কালের পুরাণ- বড় ধাক্কা খেল আওয়ামী লীগ by সোহরাব হাসান

Saturday, February 22, 2014

সব রাজনৈতিক দলেই কিছু নেতা থাকেন, কথা বলতে ভালোবাসেন। তাঁরা কাজ করেন কম। কথা দিয়েই কাজের ঘাটতিটা পূরণ করতে চান।
তবে সম্ভবত ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগে এই নেতা-নেত্রীর সংখ্যাই বেশি। বিরোধী দলে এ রকম কথার রাজাদের কদর বেশি। কেননা, বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বিরোধী দলের একমাত্র কাজ হলো সরকারের সমালোচনা করা এবং সেই কাজটি যিনি যত জ্বালাময়ী ভাষায় দিতে পারেন, তিনি বড় নেতা হন। বাংলাদেশে জ্বালাময়ী ভাষায় বক্তৃতা দেওয়া নেতার অভাব নেই। অভাব আছে দক্ষ প্রশাসকের। মন্ত্রীও যে একজন প্রশাসকও, সে কথাটি তাঁরা ক্ষমতায় থাকতে ভুলে যান এবং নিজের মন্ত্রণালয় ছাড়া সব বিষয়ে পাণ্ডিত্য দেখান।

শেখ হাসিনার তৃতীয় মন্ত্রিসভার বয়স দেড় মাসেরও কম। গত মাসের ১২ তারিখে তাঁর নেতৃত্বে নতুন মন্ত্রিসভা শপথ নিয়েছে। আজ ফেব্রুয়ারির ২২ তারিখ। এই এক মাস ১০ দিনের মধ্যে সরকার রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণী ক্ষেত্রে যেই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তটি নিয়েছে তা হলো উপজেলা পরিষদ নির্বাচন। সব উপজেলার মেয়াদ এখনো শেষ হয়নি। স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমেদ বলেছেন, মেঘ না চাইতেই জল। সরকার হয়তো ভেবেছিল, প্রায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জিতে আসা জাতীয় নির্বাচনের এক-দেড় মাসের মধ্যে উপজেলা নির্বাচন হলে বিরোধীরা বেকায়দায় পড়বে। কিন্তু প্রথম দফার ৯৭টি উপজেলা নির্বাচনের ফলাফলে দেখা যায়, বিরোধী দল নয়, সরকারি দলই বেকায়দায় পড়েছে। বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। দ্বিতীয় যে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত সরকার নিয়েছে তা হলো, দ্রুত বিচার আইনের মেয়াদ আরও চার বছর বাড়ানো। আগামী এপ্রিলে এই মেয়াদ শেষ হবে। আগে দুই বছর করে বাড়ানো হতো। এবার চার বছর বাড়ল।
তবে উপজেলা নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে সরকারি দলের একটি সন্তুষ্টির জায়গা আছে সেটি হলো, শেখ হাসিনার আমলে সব নির্বাচন যে অবাধ ও সুষ্ঠু হয়, এটাই তার প্রমাণ। এ কারণে বাকি উপজেলা নির্বাচনগুলো ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সেসব নির্বাচন যদি মোটামুটি সুষ্ঠু হয় এবং বিরোধীদের জয়ের ধারা অব্যাহত থাকে, তাহলে আওয়ামী লীগ নেতারা জোর দিয়ে বলতে পারবেন, ‘আমরা ভোট কারচুপি করি না।’ তাতে তাঁদের রাজনৈতিক অবস্থান দুর্বল হলেও নৈতিক অবস্থান পোক্ত হবে। আর যদি নির্বাচন সুষ্ঠু না হয় এবং ক্ষমতাসীনেরা যেকোনো উপায়ে জয়ী হতে চায়, তাহলে আরও বড় চ্যালেঞ্জ সরকারের জন্য অপেক্ষা করছে। বিরোধী দল তখন সরকারকে সময় দিতে চাইবে কি না, সে ব্যাপারে যথেষ্ট সংশয় আছে।
গত দেড় মাসে মন্ত্রীরা কে কী কাজ করেছেন, হিসাব নিলে অনেকের জমা খাতার হিসাব মেলানো কঠিন। বেশির ভাগ মন্ত্রীর কথাবার্তা শুনে মনে হয়, মন্ত্রিত্ব করা তাঁদের কাছে ডাল-ভাত। তাঁদের একমাত্র কাজ হলো পরাস্ত বিএনপি-জামায়াতকে কোণঠাসা করা। বিএনপি-জামায়াত তো এখন সংসদে নেই, রাজপথেও নেই। কোনো কোনো মন্ত্রী জাতীয় নির্বাচন বর্জন করে উপজেলা নির্বাচন করার জন্য বিএনপির নেত্রী খালেদা জিয়াকে নাকে খত দিতে বলেছিলেন। সেই মন্ত্রীদের কাছে জিজ্ঞাসা, এখন কে নাকে খত দেবেন।
তবে আমরা নিশ্চয়ই সব মন্ত্রীকে এই বাকপটু দলে ফেলছি না। অনেক মন্ত্রীকে দায়িত্ব নিয়েই কঠিন পরিস্থিতি সামাল দিতে হচ্ছে। তাঁরা নিজেদের গুরুত্ব দেশের মানুষ ও বিদেশি বন্ধুদের কাছে ভালোভাবেই তুলে ধরতে পেরেছেন। যেসব মন্ত্রী আগের মন্ত্রণালয়ে নিজেদের ঠাঁই করে নিতে পেরেছেন, স্বভাবতই তাঁরা কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থায় আছেন। কিন্তু যাঁরা মন্ত্রিসভায় নতুন এসেছেন অথবা পুরোনো হলেও নতুন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন, তাঁদের কাজটি বুঝতে তো কিছুটা সময় লাগার কথা। যদিও এসব মন্ত্রীর হাবভাব দেখে মনে হয়, মন্ত্রণালয় পরিচালনা কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো বিএনপি-জামায়াতকে ঘায়েল করা। তাই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তাঁদের কণ্ঠে সেই জিগিরই প্রতিধ্বনিত হচ্ছে—রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি কত খারাপ, কত গণবিচ্ছিন্ন।
৫ জানুয়ারির নির্বাচনে বিএনপির না যাওয়া তাদের রাজনৈতিক ভুল ছিল বলে আমরাও মনে করি। এর অর্থ এই নয় যে তারা জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। বরং উপজেলা নির্বাচনে মৌলবাদী জামায়াতে ইসলামীর আশাতীত ভালো ফল কেবল সরকারের জন্য নয়, বাংলাদেশের জন্যও অশনিসংকেত। অতীতে কোনো নির্বাচনে তারা এই ফল দেখাতে পারেনি।
বলার অপেক্ষা রাখে না যে গত দেড় মাসে সরকার এমন কিছু করে দেখাতে পারেনি যে আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা বাড়বে। এমনকি মার্কিন গবেষণা সংস্থা আরডিআই ও ডিআইএর জরিপে ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা কমারই ইঙ্গিত দিয়েছে। অনেকে এ কথাও বলাবলি করছে যে সরকার ছাত্রলীগকেই সামাল দিতে পারছে না, সেই সরকার কীভাবে দেশের সার্বিক পরিস্থিতি নিজের আয়ত্তে নিয়ে আসবে। চট্টগ্রামে স্বর্ণ ব্যবসায়ী মৃদুল চৌধুরীর অপহরণ ও উদ্ধারের ঘটনাটি নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিমন্ত্রীকে জিজ্ঞেস করতে চাই, কেন মৃদুল অপহরণ হলেন, কারা তাঁকে অপহরণ করলেন, কেন অপহরণ করলেন, কীভাবে তিনি ছাড়া পেলেন?
আয়মান আল-জাওয়াহিরির ভিডিও বার্তার জন্য বিরোধী দলকে দায়ী করা যায়। কিন্তু মৃদুল চৌধুরীর অপহরণকারীদের খুঁজে বের করা সত্যি কঠিন!
এত দিন সরকারি দলের নেতারা এবং সরকারের মন্ত্রীরা সব অপকর্মের দায় বিরোধী দলের ধ্বংসাত্মক রাজনীতির ওপর চাপিয়ে বাহবা নিতে চাইতেন। দেশের যা কিছু অমঙ্গল, সবকিছুর জন্য বিরোধী দল দায়ী। কিন্তু এখন তাঁরা কী বলবেন? এখন তো বিরোধী দল ধ্বংসাত্মক কোনো কর্মসূচি দিচ্ছে না।
একজন প্রভাবশালী মন্ত্রী বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে বাংলাদেশে আল-কায়েদার এজেন্ট হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। সেটি যদি সত্যি হতো, তাহলে মন্ত্রীর তথ্য উদ্ঘাটনের আগেই যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিত। তাঁর পরামর্শের অপেক্ষা করতেন না। তারেক রহমানের রাজনীতির বিরোধিতা করা এবং তাঁকে আল-কায়েদা বানানো এক কথা নয়। উপজেলা নির্বাচনে তারেক রহমানের দল আওয়ামী লীগের চেয়ে বেশি পদ পেয়েছে, জামায়াতকে ধরলে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ। এখন কি মন্ত্রী মহোদয় বলবেন, বাংলাদেশের দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ আল-কায়েদার সমর্থক? মন্ত্রী মহোদয় হয়তো বলবেন, বিএনপির নেত্রী খালেদা জিয়া যেহেতু আল-কায়েদা নেতা জাওয়াহিরির ভিডিও বার্তাকে প্রধানমন্ত্রীর পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়ের বানানোর বলে দাবি করেছেন, সেহেতু তার পাল্টা একটি বক্তব্য দেওয়া দরকার। কিন্তু তাঁকে মনে রাখতে হবে, দেশ চালাচ্ছে আওয়ামী লীগ, বিএনপি-জামায়াত নয়। তাই দেশে যত অঘটন ঘটবে, তার দায়ও আওয়ামী লীগকেই নিতে হবে অথবা তথ্য-প্রমাণ দিয়ে বলতে হবে, ওরা অপরাধী। হাওয়ায় ছড়ি ঘোরালে হবে না।
বিরোধী দলে থাকলে নেতা-নেত্রীরা অনেক কিছু বলেন, বলতে পারেন। কিন্তু ক্ষমতায় থাকা নেতাদের প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব জনগণের কাছে দেওয়া ওয়াদা পূরণ করা। অবশ্যই ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ২০২১ সালের মধ্যে মধ্য আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশে পরিণত করার বাইরে কার্যত কোনো প্রতিশ্রুতি দেয়নি। দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেনি। বরং বিচারবহির্ভূত হত্যা বন্ধে ২০০৮ সালে যেই প্রতিশ্রুতি ছিল, সেটি সজ্ঞানে প্রত্যাহার করে নিয়েছে। এর অর্থ কি এই দাঁড়ায় না যে ২০০৮ সালে বাংলাদেশে আইনের শাসনের জন্য বিচারবহির্ভূত হত্যার প্রয়োজন ছিল না! এখন আছে। বিশ্ব দ্রুত সামনে এগোচ্ছে। আর আমরা ক্রমেই পেছনে চলে যাচ্ছি।
১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের নির্বাচনেও আমরা শক্তিশালী বিরোধী দল পেয়েছিলাম বলে সেই সরকার ও সংসদে ভারসাম্য ছিল। অন্তত প্রথম দুই-আড়াই বছর। ২০০১ ও ২০০৮ সালের নির্বাচনে সেই ভারসাম্য রক্ষিত হয়নি বলে দেশের রাজনীতি ও গণতন্ত্রচর্চা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়ে পড়ে। আর ২০১৪ সালে নির্বাচনে বিরোধী দলের অস্তিত্ব নেই বলেই জনমনে ধারণা। ফলে এই ভারসাম্যহীন সংসদ ভারসাম্যপূর্ণ রাজনীতি উপহার দিতে পারবে কি না, সেটাই এখন ক্ষমতাসীনদের জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জাতীয় ঐকমত্যের সরকার মুখে বললেই হয় না, কাজে দেখাতে হয়। নির্বাচনী বৈতরণি পার হয়ে আওয়ামী লীগের নেতারা এতটাই আস্থাশীল হয়ে পড়লেন যে উপজেলায় ১৪-দলীয় শরিকদের সঙ্গেও পদ ভাগাভাগি করতে রাজি হলেন না। বাংলাদেশের রাজনীতিতে পথ ও পথের বিবেচনায় আওয়ামী লীগের যেমন কিছু সুবিধা আছে, তেমনি অসুবিধার দিকটি হলো, আওয়ামী লীগ বিপদে না পড়লে কখনো কারও সঙ্গে জোট বাঁধে না। বিপদে পড়লে খেলাফত মজলিসের সঙ্গেও জোট বাঁধতে পারে। অন্য সময়ে একলা চল নীতিতে চলে দলটি। ১৪ দল ও জাতীয় পার্টির সঙ্গে সমঝোতা করে প্রার্থী দিলে নিশ্চয়ই ক্ষমতার দেড় মাসেরও কম সময়ের মধ্যে আওয়ামী লীগকে উপজেলা নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াতের কাছে এভাবে নাকানিচুবানি খেতে হতো না।
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrab03@dhaka.net

