Home » , , , , » নুরুল ইসলাম হত্যা মামলাঃ বিপ্লবের নেতৃত্বেই অপহরণ ও খুন

নুরুল ইসলাম হত্যা মামলাঃ বিপ্লবের নেতৃত্বেই অপহরণ ও খুন

Written By Kutubi Coxsbazar on Friday, July 22, 2011 | 1:43 PM

ক্ষ্মীপুর পৌরসভার মেয়র আবু তাহেরের ছেলে এ এইচ এম বিপ্লবের নেতৃত্বেই বিএনপির নেতা ও আইনজীবী নুরুল ইসলামকে অপহরণ ও হত্যা করা হয়। তাহেরেরই বাসায় লাশ কেটে টুকরো টুকরো করে বস্তায় ভরে নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। ঘটনাটির এই বর্ণনা নুরুল ইসলাম হত্যা মামলার রায়ে উল্লেখ রয়েছে।
চট্টগ্রাম বিভাগীয় দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের তৎকালীন বিচারক এম হাসান ইমাম ২০০৩ সালের ৯ ডিসেম্বর মামলাটির রায় দেন। রায়ে বিপ্লব ও তাঁর ভাই আবদুল জব্বার ওরফে লাভুসহ পাঁচজনকে মৃত্যুদণ্ড, বিপ্লবের আরেক ভাই টিপুসহ নয়জনকে যাবজ্জীবন এবং দুজনকে পাঁচ বছর করে সশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়।
রায়ে শিমুল কুমার দেবনাথ নামে আসামির দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। ২০০২ সালের ১৩ মার্চ লক্ষ্মীপুরের আদালতে দেওয়া ওই জবানবন্দিতে নুরুল ইসলামকে অপহরণের প্রস্তুতি থেকে লাশ টুকরো টুকরো করে বস্তায় ভরে মাইক্রোবাসে ওঠানো পর্যন্ত ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে।
২০০০ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর রাতে নুরুল ইসলামকে লক্ষ্মীপুরের বাসা থেকে অপহরণ এবং পরে হত্যা করা হয়।
রায় ঘোষণার সময় চট্টগ্রাম দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) ছিলেন কামরুল ইসলাম। তিনি গতকাল বৃহস্পতিবার প্রথম আলোকে বলেন, নুরুল ইসলাম হত্যা মামলাটি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। এর আগেই রাষ্ট্রপতি একজন আসামির সাজা যেভাবে মওকুফ করেছেন, তাতে সাধারণ মানুষের মধ্যে আস্থাহীনতা দেখা দিতে পারে।
দণ্ডিত আসামি যাঁরা: দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের রায়ে বিপ্লব ছাড়াও আবদুল জব্বার ওরফে লাভু (তাহেরের পালক ছেলে), আলমগীর হোসেন, জিকো, তানভীর হায়দার চৌধুরী ওরফে রিংকু ও জিয়াউর রহমান ওরফে শিপনকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেওয়া হয়। যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ দেওয়া হয় আবদুল খালেক, আবদুল গণি, পরাণ, জাকির হোসেন, মেহেদী, টিপু (তাহেরের আরেক ছেলে), মাহফুজ, মারজু ও শিমুলকে। এ ছাড়া পাঁচ বছর করে কারাদণ্ড হয় দীনেশ ও দুলালের।
