিয়ে আসতে এসআই আকরাম শেখকে পাঠানো হয়েছিল। পথে যা ঘটেছে বা হয়েছে, তা তো সবার জানা।’
কোম্পানীগঞ্জে ওই দিন ডাকাত সন্দেহে পৃথক স্থানে ছয়জনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয় বলে পুলিশ দাবি করেছিল। এর মধ্যে টেকেরহাট মোড়ে মারা হয় তিনজনকে। তাদেরই একজন কিশোর শামছুদ্দিন মিলন। মিলনকে মারা হয় সকাল সাড়ে ১০টার দিকে, আর বাকি দুজনকে মারা হয়েছিল ভোরবেলায়। মিলনকে হত্যার পুরো ঘটনা উপস্থিত কেউ একজন ভিডিও চিত্রে ধারণ করেন। সেই ভিডিও চিত্র লোকজনের হাতে ছড়িয়ে পড়লে পৈশাচিক ওই ঘটনা ফাঁস হয়ে যায়।
এ ঘটনায় থানায় দায়ের হওয়া ডাকাতি ও খুনের মামলায় নিরপরাধ কিশোর মিলনকেও আসামি করা হয়েছে। তবে মামলার বাদী ডাকাতের গুলিতে নিহত রিকশাচালক মোশাররফ হোসেন মাসুদের বাবা রফিক প্রথম আলোকে জানান, তিনি কেবল সেই রাতে যে কয়েকজনকে চিনেছেন, তাদের নাম পুলিশকে বলেছেন। পরে পুলিশ ওই নামের সঙ্গে যারা গণপিটুনিতে নিহত হয়েছে, তাদেরও আসামি করেছে বলে শুনেছেন। মিলন নামে কাউকে আসামি করেছেন কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি অশিক্ষিত মানুষ। তারা (পুলিশ) আমাকে কাগজ দিয়েছে, আমি স্বাক্ষর করেছি।’
মিলনের প্রতিবেশী আবদুল হাই জানান, মিলন বাচ্চা ছেলে। টাকার অভাবে লেখাপড়া করতে পারেনি। চট্টগ্রামে চলে গেছে কাজ শিখতে। ১৪-১৫ দিন আগে বাড়ি এসেছিল। তিনি বলেন, ছেলেটি কখনো এলাকায় কোনো অন্যায় কাজ করেছে বলে কেউ বলতে পারবেন না।
গতকাল চরফকিরা ইউনিয়নের চরফকিরা গ্রামে মিলনের বাড়িতে গেলে তার মা কহিনুর বেগম কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি বারবার প্রথম আলোকে বলতে থাকেন, ‘সেই দিন (২৭ জুলাই) সকালে মিলন আমাকে ফোন করে বলে, “মা, কিছু লোক আমাকে বেপারী বাড়ির স্কুলের ঘাটলায় আটকে রেখেছে, তুমি...” এ কথা বলার পরই লাইন কেটে যায়। আমি বহুবার চেষ্টা করেও ফোনে আর কথা বলতে পারিনি। তা ৎ ক্ষণিক আমার ভাশুর জসিম উদ্দিনকে সঙ্গে নিয়ে সেখানে যাই। লোকজন জানায়, আমার নিরপরাধ ছেলেকে মারধর করে সঙ্গে থাকা টাকা ও মোবাইল ফোন নিয়ে জামাল উদ্দিন মেম্বার (স্থানীয় ইউপি সদস্য) ও মিজানুর রহমান ওরফে মানিক পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছে।’
কান্না সামলিয়ে কহিনুর বলেন, ‘সেখান থেকে থানার উদ্দেশে যাওয়ার পথে টেকেরহাট বাজারে লোকজনকে বলাবলি করতে শুনি, পুলিশ এক ছেলেকে ডাকাত বলে পিটিয়ে মেরে ফেলেছে। পুলিশই তার লাশ থানায় নিয়ে গেছে। থানায় গিয়ে দেখি পাঁচটি লাশের সঙ্গে মিলনের লাশ পড়ে আছে। থানার ভেতর ঢোকার চেষ্টা করেও পুলিশের বাধার কারণে পারিনি।’
চরফকিরা ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের চরফকিরা গ্রামের সৌদিপ্রবাসী গিয়াস উদ্দিনের ছেলে মিলন। চার ভাইয়ের মধ্যে মিলন সবার বড়। সে ২০১০ সালে স্থানীয় কবি নজরুল উচ্চবিদ্যালয়ে দশম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হয়। এরপর আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে পরীক্ষা দেয়নি। মিলনের ছোট তিন ভাইয়ের একজন বর্তমানে একই স্কুলে দশম শ্রেণীতে পড়ে। বাকি দুজন (যমজ) জহিরুদ্দিন রুবেল ও সাইফুদ্দিন ফয়সাল উত্তর চরফকিরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ে।
মিলনের বাবা গিয়াসউদ্দিন প্রায় আড়াই বছর আগে পৈতৃক ভিটা (দুই শতক জায়গা) চাচাতো ভাইয়ের কাছে বিক্রি করে সৌদি আরবে যান। শর্ত ছিল, বিদেশে গিয়ে রোজগার করে টাকা পাঠাবেন এবং ওই টাকায় জমি কিনে বাড়ি করা পর্যন্ত তাঁরা এই ভিটায় থাকবেন।
লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর প্রথম কিছুদিন কক্সবাজারে গিয়ে ছোটখাটো কাজ করে মিলন। পরে বাবা খবর পাঠায় ওয়েল্ডিংয়ের কাজ শেখার জন্য, তাহলে তাঁকে বিদেশে নিয়ে যাবেন। তিন-চার মাস আগে চাচা সাহাবউদ্দিনের সঙ্গে চট্টগ্রামের বহদ্দারহাটে গিয়ে ওয়েল্ডিংয়ের কারখানায় কাজ শিখতে শুরু করে মিলন। এর মধ্যে বাড়িতে পল্লি বিদ্যুতের মিটারে সমস্যা হওয়ায় এবং বাবার পাঠানো টাকায় কেনা জমি নিবন্ধনে মাকে সহায়তা করতে ১৪-১৫ দিন আগে বাড়িতে আসে সে।
মিলনের মা জানান, কিছুদিন আগে জমি কেনার জন্য এক লাখ ২৫ হাজার টাকা পাঠান মিলনের বাবা। ওই টাকায় ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের কামাল মেম্বারের কাছ থেকে এক খণ্ড জমি কিনেছেন তাঁরা। সেই জমি রেজিস্ট্রি ও দলিল লেখানোর জন্য ২৭ জুলাই বাড়ি থেকে ১৪ হাজার টাকা নিয়ে সকাল সাড়ে আটটার দিকে বের হয়েছিল মিলন। আর ফিরল লাশ হয়ে।
কহিনুর বেগম বলেন, ‘শুনেছি, উপজেলা সদরে যাওয়ার পথে চরকাঁকড়ার বেপারী বাড়ির বায়তুল নূর জামে মসজিদের ঘাটলায় বসে মিলন অপেক্ষা করছিল চরকাঁকড়া একাডেমি উচ্চবিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ুয়া তাঁর (মিলনের মায়ের) ফুফাতো বোনের মেয়ের সঙ্গে দেখা করার জন্য। স্কুলে তার পরীক্ষা চলছিল।’
মিলনের মায়ের করা মামলার আসামি চরকাঁকড়া ইউনিয়নের সংরক্ষিত নারী সাংসদ ফেরদৌস আরা বেগমের স্বামী মিজানুর রহমান মানিক বলেন, ‘অপরিচিত দেখে আমি ছেলেটিকে এখানে বসে থাকার কারণ জিজ্ঞেস করি। স্কুলে তাঁর আত্মীয়ের সঙ্গে দেখা করার জন্য বসে আছে বলে জানায় সে। বাড়ি কোথায় জানতে চাইলে সে জানায়, চরফকিরা। এর মধ্যে আশপাশের কিছু লোক জড়ো হয়। তারা ছেলেটিকে ডাকাত বলে সন্দেহ করে। কারণ, ওই দিন ভোর রাতে আশপাশের এলাকায় ডাকাত ধরে গণপিটুনি দেওয়া হয়েছিল।’
মানিক জানান, ওই সময় ঘটনাস্থলে স্থানীয় ইউপি সদস্য জামালউদ্দিন আসেন। তিনিও মিলনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। এরপর আমরা পার্শ্ববর্তী স্কুল থেকে ওই মেয়েটিকে ডেকে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করি। প্রথমে সে কিছু না বলে চুপ করে থাকে। সম্ভবত অনেক লোক দেখে চুপ করে ছিল। পরে আমি ধমক দিলে ছেলেটিকে তার আত্মীয় বলে জানায় মেয়েটি।
মানিক দাবি করেন, ‘এর পরও উপস্থিত লোকজন মিলনকে ডাকাত সন্দেহে হালকা মারধর করে। আমি এবং জামাল মেম্বার ছেলেটিকে মক্তবের ভেতর আটকে রাখি এবং থানায় খবর দিই। পুলিশ এলে তাদের কাছে সোপর্দ করি।’
চরকাঁকড়া একাডেমি উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জাহাঙ্গীর আলম জানান, ওই মেয়ে ছেলেটিকে তাদের আত্মীয় বলে স্বীকার করেছে।
মিলনের ওই খালাতো বোন গতকাল স্কুলে যায়নি। তার গ্রামের বাড়ি চরকাঁকড়া গ্রামে গেলে তার বাবা মিলনকে তাদের আত্মীয় বলে স্বীকার বা অস্বীকার কোনোটাই করেননি। তিনি বলেন, ‘আমার মেয়ের সঙ্গে দেখা করতে এসেছে বলে বলছে। আমি এ সম্পর্কে কিছুই জানি না।’ মেয়েটির সঙ্গে কথা বলতে দিতেও রাজি হননি তিনি।
স্থানীয় একাধিক সূত্রে জানা গেছে, এই পরিবারটিকে এ বিষয়ে মুখ না খুলতে কোম্পানীগঞ্জ থানার পুলিশের পক্ষ থেকে চাপ দেওয়া হয়েছে। পুলিশকে বাঁচাতে স্থানীয় এক জনপ্রতিনিধিও দৌড়ঝাঁপ করছেন বলে ওই সূত্রগুলো জানায়।

