Home » , » সড়ক নিরাপত্তা উপেক্ষিত by আনোয়ার হোসেন

সড়ক নিরাপত্তা উপেক্ষিত by আনোয়ার হোসেন

Written By Unknown on Tuesday, August 16, 2011 | 6:07 AM

দেশে সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিল রয়েছে। আছে সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধবিষয়ক সেলও। এগুলো যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের অধীন। কিন্তু একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটলেও এই প্রতিষ্ঠানগুলো নিষ্ক্রিয়। সরকারও নির্বিকার।

সরকারি হিসাবে বছরে গড়ে তিন হাজারের বেশি লোক সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায়। বেসরকারি হিসাবে এই সংখ্যা ১২ থেকে ২০ হাজার। বিশেষজ্ঞরা সড়ক দুর্ঘটনার জন্য ভাঙাচোরা ও ত্রুটিপূর্ণ সড়ক, ভুয়া লাইসেন্সধারী চালক এবং জনসচেতনতার অভাবকে দায়ী করছেন।
সারা দেশে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) অধীন জাতীয় ও আঞ্চলিক সড়ক ১৮ হাজার কিলোমিটার। এর মধ্যে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ সড়কের দশা বেহাল ও ত্রুটিপূর্ণ। তা ছাড়া পেশাদার চালকের লাইসেন্স দেওয়া হচ্ছে মন্ত্রীর সুপারিশে ও পরীক্ষা ছাড়াই। আর সচেতনতা সৃষ্টির কার্যক্রমও চোখে পড়ে না।
সড়ক দুর্ঘটনাকে নরহত্যা হিসেবে গণ্য করে দায়ী চালকদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়ার আইন করা হয়েছিল ১৯৮৫ সালে। শ্রমিক সংগঠনগুলোর চাপে সরকার পরে আইন সংশোধন করে। এখন চালকের ভুলে দুর্ঘটনা হলে এক থেকে তিন বছর কারাদণ্ডের বিধান আছে। আইনটি যুগোপযোগী করতে ২০০৭ সালে একটি কমিটি করেছিল যোগাযোগ মন্ত্রণালয়। কমিটি আইনের খসড়া তৈরি করেছে। খসড়াটি চার বছর ধরে এ-টেবিল ও-টেবিল ঘুরছে, আইনে পরিণত হয়নি। ফলে একটি দুর্ঘটনার পর কয়েক দিন হইচই হলেও বাস্তব কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না।
সরকারি হিসাবে ১৯৯৯ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত এক যুগে সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে ৩৮ হাজার লোক। আহত হয়েছে ৩৫ হাজার। এ সময় দুর্ঘটনা ঘটেছে প্রায় ৫০ হাজার।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউট (এআরআই) মনে করে, পুলিশ দুর্ঘটনা ও হতাহতের যে হিসাব দেয়, প্রকৃত সংখ্যা এর তিন গুণ। অবশ্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) ২০০৭ সালের হিসাবে বলা হয়েছে, এ বছর বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় ২০ হাজার ৩৪ জন মারা যায়। বাংলাদেশের প্রতি এক লাখ মানুষের মধ্যে ১২ দশমিক ৬ জন সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায় বলে ডব্লিউএইচও উল্লেখ করে।
যুক্তরাজ্য সরকারের বৈদেশিক উন্নয়ন সংস্থার (ডিএফআইডি) ২০০৪ সালের এক জরিপে বলা হয়েছে, সড়ক দুর্ঘটনায় বাংলাদেশের মোট দেশীয় উৎপাদনের (জিডিপি) ১ দশমিক ৬ শতাংশ ক্ষতি হয়। তবে এআরআইয়ের সাবেক পরিচালক মাজহারুল ইসলাম বলেন, এখন সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ জিডিপির ২ শতাংশেরও বেশি।
নিষ্ক্রিয় কাউন্সিল: সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিলের তিন মাস পর পর বৈঠক করার কথা। কিন্তু এই সরকারের পৌনে তিন বছরে বৈঠক হয়েছে মাত্র তিনটি। মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, এই তিনটি বৈঠকের একটি করা হয়েছে নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খানের অনুরোধে। গত ২৭ জুলাই বৈঠকটি হয়। এখানে সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কোনো আলোচনাই হয়নি। উল্টো সাড়ে ২৪ হাজার পেশাদার চালককে পরীক্ষা ছাড়াই লাইসেন্স দেওয়া এবং পরিবহন খাতে চাঁদা নির্ধারণ নিয়ে আলোচনা হয়।
