Home » , , » কিডনি লিভার ব্যবসায় ৫৮ চক্র by পারভেজ খান

কিডনি লিভার ব্যবসায় ৫৮ চক্র by পারভেজ খান

Written By Unknown on Friday, September 9, 2011 | 1:43 PM

রাজধানী ও বিভিন্ন বিভাগীয় শহরসহ দেশের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় ৫৮টি অপরাধী চক্র রয়েছে যাদের ব্যবসাই হচ্ছে কিডনি ও লিভার বেচাকেনা। গ্রামের সহজ-সরল দরিদ্র মানুষই তাদের মূল শিকার। দারিদ্র্যের সুযোগে এসব সরলমনা মানুষকে তারা নানা প্রলোভনে আকৃষ্ট করে লিভার ও কিডনি কিনে নেয়। তারা ক্রেতা-বিক্রেতা সেজে পত্রিকায় বিজ্ঞাপনও দিচ্ছে। এ চক্রকে নানাভাবে সহায়তা করছে দেশের কয়েকটি শীর্ষ পর্যায়ের বেসরকারি সংস্থা বা এনজিওর মাঠ পর্যায়ের কর্মী আর সুদ ব্যবসায়ীরা। সহায়তা করছেন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালের কিছু অসৎ চিকিৎসক আর ক্লিনিক ব্যবসায়ীও। খোদ ঢাকাতেই রয়েছে এ রকম আটটি হাসপাতাল ও ক্লিনিক আর তিনটি সংঘবদ্ধ চক্র।
গত বৃহস্পতিবার ঢাকায় গ্রেপ্তার হওয়া জয়পুরহাটের একটি চক্রের নেতা তারেক ওরফে বাবুল, জয়পুরহাটে গ্রেপ্তার হওয়া সাইফুল, সাত্তার, মোস্তফা, ফোরকানসহ র‌্যাব ও পুলিশের একাধিক সূত্র থেকে এসব তথ্য জানা গেছে। র‌্যাবের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, তাঁদের গোয়েন্দা ইউনিট এ ব্যাপারে সারা দেশ থেকে তথ্য সংগ্রহ করছে। ইতিমধ্যে তারা এ চক্রের সদস্যদের একটি তালিকা তৈরি করে তাদের গ্রেপ্তারের জন্য অভিযানও শুরু করেছে।
গতকাল শুক্রবার সকালে ঢাকা মহানগর পুলিশের ডিবি কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সামনে হাজির করা হয় গ্রেপ্তার করা কিডনিচক্রের নেতা তারেক ওরফে বাবুলকে। বাবুলের বিরুদ্ধে অভিযোগ, সে শতাধিক কিডনি ও লিভার বেচাকেনা করেছে গত আট বছরে। অনেকের কিডনি প্রতিস্থাপন হয় দেশের বাইরেও।
বাবুল সাংবাদিকদের জানায়, সে উচ্চ শিক্ষিত। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যবস্থাপনায় সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়েছে সে। টানা ছয় বছর এ চক্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকলেও দুই বছর ধরে সেটা ছেড়ে দিয়ে এখন গার্মেন্টের টুকরা কাপড়ের ব্যবসা করছে। চক্র পরিচালনাকালে সে ৩৫ থেকে ৪০টি কিডনি বেচাকেনা করেছে। মূলত তার কাজ হচ্ছে ক্রেতা আর বিক্রেতা জোগাড় করে তাদের মধ্যে মধ্যস্থতা করে দেওয়া। কারো কিডনি নেওয়া হলে তাকে দেওয়া হয় তিন থেকে সাড়ে তিন লাখ টাকা। আর ক্রেতার কাছ থেকে সে যেটা পায় তা থেকে বিভিন্ন খরচাদি বাদে তার ৩০-৪০ হাজার টাকা থাকে। বাবুল আরো জানায়, প্রথমে মানুষের সহায়তার জন্য সম্পূর্ণ মানবিক ও সেবামূলক কাজ ভেবেই