এ কোন পুলিশ, এ কেমন পৈশাচিকতা!

‘মারি হালা। মারি হালা। পুলিশ কইছে মারি হালাইবার লাই। তোরা মারছ্ না কা? (মেরে ফেল। মেরে ফেল। পুলিশ বলেছে মেরে ফেলার জন্য। মারিস না কেন?)’

লোকজনের জটলা থেকে কেউ একজন এভাবে বলছেন, আর কিছু লোক কিশোর মিলনকে রাস্তার ওপর ফেলে এলোপাতাড়ি কিল-ঘুষি ও লাথি মারছে। একজন লাঠি দিয়ে এলোপাথাড়ি পেটাচ্ছে। একপর্যায়ে এক যুবক ইট দিয়ে তার মাথায় আঘাত করে। মিলনের মৃত্যু নিশ্চিত হলে পুলিশ তার লাশ গাড়িতে তুলে নিয়ে যায়।
গত ২৭ জুলাই সকালে নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জে ঘটে এই অকল্পনীয় ঘটনা। ভিডিও চিত্রে দেখা যায়, ১৬ বছরের কিশোরটিকে পুলিশের গাড়ি থেকে একজন নামিয়ে জনতার হাতে ছেড়ে দিচ্ছে। তারপর শুরু হয় কথিত গণপিটুনি। অবিশ্বাস্য এই হত্যাকাণ্ড ঘটে পুলিশের উপস্থিতিতে।
কোম্পানীগঞ্জে ওই দিন ডাকাত সন্দেহে পৃথক স্থানে ছয়জনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয় বলে পুলিশ দাবি করেছিল। এর মধ্যে টেকেরবাজার মোড়ে মারা হয় তিনজনকে। তাঁদেরই একজন এই কিশোর শামছুদ্দিন মিলন। মিলনকে মারা হয় সকাল সাড়ে ১০টার দিকে। আর বাকি দুজনকে মারা হয়েছিল ভোরবেলায়।
মিলনকে হত্যার অভিযোগ এনে তার মা বাদী হয়ে আদালতে মামলা করেছেন। এ ঘটনায় ‘দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে’ গত শনিবার রাতে কোম্পানীগঞ্জ থানার তিনজন পুলিশ সদস্যকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। তাঁরা হলেন: উপপরিদর্শক (এসআই) মো. আকরাম শেখ, কনস্টেবল আবদুর রহিম ও হেমারঞ্জন চাকমা।
মিলন কোম্পানীগঞ্জের চরফকিরা গ্রামের গিয়াস উদ্দিনের ছেলে। সে দশম শ্রেণী পর্যন্ত পড়ালেখা করেছে, তবে এসএসসি দেয়নি। সে চট্টগ্রামে একটি কোম্পানিতে কাজ করে। কয়েক দিন আগে সে বাড়ি এসেছিল। চার ভাইয়ের মধ্যে মিলন সবার বড়। তার বাবা বিদেশে থাকেন।
মিলনকে পুলিশের গাড়ি থেকে নামানো, পিটিয়ে হত্যা এবং লাশ পুলিশের গাড়িতে তুলে নিয়ে যাওয়া পর্যন্ত পুরো ঘটনার ভিডিও চিত্র এখন কোম্পানীগঞ্জের বিভিন্নজনের মুঠোফোনে পাওয়া যায়। বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল সময় গতকাল এর ভিডিও চিত্রের উল্লেখযোগ্য অংশ সম্পচারও করেছে।
ভিডিও চিত্রে দেখা যায়, মারধরের একপর্যায়ে মিলন উঠে দৌড়ে পাশের একটি দোকানে আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু উপস্থিত কেউ তাকে বাঁচাতে ন্যূনতম চেষ্টাও করেনি। এ পর্যায়ে সাদা শার্ট ও কালো প্যান্ট পরা একজন ইট নিয়ে সজোরে আঘাত করেন মিলনের মাথায়। সঙ্গে সঙ্গে রাস্তায় লুটিয়ে পড়ে মিলন। একই লোক ইট দিয়ে এর পরও মিলনের মাথায় একাধিকবার আঘাত করেন। সঙ্গে আরও কয়েকজন এলোপাতাড়ি লাথি মারতে থাকে। মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর মিলনের লাশ পুলিশ গাড়িতে তুলে নিয়ে যায়। পুরো ঘটনার সময় পুলিশের সদস্যরা গাড়ি নিয়ে উপস্থিত ছিলেন।
মিলনের মা কোহিনুর বেগম তাঁর ছেলেকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ এনে গত বুধবার আদালতে মামলা করেছেন। মামলার আরজিতে মিলনকে আটক করে মারধর এবং পুলিশের হাতে সোপর্দ করা পর্যন্ত স্থানীয় বাসিন্দা মিজানুর রহমান ওরফে মানিক ও চরকাঁকড়া ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সদস্য জামাল উদ্দিন সম্পৃক্ত ছিলেন বলে অভিযোগ করা হয়।
কোহিনুর বেগম উল্লেখ করেন, গত ২৭ জুলাই সকালে মিলন জমি নিবন্ধনের কাজের জন্য বাড়ি থেকে ১৪ হাজার টাকা নিয়ে উপজেলা সদরের দিকে যায়। পথে সে চরকাঁকড়া বেপারী উচ্চবিদ্যালয়ে পড়ুয়া দূর-সম্পর্কের এক খালাতো বোনের সঙ্গে কথা বলতে বিদ্যালয়ের মসজিদের পুকুরঘাটে বসে অপেক্ষা করছিল। এ সময় মানিক নামের স্থানীয় একজন মিলনকে সেখানে বসে থাকার কারণ জানতে চান।
একপর্যায়ে সেখানে আসেন স্থানীয় ইউপি সদস্য জামাল উদ্দিন। তিনিও মিলনকে সেখানে বসে থাকার কারণ জানতে চান। কারণ জানালে জামাল উদ্দিন ওই মেয়েটিকে বিদ্যালয় থেকে ডেকে এনে মিলনের পরিচয় নিশ্চিত হন। কিন্তু এরপর মানিক ও জামালসহ উপস্থিত লোকজন মিলনকে চড়-থাপড় দিয়ে তার সঙ্গে থাকা নগদ টাকা ও মুঠোফোন ছিনিয়ে নেয় এবং মিলনকে পুলিশে সোপর্দ করে।
কোহিনুর বেগমের অভিযোগ, পুলিশ আহতাবস্থায় মিলনকে হাসপাতাল বা থানায় না নিয়ে টেকেরবাজার এলাকার তিন রাস্তার মোড়ে নিয়ে যায়। সেখানে স্থানীয় লোকজন মিলনকে পিটিয়ে হত্যা করে। পরে পুলিশ সেখান থেকে মিলনের লাশ থানায় নিয়ে যায়।
যোগাযোগ করা হলে ইউপি সদস্য জামাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘লোকজন ডাকাত সন্দেহে ছেলেটিকে মারধর শুরু করে। আমি তাকে উদ্ধার করে সম্পূর্ণ সুস্থ অবস্থায় পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছি। ওই ছেলে নিজেই হেঁটে পুলিশের গাড়িতে উঠেছে। এরপর শুনেছি, তিন রাস্তার মোড়ে লোকজন পুলিশের কাছ থেকে ছেলেটিকে নিয়ে পিটিয়ে মেরে ফেলেছে।’
এক প্রশ্নের জবাবে জামাল বলেন, ‘আমরা তার কাছে যা কিছু পেয়েছি, তা দারোগা আকরামকে দিয়েছি। আমরা তো তাকে (মিলন) মেরে ফেলার জন্য পুলিশের হাতে তুলে দেইনি। পুলিশের কাজ তো কাউকে মেরে ফেলা না। কিন্তু তারা যদি কাউকে মৃত্যুর মুখে ফেলে দেয়, তাহলে কার কী করার আছে।’
পারিবারিক সূত্র জানায়, ওই সময় মিলন কিছু লোক তাকে আটক করেছে বলে মোবাইল ফোনে মাকে জানায়। তার মা মিলনের এক চাচাকে নিয়ে ঘটনাস্থলে এসে জানতে পারেন তাকে পুলিশে দেওয়া হয়েছে।
কোম্পানীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রফিক উল্লাহ গতকাল সন্ধ্যায় প্রথম আলোকে জানান, মিলনকে ডাকাত সন্দেহেই লোকজন পিটিয়ে মেরেছে। তিনি বলেন, আদালতে করা তার মায়ের মামলার কপি এখনো থানায় আসেনি।
নোয়াখালীর পুলিশ সুপার (এসপি) হারুন-উর-রশিদ হাযারী গতকাল রোববার দুপুরে জানান, এ ঘটনায় দায়িত্ব অবহেলার অভিযোগে তিন পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ঘটনা তদন্তে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মাহবুব রশীদকে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে আগামীকাল মঙ্গলবারের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এসপি হারুন-উর-রশিদ হাযারী গতকাল মিলনকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। চরফকিরায় মিলনের বাড়িতে গিয়ে তার পরিবারের সদস্য এবং ওই স্কুলছাত্রীর সঙ্গেও কথা বলেন। পরে এসপি হারুন প্রথম আলোকে বলেন, ‘মিলন অপরাধী কি না, তা এই মুহূর্তে বলা যাবে না। আমরা সব বিষয় খতিয়ে দেখছি।’
স্থানীয় লোকজন জানান, গতকাল পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শনের সময় স্থানীয়ভাবে অপরিচিত কয়েকজন ব্যক্তি মিলনকে নানাভাবে ডাকাত হিসেবে চিহ্নিত করতে তৎপর ছিল।