কালের পুরাণ- মেধা ও তারুণ্যের প্রতি রাষ্ট্রের উপেক্ষা by সোহরাব হাসান

Saturday, February 15, 2014

গত বছরের এপ্রিল-মে মাসে এইচএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। বিরোধী দলের আন্দোলন, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সংঘাতের কারণে দীর্ঘ সময় নিয়ে এই পরীক্ষা নিতে হয়েছে। বেশির ভাগ পরীক্ষা হয়েছে শুক্র ও শনিবার।
অন্য দিন বিরোধী দলের হরতাল-অবরোধ থাকায় পরীক্ষা হতে পারেনি। গত বছর একই সমস্যা হয়েছিল এসএসসি, জেএসসি ও পিএসসি পরীক্ষার বেলায়ও।

এইচএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয় গত বছর আগস্টের মাঝামাঝি। এখন ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি। এর মধ্যে
ছয় মাস চলে গেলেও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ভর্তির প্রক্রিয়া শেষ হয়নি। কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন পর্যন্ত ভর্তির প্রক্রিয়া শুরুই হয়নি। মার্চ নাগাদ ভর্তির প্রক্রিয়া শেষ হলেও ক্লাস শুরু হতে এপ্রিল-মে পর্যন্ত গড়াবে।
মাঝখানে পুরো একটি বছর হারিয়ে যাবে এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রত্যেক শিক্ষার্থীর জীবন থেকে।
সাধারণত একটি পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর নতুন শ্রেণীতে ভর্তির প্রক্রিয়া তিন মাসের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা। গত এক বছরে রাজনৈতিক সহিংসতার অজুহাত দেওয়া হলেও ভর্তি প্রক্রিয়ার এই বিলম্ব সব সময় ঘটে থাকে। কেন ঘটে, কারা ঘটান, তার ব্যাখ্যা নেই। ইতিমধ্যে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো একাধিক সেমিস্টার শেষ করেছে। আমাদের প্রগতিশীল ছাত্রসংগঠনগুলোও এ নিয়ে আন্দোলন করে না। আর সরকারদলীয় ছাত্রসংগঠনের নেতারা মনে করেন, পরীক্ষা যত বিলম্বে হবে, তত তাঁদের লাভ। নেতৃত্ব প্রলম্বিত হবে; সেই সঙ্গে চাঁদাবাজি আর দখলবাজিও।
কেবল ভর্তি পরীক্ষা নয়, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের সব পরীক্ষা, ক্লাস ও কোর্স শেষ হয় নির্ধারিত সময়ের অনেক পরে। সব বিশ্ববিদ্যালয়েই কম-বেশি সেশনজট আছে। তবে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় এ ক্ষেত্রে রেকর্ড সৃষ্টি করে চলেছে। গড়ে দুই থেকে তিন বছর সেশনজট চলছে এই প্রতিষ্ঠানটিতে। এর কুফল ভোগ করতে হচ্ছে গরিব ও সুবিধাবঞ্চিত ছাত্রছাত্রীদেরই এবং বলা বাহুল্য, তাঁদের সংখ্যাই বেশি।
বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে স্নাতক ও স্নাতক সম্মান, স্নাতকোত্তর পর্যায়ে শিক্ষার্থীসংখ্যা ২১ থেকে ২২ লাখ। যার মধ্যে ১৩ থেকে ১৪ লাখ পড়াশোনা করেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। অন্যরা অর্থাৎ তুলনামূলক সুবিধাভোগীরা ভর্তি হন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি-বেসরকারি মেডিকেল কলেজে। কেউ কেউ উচ্চতর মাদ্রাসায়ও পড়েন। কিন্তু অর্ধেকের বেশি ছাত্রছাত্রী যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আওতায় পড়েন, সেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির মা-বাপ আছে বলে মনে হয় না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে সেশনজট অনেকটা কমিয়ে আনা সম্ভব হলেও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় চলছে সেই পুরোনো নিয়মেই। সেখানে অধ্যয়নরত প্রত্যেক শিক্ষার্থী গড়ে দুই বছর সেশনজটে পড়লে জাতীয় ক্ষতির পরিমাণটি ভাবা যায়। ১৩-১৪ লাখ ছাত্রছাত্রীর জীবন থেকে দুটি বছর করে হারিয়ে যাচ্ছে। কমপক্ষে ২৬ লাখ ইউনিট বছর। গত বছর এইচএসসিতে পাস করেছেন পাঁচ লাখ ৭৯ হাজার। এঁদের সবাই বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে না পড়লেও অধিকাংশ পড়বেন। কিন্তু তাঁদের জীবনের হারিয়ে যাওয়া দিন, মাস ও বছরগুলোর হিসাব কে দেবেন?

দুই
প্রতিদিন পাঠকের কাছ থেকে বহু চিঠি পাই। তরুণদের চিঠির বেশির ভাগই চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ও বিসিএস পরীক্ষা-সংক্রান্ত। গতকাল প্রথম আলোয় খবর বের হয়েছে, প্রিলিমিনারি পরীক্ষার ফল প্রকাশের সাত মাস পার হলেও ৩৪তম বিসিএসের লিখিত পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা করা হয়নি। ফলে দুশ্চিন্তায় আছেন ৪৬ হাজার ২৫০ জন পরীক্ষার্থী। ভাবা যায়! এই কর্মকমিশন নিয়ে আমরা কী করব?
সরকারি চাকরিতে প্রবেশের আগের বয়সসীমা ছিল ২৮ বছর। এখন করা হয়েছে ৩০ বছর। কিন্তু অনেকেরই অভিযোগ, এই সময়ের মধ্যে তাঁরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হতে পারেন না। পারলেও চাকরি খোঁজার বয়স থাকে না। সে জন্য চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩২ বা ৩৫ করার দাবি তাঁদের। পৃথিবীর আর কোনো দেশে তরুণদের নিয়ে রাষ্ট্র ও সরকার এমন তামাশা করতে পারে না। সব সম্ভবের দেশে সবকিছু করে পার পাওয়া যায়।
আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে রাজনৈতিক বিরোধ আছে। আছে পথ ও মতের বিস্তর ফারাক। কিন্তু একটি জায়গায় তাদের মধ্যে অদ্ভুত মিল দেখা যায়। সেটি হলো, তরুণ প্রজন্মকে ক্রমাগত উপেক্ষা করা। তাদের তারুণ্য, প্রাণশক্তি ও মেধাকে অগ্রাহ্য করা। আর এই কাজটি শুরু হয় প্রাথমিক স্তর থেকেই। স্বাধীনতার ৪৩ বছরেও অভিন্ন প্রাথমিক শিক্ষা চালু হয়নি। প্রাথমিক শিক্ষা অতিশয় বাণিজ্যিকীকরণ হয়ে পড়েছে। প্রথম শ্রেণীতে পড়ার আগেই ছেলেমেয়েকে দুই থেকে তিন বছর পড়তে হয়, প্লে গ্রুপ, কেজি ওয়ান, কেজি টু। তাই একটি শিশুকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চৌকাঠ পার হতেই আট থেকে নয় বছর লেগে যায়। চার বছর বয়সেও শিশুটি বিদ্যালয়ে ভর্তি হলে এসএসসি পাস করতে লাগে ১৮-১৯ বছর। এরপর কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে আরও ছয়-সাত বছর। আর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের খপ্পরে পড়লে তো বাড়তি দুই বছর যোগ করতে হবে। এরশাদের আমলে আশির দশকে দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় সবচেয়ে বেশি নৈরাজ্য চলছিল। তখন আমাদের এক অনুজ শিক্ষার্থী এইচএসসি পাস করার পর এখানে ভর্তির প্রক্রিয়া বিলম্ব দেখে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন ইংরেজি বিভাগে। সেখানে চার বছরে অনার্স ও এমএ করার পর দেশে এসে দেখেন, তাঁর সতীর্থরা অনার্সই শেষ করতে পারেননি। এই অপচয়ের জবাব কী?
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার এই মস্ত বড় দুর্বলতার দিক নিয়ে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকেরা কিংবা শিক্ষাবিদেরা ভাবেন না। ভাবলে প্রতিবছর লাখ লাখ পরীক্ষার্থীকে এভাবে পরীক্ষা, ফল প্রকাশ কিংবা ভর্তি পরীক্ষার তারিখের জন্য হয়রানি ও দুর্ভোগে পড়তে হতো না। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে যে ভয়াবহ অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে, তা তাঁরা একবারও চিন্তা করেন না।
আমাদের নতুন প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেকেই বড় বড় কথা বলেন। তাঁদের হাতে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ বলে দাবি করেন,
কিন্তু নতুন প্রজন্মের প্রায় প্রত্যেকের জীবন থেকে যে তিন-চারটি বছর হারিয়ে যাচ্ছে, সে সম্পর্কে তাঁরা কেউ কিছু বলেন না।
এর পেছনে শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ যেমন দায়ী, তেমনি দায়ী শিক্ষার এবং তরুণ প্রজন্মের প্রতি রাষ্ট্রের ও শিক্ষার অভিভাবকদের চরম উদাসীনতা।
১৯৯২ সালে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল কলেজ পর্যায়ের স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শিক্ষায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে। আগে যার দায়িত্ব ছিল কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর। এসব বিশ্ববিদ্যালয় নিজস্ব শিক্ষাক্রম পরিচালনার পাশাপাশি কলেজগুলোর তদারকির কাজ করত; বিশ্ববিদ্যালয় সনদও প্রদান করত তারা। কিন্তু জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষায় শৃঙ্খলা আনার বদলে দুর্গতি এনেছে। এই বিশ্ববিদ্যালয় সবচেয়ে বেশি বিতর্কিত ও কলঙ্কিত হয় বিগত বিএনপি সরকারের আমলে, যখন আফতাব উদ্দিন আহমাদ উপাচার্য ছিলেন। পরবর্তীকালে পদ্মা-যমুনায় অনেক পানি গড়িয়েছে। একাধিকবার সরকার ও উপাচার্য বদল হয়েছেন। কিন্তু এই বিশ্ববিদ্যালয়টির দুর্নীতি, অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা কমেছে এমন দাবি করা যাবে না। সেশনজট আগেও ছিল, এখনো আছে। দলীয়করণ আগেও ছিল, এখনো আছে। আর এসব রোগের উপসর্গ এখন আর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়েই সীমিত নেই, প্রতিটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েই স্বজনপ্রীতি ও দলীয়করণের মচ্ছব চলছে। যখন যাঁরা ক্ষমতায় থাকেন, তাঁরাই বিশ্বদ্যািলয়গুলোকে দলীয় কর্মীদের কর্মসংস্থান কেন্দ্রে পরিণত করেন।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্র ও শিক্ষক-কর্মচারী অনুপাত কত হওয়া উচিত? উন্নত বিশ্বে ছাত্র ও শিক্ষকের অনুপাত ১০:১। অর্থাৎ ১০ জন শিক্ষার্থীর জন্য একজন শিক্ষক। আমাদের দেশে সেটি সম্ভব না হলেও ইউজিসি এই অনুপাত বেঁধে দিয়েছে ১৪:১। কিন্তু যেখানে ছাত্র ও কর্মকর্তা-কর্মচারীর অনুপাত বেশি হওয়ার কথা, সেখানে অনেক কম। উপাচার্য মহোদয়েরা দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম যে কাজটি করেন সেটি হলো, কিছু অপ্রয়োজনীয় কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ দিয়ে দল ভারী করা। বিশ্ববিদ্যালয় মানেই এখন মাথাভারী প্রশাসন। কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ও কর্মচারী অনুপাত ৪: ১। অর্থাৎ চারজন ছাত্র বা ছাত্রীকে দেখাশোনার জন্য একজন কর্মকর্তা বা কর্মচারী রয়েছেন।
বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি ফি ও বেতন বাড়ানোর বিরুদ্ধে আন্দোলন হচ্ছে। এই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্ধিত ফি ও বেতন থেকে আয় বাড়বে ৫০ লাখ টাকারও কম। অথচ বাড়তি শ্রমিক-কর্মচারী নিয়োগ করে তাঁদের পেছনে ব্যয় করা হচ্ছে কয়েক কোটি টাকা। জনগণের অর্থ নিয়ে এমন স্বেচ্ছাচারিতা চালানোর সাহস পান কীভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা?
একটি দেশের মানবসম্পদ তৈরি করার প্রধান মাধ্যম হলো বিশ্ববিদ্যালয় বা সমমানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। অথচ আমাদের দেশে এর মানই নাজুক। পশ্চিমের উন্নত বিশ্ববিদ্যালয় দূরে থাক, প্রতিবেশী দেশগুলোর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গেও আমরা প্রতিযোগিতায় পেরে উঠছি না।
বিশ্ব, এমনকি এশীয় সূচকেও বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মান ক্রমেই নিচের দিকে নামছে। আর কত নিচে নামলে মহাত্মনদের চৈতন্যোদয় হবে?
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrab03@dhaka.net