নৌমন্ত্রীর চাপে ২০০৯ সালে ১০ হাজার লাইসেন্স দেওয়া হয়েছিল পরীক্ষা ছাড়া। এবার তাঁর শ্রমিক সংগঠন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন ফেডারেশন সাড়ে ২৪ হাজার লাইসেন্সের জন্য আবেদন করেছে।
সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিলে সরকারি কর্মকর্তা, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, মালিক-শ্রমিক প্রতিনিধি আছেন। একাধিক সদস্য জানান, সর্বশেষ বৈঠকে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের ডাকাই হয়নি। কাউন্সিলের সদস্য ও নিরাপদ সড়ক চাই-এর চেয়ারম্যান চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন প্রথম আলোকে বলেন, ‘এভাবে মানুষ মরছে, কিন্তু সরকারিভাবে কোনো গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। সরকারের বিভিন্ন বিভাগের মধ্যেও কোনো সমন্বয় নেই।’
একইভাবে সওজ ও বিআরটিএর একটি সেল আছে। বিআরটিএর সেলটি শুধু পুলিশের কাছ থেকে তথ্য নিয়ে একটি বই প্রকাশ ও চালকদের জন্য কয়েকটি সেমিনার করে। আর সওজের সেলটির কাজ কী, তা কেউ বলতে পারে না।
জানতে চাইলে যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন বলেন, ভাঙাচোরা সড়ক ও সড়কের ত্রুটির কারণে দুর্ঘটনা হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে সওজকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটসহ বিশেষজ্ঞদের সঙ্গেও বসবেন তিনি। সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিলের বৈঠক সম্পর্কে মন্ত্রী বলেন, খুব শিগগির সবাইকে নিয়ে বৈঠক হবে। পরীক্ষা ছাড়া পেশাদার লাইসেন্স দেওয়ার বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘একেবারে পরীক্ষা ছাড়া নয়। ন্যূনতম পরীক্ষা নিয়ে যারা যানবাহন চালাতে পারে, তাদের লাইসেন্স দেওয়ার চিন্তাভাবনা চলছে।’
দুর্ঘটনা হলেই সরকার একটু তৎপর হয়, তারপর ভুলে যায়, কেন? জবাবে মন্ত্রী বলেন, ‘এবার আমরা খুব সিরিয়াস। সড়ক দুর্ঘটনা বন্ধ করতেই হবে।’
কাজ হয় না: যোগাযোগ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বুয়েটের এআরআই গত বছর জুনে সারা দেশের ২১৬টি স্থানকে অতি দুর্ঘটনাপ্রবণ (ব্ল্যাক স্পট) হিসেবে চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সওজের কাছে পাঠায়। যোগাযোগ মন্ত্রণালয়কেও বিষয়টি জানানো হয়। কিন্তু এক বছরেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
এআরআই সূত্র বলছে, একটি নির্দিষ্ট এলাকার মধ্যে বছরে তিনবার বা তারও বেশি দুর্ঘটনা ঘটলে এটাকে ব্ল্যাক স্পট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ব্ল্যাক স্পটগুলোতে সড়কের অস্বাভাবিক বাঁক থাকে, সড়কের পাশে হাটবাজার গড়ে ওঠে এবং সড়ক সংকেত থাকে না। শনিবার মানিকগঞ্জের যে স্থানে সড়ক দুর্ঘটনায় মিশুক মুনীর ও তারেক মাসুদ মারা গেছেন, সেটিও একটি ব্ল্যাক স্পট।
গতকাল দুর্ঘটনাস্থলটি পরিদর্শনে গিয়েছিলেন এআরআইয়ের পরিচালক ও বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক হাসিব মোহাম্মদ আহসান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, দুর্ঘটনাস্থলে সড়ক সংকেত (ওভারটেক করা যাবে, যাবে না; গতিসীমা কত) নেই। অত্যধিক বাঁক ও সড়কের পাশের গাছপালাও দুর্ঘটনার জন্য দায়ী।
এআরআই পরিচালক বলেন, সরকার কলেরা ও পোলিওকে মহামারি হিসেবে ঘোষণা দিয়ে সে অনুযায়ী পরিকল্পনা ও কর্মসূচি নিয়ে সফল হয়েছে। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনা একটি মহামারি হলেও এ নিয়ে কোনো পরিকল্পনা ও কর্মসূচি নেই। আগামী এক বছরে কী পরিমাণ সড়ক দুর্ঘটনা কমবে, সে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে কর্মসূচি ঠিক করে এগোতে হবে।
