মত দ্বিমত- ক্ষমতায় থাকা ও যাওয়াই মুখ্য by ইফতেখারুজ্জামান

Tuesday, February 18, 2014

সুশাসন নিয়ে গবেষণা সংস্থা পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) পক্ষ থেকে যে গবেষণার কাজটি হয়েছে, তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যথার্থ চিত্রই উঠে এসেছে এই গবেষণা প্রতিবেদনে।
সুশাসন বলতে স্বাভাবিকভাবে আমরা বুঝি স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, আইনের শাসন ও অংশগ্রহণমূলক ব্যবস্থা, যেখানে সব শ্রেণীর নাগরিকের অংশগ্রহণ নিশ্চিত থাকবে এবং তাদের স্বার্থের বিষয়টির প্রতি শ্রদ্ধা থাকবে। এই বিষয়গুলো নিশ্চিত না হলে সুশাসনের ক্ষেত্রে ঘাটতি থেকেই যাবে। ফলে যে চিত্র প্রকাশ পেয়েছে তা নতুন নয়, ধারাবাহিকভাবেই এ অবস্থা চলে আসছে।

সংসদীয় গণতন্ত্রের পথে আমরা যে যাত্রা শুরু করেছিলাম, তার কাঠামোগুলো কিন্তু রয়েছে। যেমন সংসদ, বিচার বিভাগ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠান, প্রশাসন বা দুদক—এগুলো সবই আছে। এগুলোকে আমরা হার্ডওয়্যার হিসেবে বিবেচনা করতে পারি। এই হার্ডওয়্যারগুলো আমাদের রয়েছে কিন্তু এর চর্চা বা এগুলো ব্যবহারের ক্ষেত্রে বড় ঘাটতি রয়ে গেছে। সমস্যাটি সেখানেই।
গবেষণা প্রতিবেদনে আইনের শাসন নিয়ে আমরা অনেক তথ্য পেয়েছি। তবে সেখানে বিশ্লেষণ নেই। জনগণ বলছে, তাদের আস্থা কমেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিচার বিভাগের ওপর। আবার র‌্যাবের ওপর বেড়েছে। এটা এক অশনিসংকেত। আমরা বুঝতে পারছি যে পুলিশ ও বিচার বিভাগের প্রতি জনগণের আস্থাহীনতার কারণ তারা এদের মাধ্যমে কোনো প্রতিকার পাচ্ছে না। আইন লঙ্ঘনকারীদের শাস্তি দেওয়ার কাজটি র‌্যাবের কাছ থেকে পাচ্ছে। এটা প্রচলিত বিচারব্যবস্থার প্রতি চরম আস্থাহীনতারই প্রমাণ দিচ্ছে। সুশাসনের জন্য এটা খুবই উদ্বেগজনক তথ্য। কারণ, যে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে বিচার-প্রক্রিয়া লঙ্ঘন ও বিচারবহির্ভূত কাজের অভিযোগ রয়েছে, তার প্রতি জনগণের আস্থা বাড়ছে! এ ধরনের পরিস্থিতিতে আমরা যাকে বলি ‘ট্রিগার হ্যাপিনেস’ তা আরও বাড়াতে পারে। এতে প্রচলিত প্রতিষ্ঠানগুলো যেমন দিন দিন আরও আস্থাহীন হয়ে পড়বে, তেমনি মানুষের মধ্যে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতাও বাড়তে পারে। আইনের শাসনের জন্য এটা খুবই উদ্বেগজনক।
শুধু এই গবেষণা নয়, আমরা বিভিন্ন গবেষণায় দেখে আসছি যে রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি জনগণের আস্থা কমছে।
এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। একজন সাংসদ যদি কোনো অপরাধীকে ছাড়িয়ে নিতে অনশন করেন, নারায়ণগঞ্জের এক সাংসদ যদি জনগণকে কর না দেওয়ার আহ্বান জানান বা চিফ হুইপ যদি ক্রেস্টের বদলে ক্যাশ দাবি করেন, তবে রাজনীতিবিদদের প্রতি খুব স্বাভাবিকভাবেই জনগণের আস্থা কমতে থাকবে। পত্রিকায় দেখলাম চার সাংসদ একই সঙ্গে মেয়র পদ ধরে রেখেছেন। এসব কর্মকাণ্ডে ক্ষমতার প্রতি তাঁদের মোহের বিষয়টি চরমভাবে প্রকাশ পায়। এ ধরনের কর্মকাণ্ড অব্যাহতভাবে চলতে থাকায় রাজনীতিবিদদের প্রতি জনগণের আস্থা কমছে।
সুশাসন নিশ্চিত করার জন্য যে প্রতিষ্ঠানগুলো সক্রিয় ও কার্যকর থাকা জরুরি, সেগুলো তাদের কর্মক্ষমতা হারিয়েছে ও হারাচ্ছে দলীয়করণের কারণে। রাজনৈতিক শক্তি নিজেদের স্বার্থে এসব প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যবহার করছে। ফলে এসব প্রতিষ্ঠান পেশাদারি হারাচ্ছে এবং নিজেদের মতো কাজ করতে পারছে না। এর ফলাফল হিসেবে অন্যায় ও অপকর্ম করে পার পাওয়া সহজ হচ্ছে, অপরাধীরা শাস্তি পাচ্ছে না, সাধারণ মানুষ বিচার পাচ্ছে না। একটা বিচারহীনতার পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। এতে সমাজে অপরাধ বেড়ে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে।
এই যে একটি পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে এর কেন্দ্রে রয়েছে রাজনীতির মধ্যে নিজের সুবিধা, নিজের দলের সুবিধা ও নিজের মুনাফা অর্জনের আকাঙ্ক্ষা। রাজনীতির সবকিছুই এখন আবর্তিত হচ্ছে নিজের সুবিধা ও স্বার্থ হাসিলের লক্ষ্যে। এই পরিস্থিতি সুশাসন সহায়ক না হয়ে সুশাসন প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছে। সবচেয়ে দুঃখজনক হচ্ছে এই অবস্থাকে বাস্তবতা হিসেবে মেনে নেওয়ার বিষয়টি। জনগণ এ ধরনের পরিস্থিতিকে যেন মেনে নিতে শুরু করেছে বা মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছে। প্রজাতন্ত্রের সব ক্ষমতার মালিক যে জনগণ, এই বিষয়টি যেন তারা ভুলতে বসেছে।
সুশাসনের মৌলিক ইস্যুগুলো দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর বিবেচ্য বিষয় নয়। ক্ষমতায় থাকা, ধরে রাখা বা যেকোনোভাবে ক্ষমতায় যাওয়াই রাজনীতির মূল বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে নাগরিক সমাজের মধ্যেও একধরনের নিস্পৃহতা ও হতাশা বিরাজ করছে। দলীয় বিভাজনের ঊর্ধ্বে দাঁড়িয়ে কেউ কোনো ইস্যু তুলে ধরলেই তাকে দলীয় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সমালোচক যে শুভাকাঙ্ক্ষী হতে পারে, সে বিষয়টি রাজনৈতিক দলগুলোর বিবেচনায় নেই।
আসল কথা হচ্ছে, যত দিন ক্ষমতা ও রাজনৈতিক অবস্থান ব্যক্তিগত সুবিধা ও মুনাফা অর্জনের পথ হিসেবে ব্যবহূত হবে এবং বিচারহীনতার মাধ্যমে আইনের শাসন পদদলিত হবে, তত দিন সুশাসন মরীচিকা হয়েই থাকবে।

ইফতেখারুজ্জামান: নির্বাহী পরিচালক, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।