সে এতে জড়িয়ে পড়ে। এতে করে একজন দরিদ্র ব্যক্তিও টাকা পেয়ে সেটা দিয়ে জীবন চালানোর জন্য নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে। আবার কিডনির কারণে যে ব্যক্তিটি মারা যেতে বসেছিল, সেও আবার সুস্থ হয়ে ওঠে। এসব ভেবেই সে এ কাজে জড়িয়ে পড়ে। তাকে সহায়তা করেছে গ্রামীণ ব্যাংক, আশা, ব্র্যাকসহ স্থানীয় কয়েকটি এনজিওর কর্মীরাও। ঢাকায়ও তাদের তিনটি চক্র আছে। আছে সরকারি-বেসরকারি আটটি হাসপাতাল ও ক্লিনিক। এ ব্যবসা শুরুর পর একপর্যায়ে ভালো আয় হওয়ার কারণে সে পেশা হিসেবেই এটাকে বেছে নেয়। পরে যখন বুঝতে পারে, এটা অপরাধ এবং তার মতো শিক্ষিত একজনের এ কাজ করা উচিত হচ্ছে না, তখনই সে এ পেশা ছেড়ে দিয়েছে।
বাবুলের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ডিবির একজন কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে জানান, সে বেশ কয়েকটি এনজিও ও সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালের নাম বলেছে। হাসপাতাল বা ক্লিনিকের চিকিৎসকদের সম্পৃক্ততার বিষয়গুলো খোঁজখবর নিয়ে দেখা হচ্ছে। তাঁরা কি জেনেশুনে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে এগুলো করেছেন, নাকি শুধু একজন চিকিৎসক হিসেবে তাঁরা তাঁদের কর্তব্য পালন করেছেন, সে ব্যাপারেও খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে।
র‌্যাবের একজন কর্মকর্তা জানান, রাজধানীর অদূরে সাভারের কয়েকটি ক্লিনিক ও হাসপাতাল সম্পর্কেও তাঁদের কাছে এ ধরনের খবর আছে। বিশেষ করে একটি বেসরকারি হাসপাতাল রয়েছে, যেটার মালিক নিজেও একজন চিকিৎসক এবং তাঁর বিরুদ্ধেও এ ধরনের অভিযোগ রয়েছে। এ চিকিৎসক নানাভাবে বিতর্কিত এবং এর আগেও একাধিকবার সংবাদ শিরোনাম হয়ে এসেছেন। তাঁর ব্যাপারেও খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে।
গতকাল এই প্রতিবেদকের সঙ্গে টেলিফোনে কথা হয় জয়পুরহাটের দুজন কিডনি ব্যবসায়ীর সঙ্গে। দুজনই তাদের নাম-পরিচয় প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে বলে, তারা দুই বছর হলো এ পেশা ছেড়ে দিয়েছে। গোবিন্দগঞ্জ, শিবগঞ্জ ও কালাই সীমান্ত এলাকায়ই এ চক্রের তৎপরতা বেশি। ঘটনাক্রমে এ চক্রের সঙ্গে স্থানীয় কয়েকটি এনজিও ও দাদন ব্যবসায়ীরাও জড়িয়ে পড়েছে।
দুই চক্র সদস্য জানায়, সীমান্ত এলাকার মানুষের একটি বড় অংশই অতিদরিদ্র। তাদের মূল ব্যবসা চোরাচালানের পণ্য বহন করা। দুই দেশের পুলিশ, সীমান্তরক্ষীদের দিয়ে তাদের যা থাকে তাতে সংসার চালানো কঠিন। আবার মাঝেমধ্যে মালামাল ধরা পড়লে তারা আরো বিপদে পড়ে। আর এ অসহায় অবস্থার সুযোগ নিয়ে স্থানীয় দাদন বা সুদ ব্যবসায়ী আর এনজিওকর্মীরা ওদের পাশে গিয়ে দাঁড়ানোর নাম করে টাকা ধার দেয়। এ টাকা পরে পরিশোধ করতে না পেরে তারা পড়ে যায় চাপের মুখে। পালিয়ে বেড়াতে থাকে কেউ কেউ। আর এই অবস্থায়ই এনজিওর কর্মী আর সুদ ব্যবসায়ীর দালালরা নানান প্রলোভন দেখিয়ে পরামর্শ দেয় কিডনি আর লিভার বিক্রির। ঋণ শোধের আর কোনো উপায়ান্তর না পেয়ে আর লাখ লাখ টাকার প্রলোভনে সেসব সরল মানুষই কিডনি ও লিভার বিক্রি করে দেয়। যেসব ক্রেতার আর্থিক সামর্থ্য বেশি তারা বিক্রেতাকে আত্মীয় পরিচয় দিয়ে ভারতসহ দেশের বাইরে বিভিন্ন উন্নত দেশেও নিয়ে যায়। তবে এ চক্রের কিছু সদস্য আছে যারা কিডনি বা লিভারদাতাকে চুক্তি অনুযায়ী টাকা দেয় না। প্রলোভনে পড়ে কিডনি বা লিভার দেওয়ার পর তারা প্রতারিতও হয়।
এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে জয়পুরহাটের কালাই ব্র্যাক অফিসের শাখা ব্যবস্থাপক আজিজুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ২০০৮ ও ২০০৯ সালে মাত্রাই ও উদয়পুর ইউনিয়নের কিডনি বিক্রেতাদের মধ্যে আটজন তাঁদের সদস্য ছিল। কিন্তু ঋণখেলাপির কারণে তারা সদস্য থেকে বাদ পড়ে। কাজেই এনজিওর প্ররোচনার কারণে তারা কিডনি বিক্রি করছে_এমন কথা ঠিক নয়।
কালাই ঠেঙ্গামারা মহিলা সবুজ সংঘের (টিএমএসএস) আঞ্চলিক ব্যবস্থাপক বিপুল চন্দ্র বলেন, 'এনজিওগুলোর কারণে নয়, বলতে পারেন গ্রাম্য মহাজন বা দাদন ব্যবসায়ীদের কারণেই ঋণগ্রস্তরা কখনো বাড়ি বিক্রি করে, কখনো বা পলাতক থাকে। দালালদের খপ্পরে পড়ে কিডনি বেচাকেনার এ অবৈধ অপকর্ম ঢাকতে এক শ্রেণীর অসাধু মানুষ এনজিওগুলোর বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে।'
বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি এবং বিএমএর সাবেক সভাপতি বিশিষ্ট শল্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক রশিদ-ই-মাহবুব গতকাল কালের কণ্ঠকে জানান, যে ব্যক্তি লিভার বা কিডনি দেয়, পারতপক্ষে তার কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়। লিভার নেওয়া হয় আংশিক। এতে ওই ব্যক্তি স্বাভাবিকভাবেই চলাচল করতে পারে। সব কিছু আগাম পরীক্ষা করেই এ প্রতিস্থাপন করা হয়। তবে এ দেশে যা ঘটছে, তা ভিন্ন। লিভার বা কিডনি বিক্রির শিকার হচ্ছে দরিদ্র শ্রেণী। সমস্যাটা হচ্ছে, এরা সচেতন নন এবং চিকিৎসা নেওয়ার মতো আর্থিক সচ্ছলতাও তাদের থাকত না। এ ধরনের একটি অঙ্গ বা অঙ্গের অংশ দান করার পর বা কাউকে দেওয়ার পর তার যে সেবা বা চিকিৎসা দরকার, সে ব্যাপারে তারা কতটা সচেতন, কতটা সচ্ছল আর কতটুকু করবে, সেটাও প্রশ্নসাপেক্ষ। ফলে এর হেরফের হলে তাদের ক্ষেত্রে মারাত্মক সমস্যা হতে পারে।

0 comments:

Post a Comment

 
Support : Dhumketo ধূমকেতু | NewsCtg.Com | KUTUBDIA @ কুতুবদিয়া | eBlog
Copyright © 2013. Edu2News - All Rights Reserved
Template Created by Nejam Kutubi Published by Darianagar Publications
Proudly powered by Dhumketo ধূমকেতু