পুলিশ সপ্তাহ ও পুলিশের সক্ষমতা

Monday, January 24, 2011

ত ৪ জানুয়ারী হইতে সারা দেশে পালিত হইতেছে পুলিশ সপ্তাহ ২০১১। পুলিশ বাহিনীর দক্ষতা ও গতিশীলতা বৃদ্ধিই ইহার মূল উদ্দেশ্য। এ উপলক্ষে ঢাকার রাজারবাগ পুলিশ লাইন মাঠে উদ্বোধনী বক্তৃতাকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পুলিশ সদস্যদের ভয়-ভীতি ও অনুরাগ-বিরাগের বশবর্তী না হইয়া আন্তরিকভাবে কাজ করিয়া যাওয়ার আহ্বান জানাইয়াছেন।

আইনভঙ্গকারী সামাজিকভাবে যতই শক্তিশালী হউক, তাহাদের শাস্তি নিশ্চিত করার কথা বলিয়াছেন তিনি। প্রকৃতপক্ষে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ শান্তি-শৃঙ্খলা ও জননিরাপত্তা বিধানে পুলিশ বাহিনীর ভূমিকা সব সময়ই জরুরি ও অনস্বীকার্য।

বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম একটি জনবহুল দেশ। বেসরকারি হিসাবে এখানকার জনসংখ্যা ১৬ কোটি ছাড়াইয়া গিয়াছে। একেতো জনবহুল দেশ, তাহার উপর দারিদ্র্যপীড়িত। স্বাভাবিক কারণেই এখানকার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। অন্যদিকে, আধুনিক সমাজ জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির দিক দিয়া যতই অগ্রসর হইতেছে, ততই অপরাধের গতি-প্রকৃতি বদলাইয়া যাইতেছে। কিন্তু সেই অনুযায়ী পুলিশ বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি না পাইলে তাহাদের নিকট হইতে কার্যকর ভূমিকা আশা করা যায় না। জানা মতে, পুলিশ বাহিনীর বর্তমান সদস্য সংখ্যা ১ লক্ষ ২৪ হাজারের অধিক। আর থানার সংখ্যা ছয় শতাধিক। সাম্প্রতিককালে পুলিশের কনস্টেবল হইতে শুরু করিয়া ইন্সপেক্টর পর্যন্ত ১৩ হাজার পদ সৃষ্টি করা হইয়াছে। তাহার পরও জনসংখ্যা অনুপাতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য সংখ্যা অনেক কম। প্রায় তেরশত মানুষের বিপরীতে রহিয়াছে একজন পুলিশ। এই অবস্থায় থানা ও পুলিশের সংখ্যা আরও বাড়ানো আবশ্যক। বিশেষত রাজধানীসহ বিভাগীয় শহরাঞ্চলে জনসংখ্যার অনুপাতে এরূপ সংখ্যা বৃদ্ধির বিষয়টি বিবেচনা করিয়া দেখা প্রয়োজন। কেহ কেহ মনে করেন, এখন ঢাকা শহরের প্রতিটি ওয়ার্ডেই থানা স্থাপন করিতে হইবে।

পুলিশ বাহিনীর সক্ষমতা ও দক্ষতা বাড়ানোর কথা আমরা প্রায়শ বলিয়া থাকি। আসলে দক্ষতার বিষয়টি কেবল প্রশিক্ষণ, দৈহিক সামর্থ্য এবং বুদ্ধিমত্তার উপরই নির্ভর করে না। এজন্য আনুষঙ্গিক সরঞ্জামাদিও প্রয়োজন। আধুনিক বিশ্বে সমাজ ব্যবস্থা যেমন অনেক জটিল হইয়াছে, তেমনি যুদ্ধ-বিগ্রহ ও উত্তাপ-উত্তেজনায় অস্ত্র ব্যবসাও সম্প্রসারিত হইয়াছে। এখন একজন সাধারণ সন্ত্রাসীর কাছে যেই অস্ত্র আছে, তাহা অনেক সময় পুলিশের কাছেও থাকে না। আজকাল পৃথিবীর হতদরিদ্র ও পশ্চাৎপদ দেশেও পুলিশকে রাস্তায় দাঁড়াইয়া বা আইন অমান্যকারী গাড়ির পিছনে পিছনে দৌড়াইয়া দায়িত্ব পালন করিতে দেখা যায় না। অথচ ইহাই আমাদের এখানকার প্রাত্যহিক চিত্র। ইহা পুলিশের জীবনের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ। গত এক দশকে দায়িত্ব পালন করিতে গিয়া সাড়ে তিনশতেরও বেশি পুলিশ নিহত হইয়াছেন যাহার ক্ষতি অপূরণীয়।