নয়া গণতন্ত্র এবং... by অমিত রহমান

Monday, January 27, 2014

নয়া এক গণতন্ত্র আমরা পেয়েছি বিতর্কিত ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনের পর। বিশ্বের কোথাও এ ধরনের গণতন্ত্র এ মুহূর্তে চালু নেই। পশ্চিমা গণতন্ত্রের জন্মদাতারা বেঁচে থাকলে হয়তো তারা বড্ড বেশি লজ্জা পেতেন।
কারণ, প্রচলিত ধারার গণতন্ত্রের সংজ্ঞার সঙ্গে বাংলাদেশী গণতন্ত্রের কোন মিল নেই। অদ্ভুত কিসিমের এই গণতন্ত্রে কোন ভোটের প্রয়োজন হয় না। সংসদেরও দরকার হয় না বিরোধী দলের। বিরোধী নেত্রী আছেন। আছেন তার দলের মন্ত্রীরা। দলের প্রধান সরকারের বিশেষ দূতও। সরকার আর বিরোধীদলকে আলাদা করে দেখার কোন সুযোগ নেই। বলা হচ্ছে, জটিল এক নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আমরা এটা অর্জন করেছি। পশ্চিমা গণতন্ত্রের প্রতি আমাদের অবিচল আনুগত্য আর নেই। কারণ, আমরা নিজেরা নয়া এক মডেল তৈরি করেছি। এখন সংবিধান সংশোধন করে নিলেই সব মামলা চুকে যায়। বুদ্ধিজীবীরা সমানেই টিভির টকশোতে নয়া সব তত্ত্ব হাজির করছেন। বলছেন এটাই গণতন্ত্র। কে ভোট দিতে গেল আর না গেল তা দেখার সুযোগ বা সময় কোথায়? ভোটের বাক্স ছিল। দাওয়াতও দেয়া হয়েছিল ভোটারদের। নিরাপত্তাও ছিল। কেউ যায়নি তাতে কি?

শাসন কায়েম হয়ে গেছে। বিদেশ থেকে স্বীকৃতিও এসে গেছে। তাই আসুন আমরা সবাই যোগ দেই গার্ডেন উৎসবে। যদিও সবার জন্য দরজা খোলা নয় এই উৎসবে। যারা সহযাত্রী তারাই যোগ দেবেন বা দিয়েছেন। আগে ব্যতিক্রম থাকতেন যারা তারাও কোরাসে যোগ দিয়েছেন। খানাপিনায় অংশ নিয়ে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলেছেন। বলেছেন, বাড়তি মজা দেখছি। আগে আমাদেরকে কেন দূরে ঠেলে রাখা হতো? এটাই তো ভাল। সবাই মিলেমিশে এক পতাকাতলে যোগ দিলে দেশে শান্তি আসবে। ভিন্নমতের কি প্রয়োজন? ওরা তো গাড়ি পোড়ায়, রাস্তা অবরোধ করে। কথায় কথায় হরতাল ডাকে। জ্বালাও পোড়াও ছাড়া ওদের যেন আর কোন কাজ নেই। একদা আমজনতার আওয়াজ অন্য স্রোতে বেশি ছিল। এখন ঠিক হয়ে যাবে। আমরা ওদেরকে ঘুম পাড়িয়ে রাখার ওষুধ পেয়ে গেছি। দেখছেন না জেলায় জেলায় থানায় থানায় কিভাবে নতুন শব্দে ঘুম ভাঙে। কেউ জাগে, কেউ চিরদিনের জন্য ঘুমিয়ে যায়।
নয়া মডেল দরকার। জয়তু সরকার প্রধান। তিনি নয়া মডেল দিয়েছেন। আসাদরা গাদ্দাফিরা কোন মডেল দিতে পারেনি। তারা বন্দুকের জোরে ক্ষমতা টিকেছিলেন বা আছেন। এখানে তো সংসদ বহাল। বিরোধীদলও থাকছে। একটু অন্যরকম আর কি! সরকার আর বিরোধীদল একযোগে কাজ করবে। বিরোধী মতের কি প্রয়োজন? অযথা বাড়তি টেনশন। কথার যুদ্ধ। জনগণকে উসকে দিয়ে ফায়দা নেয়ার চেষ্টা। বাংলাদেশী নতুন মডেলে এর কোন জায়গা নেই। ধীরে ধীরে এই জঞ্জাল সাফ করতে হবে। বিরোধী মতের আপাতত কোন দরকার নেই। ভবিষ্যতে দেখা যাবে। পশ্চিমা দুনিয়ার কয়েকজন চেঁচামেচি করবে। পরে ঠিক হয়ে যাবে। আর ওরা কি চায়? ব্যবসা, সুযোগ সুবিধা। সবই তারা পাবে। দেখলেন না চীন কিভাবে রাতারাতি পাল্টে গেল। আরও বড় শক্তি? অপেক্ষা করুন। দেখবেন সেটাও ম্যানেজ হয়ে গেছে। বিরোধীরা যে কেন ভোটে এলো না, তা আমি বুঝতে পারি না। তারা এলেই অনেক কিছু পেতো। আমি তো সবাইকেই দিয়েছি।
গোলমালটা হচ্ছে ইউরোপীয় একটি শক্তিকে নিয়ে। তারা ওয়েস্টমিনস্টার ধারণার অন্য ব্যাখ্যা মানতে চায় না। তাই তারা আপত্তি করেছে। সংসদে প্রস্তাবও পাস করেছে। আপাতত বৈরী। পরশু সকালে দেখবেন বিলকুল ঠিক। বিরোধীরাও চুপ হয়ে যাবে। সামনে কত যে খেলা অপেক্ষা করছে। উপজেলা যাক না- দেখবেন হিসাব মেলাতে পারছে না। রাজনীতি চার দেয়ালের মধ্যেই বন্দি হয়ে যাবে। মিডিয়া তো কাবু হয়েই গেছে। আমাদের কিছু করতে হয়নি। নিজেরাই ম্যানেজ হয়ে গেছে। নতুন আইন করতে যাচ্ছি তাতে ওয়েব দুনিয়াও ঠাণ্ডা হয়ে যাবে। ক’জনের সাহস আছে আইন অমান্য করে বিপ্লবে যোগ দেয়ার? তার মানে কি? মানে খুবই সোজা। এক নেতা, এক দেশ, স্লোগানটি একসময় শুনতে ভাল লাগতো। মাঝখানে অরুচি ছিল। এখন নয়া মোড়কে মোড়ানো হচ্ছে। ভাল লাগতেও পারে। না লাগলে চলে যান অন্য দেশে। কার কি আপত্তি। কেউ আপত্তি জানাবে না। নিরাপত্তার জন্য, সুশাসনের জন্য প্রজারা নানা সময় নানা কিছু করেছেন। এই ভূখণ্ডেও তা-ই দেখা গেছে। প্রজারা রাজাকে বসান। আবার হটিয়েও দেন। রাজতন্ত্র আর গণতন্ত্রের মিল খুঁজতে গিয়ে অযথা বাড়তি চিন্তা করছেন কেন? সময় শেষ হয়ে যায়নি। অপেক্ষা করুন, দেখুন। নয়া কিছুর জন্য কষ্ট করতে হয়। রূপকথার গল্প শেষে সব সময় বলা হয়, এরপর তারা সুখে-শান্তিতে বসবাস করতে লাগলো। এটা রূপকথা কিনা তা নিয়ে আপনি বিতর্ক করতে পারেন। আমি অন্তত করছি না।

সংরক্ষিত স্পিকার অসাংবিধানিক by শহীদুল্লাহ ফরায়জী

Wednesday, January 22, 2014

বাংলাদেশ রক্তের দামে কেনা মুক্তিযুদ্ধের ফসল। যার মূলে ছিল জনগণের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক মুক্তির চেতনা। সেই লক্ষ্যে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বিনির্মাণে জনগণের অভিপ্রায়ের পরম অভিব্যক্তির সনদ হিসেবে
’৭২-এর সংবিধান প্রণয়ন করা হয়েছে। কিন্তু জনগণের ইচ্ছা বা অভিপ্রায় ধারণ করার প্রক্রিয়া অনেক সময় যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয় না। কখনও কখনও সংবিধান ব্যক্তি, দলীয় বা গোষ্ঠীর সংকীর্ণ স্বার্থরক্ষায় পরিণত হয়। ফলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাভিত্তিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র উদ্ভবের সম্ভাবনা দিন দিন তিরোহিত হচ্ছে। সংবিধানের প্রতি আস্থাহীনতা ভয়ঙ্কর প্রকট হয়েছে, ফলে সংবিধান লঙ্ঘন হলেও নীরবে সবাই মেনে নিচ্ছে। সরকার ও সংসদ সংবিধান লঙ্ঘন করছে, ফলে কেউ প্রতিকারের জন্য এগিয়ে আসার নৈতিক শক্তি পাচ্ছে না।