কালের পুরাণ- বিএনপিকে মাঠে নামাতে মন্ত্রীদের উসকানি! by সোহরাব হাসান

কূটনীতিকেরা বিএনপিকে দুই বছরের মধ্যে আন্দোলন না করার পরামর্শ দিয়েছেন বলে গতকাল একটি পত্রিকায় খবর প্রকাশিত হয়েছে। এ খবরের সত্যাসত্য সম্পর্কে আমরা নিশ্চিত নই।
তবে বিএনপির নেতাদের হাবভাব দেখে মনে হয়, তাঁরা দুই বছর না হলেও আন্দোলনের জন্য সরকারকে কিছুটা সময় দিতে চান। এর আগে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া সংবাদ সম্মেলনে আন্দোলনের আগে দল গোছানোর কথা বলেছিলেন। সেই সঙ্গে তিনি এ কথাও জানিয়ে দেন যে তাঁরা খুব বেশি দিন অপেক্ষা করবেন না। বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৯-দলীয় জোটের ভেতরেও যে আন্দোলনে নামা না-নামা নিয়ে চাপান-উতোর চলছে, নানা সূত্রে তারও আভাস পাওয়া যাচ্ছে।

কিন্তু এক মাস বয়সী সরকারের কতিপয় মন্ত্রী যে ভাষায় কথা বলছেন, তাতে মনে হচ্ছে, ক্ষমতাসীন দলটিই চাইছে না বিএনপি বেশি দিন আন্দোলনের বাইরে থাকুক। মাঠ গরম না হলে এই শেষ শীতের দিনে তাঁদের ভালো লাগে না।
গত বৃহস্পতিবার শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু একটি বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে জাতীয় নির্বাচনে অংশ না নিয়ে উপজেলা নির্বাচনে অংশ কেন নিচ্ছে, সে জন্য বিএনপির কাছে কৈফিয়ত তলব করেছেন। এ নিয়ে মন্ত্রীর আত্মশ্লাঘার কিছু নেই। বিএনপি জাতীয় নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার কারণেই তো আমির হোসেনের মতো আরও অনেকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সাংসদ নির্বাচিত হয়ে শেখ হাসিনার তৃতীয় সরকারের মন্ত্রী হয়েছেন। শেখ হাসিনার প্রথম সরকারে যিনি প্রথমে মন্ত্রীই হতে পারেননি। কেননা, তিনি বিএনপির একজন নবীন নেতার কাছে হেরে গিয়েছিলেন। পরে টেকনোক্র্যাট কোটায় খাদ্যমন্ত্রী হন এবং উপনির্বাচনে ইলেন ভুট্টোকে হারিয়ে সাংসদ হন। ২০০১ সালের নির্বাচনে আবার ইলেন ভুট্টোই নির্বাচিত হন। হেরে যান আমির হোসেন আমু।
সে ক্ষেত্রে বিএনপি নির্বাচনে না আসায় তাঁর অন্তত সুবিধাই হয়েছে। বিএনপির কাছে কৈফিয়ত না চেয়ে তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারতেন।
আর নির্বাচনে অংশ না নিয়ে বিএনপি ভুল করে থাকলে সে জন্য জনগণ তাদের কাছে কৈফিয়ত চাইবে। এখন যদি বিএনপি ভুল বুঝতে পেরে উপজেলা নির্বাচনে শরিক হয়েও থাকে, সে জন্য কৈফিয়ত দিতে হবে কেন?
আমির হোসেন আমুরা যেহেতু নিজেদের নির্বাচিত প্রতিনিধি মনে করেন, তাঁদেরই উচিত জনগণের কাছে কৈফিয়ত দেওয়া। এক মাসের বেশি সময় হলো, তিনি শিল্প মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে আছেন। এই সময়ে তাঁর মন্ত্রণালয়ে কী কাজ হয়েছে, সেটি জানার অধিকার দেশবাসীর আছে। এত দিন সব দুর্গতির জন্য তাঁরা বিরোধী দলের সংঘাত-সংঘর্ষ, হরতাল-অবরোধের অজুহাত দিতেন। এখন তো সেসব নই। তাহলে কেন শিল্পকারখানায় উৎপাদন বাড়ছে না? কেন কারখানাগুলোতে প্রয়োজনীয় গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে না? কেন রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পকারখানাগুলোর লোকসান বাড়ছে। শিল্প মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেওয়ার পর আমির হোসেন আমু শিল্পবহির্ভূত বিষয় নিয়ে কথাবার্তাই বেশি বলছেন।
আরেক মন্ত্রী, প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন একই দিন ফরিদপুরে ছাত্রলীগের কর্মী সম্মেলনে বিএনপির উদ্দেশে বলেছেন, তাদের আন্দোলন ঠেকাতে ছাত্রলীগই যথেষ্ট। তাঁর এ কথাটি পত্রিকায় পড়ে দুই দশক আগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার একটি বক্তব্য মনে পড়ে। সে সময় বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে জোরদার আন্দোলন চলছিল। সেই প্রেক্ষাপটে তিনি বলেছিলেন, বিরোধী দলের আন্দোলন দমন করতে ছাত্রদলই যথেষ্ট। আমাদের দেশে ক্ষমতা বদলায়, দল বদলায়, ক্ষমতাবানদের চরিত্র বদল হয় না।
কঠিন সত্য হলো, খালেদা জিয়ার ছাত্রদল বিরোধী দলের আন্দোলন মোকাবিলা করতে পারেনি। তাঁকে শেষ পর্যন্ত বিরোধী দলের দাবি মেনে নিতে হয়েছিল। আর এখন তো বিরোধী দল আন্দোলনই করছে না। সংসদের ভেতরে যাঁরা বিরোধী দলের আসনে বসেছেন, তাঁরা নিষ্ক্রিয়, নির্জীব। একই সঙ্গে সরকারে ও বিরোধী দলেও আছেন। দলের নেতা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ নির্বাচন না করেও সাংসদ হয়েছেন, বিশেষ দূত হয়েছেন। রওশন এরশাদ নির্বাচন করে সংসদে বিরোধী দলের নেতা হয়েছেন। তাঁদের স্বামী-স্ত্রীর বিরোধ এখন সংসদেও গড়িয়েছে। রঙ্গভরা বঙ্গদেশে আরও কত কিছু দেখতে হবে।
আর সংসদের বাইরে থাকা বিএনপি ভোটে পরাজিত না হলেও রাজনৈতিক কৌশলে পরাজিত হয়ে এখন কিংকর্তব্যবিমূঢ়। দলের বিভিন্ন পর্যায়ে নেতা-কর্মীদের মধ্যে বিরোধ ও দ্বন্দ্ব লক্ষ করা যাচ্ছে। কর্মীদের অভিযোগ, নেতাদের কারণে আন্দোলন সফল হয়নি। এই অবস্থায় বিএনপির নেতারা যখন শিগগিরই আন্দোলনের চিন্তা করছেন না, তখন মন্ত্রীদের উসকানিমূলক বক্তৃতা-বিবৃতির কী যুক্তি থাকতে পারে?
বাংলায় একটি প্রবাদ আছে। সুখে থাকতে ভূতে কিলায়। দেশে আন্দোলন নেই, হরতাল-অবরোধ নেই এটি সম্ভবত মন্ত্রীদের ভালো লাগছে না। এ কারণেই কি মন্ত্রীরা উসকানিমূলক বক্তৃতা-বিবৃতি দিয়ে যাচ্ছেন? তবে গত মন্ত্রিসভার সদস্য যাঁরা ছিলেন, তাঁদের কাছ থেকে নব্য মন্ত্রীদের শিক্ষা নেওয়ার অনুরোধ জানাচ্ছি। সেই মন্ত্রিসভায় যাঁরা বড় বড় কথা বলতেন, তাঁদের অনেকেই এখন মন্ত্রিসভার বাইরে। পাঁচ বছর তাঁরা বিএনপি তথা বিরোধী দলকে গালমন্দ করে নিজেদের সফল মন্ত্রী হিসেবে দেখাতে চেয়েছিলেন। দিনের শেষে মন্ত্রিত্ব হারিয়েছেন। কেননা, শেষ বিচারে সরকারের সাফল্য ও ব্যর্থতার দায় শেখ হাসিনাকেই নিতে হবে।
বর্তমানে বিএনপি নাজুক অবস্থায় আছে, মানি। এর অর্থ এই নয় যে আওয়ামী লীগ খুব ভালো অবস্থায় আছে। বিএনপি নির্বাচন করেনি, তাই সংসদে বা সরকারে তার কোনো ভূমিকা নেই। কিন্তু যেহেতু আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আছে, ভালোমন্দের দায়ও তাদের নিতে হবে। কে কীভাবে নেন সেটাই দেখার বিষয়। ইতিমধ্যে মন্ত্রী পদমর্যাদার চিফ হুইফ সাহেব এক বিস্ফোরণ ঘটিয়েছেন। দলের নেতা-কর্মীদের কাছে ক্রেস্ট না দিয়ে ক্যাশ নিয়ে আসার জন্য হুকুম দিয়েছেন। বিগত সরকারের ক্যাশ আদায়কারীরা এখন দুদকের সন্দেহ ও তদন্তের আওতায়।
আমরা জানি না, উসকানিমূলক বক্তৃতা-বিবৃতি দিয়ে মন্ত্রীরা বিরোধী দলকে মাঠে নামাতে চাইছেন কেন? দেশে শান্তি আছে, এটি তাঁদের পছন্দ নয়? আবার কি মন্ত্রীরা ৫ জানুয়ারির আগের অবস্থায় দেশকে ফিরিয়ে নিতে চান?
শেখ হাসিনার তৃতীয় সরকারের মেয়াদ মাত্র এক মাস কয়েক দিন। এই কয়েক দিনে নিশ্চয়ই সরকার টের পেয়েছে, বিরোধী দলকে রাজনৈতিক কৌশলে হারানো যত সহজ, দেশ চালানো তত সহজ নয়। এই এক মাস সময়ের মধ্যেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে গেছে, এই এক মাস সময়ের মধ্যেই দাম না পেয়ে কৃষকেরা আলু রাস্তায় ফেলে দিচ্ছেন। এই সময়ের মধ্যেই জানা গেল, যুক্তরাষ্ট্র জিএসপি-সুবিধা সহজে ফিরিয়ে দিচ্ছে না।
প্রায় প্রতিদিনই সরকারপ্রধানকে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। তিনি সাধ্যমতো সেগুলো সমাধানেরও চেষ্টা করছেন। কিন্তু তাঁর অধিকাংশ মন্ত্রীই সম্ভবত সেই বাস্তবতা উপলব্ধি করতে পারছেন না। আর সে কারণেই বিরোধী দলকে রাজপথে নিয়ে আসার জন্য উসকানি দিয়ে যাচ্ছেন। এটি থামানো প্রয়োজন।

সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrab03@dhaka.net

কালের পুরাণ- জামায়াতমুক্ত বিএনপি! দেশ সন্ত্রাসমুক্ত হবে কি? by সোহরাব হাসান

Sunday, January 26, 2014

নির্বাচনের আগে ও পরে সারা দেশে যে সংঘাত, সহিংসতা, গাড়ি পোড়ানো, বাড়ি জ্বালানোর ঘটনা ঘটেছে; তার মূল হোতা যে জামায়াতে ইসলামী ও তার ছাত্রসংগঠন ছাত্রশিবির—এ ব্যাপারে কারও সন্দেহ নেই।
সরকারের দমন-পীড়নও এর পক্ষে কোনো সাফাই হতে পারে না। এসব নারকীয় ঘটনা অস্বীকার কিংবা সেই ঘটনাকে একমাত্র রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা—দুটোই রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বের পরিচয়।

কিন্তু আমাদের প্রশ্ন হলো জামায়াতে ইসলামীর মতো একটি প্রায় গণবিচ্ছিন্ন রাজনৈতিক দল, সারা দেশে যাদের জনসমর্থন এখন ৩ শতাংশে এসে ঠেকেছে; দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যার অংশ নেওয়ারই যোগ্যতা ছিল না এবং নবম জাতীয় সংসদে মাত্র দুটি আসন পেয়েছিল, সেই দলটি কীভাবে বছরজুড়ে এত সব তাণ্ডব ঘটাল? এটি কি নিছক বিএনপির সঙ্গে জোট বাধার জন্য, না আরও গভীরে এর কারণ লুকিয়ে আছে?
নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ কেন তাঁর নির্বাচনী এলাকার জামায়াতের একজন রুকনকে ফুলের মালাসমেত দলে নিয়ে এলেন, তার ব্যাখ্যা নেই। এখন যদি ওই রুকনের পথ অনুসরণ করে জামায়াতের সব নেতা-কর্মী আওয়ামী লীগে যোগদানের জন্য লাইন দেন, তাহলে আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব কি তাঁদের সাদরে বরণ করে নেবে? ক্ষমতার রাজনীতির অঙ্ক এমন সরলরেখায় চালিত হলেও আদর্শের রাজনীতি বড় কঠিন। সেই কঠিনকে আওয়ামী লীগ ভালোবাসতে প্রস্তুত আছে বলে মনে হয় না।
বিএনপি জামায়াতে ইসলামী নামের দলটির সঙ্গে গাঁটছড়া রাখবে কি রাখবে না, সেটি তাদের একান্ত নিজস্ব বিষয়। কিন্তু বিএনপি নেতৃত্বকে মনে রাখতে হবে যে জামায়াতের কারণেই আজ তাদের মৌলবাদের দোসর, জঙ্গিবাদের সহযোগী এবং যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষকের যে বদনাম হয়েছে, তা ঘোচানো কঠিন হবে। মধ্যপন্থী বিএনপি কী করে একটি মৌলবাদী দলের সঙ্গে একীভূত হলো?
এসব কথা বললে নিশ্চয়ই বিএনপি-সমর্থক বুদ্ধিজীবীরা হইচই করে উঠবেন এবং জানান দিতে চাইবেন, জামায়াতের সঙ্গে কেবল বিএনপিই জোটবদ্ধ হয়নি; আশির দশকে ও নব্বইয়ের দশকে আওয়ামী লীগও জোট বেঁধেছিল। আওয়ামী লীগ ছিয়াশি সালে ও পঁচানব্বই-ছিয়ানব্বইয়ে জামায়াতের সঙ্গে জোট বাঁধেনি। ছিয়াশিতে দলটি তার নিজের স্বার্থেই নির্বাচন করেছিল; যেমনটি করেছিল আওয়ামী লীগ। আর ১৯৯৫-৯৬ সালে আওয়ামী লীগ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে যে আন্দোলন গড়ে তোলে, সেই আন্দোলনে জামায়াত ও জাতীয় পার্টিও যোগ দিয়েছিল রাজনৈতিক সুবিধা পেতে। এরশাদ আমলে তিন জোটের পাশাপাশি জামায়াত যে যুগপৎ আন্দোলন করেছিল, তার যোগসূত্রটি ছিল বিএনপিই। ১৯৯৫-৯৬ সালের আন্দোলনে জামায়াত সহযাত্রী হওয়া সত্ত্বেও আওয়ামী লীগ যুদ্ধাপরাধের বিচারের আন্দোলনেও জোরালো ভূমিকা রেখেছিল। অন্যদিকে সেই আন্দোলনের কারণে বিএনপি সরকার জাহানারা ইমামসহ ২৪ বিশিষ্ট নাগরিকের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা করে। বিএনপির বাকি আমল সেই মামলা ঝুলে ছিল; বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের তত্ত্বাবধায়ক সরকার এসে তা প্রত্যাহার করে নেয়।
এখন বিএনপি যদি যুদ্ধাপরাধের বিচারের প্রতি সমর্থন জানিয়ে জামায়াতের সঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আন্দোলন করত, তাহলে কারও কিছু বলার থাকত না। দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। বিএনপির নেতৃত্ব কেবল জামায়াতকেই আন্দোলনের সহযাত্রী করেনি, ১৮-দলীয় জোটে এমন কিছু ধর্মান্ধ দলকে যুক্ত করেছে, যারা কখনোই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিশ্বাস করে না। তারা বিশ্বাস করে হেফাজতে ইসলামের ১৩ দফায়। আর আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪-দলীয় জোটের শরিকেরা যত কমজোরিই হোক না কেন, তারা চিন্তাচেতনায় বামপন্থার অনুসারী। দুই জোটের মৌলিক পার্থক্যটাও এখানে। তবে আমরা একইভাবে সাবেক স্বৈরাচারের সঙ্গে আওয়ামী লীগের গাঁটছড়া বাঁধাকে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারি না। বিগত নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে সবচেয়ে বিপদে ফেলেছে এরশাদ। তার অস্বাভাবিক কর্মকাণ্ডই নির্বাচনকে বেশি প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। রাজাকারের মতো স্বৈরাচারও গণতন্ত্রের জন্য বিপজ্জনক।
বিএনপির নেতৃত্ব স্বীকার করুক আর না করুক জামায়াত-শিবির যে তাদের ঘাড়ে বন্দুক রেখেই যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচাতে সারা দেশে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়েছিল, তা দিবালোকের মতো স্পষ্ট। ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি থেকেই সরকার ও প্রশাসনকে অকেজো করে দিতে তারা একের পর এক বোমা হামলা চালিয়েছে, বাস-ট্রাক পুড়িয়েছে, পুলিশ খুন করেছে। বিএনপির মতো একটি নিয়মতান্ত্রিক দল কেন সেই সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে নিজেদের যুক্ত করল সেটাই বড় প্রশ্ন। শত্রুর শত্রু যে সব সময় মিত্র হয় না, সেটা আবার প্রমাণিত হলো।
বিএনপির নেতৃত্বের ব্যর্থতা হলো, তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আন্দোলনটিকে জামায়াত-শিবিরের যুদ্ধাপরাধের বিচার বন্ধে পরিচালিত আন্দোলন থেকে পৃথক করতে পারেনি। যুদ্ধাপরাধের বিচার এবং জোটের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে জামায়াত-শিবিরের নাশকতায় তারা সমভাবে মৌনতা অবলম্বন করেছে। ক্ষেত্রবিশেষে বিএনপির স্থানীয় নেতা-কর্মীরাও যুক্ত হয়েছেন। নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতা তিন মাস ধরে চললেও জামায়াত-শিবিরের সন্ত্রাস ও নাশকতা চলেছে বছরজুড়েই; নির্বাচনের প্রাক-মুহূর্তে এবং পরে যা সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংসতায় রূপ নিয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত যে বাংলাদেশ, সেই বাংলাদেশে এ ধরনের সাম্প্রদায়িক সহিংসতা কীভাবে ঘটল? গণতন্ত্রের সঙ্গে স্বৈরতন্ত্র ও একনায়কতন্ত্রের যতটুকু দূরত্ব, তার চেয়ে কম দূরত্ব নয় সাম্প্রদায়িকতার। আমাদের দুর্ভাগ্য, এক পক্ষ কেবল স্বৈরতন্ত্রকে গণতন্ত্রের বিপদ মনে করে, সাম্প্রদায়িকতাকে নয়। অন্য পক্ষ সাম্প্রদায়িকতাকে বিপদ ভাবলেও স্বৈরতন্ত্রের বিপদ আমলে নেয় না।
প্রধানমন্ত্রী অভয়নগরের মালোপাড়ায় আক্রান্ত ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উদ্দেশ করে বলেছেন, ‘এই মাটির সন্তান আপনারা। অধিকার নিয়েই আপনারা এখানে থাকবেন। কেউ আপনাদের অধিকার ছিনিয়ে নিতে পারবে না। মনে জোর নিয়ে আপনাদের রুখে দাঁড়াতে হবে। আমরা আপনাদের পাশে আছি।’ প্রধানমন্ত্রীর কথায় আবেগ ও আন্তরিকতা আছে। কিন্তু আওয়ামী লীগের প্রতিটি নেতা-কর্মী কি প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য হূদয়ে ধারণ করেন? করেন না। করলে আক্রান্ত সংখ্যালঘু সম্প্রদায় সাহায্য চেয়েও কেন পায়নি? কেন স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা সময়মতো এগিয়ে এলেন না। কেন প্রশাসন ও পুলিশ নির্বিকার ছিল? আসলে সাম্প্রদায়িকতা যখন সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের মনের গভীরে বাসা বাঁধে, তখন আওয়ামী লীগ-বিএনপি থাকে না; সব এক হয়ে যায়। কেউ আক্রমণ করে, কেউ নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে। ৪২ বছর ধরেই সংখ্যালঘুদের ওপর এ নির্যাতন চলে আসছে। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা ওহাবের বিরুদ্ধে উসকানির অভিযোগ আছে। সরকার কি তাঁর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিয়েছে? এ রকম একজন ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রীর অনুষ্ঠানে কীভাবে গেলেন? সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার কারণ এই বিচারহীনতা। অপরাধীদের শাস্তি না পাওয়া।
সরকার সংখ্যালঘুদের পুড়িয়ে দেওয়া বাড়িঘর দ্রুত নির্মাণ করেছে। কিন্তু তাদের মনে যে ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে, ইটপাথরের দেয়াল তা মুছে ফেলতে পারবে না। সে জন্য চাই সরকার, রাজনৈতিক দল ও সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের সম্মিলিত উদ্যোগ।
মওলানা ভাসানী একবার বলেছিলেন, নকশাল কারও গায়ে লেখা থাকে না। সেই কথাটি একটু ঘুরিয়ে বলা যায়, সাম্প্রদায়িকতাও কারও গায়ে লেখা থাকে না। খালেদা জিয়া কিংবা বিএনপির অন্যান্য নেতা যখন কথায় কথায় ভারতীয় জুজুর ভয় দেখান, তখন তার মধ্যে বৃহৎ প্রতিবেশী সম্পর্কে ক্ষোভের পাশাপাশি ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের প্রতিও দলটির প্রচ্ছন্ন হুমকি দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। যাঁরা আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে মসজিদে উলুধ্বনি শোনা যাবে বলে বক্তৃতা করেন এবং যাঁরা ভোটের হিসাবে সংখ্যালঘুদের নাম বাদ দিয়ে রাখেন; সংখ্যালঘুরা কোন ভরসায় তাঁদের ভোট দেবেন?
ডেইলি স্টার-এ মাহ্ফুজ আনাম বিএনপিকে উদ্দেশ করে লিখেছেন, পুরোনো ধ্যানধারণা, পুরোনো কৌশল, পুরোনো মিত্র কোনো সুফল বয়ে আনবে না; বরং বোঝা হয়ে থাকবে। তবে এটি কেবল বিএনপির জন্য নয়, ক্ষমতাসীন দলটির জন্যও সমান সত্য। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বকে বুঝতে হবে সবকিছুর দায় বিএনপি-জামায়াতের ওপর চাপালে দেশে শান্তি আসবে না, সুশাসনও প্রতিষ্ঠিত হবে না।
প্রধানমন্ত্রী বিএনপিকে জামায়াতমুক্ত হতে বলেছেন। তিনি বোঝাতে চাইছেন, জামায়াতমুক্ত হলে বিএনপি সন্ত্রাসমুক্ত হবে। কিন্তু দেশকে সন্ত্রাসমুক্ত করার এবং রাখার দায়িত্ব সরকারেরই। অতএব আওয়ামী লীগকেও পুরোনো কৌশল, দোষারোপের পুরোনো রাজনীতি পরিহার করে দেশকে সামনে নিয়ে যাওয়ার কথা ভাবতে হবে। অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিতে হবে। সমালোচনা সহ্য করার ধৈর্য থাকতে হবে। সবকিছু বিএনপি-জামায়াতের কাজ বলে দায় এড়ানোর প্রবণতা কাজে দেবে না।
বিএনপি সংসদে থাকুক বা না থাকুক, তার সঙ্গে একটি কর্মসম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সেটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য ও শক্তি।
প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, বিএনপি নেত্রী নির্বাচনে না গিয়ে যে ভুল করেছেন, এখন তাঁকে খেসারত দিতে হবে। খেসারত দিচ্ছেনও। তবে একটি রাজনৈতিক দল বা নেত্রী ভুল করলে তার খেসারত দলের ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীকে মনে রাখতে হবে যে, একটি সরকার ভুল করলে তার খেসারত গোটা জাতিকেই দিতে হয়।
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrab03@dhaka.net