পুলিশের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ পৃথিবীর সব দেশেই আছে। তাহার পরও বাস্তবতা হইল, নানা আইনি সহায়তা ও নিরাপত্তার জন্য আমাদের পুলিশের কাছেই যাইতে হয়। আমাদের পুলিশ বাহিনী ১৮৬১ সালের পুরাতন আইন দ্বারা পরিচালিত হওয়ার কারণে নানা সমস্যাই হইতে পারে। ভারত ও পাকিস্তান ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলের বিভিন্ন আইনের সংস্কার করিলেও এ ব্যাপারে আমরা এখনও দ্বিধান্বিত। প্রস্তাবিত পুলিশ অধ্যাদেশের প্রয়োজনীয় রদবদল শেষে নূতন আইন কার্যকর করা জরুরি। পুলিশের যানবাহন, আবাসন ও অন্যান্য ভৌত অবকাঠামো সংক্রান্ত সমস্যা দূর করিয়া সর্বপ্রকার লজেস্টিক সাপোর্ট বাড়াইতে হইবে। বাড়াইতে হইবে বেতন-ভাতাসহ নানা সুযোগ-সুবিধা। সেইসঙ্গে পুলিশ বাহিনীকে দায়িত্বশীল, অধিক সক্রিয় ও জনগণের প্রতি বন্ধুভাবাপন্ন হইতে হইবে।

নয় পুলিশের রক্তে পিচঢালা পথ লাল

Sunday, January 16, 2011

রসিংদীতে মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় দুই ওসিসহ পুলিশের ৯ সদস্য নিহত হয়েছেন। আহত আরেক পুলিশ সদস্য আশঙ্কাজনক অবস্থায় ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। গতকাল শনিবার সকালে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের শিবপুর উপজেলার ঘাসিরদিয়া এলাকায় একটি মালবোঝাই ট্রাকের সঙ্গে পুলিশের পিকআপ ভ্যানের মুখোমুখি সংঘর্ষে মর্মান্তিক এ দুর্ঘটনা ঘটে।