দেশের নবম সংসদে একজন সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্যকে অসাংবিধানিকভাবে স্পিকার নির্বাচিত করা হয়েছে, দশম সংসদেও নাকি সংরক্ষিত আসন থেকে স্পিকার নির্বাচন করা হবে। আমাদের বিদ্যমান সংবিধানের আওতায় জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত সংসদ সদস্য ব্যতীত প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হওয়ার কোন সাংবিধানিক এখতিয়ার নেই। প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার এসব পদসমূহ প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের জন্য সাংবিধানিকভাবে নির্ধারিত এবং সুরক্ষিত। এসব রাষ্ট্রীয় পদ কেবলমাত্র প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিতদের জন্য, সুতরাং এগুলো সংবিধানের অলঙ্ঘনীয় ও অপরিবর্তনীয় বিধান আইনগতভাবে লঙ্ঘনের কোন সুযোগ নেই। বাংলাদেশের সংবিধান প্রত্যক্ষ ভোটের সংসদ সদস্য ও সংরক্ষিত মহিলা সংসদ-সদস্যের ক্ষমতা বিভাজন সুস্পষ্ট-সুনির্দিষ্ট ও নির্ধারিত করে দিয়েছে। সংবিধানের বেঁধে দেয়া ক্ষমতার বিভাজনকে লঙ্ঘন করার এখতিয়ার জাতীয় সংসদের নেই। সংবিধান যেখানে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের ক্ষমতা পৃথকীকৃত করে নির্দেশনা দিয়েছে, সেখানে অনির্বাচিত মহিলা সংসদ সদস্যদের একীভূত করা সংবিধানের চরম লঙ্ঘন। জনগণের ভোটে নির্বাচিতদের সুরক্ষিত পদ অনির্বাচিত দিয়ে প্রতিস্থাপন করা যায় না। জনগণের প্রত্যক্ষ ভোট-ই হচ্ছে আমাদের রাষ্ট্র পরিচালনার নৈতিক ভিত্তি এবং সংবিধানের আদর্শিক নীতি। নির্বাচিত সংসদ সদস্যগণ প্রজাতন্ত্রের সমগ্র জনগণের প্রতিনিধিত্ব করেন।
সংরক্ষিত মহিলা সদস্য জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধি নয়। সংসদ সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত হলেই নির্বাচিত প্রতিনিধি হয় না তা ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল সংক্রান্ত মামলার রায়ে সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক বলেছেন ‘রাষ্ট্রপতি সংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদাধিকারী ব্যক্তি বটে কিন্তু তিনি গণতান্ত্রিকভাবে প্রজাতন্ত্রের নির্বাচিত প্রতিনিধি নন’।
সংবিধানের ৭৪(১) মোতাবেক ৩০০ আসনের সংসদ থেকে স্পিকার নির্বাচন অপরিহার্য করেছে। ‘স্পিকার পদ’ নির্বাচিতদের জন্য সুরক্ষিত। সুতরাং এখানে সংরক্ষিত আসনের কোন সুযোগ নেই। ৩০০ আসনের কোন একটি আসন শূন্য হলে যেমন সংরক্ষিত দিয়ে প্রতিস্থাপন করা যায় না, তেমনি নির্বাচিতদের জন্য রাষ্ট্রীয় পদ অনির্বাচিত দিয়ে পূরণ করা যায় না। ‘নির্বাচিত’ এবং ‘সংরক্ষিত’ কখনও সমকক্ষ হতে পারে না।
আমাদের সংবিধানে ১৫২ অনুচ্ছেদে স্পিকার পদের ব্যাখ্যায় ‘স্পিকার’ অর্থ এই সংবিধানের ৭৪ অনুসারে সাময়িকভাবে স্পিকারের পদে অধিষ্ঠিত ব্যক্তি’ নির্ধারণ করেছে। শূন্য আসনে যে সময়েই যতবার নির্বাচন হোক তা হবে ৩০০ আসনের সংসদ সদস্য থেকে-এটা সংবিধানের অলঙ্ঘনীয় বিধান। যে বিধান লঙ্ঘন করা যায় না। স্পিকার পদের সঙ্গে সাধারণ নির্বাচন অবিচ্ছেদ্যভাবে ঘনিষ্ঠ। কারণ স্পিকার নির্বাচন করতে গেলেও সাধারণ নির্বাচন লাগে, আর স্পিকার পদ শূন্য করতে গেলেও সাধারণ নির্বাচন আবশ্যক। সংবিধানের ৭৪(১) অনুচ্ছেদটি কেবলমাত্র ৩০০ আসনের সংসদকে একমাত্র নির্ধারণ করেছে। এই অনুচ্ছেদে সাধারণ নির্বাচন ছাড়া অন্যকোন সংসদ সদস্য অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কোন এখতিয়ার নেই। জনগণের ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য বাঙালি জাতি বহুবার সংগ্রাম করেছে, বহুবার আত্মত্যাগ করেছে। এখনও তা অব্যাহত রয়েছে।
৩০০ আসনের সংসদ ব্যতিরেকে যদি স্পিকার নির্বাচিত হয়, তাহলে সংরক্ষিত আসন থেকে প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার সদস্যগণ নির্ধারিত হতে পারবেন। তাতে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোট ধ্বংসস্তূপে পরিণত হবে। এর মধ্য দিয়ে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটের মর্যাদা হরণ, জনগণের সার্বভৌমত্ব এবং সংসদীয় চেতনাকেই হত্যা করা হবে। সাংবিধানিকভাবে নিরূপিত ৩০০ আসনের অধিক্ষেত্র ও ক্ষমতা আইন শাস্ত্রের অনেক পণ্ডিতরা বুঝতে অক্ষম বা উদাসীন। অনির্বাচিতকে স্পিকার নির্বাচন করায় জনগণকে অপমানিত করার ক্ষমতার দম্ভ প্রকাশিত হয়েছে। ৩০০ আসনের নির্বাচিত সংসদ নিজেদের সাংবিধানিক অধিকারই রক্ষা করতে পারে না। সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিয়ে জাতীয় সংসদে সিদ্ধান্ত নিলেই তা সাংবিধানিক হয় না। জনগণের অভিপ্রায়ের পরম অভিব্যক্তিরূপে সংবিধান প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ আইন আর স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে বলা হয়েছে ‘বাংলাদেশের সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী জনগণ’। সুতরাং সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটের অধিকার বা ক্ষমতা অন্য কিছু দিয়ে প্রতিস্থাপন যোগ্য নয়। জনগণের সার্বভৌমত্ব ক্ষমতায়ন, গণতন্ত্র ও প্রজাতান্ত্রিকতা এগুলো সংবিধানের মৌলিক কাঠামো যা সংসদ পরিবর্তন করতে পারে না।
আমাদের সংবিধান ১২২(১) মোতাবেক প্রাপ্তবয়স্কের ভোটাধিকার-ভিত্তিতে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান বাধ্যতামূলক করেছে। যা সংবিধানের ৬৫(২) একক আঞ্চলিক নির্বাচনী এলাকাসমূহ থেকে প্রত্যক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে আইনানুযায়ী নির্বাচিত তিন শত সদস্য নিয়ে সংসদ গঠিত হইবে নিশ্চিত করেছে।
ফলে সংরক্ষিত নারী আসন ছাড়াই ৩০০ আসনের সংসদ গঠিত হয়ে যায়। সেই ৩০০ আসনের সংসদ থেকে প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিসভা গঠন, স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা। প্রত্যক্ষ ভোটের সংসদ হচ্ছে মূল সংসদ। যে সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের আস্থাভাজন প্রধানমন্ত্রী হবেন ৩০০ আসন থেকে। সেই সংসদের অভিভাবক হবেন প্রত্যক্ষ ভোটের সাংসদ ছাড়া- এ অমূলক চিন্তা গণতন্ত্রের বহুমাত্রিক গবেষণার জন্য গুরুত্ব পেতে পারে নিঃসন্দেহে কিন্তু বিদ্যমান সংবিধান তা সমর্থন করে না।
সংবিধানের ১২২(১) অনুচ্ছেদ মোতাবেক গঠিত সংসদই মূল ভিত্তি। সংবিধান নির্বাচিত সংসদের ক্ষমতা সুনির্দিষ্ট করে দিয়েছে। যেমন-
১.    সাধারণ নির্বাচনের পর রাষ্ট্রপতি, ৫৬(৩) অনুযায়ী যে সংসদ-সদস্য সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের আস্থাভাজন বলিয়া রাষ্ট্রপতির নিকট প্রতীয়মান হইবেন, রষ্ট্রিপতি তাঁহাকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করিবেন।
২.    সাধারণ নির্বাচনের পর স্পিকার নির্বাচন নিয়ে সংবিধানের ৭৪(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কোন সাধারণ নির্বাচনের পর সংসদের প্রথম বৈঠকে সংসদ-সদস্যদের মধ্য হইতে সংসদ একজন স্পিকার ও একজন ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত করিবেন, এবং এই দুই পদের যে কোনটি শূন্য হইলে সাত দিনের মধ্যে কিংবা ঐ সময়ে সংসদ বৈঠকরত না থাকিলে পরবর্তী প্রথম বৈঠকে তাহা পূর্ণ করিবার জন্য সংসদ-সদস্যদের মধ্য হইতে একজনকে নির্বাচিত করিবেন। অর্থাৎ কোন সাধারণ নির্বাচনের পর (ধহু মবহবৎধষ বষবপঃরড়হ বষবপঃ ভৎড়স ধসড়হম রঃং সবসনবৎং) যারা সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন অর্থাৎ স্পিকার নির্বাচিত হবেন ৩০০ আসনের সংসদ-সদস্যদের মধ্য থেকে, এটা সংবিধানে প্রদত্ত বাধ্যবাধকতা। যিনি একক আঞ্চলিক নির্বাচনী এলাকাসমূহের কোন না কোন একটি হতে নির্বাচিত সংসদ সদস্য নহেন, তিনি কোন ক্রমেই স্পিকার নির্বাচিত হতে পারবেন না।
৩.    সংবিধানের ৭২(২) অনুযায়ী এই সংসদ সদস্যদের যে কোন সাধারণ নির্বাচনের ফলাফল ঘোষিত হইবার ত্রিশ দিনের মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠানের জন্য সংসদ আহ্বান করা হইবে।
৪.    ৭২(৩) রাষ্ট্রপতি পূর্বে ভাঙ্গিয়া না দিয়া থাকলে প্রথম বৈঠকের তারিখ হইতে পাঁচ বৎসর অতিবাহিত হইলে সংসদ ভাঙ্গিয়া যাইবে;
৫.    ৭৩(২) সংসদ-সদস্যদের প্রত্যেক সাধারণ নির্বাচনের পর প্রথম অধিবেশনের সূচনায় এবং প্রত্যেক বৎসর প্রথম অধিবেশনের সূচনার রাষ্ট্রপতি সংসদে ভাষণ দান করিবেন। এসব নির্দেশনা ৩০০ আসনের সংসদের ক্ষমতার অধিক্ষেত্র নির্ধারিত করেছে।
সংবিধানের ৯৪ অনুচ্ছেদ মোতাবেক বাংলাদেশ সুপ্রিমকোর্টও একটি একক প্রতিষ্ঠান। যা আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগ নিয়ে গঠিত। উভয় বিভাগের বিচারকগণকে বিচারপতি বলা হয়। তাই বলে কি হাইকোর্টের কোন বিচারপতি আপিল বিভাগের এখতিয়ার বা ক্ষমতা প্রতিস্থাপন করতে পারবে? নিঃসন্দেহে না। এমনি ভাবে সংসদ সদস্য হলেই কি নির্বাচিত সংসদের এখতিয়ার বা ক্ষমতা সংরক্ষিত আসন দিয়ে কি প্রতিস্থাপন করা যাবে? অবশ্যই না !
বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের জন্য সংবিধান ‘নির্বাচিত’ ও ‘সংরক্ষিত’ দুই ধরনের সংসদ সদস্য নির্ধারণ করেছে। (যেমন ১৬২ কিশোরগঞ্জ-১ জনাব সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, বেগম তহুরা আলী, মহিলা আসন-১৯)। কেউ কেউ মনে করেন ৩০০ আসন এবং সংরক্ষিত আসনের সবাইকে সংসদ সদস্য হিসেবে অভিহিত করায়, প্রত্যক্ষ ভোটের সংসদ সদস্য আর সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য এক ও অভিন্ন হয়ে যায়! যা একেবারেই অমূলক এবং বিভ্রান্তিকর চিন্তা। সংসদ সদস্যদের আসন শূন্য হলে অনুচ্ছেদ ১২৩(৩) (ক, খ) এবং (৪) মোতাবেক যেভাবে নির্বাচিত সংসদ সদস্যের নির্বাচন হবে সংরক্ষিত আসনে কি সেভাবে প্রত্যক্ষ ভোটেই নির্বাচন হবে? তাহলে নির্বাচিত আসন আর সংরক্ষিত আসন একাকার হয়ে যাবে কিভাবে? সংবিধানের সকল নির্দেশনা ৩০০ আসন নিয়ে আর সংরক্ষিত আসন নিয়ে শুধু ৬৫(৩)-এ একবারই বলা হয়েছে। সংবিধানের কোথাও আর সংরক্ষিত আসন নিয়ে একটি নির্দেশনাও নেই।
সংরক্ষিত আসন থেকে যদি স্পিকার ক্ষেত্র মতে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হতে পারেন তাহলে ভবিষ্যতে কোন নারী আর ৩০০ আসনের সংসদের প্রার্থী হতে উৎসাহী হবেন না বা প্রেরণা হিসেবে কাজ করবে না। যা আনুপাতিক বা সংরক্ষিত আসনের চেতনাকে বিপন্ন করবে।
১৯৭২-এ প্রবর্তিত সংবিধানের অন্তরাত্মার গভীরতা অনুধাবন না করায় সংবিধান লঙ্ঘনকে লাগামহীন করে তুলছে। এর মধ্য দিয়ে সংসদীয় রাজনীতির ক্ষতি সাধনের ক্ষমতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। অতীতেও সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে সংসদীয় গণতান্ত্রিক ধারাকে বিপজ্জনক পথে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। ফলে জাতিকে অতি উচ্চ মূল্য দিতে হয়েছে।
স্পিকার নির্বাচন নিয়ে আবেগের আতিশয্যে সাংবিধানিক নির্দেশনা লঙ্ঘন করে ফেলেছি। সংসদীয় চেতনায় বড় ধরনের আত্মঘাতী কাজ আমরা করে ফেলেছি। স্পিকার নির্বাচনে যে ব্যত্যয় ঘটে গেছে তা সংশোধন করা জাতীয় প্রয়োজনে জরুরি। কারণ সংসদের অভিভাবক যদি সংবিধান লঙ্ঘন দায়ে অভিযুক্ত হন তা গণতান্ত্রিক চেতনার আত্মহননকে উৎসাহিত করবে।
আমাদেরকে যেমন ক্ষমতার প্রলোভন থেকে সংযত থাকতে হবে তেমনি সংবিধানের প্রাধান্য অব্যাহত রাখতে হবে, যা পবিত্র কর্তব্য হিসেবে বিবেচনার জন্য সংবিধানের প্রস্তাবনায় নির্দেশনা রয়েছে। সংবিধানের প্রাধান্য অক্ষুণ্ন রাখার যে পবিত্র দায়িত্ব তা আমরা পালন করতে গত ৪২ বছরে বহুবার ব্যর্থ হয়েছি। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মাধ্যমে খন্দকার মোস্তাক সামরিক আইন জারি করে সামরিক ফরমানের মাধ্যমে সংবিধানকে সামরিক আইনের অধীনে আনা হয়। অনুরূপভাবে ১৯৮২ সালে এইচ এম এরশাদ সামরিক আইন জারি করে সংবিধানকে স্থগিত ঘোষণা করেছিল। এখন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানকে বর্তমান সরকার তাদের প্রয়োজন এবং ইচ্ছার অধীন পরিচালিত করছে। আওয়ামী লীগের নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই স্বাধীনতার ঘোষণা ও সংবিধান প্রণয়ন করেছিল। আর আজ সেই আওয়ামী লীগই স্বাধীনতার ঘোষণা এবং সাংবিধানিক চেতনা থেকে ক্রমাগত দূরে সরে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে রাষ্ট্রব্যবস্থা আইনগত ও নৈতিকভাবে ভেঙে পড়বে। অথচ সরকার সংবিধান ও আইনের রক্ষণ, সমর্থন ও নিরাপত্তা দিতে শপথ দ্বারা বাধ্য। বাংলাদেশকে আমরা যেন ক্ষমতার উন্মত্ততায় ধ্বংসের আবর্তে ফেলে না দেই। রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীনতার স্বপ্ন পূরণের উপযোগী রাষ্ট্র বিনির্মাণ করা জরুরি।
লেখক: গীতিকার