কালের পুরাণ- শেখ হাসিনার যোগ-বিয়োগ by সোহরাব হাসান

Thursday, January 23, 2014

শেখ হাসিনার নতুন মন্ত্রিসভায় আগের মন্ত্রিসভার ৫১ সদস্যের মধ্যে ৩৫ জনই বাদ পড়েছেন। ৪৯ সদস্যের নতুন মন্ত্রিসভায় আগের মন্ত্রিসভার আছেন মাত্র ১৮ জন। বাকিরা সবাই নতুন।
আগের সাতজন উপদেষ্টার মধ্যে বাদ পড়েছেন চারজন। এই যোগ-বিয়োগ কী ইঙ্গিত দেয়? এটাই ইঙ্গিত দেয় যে আগের পাঁচ বছর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যাঁদের নিয়ে সরকার পরিচালনা করেছেন, তাঁদের অধিকাংশ ছিলেন অদক্ষ, অযোগ্য ও দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত। অযোগ্য ও অদক্ষ না হলে তাঁরাও ১৮ জনের কাতারে এসে যেতেন। প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন নিয়মরক্ষার নির্বাচনে জয়ী হওয়া সহজ, কিন্তু মন্ত্রিসভায় ঠাঁই নেওয়া কঠিন। সে ক্ষেত্রে আগের আমলনামাটি অবশ্যই বিবেচনায় নেওয়া হবে। প্রধানমন্ত্রী নিয়েছেন বলেই শুনেছি। যাঁদের সম্পর্কে পাঁচ বছর ধরেই লেখালেখি হয়েছে, যাঁরা নানা বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন, তাঁদের বেশির ভাগই বাদ পড়েছেন।