নিহতদের সবাই নরসিংদীর বেলাব থানায় কর্মরত ছিলেন। স্থানীয় পৌরসভা নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার বিষয়ে একটি সভায় যোগ দিতে ওই পুলিশ সদস্যরা নরসিংদী পুলিশ লাইনে যাচ্ছিলেন। দুর্ঘটনায় নিহত পুলিশ সদস্যরা হলেন বেলাব থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফারুক আহমেদ খান (৪৫), ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (তদন্ত) জিয়াউল খান (৪০), উপপরিদর্শক (এসআই) কংকন কুমার মণ্ডল (৪২), কনস্টেবল কৃষ্ণ কুমার বর্মণ (৫০), রিয়াজ উদ্দিন (৪০), নারায়ণচন্দ্র কৃষ্ণ (৪৫), বজলুর রহমান (৫০), মাসুদ পারভেজ (৪২) ও গাড়িচালক রেজাউল হক (৪০)। আহত কনস্টেবলের নাম প্রিয়তোষ (৫০)।
পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, ১৭ জানুয়ারি নরসিংদী ও মনোহরদী পৌরসভার নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার বিষয়ে নরসিংদী পুলিশ লাইনে একটি সভা ডাকা হয়েছিল। সভায় যোগ দিতে সকালে বেলাব থানার ওসি ফারুক আহমেদসহ ১০ জনের একটি দল পুলিশ ভ্যানে করে সেখানে যাচ্ছিল। সকাল সোয়া ১১টার দিকে তাদের গাড়িটি শিবপুরের ঘাসিরদিয়া এলাকা অতিক্রম করছিল। ওই সময় বিপরীত দিক থেকে আসা একটি মাছবোঝাই ট্রাক (যশোর মেট্রো-ট-১১-২৩৫২) পুলিশ ভ্যানের ওপর উঠে পড়ে। এতে পুলিশ ভ্যানের সামনের অংশ দুমড়ে-মুচড়ে ট্রাকের ভেতর ঢুকে যায়। ঘটনাস্থলেই জিয়াউল খানসহ পুলিশের আট সদস্য নিহত হন। ওসি ফারুক আহমেদ ও কনস্টেবল প্রিয়তোষকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় নরসিংদী জেলা হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে কয়েক মিনিটের মধ্যে ফারুক মারা যান।
নরসিংদীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বিজয় বসাক জানান, মারাত্মক আহত প্রিয়তোষকে প্রথমে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখান থেকে তাঁকে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে নেওয়া হয়। তাঁর অবস্থা আশঙ্কাজনক। রাত সোয়া ১২টার দিকে যোগাযোগ করা হলে নরসিংদীর পুলিশ সুপার ড. আক্কাসউদ্দিন ভুঁইয়া কালের কণ্ঠকে জানান, প্রিয়তোষের অবস্থার কোনো উন্নতি ঘটেনি।
নরসিংদী জেলা হাসপাতালের আবাসিক মেডিক্যাল কর্মকর্তা মিজানুর রহমান কালের কণ্ঠকে জানান, দুর্ঘটনার পর ১০ জনকেই জেলা হাসপাতালে আনা হয়। তাঁদের মধ্যে আগেই আটজনের মৃত্যু হয়েছিল। হাসপাতালে আনার ১০ মিনিট পর ফারুক আহমেদের মৃত্যু হয়।
তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, দুর্ঘটনাকবলিত পুলিশের ভ্যান ও ট্রাকটি মহাসড়কে পড়ে রয়েছে। সংঘর্ষের ফলে পুলিশ ভ্যানের সামনের অংশ ট্রাকের ভেতরে চলে যায়। এতে পুলিশের ভ্যানের সামনে থাকা ফারুক, জিয়াউল ও গাড়িচালক রেজাউল ট্রাকের সঙ্গে আটকে পড়েন। খবর পেয়ে শিবপুর থানা পুলিশ, নরসিংদী পুলিশ লাইনের রিজার্ভ পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ঘটনাস্থলে ছুটে যান। তাঁরা ক্রেন দিয়ে দুদিক থেকে টেনে গাড়ি দুটি আলাদা করেন। সামনে থাকা ফারুককে আশঙ্কাজনক অবস্থায় জেলা হাসপাতালে পাঠানো গেলেও বাকি দুজন আগেই মারা যান। নিহতদের রক্তে লাল হয়ে যায় পিচঢালা পথ। দুর্ঘটনার পর ট্রাকটি আটক করা হলেও এর চালক ও তার সহকারী পালিয়ে যায়। এ ঘটনায় শিবপুর থানায় একটি মামলা করা হয়েছে।
দুর্ঘটনার পর মহাসড়কের উভয় পাশে দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়। পরে দুর্ঘটনাকবলিত গাড়ি দুটি মহাসড়ক থেকে সরিয়ে নিলে দুপুর ১২টার দিকে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
নরসিংদীর পুলিশ সুপার জানান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজি) হাসান মাহমুদ খন্দকারকে ফোন করে এ দুর্ঘটনায় শোক প্রকাশ করেন। তিনি নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীর তহবিল থেকে সহযোগিতার আশ্বাস দেন। প্রধান নির্বাচন কমিশনার ড. এ টি এম শামসুল হুদা এ ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করেছেন। আইজি হাসান মাহমুদ খন্দকার নিহতদের পরিবারকে ৫০ হাজার টাকা করে দেওয়া হবে বলে জানান।
দুর্ঘটনার পর উদ্ধারকাজে অংশ নেওয়া স্থানীয় ঘাসিরদিয়া গ্রামের জসিমউদ্দিন বলেন, ‘ট্রাকের ভেতর পুলিশের গাড়ি ঢুকে যাওয়ায় আহতদের উদ্ধার করা যাচ্ছিল না।’
নরসিংদী জেলা হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, মেঝেতে সারি সারি লাশ। একসঙ্গে এত সহকর্মীর চলে যাওয়ার ঘটনা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছিলেন না অন্যরা। শোকে অনেক পুলিশ সদস্য নির্বাক হয়ে পড়েন। কেউ কেউ হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন।