এআরআই পরিচালক বলেন, এবার দুর্ঘটনার হার বেশি এবং হতাহতের সংখ্যাও বেড়েছে। এর কারণ সম্পর্কে তিনি সড়কের দুরবস্থা, যানবাহনের সংখ্যা বৃদ্ধি, বেপরোয়া যান চলাচলের কথা উল্লেখ করেন।
সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক শামসুল হক বলেন, কোনো রকম অর্থ খরচ না করে শুধু সচেতনতা বৃদ্ধি, চালকের প্রশিক্ষণ, মোটরযান আইনের প্রয়োগের মাধ্যমে ২৫ থেকে ৩৫ শতাংশ দুর্ঘটনা কমানো সম্ভব। আর পরিকল্পিতভাবে সড়ক নির্মাণ, ত্রুটিমুক্ত যানবাহন নিশ্চিত করা এবং এই খাতে গবেষণা-পরিকল্পনার মাধ্যমে দুর্ঘটনা একেবারে কমিয়ে আনা যায়। কিন্তু বাংলাদেশে এর কোনোটাই হচ্ছে না।
ঢাকা-আরিচা মরণফাঁদ: আরিচা হয়ে ঢাকা-বাংলাবান্ধা মহাসড়কের দূরত্ব ৫০৭ কিলোমিটার। এর মধ্যে ঢাকা-আরিচা অংশের দূরত্ব ৮৮ কিলোমিটার। এই ৮৮ কিলোমিটার পথে প্রতিবছর গড়ে ১৪৫ জন সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারাচ্ছে। আরিচা পার হয়ে বাংলাবান্ধা পর্যন্ত এত মানুষের প্রাণহানি হয় না বলে বিআরটিএ ও এআরআই সূত্র জানায়। ঢাকা-আরিচা পথে প্রতিবছর গড়ে ১৩১টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। এই অংশটুকুতে ২২টি স্থান রয়েছে, যেখানে প্রতিবছরে গড়ে তিনটি দুর্ঘটনা ঘটে।
আরও ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক: সওজ ও সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণাকেন্দ্রের হিসাবে, সারা দেশে অন্তত ১০০ কিলোমিটার মহাসড়ক খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। এই ১০০ কিলোমিটারের মধ্যে অন্তত ২১৬টি স্থান আছে (ব্ল্যাক স্পট), যেখানে বছরে অন্তত তিনটি করে দুর্ঘটনা ঘটে।
দেশে নয়টি জাতীয় মহাসড়ক আছে। দূরত্ব সাড়ে তিন হাজার কিলোমিটার। এই মহাসড়কের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ জায়গাগুলো হচ্ছে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কাঁচপুর সেতুর পূর্ব প্রান্ত, গজারিয়া, দাউদকান্দি, সোনারগাঁ ও মধ্যবাউশিয়া। ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের টেপারা বাসস্ট্যান্ড, জয়পাড়া বাসস্ট্যান্ড, পুখুরিয়া বাসস্ট্যান্ড, সাভার বাজার ও বাথুলী উল্লেখযোগ্য।
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মধ্যে কাঁচপুর সেতুর পূর্ব প্রান্তে ৬০০ মিটার জায়গার মধ্যে ১৯৯৮ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত ৪৯ জন সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায়।
দেশের সড়ক দুর্ঘটনার প্রকৃতি বিশ্লেষণ করে বিআরটিএ জানায়, ৩৭ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটে জাতীয় মহাসড়কে, ১২ শতাংশ আঞ্চলিক মহাসড়কে এবং ১৫ শতাংশ শাখা সড়কে (ফিডার রোড)।
বাংলাদেশে দুর্ঘটনা বেশি: ২০০৯ সালে এআরআই এশিয়া, ইউরোপ ও অস্ট্রেলিয়া মহাদেশের ১৫টি দেশের সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর একটি তুলনামূলক চিত্র প্রকাশ করে। এতে দেখা গেছে, ১৫টি দেশের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর দিক থেকে বাংলাদেশ দ্বিতীয়। এ তালিকায় নেপাল প্রথম।

0 comments:

Post a Comment

 
Support : Dhumketo ধূমকেতু | NewsCtg.Com | KUTUBDIA @ কুতুবদিয়া | eBlog
Copyright © 2013. Edu2News - All Rights Reserved
Template Created by Nejam Kutubi Published by Darianagar Publications
Proudly powered by Dhumketo ধূমকেতু