নতুন সরকার- সামনে এখন সুশাসনের চ্যালেঞ্জ by ইফতেখারুজ্জামান

Friday, January 17, 2014

বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের প্রয়াণের আগের দুই সপ্তাহের মধ্যে পর পর দুটি অনুষ্ঠানে তাঁর পাশে থাকার বিরল সৌভাগ্য হয়েছিল। এর একটি ছিল ইতিহাসের মহিরুহ আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী নেতা নেলসন ম্যান্ডেলার স্মরণে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠান, যেখানে হাবিবুর রহমান বলেছিলেন, বাংলাদেশের রাজনীতিবিদেরা ম্যান্ডেলার জীবনাদর্শ থেকে কিছুই শেখেননি।
যুক্তি হিসেবে যে বিষয়ের ওপর তিনি বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন, তা হলো ম্যান্ডেলা দীর্ঘ ২৭ বছর কারাবাসের পর বর্ণবাদ-পরবর্তী দক্ষিণ আফ্রিকার অবিসংবাদী নেতা হিসেবে জনরায়ে নির্বাচিত প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পাঁচ বছরের এক মেয়াদ পালনের পর তাঁর প্রতি পরিপূর্ণ জনসমর্থন নিশ্চিত জেনেও ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়িয়েছিলেন। শান্তিপূর্ণ ও অহিংস আন্দোলনের মাধ্যমে বিজয় অর্জন করে গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার, আইনের শাসন ও সম-অধিকারের মূলমন্ত্রের ক্ষেত্রে কোনো প্রকার ছাড় না দিয়ে মৌলিক জাতীয় ইস্যুতে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার স্বার্থে কেমন করে প্রতিপক্ষকে সঙ্গে নিয়ে জাতি গঠনে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব, তার দৃষ্টান্ত স্থাপন করে ম্যান্ডেলা হয়ে উঠেছিলেন বিশ্বমাপের নেতা, বিশ্বব্যাপী রাজনীতিবিদ ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের জন্য অনুপ্রেরণা ও পথপ্রদর্শক।