বেলাব থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আরবীকুল কাঁদতে কাঁদতে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সকালে থানায় আমার ডিউটি থাকায় স্যারদের গাড়িতে পুলিশ লাইনে আসা হয়নি। আমি গাড়ির পেছনেই মোটরসাইকেল নিয়ে আসছিলাম। হঠাৎ করে ঘাসিরদিয়ায় আসার পর দেখি আমাদের গাড়িটি ট্রাকের ভেতরে চলে গেছে। আমাদের স্যাররা মারা গেছেন।’ কথাগুলো বলতে বলতে আবারও তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। কান্না থামিয়ে তিনি আবার বলেন, ‘আমাদের গাড়িটি অনেক পুরনো। থানায় কোনো নতুন গাড়ি না থাকায় ব্যবহার অনুপযোগী হওয়া সত্ত্বেও এটি ব্যবহার করা হচ্ছিল। ভালো গাড়ি থাকলে একসঙ্গে এত মানুষকে পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হতো না।’
নিহত ফারুকের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর উপজেলার চান্দুরা গ্রামে। তাঁর বাবার নাম আলী আহাম্মদ খান। জিয়াউল খানের বাড়ি জামালপুরের মেলান্দহ উপজেলার বাগডোবা গ্রামে। তাঁর বাবার নাম ডালিম খান। কংকন কুমার মণ্ডলের বাড়ি খুলনা সদর উপজেলার পাইকগাছা গ্রামে। তাঁর বাবার নাম নিত্যানন্দ। এ ছাড়া কনস্টেবল কৃষ্ণ কুমার বর্মণ গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার উত্তর লস্করচালা গ্রামের শ্রীকান্ত বর্মণের ছেলে, রিয়াজ উদ্দিন কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলার ঘাগড়া গ্রামের ইউনুস আলীর ছেলে, নারায়ণচন্দ্র কৃষ্ণ ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার ভেহিবখলা গ্রামের সাধন কুমারের ছেলে, বজলুর রহমান মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার আশাপুর গ্রামের ফয়জুদ্দিনের ছেলে, মাসুদ পারভেজ জামালপুর সদর উপজেলার দমদমা গ্রামের ছোহরাব আলীর ছেলে ও গাড়িচালক রেজাউল হক জামালপুরের সরিষাবাড়ী উপজেলার গোবিন্দনগর গ্রামের আবুল কাশেমের ছেলে। আহত প্রিয়তোষ নেত্রকোনা সদর উপজেলার সাতপাই গ্রামের নিরঞ্জন চন্দ্র পালের ছেলে।
দুর্ঘটনার খবর পেয়ে জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী রাজি উদ্দিন আহমেদ রাজু, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সংসদ সদস্য নুরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুন, নজরুল ইসলাম হীরু, জহিরুল হক মোহন, স্বরাষ্ট্রসচিব আবদুস সোবহান শিকদার, আইজি হাসান মাহমুদ খন্দকার, র‌্যাবের মহাপরিচালক মোখলেছুর রহমান, উপমহাপরিদর্শক (ঢাকা রেঞ্জ) মো. আসাদুজ্জামান, নরসিংদীর জেলা প্রশাসক অমৃত বাড়ৈ, পুলিশ সুপার ড. আক্কাছ উদ্দিন ভূঞা, নরসিংদীর পৌর মেয়র লোকমান হোসেন, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট আসাদুজ্জামান, জেলা বিএনপির সভাপতি খায়রুল কবির খোকন দুর্ঘটনাস্থল ও হাসপাতাল পরিদর্শন করেন।
ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী রাজি উদ্দিন আহমেদ রাজু বলেন, সাধারণ মানুষ দুর্ঘটনায় পড়লে পুলিশের সদস্যরা তাদের বাঁচাতে ছুটে যেতেন। তাঁরা উদ্ধার করতেন। কিন্তু আজ তাঁদেরই দুর্ঘটনার কবলে পড়তে হলো। ঘটনাটি খুবই মর্মান্তিক।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য নুরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুন বলেন, ‘বেলাব থানা থেকে আমার কাছে ফোন যেত একটি গাড়ির জন্য। কিন্তু আমি তাঁদের নতুন গাড়ি দিতে পারিনি। আজ পুরনো গাড়িতে চড়ে দায়িত্ব পালনকালে তাঁদের এমন দুঃখজনক মৃত্যু হলো। এটা মেনে নেওয়া যায় না।’
আইজি হাসান মাহমুদ খন্দকার নরসিংদী জেলা হাসপাতালে নিহত পুলিশ সদস্যদের লাশ দেখে নির্বাক হয়ে যান। কনস্টেবল নারায়ণচন্দ্র কৃষ্ণ ও পুলিশের গাড়িচালক রেজাউল হকের পরিবারকে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে তাঁর চোখও ছলছল করে ওঠে। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘পুলিশ বাহিনীকে অনেক প্রতিবন্ধকতার মধ্যে দায়িত্ব পালন করতে হয়। পুলিশের আধুনিক যানবাহনের অভাব রয়েছে। পুরনো লক্কড়ঝক্কড় গাড়ি দিয়ে পুলিশ সদস্যরা দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে এভাবেই আত্মত্যাগ করে যাচ্ছেন। এমন আরো অনেক আত্মত্যাগের মধ্য দিয়েই আমরা দায়িত্ব পালন করছি।’
এক প্রশ্নের জবাবে আইজি হাসান মাহমুদ বলেন, পৌরসভা নির্বাচনের আইনশৃঙ্খলাবিষয়ক সভায় কনস্টেবলদের উপস্থিতি দরকার ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে।
পুলিশ সুপার ড. আক্কাছ উদ্দিন ভূঞা কালের কণ্ঠকে বলেন, সন্ধ্যার পর নিহতদের মরদেহের ময়নাতদন্ত শেষে নরসিংদী পুলিশ লাইনে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