রায়ে যা বলা হয়: রায়ে বলা হয়, শিমুলের জবানবন্দি পর্যালোচনায় দেখা যাচ্ছে, ঘটনার রাত নয়টা থেকে ১১টার মধ্যে আসামি বিপ্লব, লাভু, জিকু, খালেক, গণি, রিংকু, পরাণ, জাকির, মেহেদী, টিপু, মাহফুজ ও মারজু গং তমিজউদ্দিনের মাঠের পেছনে ট্রাক শ্রমিক ইউনিয়নের কার্যালয়ে বসে মদ পান করে। এরপর রাত ১২টার মধ্যে বিপ্লবের নেতৃত্বে আসামিরা মাহফুজের গাড়িতে করে নুরুল ইসলামের বাসায় যান। এর ৪৫ মিনিট পর ওই মাইক্রোবাসে করে তাঁরা নুরুল ইসলামকে তুলে আবু তাহেরের বাসায় নিয়ে আসেন। এরপর আসামি টিপু, লাভু, শিপন ও রিংকু আইনজীবী নুরুল ইসলামকে রামদা ও ছেনি দিয়ে কেটে টুকরো টকরো করেন। লাশের টুকরোগুলো দীনেশ, দুলাল ও শিমুলকে বস্তায় ভরার জন্য নির্দেশ দেন বিপ্লব ও লাভু। তাঁরা লাশের টুকরোগুলো বস্তায় ভরে মাহফুজের গাড়িতে ওঠান। এরপর লাশের বস্তা নিয়ে বিপ্লব, লাভু, জিকো, খালেক, গণি, রিংকু, শিপন ও মেহেদী ওই গাড়িতে করে মজু চৌধুরীর হাটের দিকে যান।
রায়ে বলা হয়, সাক্ষী ফাতেমা বেগম (নুরুল ইসলামের প্রতিবেশী) সাক্ষ্যে সুস্পষ্টভাবে বলেন, ঘটনার রাত ১২টা-সাড়ে ১২টার দিকে নুরুল ইসলামের বাসার সামনের কক্ষে বসে কাজ করা অবস্থায় হঠাৎ প্রথমে ফটক ভাঙার শব্দ শোনেন। বাইরে থেকে সন্ত্রাসীরা নুরুল ইসলামকে ঘর থেকে বের হতে বলে। নুরুল ইসলাম ভয়ে ঘরের ভেতর খাটের নিচে আশ্রয় নেন। সন্ত্রাসীরা দরজা ভেঙে সেখান থেকে তাঁকে বের করে নিয়ে আসে। এ সময় নুরুল ইসলাম তাঁকে হত্যা না করতে বিপ্লবকে অনুরোধ করেন। এরপর আসামিরা নুরুল ইসলামকে টেনেহিঁচড়ে বের করে মাইক্রোবাসে উঠিয়ে দ্রুতগতিতে মাদামের (তাহেরের বাসা) দিকে যায়।
রায়ে বলা হয়, আরেক সাক্ষী নূর মোহাম্মদ পাটোয়ারী হলেন ফাতেমা বেগমের প্রতিবেশী। পাটোয়ারী সাক্ষ্যে বলেন, ঘটনার রাতে বিপ্লবসহ ৮-১০ জনকে নুরুল ইসলামকে অপহরণ করে নিয়ে যেতে দেখেছেন। সাক্ষী হারুনুর রশিদও বলেন, তিনি দেখেছেন, নুরুল ইসলামের চোখ বেঁধে বিপ্লব, লাভু, জাকির, পরাণ, মেহেদী, জিকো, খালেক ও গণি নিয়ে গেছেন।
রায়ে বলা হয়, ‘উপরোক্ত সাক্ষ্য থেকে আসামি শিমুল কুমারের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, ঘটনার রাতে আসামি বিপ্লব, লাভু, জিকো, খালেক, গণি, রিংকু, পরাণ, জাকির, মেহেদী, টিপু, শিপন, মাহফুজ এবং অন্যান্য কর্তৃক নুরুল ইসলামকে তাঁর বাসা থেকে অপহরণের ঘটনাটি সুস্পষ্টভাবে সমর্থিত হয়েছে।’
যাঁরা খালাস পান: বিচারক রায়ে এই মামলার আসামি লক্ষ্মীপুর পৌরসভার তৎকালীন চেয়ারম্যান আবু তাহের, তাঁর স্ত্রী নাজমা তাহের, ভায়রা হাসু চেয়ারম্যানসহ ১৫ আসামিকে খালাস দেন।