ম্যান্ডেলার আদর্শের চর্চা বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বে পরিপূর্ণ প্রতিফলিত হবে—এমন আশা করা মূর্খের কাজ হবে। একদিকে ক্ষমতায় আরোহণ নিশ্চিত করার জন্য আন্দোলনের নামে নির্মম রক্তক্ষয়ী সহিংসতা ও অন্যদিকে ক্ষমতায় থাকার জন্য সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার নামে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ধূলিসাৎ করে জনরায়ের পথ রুদ্ধ করার যে অধ্যায় রচিত হলো, তা গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের জন্য আত্মঘাতী। নৈতিকতাবিবর্জিত ধ্বংসাত্মক ও নেতিবাচক রাজনীতি এ দেশের গণতন্ত্রকামী জনগণের জন্য চরম হতাশাব্যঞ্জক, একই সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরিপন্থী।
৫ জানুয়ারির নির্বাচন সংবিধানের মর্ম ও চেতনার সঙ্গে কতটুকু সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। তবে ভোটার অংশগ্রহণের মাপকাঠির পাশাপাশি যেসব কারণে এই নির্বাচনের ফলে গঠিত সংসদ ও সরকার নিশ্চিতভাবে আস্থাহীনতার সংকটের মুখোমুখি, তার মধ্যে অন্যতম জনগণের ম্যান্ডেটের অনুপস্থিতি। এ নির্বাচন ছিল নিতান্তই ক্ষমতাকেন্দ্রিক, এখানে নির্বাচনী ইশতেহার কোনো ভূমিকা পালন করেনি। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের আনুষ্ঠানিকতার ইশতেহার ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে বলা হয়েছিল, জনগণের ম্যান্ডেট পাওয়ার উদ্দেশ্যে এবার নির্বাচনী ইশতেহার ব্যবহূত হয়নি। অর্থাৎ সরকারের নিজস্ব অবস্থান অনুযায়ী সরকার জনরায়ের সংকটে, যা কাটিয়ে উঠে জনগণের আস্থা অর্জন যত দিন তাঁরা ক্ষমতায় থাকবেন, তত দিনের জন্য অন্যতম চ্যালেঞ্জ সঙ্গে থাকবে।
আস্থা অর্জনের প্রথম পদক্ষেপ হতে পারত প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী অংশগ্রহণমূলক একাদশ সংসদ নির্বাচনের লক্ষ্যে সুনির্দিষ্ট সময়াবদ্ধ রোডম্যাপ ঘোষণার মাধ্যমে আলোচনার পথ সুগম করা। নির্বাচনের আগে থেকে বলা হয়েছিল যে ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের পরই একাদশ সংসদ নির্বাচন নিয়ে বিরোধী দলের সঙ্গে আলোচনার সূত্রপাত করা হবে, যদিও শপথ গ্রহণের পর সরকারের কর্তাব্যক্তিরা জানিয়ে দিচ্ছেন যে সরকার পুরো পাঁচ বছরই ক্ষমতায় থাকবে।
ম্যান্ডেটবিহীন সরকারের আস্থা অর্জনের হাতিয়ার হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কতিপয় এজেন্ডার কথা বলা হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা ও শান্তি প্রতিষ্ঠা, নিরবচ্ছিন্ন উন্নয়ন, সাম্প্রদায়িকতা ও জঙ্গিবাদ দমন, আইনের শাসন, সুশাসন, দুর্নীতি দমন ইত্যাদি দেশবাসীর প্রাণের দাবি। আশার কথা, আগের আমলে যেসব মন্ত্রীর বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মসহ গগনচুম্বী সম্পদাহরণের অভিযোগ ছিল, তাঁদের অনেককেই নতুন মন্ত্রিসভায় রাখা হয়নি। প্রধানমন্ত্রী এও বলেছেন যে তাঁদের বিরুদ্ধে দুদক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে, তিনি কাউকে ছাড় দেবেন না। তবে সরকারের বি-টিমের ভূমিকায় লিপ্ত দুদক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও নির্বাচন কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠান বাস্তবে জনপ্রতিনিধিত্বের অবস্থানে থেকে ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারবে, এরূপ আস্থা জনমনে নেই বললেই চলে।
সদিচ্ছা থাকলে অবশ্য সরকার দু-একটি পদক্ষেপ অনতিবিলম্বে নিতে পারে। নবম সংসদের শেষ অধিবেশনের শেষ মুহূর্তে দুর্নীতি দমন কমিশন আইনের সংশোধনী বিল পাস করে দুদককে সম্পূর্ণ অকার্যকর করার আত্মঘাতী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল, যা একদিকে সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকারের পরিপন্থী ও অন্যদিকে অসাংবিধানিক ও বৈষম্যমূলক। দশম সংসদের প্রথম অধিবেশনেই আইনটির যথাযথ সংশোধন করে দুদককে কার্যকর করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপটি সরকার নিতে পারে। দ্বিতীয়ত, মহাজোট সরকারের পুরো মেয়াদে সংঘটিত দুর্নীতির ওপর শ্বেতপত্র প্রকাশ করে তার পরিপ্রেক্ষিতে সুনির্দিষ্ট সময়াবদ্ধ কৌশল গ্রহণ করে দুর্নীতির অপরাধে দায়ী ব্যক্তিদের কোনো প্রকার ভয় ও করুণার ঊর্ধ্বে থেকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে পারে। এ ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করতে না পারলে দুর্নীতিবিরোধী সব ঘোষণা ফাঁকা বুলি হিসেবে আরও একবার প্রমাণিত হবে।
একদিকে পুরোনো-নতুনের সংমিশ্রণ ও অন্যদিকে তথাকথিত বিরোধী দলের সঙ্গে ক্ষমতার ভাগাভাগির এক অভিনব ও বিভ্রান্তিকর মন্ত্রিসভা আইনের শাসন, দুর্নীতি প্রতিরোধ ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় অঙ্গীকারবদ্ধ থাকবে—এরূপ ঘোষণা করা হয়েছে। ক্ষমতার রাজনীতির মূল উপাদান যে দুর্নীতি, ক্ষমতায় থাকলে পর্বতসম সম্পদ অর্জনের সুযোগকে যেভাবে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ করা হয়েছে, রাষ্ট্রক্ষমতা যেভাবে দুর্নীতি-সহায়ক শক্তির করায়ত্ত হতে চলেছে, দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করার মানসিকতা যেভাবে রাজনৈতিক চর্চার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে বাস্তবে ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করা হবে এই সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ।
আর এই চ্যালঞ্জ মোকাবিলায় সরকার কতটুকু অনমনীয় থাকতে পারবে, তার এক তাৎপর্যপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর একজন বিশেষ দূত নিয়োগের মাধ্যমে। নির্বাচনে তাঁর দলের অংশগ্রহণকে কেন্দ্র করে মঞ্চায়িত সিরিজ নাটকে তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা যে দর-কষাকষির অন্যতম উপাদান ছিল, তা গোপন কিছু নয়। বিশেষ দূত হিসেবে তাঁর ভূমিকা যা-ই হোক না কেন, আইনের শাসন আর দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের ঘোষিত অবস্থান যে মূলত দলীয় রাজনৈতিক এজেন্ডার হাতিয়ার, এই নিয়োগ তারই দৃষ্টান্ত হিসেবে ধরে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই। মন্ত্রিসভার শপথ গ্রহণের দিন সুশাসনের অঙ্গীকারের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সরকারি দলের একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি প্রতীকী অনশনের আরেক নাটক মঞ্চস্থ করে আট মামলার এক দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসীকে আটকাবস্থা থেকে সগৌরবে ছাড়িয়ে আনতে পেরেছেন। জানামতে, তাঁর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গৃহীত হয়নি, হলেও তা কতটুকু কার্যকর হবে, তাও বোধ হয় সবারই জানা।
সুশাসনের পথে আরও চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে দশম সংসদকে কেন্দ্র করে। অস্বীকার করার উপায় নেই যে, সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর মূলত বিরোধী দলের সংসদ বর্জনের কারণে সংসদ তার প্রত্যাশিত ভূমিকা পালনে ব্যর্থ হয়েছে। নবম সংসদের মোট কার্যকালের প্রায় ৯০ শতাংশ তৎকালীন বিরোধী দল বর্জন করে রেকর্ড স্থাপন করে। নেতিবাচক রাজনীতিতে প্রতিপক্ষের তুলনায় খারাপ রেকর্ড করার প্রতিযোগিতা এমনই আত্মঘাতী যে এবারের সংসদকে রূপান্তরিত করা হয়েছে কার্যত বিরোধী দলহীন একচ্ছত্র ভুবনে। নির্বাচনী বৈধতার মুখোশ হিসেবে মঞ্চায়িত জাপা নাটকের শেষ দেখতে হয়তো আরও অপেক্ষা করতে হবে। তবে এটুকু নিশ্চিত বলা যায় যে, এবারের সংসদে থাকবে সরকারের আজ্ঞাবহ একধরনের ক্যাঙারু বিরোধী দল; থাকবে না কোনো অর্থবহ সংসদীয় কমিটি; থাকবে না কোনো কার্যকর সংসদীয় বিতর্ক, থাকবে না বাস্তব অর্থে কোনো গঠনমূলক সমালোচনা। বিরোধীদলীয় অবস্থান বাংলাদেশের প্রায় সব রাজনৈতিক দলের জন্যই অগ্রহণযোগ্য; জাতীয় পার্টির জন্য তো বটেই। তবে নামে বিরোধী দল হয়েও মন্ত্রিত্বের জন্য যে আকুতি-মিনতি, আবার যেভাবে তার প্রশ্রয়, তা অভূতপূর্ব।
একদিকে ম্যান্ডেটহীন সরকার, অন্যদিকে সরকারের আজ্ঞাবহ সংসদ—এরূপ অবস্থায় আইনের শাসন যে আকাশকুসুম নয়, তা প্রমাণ করা হবে সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ। আইনশৃঙ্খলা ও শান্তি প্রতিষ্ঠার নামে আইনের রক্ষক হয়ে উঠতে পারে ভক্ষক। নিরপরাধ সাধারণ মানুষ হতে পারে মিথ্যা মামলা, গ্রেপ্তার-বাণিজ্য আর জামিন-বাণিজ্যের সহজ শিকার। রয়েছে নির্যাতন, বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম, ক্রসফায়ারের ঘটনা বৃদ্ধির ঝুঁকি। অন্যদিকে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, বিশেষ করে বাক্স্বাধীনতার মতো মৌলিক অধিকার বৃহত্তর ঝুঁকির সম্মুখীন হতে পারে।
বিপরীতমুখী দুই পক্ষের ঊর্ধ্বে নিরপেক্ষতা ও বস্তুনিষ্ঠতার অবস্থানকে ‘ষড়যন্ত্র’ হিসেবে চিহ্নিত করার অপচেষ্টা বৃদ্ধি পেতে পারে। সমালোচনামাত্রই বিবেচিত হতে পারে শত্রুতা হিসেবে। বার্তাবাহককে স্তব্ধ করার ঝুঁকি প্রকটতর হতে পারে কপটাচারীদের স্তাবকতার কারণে। এরূপ সম্ভাবনা ভুল প্রমাণ করতে চাই সমালোচনা সইবার ও ভুলত্রুটি সংশোধনের সৎ সাহস, যা হতে পারে জনগণের আস্থা অর্জনের অন্যতম চাবিকাঠি।

ইফতেখারুজ্জামান: নির্বাহী পরিচালক, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।