নির্বাচনের পর প্রথম সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী জানিয়ে দিয়েছেন, কোনো দুর্নীতিবাজের দায়িত্ব তিনি নেবেন না। মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকে তিনি সবাইকে অতীত থেকে শিক্ষা নিতে বলেছেন। কয়েকজন সাবেক মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর বিপুল সম্পদ আহরণের উৎস খুঁজে বের করতে দুর্নীতি দমন সংস্থা (দুদক) মাঠে নেমেছে বলে পত্রিকায় খবর এসেছে। দুদকের সুমতি হোক।
বাদ পড়া মন্ত্রী-উপদেষ্টারা পাঁচ বছর বেশ দাপটের সঙ্গে ছিলেন, ভেতরের বা বাইরের সমালোচনা একেবারেই পাত্তা দেননি। তাঁদের কপাল পোড়ার কারণ নির্বাচনের আগেই যথারীতি সারা দেশে চাউর হয়ে গিয়েছিল। শোনা যায়, নতুন মন্ত্রিসভা গঠনের পর বাদ পড়াদের কয়েকজন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ধরনাও দিয়েছেন। কাজ হয়নি। প্রধানমন্ত্রী তাঁর সিদ্ধান্তে অটল। নির্বাচনের আগে যখন পত্রিকায় মন্ত্রী-সাংসদদের হলফনামায় ঘোষিত সম্পদের বিবরণ প্রকাশিত হচ্ছিল, তখনই নাকি তিনি মনস্থির করে ফেলেন কাকে রাখবেন, কাকে বাদ দেবেন। পাঁচ বছরের আমলনামা তো তাঁর হাতে ছিলই।
এখন বাদ পড়া ব্যক্তিদের কেউ কেউ বলছেন, দলে তাঁরা বেশি বেশি সময় দেবেন। আগে কেন দেননি, সেটিও মিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন। এঁদের অধিকাংশের সঙ্গে স্থানীয় নেতা-কর্মীদের যোগাযোগ অত্যন্ত ক্ষীণ। তাঁরা কর্মীদের সমর্থনে নেতা হননি, সভানেত্রীর আশীর্বাদে হয়েছেন। এখন সেই আশীর্বাদটুকুও আলগা হয়ে গেছে।
শুধু মন্ত্রী-উপদেষ্টা নন, অনেক সাংসদও গত পাঁচ বছরে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। তাঁদের সম্পদের পরিমাণ দেখে নিজেরাও সম্ভবত লজ্জিত হয়েছেন, যে কারণে আওয়ামী লীগের একটি প্রতিনিধিদল নির্বাচন কমিশনে গিয়ে তাদের ওয়েবসাইট থেকে হলফনামা প্রত্যাহার করতে বলেছিল। আবদার আর কাকে বলে?
এই জনসেবকদের সৌভাগ্য যে বাংলাদেশের সাংবাদিকতার মান এখনো সেই উচ্চতায় যায়নি, যেখানে মন্ত্রী-সাংসদদের হলফনামার বাইরে থাকা সম্পদের হিসাব বের করে আনবে। বিদেশে কোন আমলে কত টাকা পাচার হয়েছে, তার বিবরণী জনগণকে জানাবে। মন্ত্রী-সাংসদেরা হলফনামায় যেসব তথ্য-উপাত্ত দিয়েছেন, সেটুকুই সাংবাদিকেরা নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইট থেকে হুবহু তুলে দিয়েছেন। আর তাতেই সবার গা জ্বালা ধরেছে।
জনপ্রতিনিধি হওয়ার আগে তাঁদের কার কী সম্পদ ছিল, পাঁচ-দশ বছর পর কী পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়েছেন, তা ওয়েবসাইটে নয়, জনসমক্ষেই প্রকাশ করা উচিত। ২০০৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে আওয়ামী লীগ মন্ত্রী-সাংসদদের সম্পদের হিসাব প্রকাশ করার ওয়াদা করেও কথা রাখেনি। আর এবারে ওয়াদার ধারে-কাছেও যায়নি। মানুষ সামনে এগোয়, আর আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো পেছনে যাওয়ার প্রতিযোগিতায় জয়ী হতে চায়। জনপ্রতিনিধিদের সম্পদের হিসাব পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়ার পরই চারদিকে হইচই পড়ে যায়। মন্ত্রী-সাংসদেরা ধনাঢ্য বাবা-চাচার দোহাই দেন। এসব দেখে নাকি ন্যাপ-প্রধান অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের একটি কথা মনে পড়ে। তিনি বলেছিলেন, ‘শৈশবে গ্রামের বাড়িতে যাঁরা শানকিতে খেতেন এবং খালের পাড়ে গিয়ে প্রাতঃকর্ম সারতেন, তাঁরাই এখন গুলশান-বনানীর আলিশান ভবনে থেকে নিজেদের নব্য জমিদার ভাবেন।’
অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত পুরোনো সহকর্মীদের রক্ষায় একটি খোঁড়া যুক্তি দিয়ে বলেছিলেন, ‘গত পাঁচ বছরে মানুষের আয় বেড়েছে। অর্থনীতির আকার বড় হয়েছে। অতএব, মন্ত্রী-সাংসদদের আয় বাড়াটাও স্বাভাবিক।’ কিন্তু সেটি কত গুণ? বিশ্বব্যাংকের ভাষ্য অনুযায়ী পাঁচ বছর আগে দেশের মানুষের বার্ষিক গড় আয় ছিল ৮৪৭ ডলার, আর এখন এক হাজার ৪৪ ডলার। অর্থাৎ পাঁচ বছরে মানুষের আয় দেড় গুণ বেড়েছে। কিন্তু মন্ত্রী-সাংসদদের আয় শতগুণ কিংবা তারও অনেক বেশি হলো কোন অলৌকিক উপায়ে, সেটি তদন্ত করে দেখা দরকার।
৫ জানুয়ারি যে নির্বাচনটি হয়ে গেল, তাকে কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য বলা যাবে না, এতে জন-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটেনি। প্রধানমন্ত্রী নিজেও বলেছেন সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার নির্বাচন। তাহলে সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচনটি হলে মন্ত্রিসভা থেকে বাদ পড়া অনেকেই যে মনোনয়ন থেকেও যে বাদ পড়তেন, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। বিরোধী দল নির্বাচন বর্জন করায় তাঁরা ফাঁকা মাঠে গোল দিয়েছেন।
বাংলাদেশ বড় অদ্ভুত জায়গা। এখানে একটি ভালো নির্বাচন, একটি ভালো সংসদ ও সরকার দিতে পারে না। যার প্রমাণ আমরা পেয়েছি ২০০১ ও ২০০৯ সালে। ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত জোটের বিপুল বিজয় তাদের মাথা খারাপ করে দিয়েছিল। ফলে মন্ত্রী বাছাইয়ে যোগ্যতাকে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। প্রায় প্রতিটি মন্ত্রণালয়ে প্রধানমন্ত্রীর মনোনীত প্রতিনিধির পাশাপাশি জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব তারেক রহমানেরও প্রতিনিধি হিসেবে একজন প্রতিমন্ত্রী নিয়োগ পেয়েছিলেন। ফলে সরকারে দ্বৈত শাসন ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের চেয়ে অধিক ক্ষমতাধর হয়ে ওঠে হাওয়া ভবন।
২০০৮ সালের নির্বাচনের পর গঠিত সরকারে দ্বৈত শাসন না থাকলেও মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী বাছাইয়ে অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার চেয়ে ব্যক্তিগত আনুগত্যই অগ্রাধিকার পায়। অনেক জ্যেষ্ঠ নেতারই মন্ত্রিসভায় ঠাঁই হয় না। প্রধানমন্ত্রী যাঁদের প্রতি অগাধ বিশ্বাস ও আস্থা রেখে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী করেছিলেন, তাঁদের বেশির ভাগই সেই মর্যাদা রক্ষা করতে পারেননি। একটি মন্ত্রিসভার স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র—দুটোই যদি পাঁচ বছর ধরে বিতর্ক ও প্রশ্নের মুখে থাকে, সেই মন্ত্রিসভাকে কী করে সফল বলা যায়?
সে সময়ে বিভিন্ন মহলের সমালোচনার মুখে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, তাঁর সরকারের মন্ত্রীরা স্যুটেড-বুটেড ও চৌকস না হলেও
সৎ ও যোগ্য! কিন্তু গত পাঁচ বছর পর দেখা গেল, তাঁর অধিকাংশ মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী স্যুটেড-বুটেড ও চৌকস হওয়ার পরীক্ষায় পাস করলেও যোগ্যতা ও দক্ষতা দেখাতে পারেননি। দলের ভেতরে ও বাইরে সেই মন্ত্রিসভার ব্যাপক সমালোচনাকে তখন সরকার আমলে নেয়নি। সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনকে রাখার জন্য যদি জেদ না ধরা হতো, তাহলে হয়তো বিশ্বব্যাংকের অর্থও পাওয়া যেত এবং পদ্মা সেতুর কাজও শুরু হতো।
গত কয়েক দিনে বিভিন্ন পত্রিকায় বাদ পড়া মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের আমলনামা ছাপা হয়েছে। এতে দেখা যায়, ‘পুরোনো মন্ত্রিসভা থেকে বাদ পড়া ৩৫ জনের মধ্যে অন্তত ২৮ মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী দায়িত্ব পালনকালে নানা কারণে বিতর্কিত ছিলেন। তাঁদের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও অস্বাভাবিক সম্পদ অর্জনসহ অদক্ষতা ও অযোগ্যতার অভিযোগ ছিল।’
নির্বাচন কমিশনে দেওয়া হলফনামা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, পাঁচ বছরে তাঁদের অনেকের সম্পদ বেড়েছে বহুগুণ। মন্ত্রীদের চেয়ে তাঁদের স্ত্রীরা আরও বেশি ধনী হয়েছেন। কেউ কেউ প্রভাব খাটিয়ে ব্যাংক, বিমা ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন নিয়েছেন, স্ত্রীর নামে সম্পদ গড়েছেন।
প্রকাশিত খবরে আরও বলা হয়, ‘পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি দায়িত্ব পালনে চরম অযোগ্যতার পরিচয় দিয়েছেন। সরকারের কূটনৈতিক ব্যর্থতার জন্য তাঁকে দায়ী করা হয়। প্রভাবশালী দেশগুলো তাঁর প্রতি বিরক্ত ছিল। আ ফ ম রুহুল হকের স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালনকালে পাঁচ বছরে তাঁর স্ত্রীর সম্পদ বেড়েছে ৭৮২ শতাংশ। এ সময়ে তাঁর ছেলে জিয়াউল হক বড় ব্যবসায়ী হয়েছেন। খাদ্য অধিদপ্তরের নিয়োগ নিয়ে সমালোচিত হয়েছেন খাদ্যমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাক। নরসিংদী পৌরসভার মেয়র লোকমান হোসেন হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সাবেক শ্রমমন্ত্রী রাজিউদ্দিন আহমেদের ভাইয়ের সম্পৃক্ততার অভিযোগ ছিল।’
এখানেই শেষ নয়। আরও আছে। সাবেক মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী এ বি তাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে অনিয়মের মাধ্যমে পদস্থ কর্মকর্তাদের মুক্তিযোদ্ধা সনদ দেওয়ার অভিযোগ আছে। অনিয়ম, দুর্নীতি, অযোগ্যতা, অদক্ষতা এবং বিপুল সম্পদের মালিক হওয়ার আরও অভিযোগ যাঁদের বিরুদ্ধে আছে, তাঁরা হলেন: সাবেক পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী মাহবুবুর রহমান, যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আহাদ আলী সরকার, স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী মজিবুর রহমান ফকির, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন, ভূমিমন্ত্রী রেজাউল করিম হীরা, সংস্কৃতিমন্ত্রী আবুল কালাম আজাদ, প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী আফছারুল আমীন, বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী এনামুল হক মোস্তফা শহীদ, মৎস্য ও পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী আবদুল হাই।
দলের অন্দরমহলের উদ্ধৃতি দিয়ে ১৩ জানুয়ারি ডেইলি স্টার লিখেছে, ‘কতিপয় মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রীর অস্বাভাবিক ধন-সম্পদ বেড়ে যাওয়ায় বিরক্ত হয়ে প্রধানমন্ত্রী তাঁদের মন্ত্রিসভায় না নেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন।’
তবে হলফনামায় সম্পদের যে বিবরণ প্রকাশিত হয়েছে, সেটাই সব নয়। অনেকের প্রকাশিত সম্পদের চেয়ে অপ্রকাশিত সম্পদের পরিমাণই বেশি। আর যাঁরা কেবল নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন, তাঁদের হিসাবটাই আমরা জানতে পেরেছি। কিন্তু যাঁরা পাঁচ বছর ধরে উপদেষ্টা ছিলেন, যাঁরা দলের বিভিন্ন পর্যায়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন, তাঁদের সম্পদের হিসাবটাও প্রধানমন্ত্রী একবার পরখ করে দেখতে পারেন।
এ প্রসঙ্গে আরও একটি কথা বলতে হয়, দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত সবাই যেমন মন্ত্রিসভা থেকে বাদ পড়েননি, তেমনি বাদ পড়া সবাইও দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। সাবেক পরিকল্পনামন্ত্রী এ কে খন্দকারের বিরুদ্ধে কোনো দুর্নীতির অভিযোগ নেই। তিনি নির্বাচন করেননি, আবার মন্ত্রীও হতে চাননি। এনামুল হক মোস্তফা শহীদ অসুস্থ থাকায় নির্বাচন করেননি। দুর্নীতি ও অনিয়মের দায়ে একাধিক উপদেষ্টা বাদ পড়েছেন বলে বাজারে কথা চালু আছে, কিন্তু তাঁদের চেয়েও বেশি দুর্নীতির অভিযোগ যে উপদেষ্টার নামে, তিনি বহাল তবিয়তে আছেন। অনুরূপ ধারণা আছে পুনর্বহাল হওয়া দুই প্রভাবশালী মন্ত্রীর সম্পর্কেও। অন্যদিকে, মন্ত্রিসভায় নতুন যাঁরা এসেছেন, তাঁদের বেশির ভাগ পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির হলেও অন্তত তিনজনের বিরুদ্ধে আগের আওয়ামী লীগের আমলে ব্যাপক দুর্নীতি ও দখলবাজির অভিযোগ রয়েছে।
তার পরও বলব, ৫১ সদস্যের মন্ত্রিসভার ৩৫ জনকে ঝেড়ে ফেলা কম সাহসের ব্যাপার নয়। প্রধানমন্ত্রীর এই যোগ-বিয়োগের সুফল দেশবাসী পাবে কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর জানার জন্য আমাদের আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে।

সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrab03@dhaka.net

কালের পুরাণ- হেরে গেছেন খালেদা জিয়া by সোহরাব হাসান

Saturday, January 11, 2014

রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি এই মুহূর্তে যে বড় সংকটে পড়েছে, ১৯৮২ সালের পর কখনোই তাকে সে পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়নি।
১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ এরশাদ বন্দুকের জোরে ক্ষমতায় আসার আগেই শামসুল হুদা চৌধুরী ও আবদুল মতিনের নেতৃত্বে দলের একটি অংশ তাঁর সঙ্গে আঁতাত করেছিল। পরবর্তী সময়ে মওদুদ আহমদসহ অনেক অভিজ্ঞ নেতা সামরিক সরকারে যোগ দিলেও বিএনপি তেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি।

বরং সামরিক স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে খালেদা জিয়ার আপসহীন ভাবমূর্তি ১৯৯১ সালের নির্বাচনে জয়ী হতে সহায়ক হয়েছিল। কিন্তু এবার দলের উপজেলা পর্যায়ের একজন নেতাকেও আওয়ামী লীগ সরকার ভাগিয়ে নিতে না পারলেও বিএনপি দল হিসেবে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে।

অনেকেই মনে করেন, বিএনপির আন্দোলনই কেবল ভুল পথে পরিচালিত হয়নি, রাজনীতির মূলধারা থেকেও দলটি ছিটকে পড়ার উপক্রম হয়েছে। কেন এমনটি হলো?

ডান দিকে ঝুঁকে পড়া মধ্যপন্থী হিসেবে বিএনপির যে অবস্থান ছিল, তা অনেকটাই হারিয়ে ফেলেছে। এখন বিএনপিকে মানুষ জামায়াত-হেফাজতের সহযোগী হিসেবে মনে করে। গত পাঁচ বছরে জনগণের সমস্যা নিয়ে তারা যেমন রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রাম গড়ে তুলতে পারেনি, তেমনি সরকারের ভুলত্রুটিগুলো জাতীয় সংসদে তুলে ধরে দায়িত্বশীল বিরোধী দল হিসেবে নিজেকে প্রমাণ দিতে ব্যর্থ হয়েছে। সংসদ নিয়ে কথা বলার চেয়ে সংসদ বর্জন করাকেই দলটি রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে নিয়েছিল, যা সংসদীয় ব্যবস্থায় সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য।

আর রাজনীতির মাঠে আওয়ামী লীগের বাইরে থাকা মধ্যপন্থী ও গণতান্ত্রিক জনগোষ্ঠীর সমর্থন আদায়ের চেষ্টা না করে বিএনপির নেতৃত্ব উগ্রবাদী জামায়াতে ইসলামী ও গোঁড়াপন্থী হেফাজতে ইসলামের ওপর ভরসা রেখেই আন্দোলনকে চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যেতে চেষ্টা করেছে, যা শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি। নিজস্ব শক্তি-সামর্থ্য নয়, দুই চরম প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির কাঁধে ভর করে বিএনপির গণ-অভ্যুত্থানের এই প্রয়াস ছিল মারাত্মক ভুল।

গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবিতে শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চ গড়ে উঠলে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব তাদের ‘নাস্তিক’ বলে দূরে ঠেলে দেয়, যদিও দলের অনেক নেতা-কর্মী তা পছন্দ করেননি। দ্বিতীয়ত, তারা হেফাজতে ইসলামের ১৩ দফা কর্মসূচির সঙ্গে সংহতি ঘোষণার পাশাপাশি ৫ মে ঢাকায় সংগঠনটির সহিংস তাণ্ডবের প্রতি সমর্থন জানালে বিএনপির অনেক শুভানুধ্যায়ীই বিস্মিত হন। ফলে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবির প্রতি দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের সমর্থন থাকা সত্ত্বেও তারা রাজপথে বিএনপির সহযাত্রী হননি। যুদ্ধাপরাধের বিচার বন্ধে জামায়াতের সহিংস কর্মকাণ্ড মানুষকে আরও বেশি আন্দোলনবিমুখ করে। জামায়াতের প্রতি বিএনপির অতিশয় নির্ভরতায় দলের অনেক জ্যেষ্ঠ নেতা অস্বস্তি বোধ করলেও প্রকাশ্যে মুখ খুলতে সাহস পাননি। এখনো পাচ্ছেন না।

জনসমর্থন বিএনপির পক্ষে থাকায় ক্ষমতাসীনেরা শুরু থেকেই বিরোধী দলকে বাইরে রেখে নির্বাচন করার যে প্রয়াস চালাচ্ছিল, বিএনপি নেতৃত্ব শেষ পর্যন্ত সেই ফাঁদে পা দেয় জামায়াত ও হেফাজতের ভরসায়। ৪ মে মতিঝিলে খালেদা জিয়ার সমাবেশে আলটিমেটামের পর দুই দলের মধ্যে সমঝোতার পথ ক্রমশ সংকুচিত হতে থাকে। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে সামনে রেখে বিরোধী দলের লাগাতার অবরোধ-হরতালের কর্মসূচি এবং সরকারের দমন-পীড়নের মুখে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতাদের আত্মগোপনে চলে যাওয়ার নীতিও ছিল আত্মঘাতী। সারা দেশে তো বটেই, খোদ রাজধানীতে বিএনপির নেতা-কর্মীদের অনুপস্থিতির সুযোগে আন্দোলনের নিয়ন্ত্রণ পুরোটাই জামায়াত-শিবিরের হাতে চলে যায় এবং বোমা ও আগুনে মানুষ খুন আর সরকারি সম্পদ ধ্বংসই হয়ে ওঠে তাদের প্রধান হাতিয়ার।

এর পাশাপাশি ঢাকা ও লন্ডনে বিএনপির নেতৃত্বের দুটি আলাদা ভরকেন্দ্রও দলের নেতা-কর্মীদের বিভ্রান্তিতে ফেলে। দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান লন্ডনে বসে দলের নেতৃত্ব ও আন্দোলনের কর্মসূচি ঠিক করে দেওয়ায় সামনে থাকা দলের অনেক নেতাই পেছনে চলে যান; আবার পেছনের কেউ কেউ সামনে চলে আসেন। নানা কারণে খালেদা জিয়ার সঙ্গে দলের বেশির ভাগ কেন্দ্রীয় নেতার দূরত্ব সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে তিনি লন্ডনপ্রবাসী পুত্র তারেক রহমান ছাড়া কারও ওপরই ভরসা রাখতে পারেননি।

সম্প্রতি বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শমসের মবিন চৌধুরীর সঙ্গে তারেক রহমানের যে কথোপকথন প্রকাশিত হয়েছে, তাতে দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের প্রতি তাঁর (তারেক) অবিশ্বাস ও অনাস্থা—দুটোই প্রকাশিত হয়েছে। অথচ বর্তমান সরকারের আমলে এই নেতাই সবচেয়ে বেশি নিগৃহীত হয়েছেন।

৫ জানুয়ারি নির্বাচনের আগে ও পরে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের বক্তৃতা-বিবৃতির মধ্যেও বেশ পার্থক্য লক্ষ করা যায়। তারেক রহমান লন্ডনে বসে শেখ হাসিনার সরকারের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধ ঘোষণা করেই ক্ষান্ত হননি, বায়াত্তর সালে প্রণীত সংবিধানকেই জন-আকাঙ্ক্ষার বিরোধী বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর এই মূল্যায়ন যদি প্রধানমন্ত্রীর একক ক্ষমতার (যা তাঁর মা খালেদা জিয়া দুবার ভোগ করেছেন) বিরুদ্ধে হতো, জনগণের সমর্থন পেত। কিন্তু তিনি এই বিবৃতির মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম মূল লক্ষ্য রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রকেই চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন এবং ৫ জানুয়ারি নির্বাচনকে অবৈধ ঘোষণা করে সরকারের প্রতি প্রকাশ্যে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন।

বিএনপির চেয়ারপারসন এখনো ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে আলোচনার দরজাটি খোলা রাখতে চান বলে আমাদের ধারণা। সম্প্রতি বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎ কারে তিনি বলেছেন, ‘আমরা আলোচনার জন্য প্রস্তুত আছি। কিন্তু প্রথমে তাদের (সরকার) আলোচনার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। সব জ্যেষ্ঠ নেতা কারাগারে আছেন। আমার বহু কর্মী জেলখানায়। অন্যরা আত্মগোপনে আছেন। তাদেরই আলোচনার পরিবেশ তৈরি করতে হবে।’

এর আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিরোধী দলের সঙ্গে আলোচনা প্রসঙ্গে বলেছেন, তাঁকে (খালেদা জিয়া) সহিংসতা ও জামায়াতে ইসলামীকে ছেড়ে আসতে হবে। সোমবার নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া সাক্ষাৎ কারে খালেদা জিয়া প্রথমবারের মতো স্বীকার করেছেন, ‘তাঁর দল জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে স্থায়ী জোট করেনি।’ জামায়াতকে ছাড়বেন কি না, জানতে চাইলে তিনি আরও বলেন, ‘এই মুহূর্তে আমি পারি না, কিন্তু যখন সময় আসবে, তখন দেখা যাবে।’

সরকারের সঙ্গে আলোচনার শর্ত হিসেবেই নয়, পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যেও জামায়াত সম্পর্কে সংশয়ের কথা বিএনপির নেতাদের অজানা নয়। কিন্তু তারা এই যুুক্তিতে দলটি নিষিদ্ধ করার বিরুদ্ধে যে তাতে তারা আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যাবে এবং আরও সহিংস হয়ে উঠবে।

বিএনপির নেতৃত্বের প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাস ছিল যে নানা কারণে মানুষ যেহেতু সরকারের প্রতি ক্ষুব্ধ, সেহেতু তারা ডাক দিলেই লাখ লাখ মানুষ রাস্তায় বেরিয়ে এসে উনসত্তর বা নব্বইয়ের মতো গণ-অভ্যুত্থান ঘটিয়ে দেবে। কিন্তু এখানে তারা যে ভুলটি করেছে তা হলো, জোটের প্রধান সহযোগী জামায়াতে ইসলামীর আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল ভিন্ন। হাইকোর্টের আদেশে জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল এবং শীর্ষ নেতারা যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত ও দণ্ডিত হওয়ার পর দলটি নিজের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য গোটা রাষ্ট্রযন্ত্রকে চ্যালেঞ্জ করছে। বিএনপির নেতৃত্ব জামায়াতের সন্ত্রাসী ও সহিংস আন্দোলনের ওপর ভরসা না করে যদি আন্দোলনের অংশ হিসেবে নির্বাচনে যেত, তাহলে জয়ের সম্ভাবনা ছিল। সরকার সে রকম একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনে কারচুপি করার সাহস পেত না। এর পরও সরকার জবরদস্তি করে নির্বাচনী ফল উল্টে দিতে চাইলে সাধারণ মানুষ তখন বিএনপির পক্ষেই রাস্তায় নেমে আসত।

রণাঙ্গনের যুদ্ধে অস্ত্রশক্তি প্রধান হাতিয়ার হলেও রাজনৈতিক যুদ্ধে কৌশল ও মিত্রের বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সেই কৌশলে বিএনপির নেতৃত্ব এ যাত্রায় জয়ী হতে পারেনি। যার সুফল তাঁর প্রতিপক্ষ শেখ হাসিনা পেয়েছেন। এর আরেকটি কারণ, ১৯৯৫-৯৬ সালে শেখ হাসিনা বিএনপি ছাড়া সবাইকে এবং ২০০৬ সালে তাদের সঙ্গে জামায়াত থাকলেও বিএনপির একসময়ের মিত্র বি. চৌধুরী, অলি আহমদকে কাছে নিতে পেরেছিলেন। কিন্তু এবার খালেদা জিয়া শেখ হাসিনাবিরোধী সবাইকে কাছে টানতে পারেননি। এমনকি জামায়াতের কারণে বি. চৌধুরী, আ স ম আবদুর রব, কাদের সিদ্দিকী জোটভুক্ত হননি। এর পাশাপাশি দলটির ভারতনীতিও পরস্পরবিরোধী উপাদানে আকীর্ণ। দলের একাংশ ভারতের আস্থা অর্জনে আন্তরিক চেষ্টা করলেও অন্য অংশ যুদ্ধ জারি রাখাকেই শ্রেয় মনে করছে। বাসার সামনে খালেদা জিয়ার ক্ষুব্ধ বক্তব্য কিংবা তারেক রহমানের দ্বিতীয় বিবৃতিতে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার আহ্বান তারই প্রমাণ।

আপাতত বিএনপি আন্দোলন ও নির্বাচনবিরোধী রণকৌশলে হেরে গেছে, এটা স্বীকার করেই তাকে নতুন পথচলার কথা ভাবতে হবে। অবরোধ-হরতালের নামে গাড়ি পোড়ানো কিংবা মানুষ মারার আন্দোলন করে যে জনসমর্থন পাওয়া যায় না, সে কথা বিএনপির নেতৃত্ব যত দ্রুত অনুধাবন করবে, ততই দেশের মঙ্গল। এমনকি বিএনপিরও।

সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrab03@dhaka.net

বাংলাদেশ এখন কালো অধ্যায় পার করছে by ফারুক চৌধুরী

Tuesday, December 31, 2013

বাংলাদেশের নির্বাচন ও রাজনৈতিক সংকট আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে কী প্রভাব ফেলতে পারে, কীভাবে দেশে একটি সুস্থ রাজনৈতিক পরিবেশ ফিরে আসতে পারে, সে বিষয়ে প্রথম আলো মুখোমুখি হয়েছেন সাবেক পররাষ্ট্রসচিব ফারুক চৌধুরী
প্রথম আলো  আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডল থেকে কি বাংলাদেশ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ল?
ফারুক চৌধুরী  আমি তো মনে করি, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি যে অবস্থায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে, এতটা নিচে আর কখনো নামেনি। ১৯৭২ থেকে ১৯৮২ এবং ১৯৮৬ থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত আমি কূটনৈতিক দায়িত্ব পালনের জন্য দেশের বাইরে ছিলাম। বিদেশে বসে বাংলাদেশের ভাবমূর্তির ওঠানামা লক্ষ করেছি। অনেকটা শ্রাবণের মেঘের মতো। কিন্তু এবার যা হলো, সম্ভবত আর কখনোই তা হয়নি।

এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ ছিল এক বিস্ময়। আমাদের স্বাধীনতার দুটি মাইলফলক ঘটনা আছে—২৬ মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণা, ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস। পৃথিবীর আর কোনো দেশের বিজয় দিবস নেই। অর্থাৎ, আমরা একটি দখলদার বিদেশি বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে বিজয় অর্জন করেছি। সেই দ্বিমেরু বিশ্বে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সংগ্রাম বিশ্বসম্প্রদায়ের ব্যাপক সমর্থন আদায় করতে সক্ষম হয়েছিল। ভারত বা তৎকালীন সোভিয়েত শিবির তো আমাদের সাহায্য করেছেই, কিন্তু যে পশ্চিমা বিশ্ব পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের কারণে রাষ্ট্রীয়ভাবে সমর্থন করেনি; সেসব দেশের জনগণ নানাভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করেছে।
প্রথম আলো  গণতন্ত্রের অন্যতম শর্ত হলো সুষ্ঠু নির্বাচন ও শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর। গত ৪২ বছরেও আমরা সেটি করতে পারলাম না কেন?
ফারুক চৌধুরী  এটি রাজনীতিবিদদের ব্যর্থতা। তাঁরা ঠিক করতে পারেননি নির্বাচনটি কীভাবে করবেন। আমাদের রাজনীতি হচ্ছে ক্ষমতা দখলের। ক্ষমতায় আসা মানে রাজনীতিবিদদের কাছে শুধু সরকার গঠন নয়; যা খুশি তাই করা। সরকারপ্রধানেরা হয়ে ওঠেন আইনকানুনের ঊর্ধ্বে। তাঁরা কাউকেই পরোয়া করেন না। দেশের বর্তমান সংকটের মূলেও এই মানসিকতা কাজ করেছে।
প্রথম আলো  বিশ্বের যেসব রাষ্ট্র এখন বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে, তারাও তো একসময় সামরিক শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছে?
ফারুক চৌধুরী  নিশ্চয়ই দিয়েছে। পাকিস্তানে, ফিলিপাইনে, ইরানেও তারা স্বৈরশাসকদের মদদ জুগিয়েছে। এ কারণেই আমি বলব, আমাদের সমস্যা আমাদেরই সমাধান করতে হবে। এই যে কূটনীতিক দেবযানীকে নিয়ে ভারত আমেরিকার সঙ্গে একটি অবস্থান নিতে পেরেছে, তা তার নিজের সামর্থ্যবলেই। একই সঙ্গে এ নিয়ে দেশটির রাজনৈতিক ঐকমত্যও এই অবস্থান নিতে সহায়তা করেছে।
প্রথম আলো  ভারত প্রথম দিকে শক্ত অবস্থান নিলেও পরে মনে হয় কিছুটা সরে এসেছে, নমনীয় হয়েছে।
ফারুক চৌধুরী  দুটি দেশের অর্থনৈতিক শক্তিও কিন্তু এক নয়। অধিকতর শক্তিধরের বিরুদ্ধে লড়তে নানা হিসাব-নিকাশ করতে হয়। কিন্তু যেটুকু তারা নিতে পেরেছে, সেটি জাতীয় ঐকমত্যের কারণেই। আর আমাদের এখানে ঠিক তার বিপরীতটি ঘটেছে।
প্রথম আলো  কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকর করার বিষয়ে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে নেওয়া প্রস্তাবকে কীভাবে দেখছেন?
ফারুক চৌধুরী  এটি তাদের চরম নির্বুদ্ধিতা। বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধের বিচার নিয়ে পাকিস্তানের বলার কিছু নেই। এর মাধ্যমে পাকিস্তান আবারও প্রমাণ করল, তারা একাত্তরের দৃষ্টিভঙ্গিতেই আচ্ছন্ন। কাদের মোল্লাকে তারা তাদের লোক বলে দাবি করেছে। এটাই হলো পাকিস্তানি মানসিকতা। আর ইমরান খানের রাজনীতি হলো তালেবানি রাজনীতি। তবে পাকিস্তানে এর প্রতিবাদও হয়েছে।
প্রথম আলো  কিন্তু এ নিয়ে বাংলাদেশে যে পাল্টাপাল্টি রাজনীতি হচ্ছে?
ফারুক চৌধুরী  যেখানে জাতীয় মর্যাদার প্রশ্ন, সেখানে পাল্টাপাল্টি মোটেই কাম্য নয়। কিন্তু কোনো কোনো মহল থেকে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদের যে দাবি করা হয়েছে। আমি মনে করি, সেই চূড়ান্ত পদক্ষেপ নেওয়ার সময় এখনো আসেনি। তবে পাকিস্তানের অন্যায়ের প্রতিবাদ আমরা অবশ্যই করব।
প্রথম আলো  পাকিস্তানের ব্যাপারে আমরা যতটা তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছি, তুরস্কের ব্যাপারে সেটি দেখাতে পারিনি। তারা আরও নগ্নভাবে যুদ্ধাপরাধের বিচারে হস্তক্ষেপ করেছে। সেখানে বাংলাদেশ দূতাবাসে হামলা হয়েছে। জাতিসংঘের পক্ষ থেকেও প্রতিবাদ করা হয়েছে। কিন্তু আমরা নীরব থেকেছি।
ফারুক চৌধুরী  আমি মনে করি তুরস্কের ব্যাপারে আমাদের নমনীয় থাকার কোনো কারণ নেই। সব ক্ষেত্রেই ভারসাম্য থাকা উচিত।
প্রথম আলো  ৪০ বছর পর আমরা যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরু করেছি। এ ব্যাপারে বহির্বিশ্বে নানা অপপ্রচারও চলছে। এসব বন্ধে এবং বিচারের যৌক্তিকতা তুলে ধরতে সরকারের যা যা করণীয় ছিল তা কি তারা করতে পেরেছে?
ফারুক চৌধুরী  সরকার করতে পারেনি। আমি বলব, এটি কূটনৈতিক দুর্বলতা।
প্রথম আলো  বাংলাদেশে বর্তমানে যে রাজনৈতিক সংকট চলছে, তার পেছনে দুটি ঘটনা কাজ করছে। যুদ্ধাপরাধের বিচার ও নির্বাচন।
ফারুক চৌধুরী  দুটি আলাদা বিষয়। যুদ্ধাপরাধের বিচার নিয়ে বিতর্কের অবকাশ নেই। যে বিচার শুরু হয়েছে, তা শেষ করতে হবে। কিন্তু সরকার ৫ জানুয়ারি একতরফা নির্বাচন করে ফেললে তার ফল খুব নেতিবাচক হবে। এই নির্বাচনের মাধ্যমে যে সরকার প্রতিষ্ঠিত হবে, তার বিশ্বাসযোগ্যতাও থাকবে না। দক্ষিণ আফ্রিকার নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা বলতেন, দুই পক্ষের ঝগড়ায় কে হারবে, কে জিতবে—সেটি বড় কথা নয়, গুরুত্বপূর্ণ হলো, মানুষের ওপর এর প্রতিক্রিয়া কী হবে?
ইকোনমিস্ট-এর সঙ্গে আমি একমত নই যে, আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জিতলে বাংলাদেশ হারবে। বাংলাদেশ হারবে না। আমি বলব, বাংলাদেশ একটি কালো অধ্যায় অতিক্রম করছে। এমনকি পুরোনো রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগও কিন্তু কঠিন সময়ের মুখোমুখি। কীভাবে এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসবে, সেটাই দেখার বিষয়।
প্রথম আলো  এ অবস্থার জন্য বিরোধী দলেরও কি দায় নেই?
ফারুক চৌধুরী  অবশ্যই দায় আছে। বিরোধী দলের যে দায়িত্ব, তা কি তারা গত পাঁচ বছরে পালন করতে পারেনি? তারা সংসদে গরহাজির থেকেছে। বিএনপি এখন বসে বসে বিবৃতি দেয় এবং তাদের একটি কর্মসূচি পালনের জন্য আরেকটি বাহু আছে, তার নাম জামায়াত-শিবির। তারা দেশের ভয়াবহ ক্ষতি করেছে, তারা মানুষ মেরেছে, সরকারি স্থাপনায় হামলা করছে, পরিবহনব্যবস্থা ভেঙে দিয়েছে। এগুলো আন্দোলন নয়, সন্ত্রাস। আর জামায়াত-শিবিরই তা করতে পারে। কেননা, দেশের প্রতি তাদের দরদ নেই। থাইল্যান্ডেও সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন হচ্ছে। সেখানে তো সরকারি কোনো স্থাপনায় হামলা হচ্ছে না।
প্রথম আলো  বিরোধী দলের অভিযোগ, সরকার তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করেছে বলেই তারা এসব করতে বাধ্য হচ্ছে।
ফারুক চৌধুরী  বিরোধী দলকে সভা-সমাবেশ করতে না দেওয়া অন্যায় ও অগ্রহণযোগ্য। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে জামায়াত-শিবিরকে দিয়ে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালাতে হবে। শান্তিপূর্ণ উপায়েই তারা সরকারের অগণতান্ত্রিক কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ জানাতে পারে।
তবে আবারও ম্যান্ডেলার কথায় ফিরে যেতে হয়। ১৯৯৭ সালে নেলসন ম্যান্ডেলা বাংলাদেশে এসে বলেছিলেন, ‘আমি দেশের প্রেসিডেন্ট। অতএব দেশটিতে যা কিছু ঘটুক না কেন, তার দায় আমাকেই নিতে হবে।’ বাংলাদেশের ক্ষমতাসীনদেরও আমি সে কথাটি স্মরণ করিয়ে দিতে চাই।
দেশে বর্তমানে জনজীবনে যে দুর্বিষহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, রাজনৈতিক নেতৃত্ব তার দায় এড়াতে পারে না। দুই দলে মুষ্টিমেয় লোক রাজনীতি করেন। আর সেই রাজনীতির জন্য গোটা দেশের মানুষ দুর্ভোগ পোহাচ্ছে। এটা মেনে নেওয়া যায় না।
প্রথম আলো  বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে আমাদের বন্ধু ও উন্নয়ন-সহযোগী রাষ্ট্রগুলো বলা যায় মুখোমুখি অবস্থানে। এর কারণ কী?
ফারুক চৌধুরী  আমার মতে, কোনো রাষ্ট্রই স্থায়ী বন্ধু বা শত্রু নয়। সবাই নিজের স্বার্থ দেখবে। প্রশ্ন হলো, আমরা আমাদের স্বার্থ কতটা দেখছি।
প্রথম আলো  ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র, জাতিসংঘ, কমনওয়েলথ ইতিমধ্যে জানিয়ে দিয়েছে, তারা পর্যবেক্ষক পাঠাবে না। আরও কোনো কঠোর পদক্ষেপ নিতে পারে?
ফারুক চৌধুরী  হ্যাঁ, তারা অবরোধ আরোপ করতে পারে। যেমন, অনেক দেশে করেছে। জিএসপি সুবিধা বাতিলও একধরনের অবরোধ। কিন্তু বাংলাদেশে চূড়ান্ত অবরোধ আরোপ করার মতো পরিস্থিতি এখনো হয়েছে বলে মনে করি না।
প্রথম আলো  যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন কিংবা জাতিসংঘ যদি শেষ পর্যন্ত কোনো কঠোর সিদ্ধান্ত নেয়, বাংলাদেশ কি তা বহন করতে পারবে?
ফারুক চৌধুরী  বাংলাদেশের বিকাশমান অর্থনীতির ওপর মারাত্মক চাপ পড়বে। আমাদের রপ্তানি কমবে, বিনিয়োগ কমলে মানুষের কর্মসংস্থানও কমবে, বেকারত্ব বাড়বে। ১৬ কোটি মানুষের বাংলাদেশের পক্ষে এসব দায় বহন করা কঠিন হবে। তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো বহির্বিশ্বে বাংলাদেশ যে সুনাম অর্জন করেছিল, তা ধুলায় মিশে যাবে।
প্রথম আলো  আপনাকে ধন্যবাদ।
ফারুক চৌধুরী  ধন্যবাদ।
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন  সোহরাব হাসান ও রাহীদ এজাজ
 
Support : Dhumketo ধূমকেতু | NewsCtg.Com | KUTUBDIA @ কুতুবদিয়া | eBlog
Copyright © 2013. Edu2News - All Rights Reserved
Template Created by Nejam Kutubi Published by Darianagar Publications
Proudly powered by Dhumketo ধূমকেতু