লাশের পকেটে বেজে উঠল ফোন

রসিংদী জেলা হাসপাতালের লাশঘরে গতকাল সারি সারি রাখা নিহত পুলিশ সদস্যদের লাশ। হঠাৎ বেজে ওঠে মোবাইল ফোন। শব্দ আসছিল নিহত কনস্টেবল রেজাউল করিমের পোশাকের ভেতর থেকে। একজন কনস্টেবল মোবাইল ফোনটি বের করে কল ধরেন।

ও প্রান্তের কথা শুনে বলেন, ‘আমি রেজাউল না। আপনারা দ্রুত জেলা হাসপাতালে আসেন।’ ফোনের লাইন কাটার পর কারো সঙ্গে কথা না বলেই নীরবে কাঁদতে থাকেন ওই কনস্টেবল। হাসপাতালে একইভাবে আরো দুজন নিহত কনস্টেবলের পকেটে মোবাইলের রিং বেজে ওঠে। কনস্টেবল মঞ্জুরুল হক সাংবাদিকদের বলেন, “নিহতের স্বজনরা ফোন করে দুর্ঘটনার খবর জানতে চেয়েছেন। কেউ বলেন, ‘আমার ছেলে এখন কেমন আছে?’ কেউ বলেন, ‘অজয়ের বাবার কী অবস্থা?’ কিন্তু আমি কিভাবে বলব, দুর্ঘটনায় সব শেষ হয়ে গেছে! ”
সকালেও কথা হয়েছিল : ‘পৌরসভা নির্বাচনের কারণে খুব ব্যস্ত থাকতে হবে।
মেয়েদের বলবা, ঠিক সময়ে খাওয়া-দাওয়া করতে।’ স্ত্রী জয়নবুন্নেসা স্মৃতিকে সকালে মোবাইল ফোনে বলেছিলেন নরসিংদীর বেলাব থানার ওসি ফারুক আহমেদ খান। এর দুই ঘণ্টা পর স্ত্রী খবর পান, তাঁর স্বামী সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন। রাজধানীর পূর্ব রাজাবাজার থেকে তিন মেয়ে অনিকা (৯), অর্ণা (৭) ও প্রিয়ন্তিকে (৪) নিয়ে নরসিংদী ছুটে যান স্মৃতি। গিয়ে পান স্বামীর নিথর দেহ।
‘ও দাদা, আমার বাবা কথা বলে না কেন, কী হয়েছে আমার বাবার? গায়ে এত রক্ত কেন?’ দাদা আলী আহাম্মদ খানকে প্রশ্ন করে অনিকা। কী জবাব দেবেন অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক আলী আহাম্মদ খান? বুকচাপড়ে কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘ওরা আমার সোনারে কাইড়া নিছে!’ ওদিকে স্বামীর লাশ দেখে স্মৃতি বিলাপ করছিলেন, ‘তোমাকে ছাড়া ওরা কিভাবে বাঁচবে? কাকে বাবা বলে ডাকবে?’ মায়ের কান্না দেখে প্রিয়ন্তিও কাঁদতে থাকে। বাবাকে হারিয়ে কাঁদছিল অর্ণাও।
রিক্তর কী থাকল? : কনস্টেবল নারায়ণচন্দ্র দাস স্ত্রী ও দুই ছেলে-মেয়ে নিয়ে বেলাব থানার পাশেই ভাড়া বাসায় থাকতেন। ছেলে অজয় প্রসাদ রিক্ত (৭) স্থানীয় একটি কিন্ডারগার্টেনে প্রথম শ্রেণীতে পড়ে। ছোট মেয়ে সমিতা রানী চন্দ্রের বয়স চার বছর। সংবাদ পেয়ে বেলাব থেকে দুই ছেলে-মেয়ে নিয়ে নরসিংদী জেলা হাসপাতালে ছুটে এসেছেন নারায়ণচন্দ্র দাসের স্ত্রী সুবর্ণা রানী চন্দ্র।
সহ্য করতে পারবেন না ভয়ে সুবর্ণাকে স্বামীর লাশের সামনে যেতে দিচ্ছিলেন না নারায়ণের সহকর্মীরা। সুবর্ণা হাসপাতালের বারান্দায় ছেলে-মেয়েকে নিয়ে বসে বিলাপ করতে থাকেন। মায়ের কান্না দেখে দুই পাশে অবুঝ দুই সন্তান নির্বাক হয়ে যায়। রিক্ত সাংবাদিকদের জানায়, ‘সকাল সাড়ে ৮টার দিকে বাবা বাড়ি থেকে বের হন। যাওয়ার সময় বলেন দুষ্টুমি না করতে। আমি কথা দিয়েছি, দুষ্টুমি করব না। কিন্তু এখন আংকেলরা বলছেন, বাবা নাকি আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। তাহলে কি বাবা আর ফিরে আসবেন না!’
কাঁদতে কাঁদতে সুবর্ণা রানী চন্দ্র বলেন, ‘রাতে নারায়ণের ডিউটি ছিল। ভোর ৫টার দিকে বাড়ি ফেরেন তিনি। আবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে পুলিশ লাইনের উদ্দেশে বাসা থেকে বের হন।’ সকাল ১১টায় আসে দুর্ঘটনার সংবাদ। কাঁদতে কাঁদতে একসময় মূর্ছা যান সুবর্ণা। জ্ঞান ফেরার পর বিলাপ করতে করতে বলেন, ‘দুটি ছোট ছেলে-মেয়েকে এখন কিভাবে আমি মানুষ করব?’
সহকর্মীদের কান্না : সহকর্মীদের লাশ নিজ হাতে ধরে গাড়ি থেকে নামিয়ে লাশঘরে নিয়ে যাচ্ছেন অন্য কনস্টেবলরা। আবার সেই লাশ তাঁরাই নিয়ে যাচ্ছেন পুলিশ লাইনে। লাশ বহনের সময় প্রতিটি সহকর্মীর চোখের পানি গাল বেয়ে পড়ছিল। কনস্টেবল মোস্তফা বলেন, ‘মাসুদ পারভেজ ভাই আমাকে খুব স্নেহ করতেন। দেখা হলেই বাড়ির খোঁজ নিতেন। গতকালও আমাদের কথা হয়। আজ তাঁর লাশ বহন করতে হচ্ছে।’ তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক এখন মৃত্যুফাঁদ। প্রতিদিনই ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটছে।’
সহকর্মীদের মরদেহ গাড়িতে তোলার সময় কান্নায় ভেঙে পড়েন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বিজয় বসাকও। এ সময় উপস্থিত অন্যরাও অশ্র“ সংবরণ করতে পারছিলেন না। বিজয় বসাক সাংবাদিকদের বলেন, ‘সকালেও তাঁরা সবাই ছিলেন সহকর্মী। আর এখন তাঁরা আমাদের মধ্যে নেই, আছে তাঁদের নিথর দেহ। এটা কোনো পুলিশের পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব নয়।’ নরসিংদীর পুলিশ সুপার ড. আক্কাস উদ্দিন দুর্ঘটনার পর থেকে ছোটাছুটি করছেন। তিনি বলেন, ‘নরসিংদী পৌরসভার আইনশৃঙ্খলাবিষয়ক সভায় আসতে গিয়ে এভাবে প্রাণ হারাতে হবে আমার লোকজনকে, ভাবতেই পারছি না।’
নিহত পুলিশ সদস্যদের মরদেহ দেখে নির্বাক হয়ে পড়েন পুলিশের মহাপরিদর্শক হাসান মাহমুদ খন্দকার। নিহতদের পরিবারের স্বজনদের সান্ত্বনা দিতে গিয়ে নিজের চোখই ছলছল করে ওঠে। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘পুলিশে এমন দুর্ঘটনা কখনো দেখিনি।’ তিনি নিহতের পরিবারকে সরকার থেকে বিশেষভাবে সহায়তা করা হবে বলে আশ্বাস দেন। তিনি সনাতন ট্রাফিক আইন পরিবর্তন করে তা যুগোপযোগী করার ব্যাপারেও মত দেন।
আনোয়ার হোসেন নামের একজন সহকর্মী বলেন, ‘বিশ্বাসই করতে পারছি না। গাড়িতে ওঠার আগেও একসঙ্গে চা খেলাম, গল্প করেছি, সেই মানুষগুলো এখন লাশ!’

মানিকগঞ্জে ছাত্রদল-পুলিশ সংঘর্ষে আহত ২০

Saturday, January 1, 2011

মানিকগঞ্জে ছাত্রদলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর মিছিলে শনিবার পুলিশের সাথে সংঘর্ষে পুলিশসহ কমপক্ষে ২০ আহত হয়েছে। এ ঘটনায় পাঁচ জনকে আটক করেছে পুলিশ।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ছাত্রদলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে দুপুর ১টার দিকে মানিকগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতি ভবন এলাকা থেকে ছাত্রদলের একটি র‌্যালী বের হয়। র‌্যালিটি জেলা বিএনপি কার্যালয়ের সামনে যাওয়ার পর পুলিশ এতে বাধা দেয়।
এ সময় পুলিশ নেতাকর্মীদের ওপর লাঠিচার্জ করে র‌্যালিটি ছত্রভঙ্গ করে দেয়। বিক্ষুব্ধ বিএনপি কর্মীরা পুলিশের ওপর ইট-পাটকেল ছুড়লে সংর্ঘষ বাধে। আধাঘন্টা ধরে চলা এ সংঘর্ষের সময় শহরে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় ব্যাংকসহ কয়েকটি দোকান ভাঙচুর করা হয়।
 
Support : Dhumketo ধূমকেতু | NewsCtg.Com | KUTUBDIA @ কুতুবদিয়া | eBlog
Copyright © 2013. Edu2News - All Rights Reserved
Template Created by Nejam Kutubi Published by Darianagar Publications
Proudly powered by Dhumketo ধূমকেতু