ক্ষমতা- আমাদের আম-আদমিরা কোথায়? by ওয়াসি আহমেদ

Sunday, December 29, 2013

বিস্ময়কর হলেও মানতে হবে, পৃথিবী থেকে আম আদমি লুপ্ত হয়নি। এই সেদিন ভারতের দিল্লি বিধানসভা নির্বাচনে আম আদমি পার্টির (এপিপি) অভাবিত সাফল্যের সুবাদে তাদের খোঁজ পাওয়া গেল।
রাজনীতির গৎবাঁধা ছক উল্টে দিয়ে তারা তাদের শক্তিমত্তাকেই জানান দিল না, বড় কাজটি যা করল তা এক কথায় প্রকাশ করলে বলতে হয় প্রত্যাখ্যান। মতলববাজ, দুর্নীতিকবলিত, প্রচলিত রাজনীতিকে সরোষ প্রত্যাখ্যান।

যে যেভাবেই দেখার চেষ্টা করুন, ঘটনাটা তথাকথিত নেতিবাচক ভোটের কারসাজি নয়। সাম্প্রতিক তৃতীয় বিশ্বে গণতন্ত্রচর্চা বলতে যা বোঝায় তা চার বা পাঁচ বছরের বিরতিতে নাগরিকদের অন্যতম মৌলিক অধিকার ভোট প্রয়োগের মধ্য দিয়ে শাসকবদল। সামগ্রিক বিচারে প্রত্যাশার চেয়ে এখানে ক্ষোভ-হতাশাই বেশি ক্রিয়াশীল। কিন্তু দিল্লিতে বিপুলসংখ্যক আম-আদমি এপিপির পক্ষে রায় দিয়ে যা করল তাতে অনেকেই প্রত্যাশা দেখতে পাচ্ছেন। হ্যাঁ, ক্ষোভ-হতাশা রয়েছে শাসককুলকে প্রত্যাখ্যানে, তবে ভুঁইফোড় এপিপির পক্ষাবলম্বনের মধ্য দিয়ে প্রত্যাখ্যানের শক্তিতে তারা আশার আলোর খোঁজই করেছে। সে আশা কতটা ফলবান হবে বা আদৌ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে কি না, সে অন্য বিতর্ক।
অরবিন্দ কেজরিওয়ালের এপিপিকে রাজনৈতিক দল বলার সময় এখনো আসেনি। আন্না হাজারের সঙ্গে মতভিন্নতার মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক দল গড়া, নির্বাচনে অংশ নেওয়া, শীলা দীক্ষিতের মতো ডাকসাইটে মুখ্যমন্ত্রীকে হটানো, এমনকি সরকার গঠনের পরও এপিপিকে ভারতের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বড়জোর একট সরব সিভিল সোসাইটি আন্দোলনের মুখপাত্র আখ্যা দেওয়া যেতে পারে। তবে বড় যে কাজটি তারা করেছে তা বিলুপ্ত হতে বসা আমজনতাকে দিয়ে রাজনৈতিক নষ্টামিকে ঝাঁটাপেটা করা। অনেকটা আক্ষরিক অর্থেই, এপিপির নির্বাচনী প্রতীক ঝাঁটা।
ভোট যদি রাজনীতিচর্চার মুখ্য নিয়ামক হয়, তাহলে সেই ভোটের মাধ্যমেই রাজনৈতিক বজ্জাতিকে ঝাঁটার ঘায়ে ঘায়েল করা সমসাময়িক কালের বড় ঘটনা। ব্যতিক্রমীও বটে। রাজনীতিবিদেরা জনগণ জনগণ করে যতই গলার শিরা ছিঁড়ে ফেলার কায়দা করুক, তারা নিশ্চিত ধরে নেয় যাদের দোহাই উঠতে-বসতে তারা পাড়ে তারা অদৃশ্য, পঞ্চভূতে বিলীন। কিন্তু প্রবল ধাক্কায় খোঁয়ারি ভেঙে ভারতীয় রাজনীতিবিদদের কথাবার্তায় বেফাঁস কিছু সত্য ঠিকই বেরিয়ে পড়েছে। কংগ্রেসের ভরাডুবির আগে মুখ্যমন্ত্রী শীলা দীক্ষিত সদম্ভে বলেছিলেন আম আদমি বলে কিছু তাঁর রাডারে ধরা পড়ছে না। আর ভরাডুবির পর কংগ্রেসের মন্ত্রী সচিন পাইলটের মতে, ঘটনাটা বড়ই আশ্চর্যজনক (অ্যাশটোনিশিং)। আশ্চর্য হওয়ার পেছনে তাঁর বক্তব্য, সাধারণ মানুষের পক্ষে একটা কঠিন পরিস্থিতিতে এক জায়গায় জড়ো হয়ে নিজেদের এভাবে প্রাসঙ্গিক ও অর্থময় করে তুলতে পারা ঘটনা হিসেবে সম্পূর্ণ নতুন, বিগত কয়েক যুগে যার নজির নেই। এটা পরিষ্কার, রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তিহীন সাধারণ মানুষ তথা আম আদমির অস্তিত্ব সচিন পাইলটদের হিসাবনিকাশে ছিল না।
ব্যাপার যা দাঁড়াল, আম আদমি আছে, তার অপার শক্তি নিয়েই। আম আদমি কারা? তারা কি জোট-গোত্রহীন, সামাজিকভাবে পরিচিতিহীন, পশ্চাৎপদ, ছন্নছাড়া বেয়াকুব জনগোষ্ঠী? রাজনীতিতে আসক্তি নেই বলে কি তারা রাজনীতি-অসচেতন, নাকি রাজনীতিবিমুখও? বিমুখ হতে গেলে কিন্তু বেয়াকুবি চলে না, সচেতনতার দরকার হয়। শিল্পবিপ্লবের সময় সমাজের মানুষজনকে মোটামুটি তিন শ্রেণীতে ভাগ করার রেওয়াজ ছিল—কুলীন (নোবিলিটি), যাজক (ক্লার্জি) এবং সাধারণ মানুষ (কমোনার)। আজকের দিনে এই শ্রেণীভাগের প্রাসঙ্গিকতা সেভাবে না থাকলেও কৌতূহলের ব্যাপার হলো, সাধারণ মানুষ যারা অভব্য-অভদ্র না হলেও কুলীন বা এলিট মোটেও নয়, ধর্ম-কর্ম করলেও মোল্লা-পুরুত-পাদরি নয়, তাদের নিয়ে টানাহেঁচড়ার শেষ নেই। অন্য দুই সম্প্রদায়কে নিয়ে কালেভদ্রে কথা ওঠে, বিতর্ক হলে সেটা একাডেমিক পর্যায়েই থেকে যায়। মূলত তারা এলিট গোত্রবদ্ধ। উন্নত ও তৃতীয় বিশ্বের এলিটদের মধ্যে ফারাক ম্যালা, যদিও মনস্তত্ত্বের রসায়নে বিভেদ নেই। অন্যদিকে মাত্রার তারতম্য সত্ত্বেও সাধারণ মানুষের মতিগতি সব বিশ্বেই এক। এখানে বলা উচিত, তৃতীয় বিশ্বে খুদে এলিটদের দাপটে সাধারণেরা অচ্ছুত আম আদমিতে পর্যবসিত। সর্বসাধারণ তারা নয়, রাজনীতিবিদেরা জনগণ বলে তাদের বোঝাতে চাইলেও তারা সেই জনগণও নয়। সুতরাং মূল প্রশ্ন তারা কারা?
দিল্লি নির্বাচনে তাদের যে পরিচয় উঠে এসেছে তাতে তারা ঘোরতর রাজনীতিসচেতন, তবে বিদ্যমান রাজনীতিতে আস্থাহীন। তারা তথাকথিত আদর্শিক দর্শনের তোয়াক্কা করে না। দরিদ্র-অবস্থাপন্ন, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, বেকার-পেশাজীবী মিলে তারা যে জায়গায় এককাট্টা, তা তাদের আত্মোপলব্ধিতে। লেজুড়বৃত্তিহীন বলে নিজ নিজ আত্মোপলব্ধিকে ইচ্ছামতো শাণাতে তারা সক্ষম, যা রাজনৈতিক দলের ধ্বজাধারীদের পক্ষে অসম্ভবই নয়, কল্পনাতীতও। এপিপি তাদের একত্র করেছে, যূথবদ্ধতার শক্তি জুগিয়েছে। যেহেতু তারা আম আদমি, কঠিন তত্ত্বকথায় আগ্রহ নেই, এপিপি তাদের সোজাসাপটা বলেছে—দুর্নীতি হটাও, রাজনীতি চোরে ভরে গেছে, চোরদের বিদায় করো।