রায়ে বলা হয়, যদিও তাজুল ইসলাম নামের এক সাক্ষী বলেছেন, আবু তাহের, নাজমা তাহের, হাসু চেয়ারম্যান, বাবর, কাশেম জিহাদী গং নুরুল ইসলামকে অপহরণপূর্বক হত্যা করে লাশ গুম করেছেন। তাজুলের এই বক্তব্য সমর্থন করেছেন সাক্ষী রাশিদা ইসলাম, আইনজীবী মনিরুল ইসলাম ও কবিরুল ইসলাম। যদিও এই সাক্ষীদের জানার উৎস ছিলেন ফাতেমা বেগম। ফাতেমা বেগম স্বয়ং তাঁর সাক্ষ্যে এসব আসামির নাম উল্লেখ করেননি। সাক্ষী তাজুল, রাশিদা ইসলাম ও মনিরুল তদন্ত কর্মকর্তাদেরও এসব আসামির নাম ঘটনার পরপর বলেননি।
রায়ে বিচারক আরও বলেন, ‘আমার বলতে দ্বিধা নেই, রাষ্ট্রপক্ষ আসামি আবু তাহের, নাজমা তাহের, হাসু চেয়ারম্যান, সাজু, মাহবুব, মানিক, আবুল কাশেম জিহাদী, নুরুল আজিম বাবর, রিপন, সুমন, জামাল, কাজল, জাহাঙ্গীর, আবদুল মতিন ও জসিমউদ্দিন ওরফে সাংবাদিক জসিমের বিরুদ্ধে আনীত দণ্ডবিধির ১২০(বি)/৩০২/২০১/৩৪ ধারায় অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে পারেনি।’
বিপ্লবের সাজা মওকুফের চিঠি বিচারিক আদালতের নথিতে সংরক্ষণ: বিপ্লবের মৃত্যুদণ্ডের আদেশ মওকুফ-সংক্রান্ত লক্ষ্মীপুর জেলা কারাগার কর্তৃপক্ষের চিঠি বিচারিক আদালতের নথিতে সংরক্ষণ করা হয়েছে। চট্টগ্রাম বিভাগীয় দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক রবিউল হাসান গতকাল চিঠিতে ‘দেখিলাম’ লিখে এর নিচে সই করেন। এরপর তা নথিতে সংরক্ষণ করা হয়।
আদালত সূত্র জানায়, বিপ্লবের মৃত্যুদণ্ডাদেশ মওকুফ-সংক্রান্ত রাষ্ট্রপতির আদেশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হয়ে কারাগার কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছায়। লক্ষ্মীপুর কারা কর্তৃপক্ষ এ-সংক্রান্ত আদেশ ১৪ জুলাই কার্যকর করে। ওই দিন এ-সংক্রান্ত আদেশের চিঠি লক্ষ্মীপুর কারা কর্তৃপক্ষ বিচারিক আদালতে পাঠায়।
প্রথম আলোর রায়পুর (লক্ষ্মীপুর) প্রতিনিধি জানান, নুরুল ইসলামের ভাই সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান শামছুল ইসলাম আজাদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘তিন-চার দিন ধরে প্রতি রাতে নম্বরপ্লেটবিহীন মাইক্রোবাসে করে সন্ত্রাসীরা এসে আমাদের গ্রামের বাড়ির সামনে অবস্থান করছে। এতে আমরা চরম উৎকণ্ঠার মধ্যে রয়েছি।’
যোগাযোগ করা হলে লক্ষ্মীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. গোলাম সারোয়ার বলেন, ‘নুরুল ইসলামের গ্রামের বাড়িতে রাতে সন্ত্রাসীদের আনাগোনা সম্পর্কে আমি অবগত নই। বিষয়টি সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

0 comments:

Post a Comment

 
Support : Dhumketo ধূমকেতু | NewsCtg.Com | KUTUBDIA @ কুতুবদিয়া | eBlog
Copyright © 2013. Edu2News - All Rights Reserved
Template Created by Nejam Kutubi Published by Darianagar Publications
Proudly powered by Dhumketo ধূমকেতু