যে কারণে এত কথা এবার সে প্রসঙ্গে আসতে হচ্ছে। বাংলাদেশে আমরা আম-আদমির দেখা কবে পেয়েছি? আমরা সংগঠিত গণ-আন্দোলন দেখেছি, স্বৈরাচারবিরোধী গণ-অভ্যুত্থান দেখেছি আর গোটা জাতির পরাধীনতার গ্লানি ঘোচাতে মরণপণ মুক্তিযুদ্ধ ৪২ বছর আগে শুরু হয়ে আজও শেষ হয়নি। বেশ কটা জাতীয় নির্বাচনও দেখা সারা, অচিরে আবারও দেখতে যাচ্ছি। যত রূঢ়ই শোনাক, আমজনতাকে আলাদা করে খুঁজে বের করা মুশকিল। তারা ছিল, তবে জনারণ্যে আচ্ছন্ন। প্রগতিচিন্তার ইচ্ছাপূরণের খোরাক জোগাতে এ নিয়ে কেউ দ্বিমত পোষণ করলেও কিছু যায়-আসে না। আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক দেউলিয়াপনার অন্যতম ক্ষত হলো ইচ্ছাপূরণের কারসাজিতে প্রগতিশীল হতে চাওয়া।
এখন যা প্রশ্ন, আমাদের মতো হতদরিদ্র, চিরবঞ্চিত মানুষের দেশে স্বতন্ত্র, স্বাধীন, অমুখাপেক্ষী আমজনতার অস্তিত্ব নেই কথাটা বলতে কি আমরা কুণ্ঠিত? গোটা রাষ্ট্রব্যবস্থা আর কত দুর্নীতিবাজ হলে, রাজনীতি কতটা বেলাজ-বেহায়াপনা উগরে দিলে ১৬ কোটি মানুষের অন্তত একটা উল্লেখযোগ্য অংশ রাজনৈতিক দলবাজিমুক্ত নিখাদ আমজনতায় পরিণত হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করবে? তথ্য বলছে, এ দেশে আমাদের অবাধ দুর্নীতি ও অপশাসনের পালাবদলময় রাষ্ট্রব্যবস্থা পৃথিবীর উন্নত-অনুন্নত, ধনী-নির্ধন সব দেশকে টেক্কা দেওয়ার নজির রেখেছে। আমাদের তথাকথিত জনপ্রতিনিধিরা ক্ষমতায় আসীন হওয়ামাত্র আলাদিনের দৈত্যের ভেলকিবাজিতে অতি অনায়াসে নিজেদের বিত্ত-বৈভবের শনৈঃ শনৈঃ স্ফীতি ঘটান। নিজেদের ঘটান, তাঁদের পতিব্রতা স্ত্রীদের ঘটান, আত্মীয়-পরিজনও এ থেকে বাদ পড়েন না। আমাদের জ্যেষ্ঠতম মন্ত্রী জনসমক্ষে এর সরল-সোজা ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে জানান, ক্ষমতায় বসলে সম্পদ বাড়াই স্বাভাবিক ঘটনা। খবরের কাগজের পাতায় এ নিয়ে ঠাট্টা-মশকরা চলছে। এ পর্যন্তই।
এমন অকপট ব্যাখ্যা, যা আগে কারও মগজে গজায়নি, সম্পদশালী হওয়ার অত্যন্ত সুচারু ও নির্ঝঞ্ঝাট পথই বাতলে দেয় না, সম্পদ আহরণের একটা তত্ত্বও দেশবাসীর কাছে পেশ করে। ক্ষমতায় আরোহণ মানে তো কেবল মন্ত্রী-সাংসদ মিলে শ কয়েক মানুষের সম্পদ-আকাঙ্ক্ষাকেই চরিতার্থ করা না, রাষ্ট্রব্যবস্থার স্তরে স্তরে, নানা অন্ধি-সন্ধিতে পাহারারত বেশুমার সহগামী ও তাদের তাঁবেদারদেরও সম্পদশালী করা। হ্যাঁ, কাজটা সম্পদ আহরণ, চুরি নয়।
চুরি যে করে সে সোজাসাপটা চোর। সিঁধ কেটে বা গা-গতরে চপচপে তেল মেখে ঘুমন্ত গৃহস্থের ঘরে রাতের আঁধারে হানা দেয় যারা, তাদের চোর বলা হয়। তাদের খুব সাবধানি হতে হয়, কারণ ধরা পড়ার ভয়। চোর বা তার মামাতো-খালাতো ভাই পকেটমাররা নিম্ন শ্রেণীর জীব। এদের সঙ্গে শিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিত মধ্যবিত্তের কোনোরূপ জ্ঞাতিগত সম্পর্ক বা কিনশিপ নেই।
অন্যদিকে ক্ষমতায় চড়ে চুরির অক্লান্ত সাধনায় যাদের অশেষ প্রতিষ্ঠা-প্রতিপত্তি, তাদের প্রতি আপামর মধ্যবিত্তের জ্ঞাতিগত ও সামাজিক পক্ষপাত এতই প্রবল, সুভাষণের আড়াল খুঁজে চুরিকে চুরি না বলে বলা হয় সম্পদ আহরণ। জ্যেষ্ঠতম মন্ত্রী নিজে সম্পদশালী না হয়েও তত্ত্বটি কেন ফলাও করে জাহির করলেন? দেশবাসী জানে তাঁর অবস্থান তাঁর রাজনৈতিক সহগামীদের থেকে যথেষ্ট তফাতে। সামাজিক মনস্তাত্ত্বিকেরা এর পেছনে যে কারণটি অবশ্যই খুঁজে পাবেন তা এই জ্ঞাতিত্ব। আমাদের প্রচলিত রাজনৈতিক সংস্কৃতির বাতাবরণে যার লালন প্রশ্নাতীত এবং আপাতদৃষ্টিতে যার বাড় অপ্রতিরোধ্য।
এ সত্ত্বেও এ কথা বিশ্বাস করা কঠিন, একচেটিয়া রাজনৈতিক জ্ঞাতিত্বের মায়ায় দেশের কমবেশি ১৬ কোটি মানুষই মোহান্ধ, অবরুদ্ধ। মায়ার এ বলয় অনেক বড়, সন্দেহ নেই; তবে এর বাইরে যারা, যাদের বলতে পারি আম আদমি, তারা কোথায়? তারা নেই এ কথা হঠকারিতামূলক। এ দেশে মৃত্যু অবধি থাকব বলে যারা টিকে আছি, তাদের বিশ্বাস করতেই হবে তারা আছে, হয়তো জনারণ্যে আচ্ছন্ন হয়ে।
তাদের তালাশ করতে হয়, এক জায়গায় জড়ো করতে হয়।
কারা করবে তালাশ? ঘুরিয়ে বললে, কে বা কারা কিসের যোগ্যতায় তাদের কাছে পৌঁছাবে বা পৌঁছার সাহস করবে? প্রশ্নটা যত অবধারিতই হোক, রাজনৈতিক মৎস্যজীবীদের জাল থেকে বেরোতে গেলে এ প্রশ্ন করে করে জবাবের অপেক্ষায় থাকা ছাড়া উপায় নেই।
ওয়াসি আহমেদ: কথাসাহিত্যিক।
 
Support : Dhumketo ধূমকেতু | NewsCtg.Com | KUTUBDIA @ কুতুবদিয়া | eBlog
Copyright © 2013. Edu2News - All Rights Reserved
Template Created by Nejam Kutubi Published by Darianagar Publications
Proudly powered by Dhumketo ধূমকেতু